নাগরিক কথা

বুয়েট বনাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!

বুয়েট বনাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমার মেঝভাই যিনি আমার থেকে তিন বছরের বড়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অনার্স মাস্টার্স। আমি বুয়েট থেকে যন্ত্রকৌশলে বি.এস.সি। মেঝভাই সলিমুল্লাহ হলে থাকতেন, আমি নজরুল ইসলাম হলে থাকতাম। পলাশী মোড়ের এপার আর ওপার।

কক্সবাজারে আমাদের খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারকে দুটো বিশ্ববিদ্যালয় দুটো সাইনবোর্ডের মত হয়ে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করেছে। আম্মা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে সলজ্জ মুখে আত্নীয় স্বজনদের বলেছে- আমার একটা ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, একটা ছেলে বুয়েটে পড়ে।

গতকালকের ঘটনা যা শুনলাম তার সারমর্ম হল- বুয়েট ক্যাম্পাসের (হল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবনের মাঝখান দিয়ে যাওয়া রাস্তা নিশ্চয় ক্যাম্পাসের অন্তর্গত) ওভারপাসের উপর কয়েকটা ছেলে গাঁজা খাচ্ছিল। বুয়েটের কিছু ছেলে সেই গাঁজা খাদকদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। এর ফল হিসেবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বিশাল ছেলেপেলের বাহিনী এসে রড, ক্রিকেটের স্ট্যাম্প ইত্যাদি নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে হামলা চালায়। বুয়েটের অনেকে এ মুহুর্তে আহত হয়ে হসপিটালে আছে এবং বুয়েটের হলের একজন গার্ডের মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি নিজে বুয়েটের ছাত্র। স্বাভাবিক ভাবেই আমার মনে বুয়েট কেন্দ্রিক আবেগ আছে। কিন্তু আমি আবেগ বাদ দিয়েই পরিস্থিতিটা যথাসাধ্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। ওভারপাসের উপর যে ছেলেগুলো গাঁজা খাচ্ছিল এরা বুয়েটের স্টাফ কোয়ার্টারের ছেলে বলে শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে ছিল বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোনটাই নিশ্চিত নয়। তবে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার প্রেক্ষিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা এসে বুয়েটের ছেলেদের পিটিয়ে গেছে- এটা মুটামুটি নিশ্চিত এবং বুয়েটের ছেলেরা যে মার খেয়ে এখন ডি.এম.সি., স্কয়ার ইত্যাদি হসপিটালে আছে এটা পুরোপুরি নিশ্চিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট কোনভাবেই পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বুয়েটের অডিটরিয়াম, শহীদ মিনার, এমনকি হলের প্রোগ্রাম দেখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বুয়েট ক্যাম্পাসে আসা অতি সাধারণ ঘটনা। বুয়েট পাশ করার এই এক যুগ পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অন্তর্গত টি.এস.সি.কে কখনো মনে হয়নি আমার নিজের ক্যাম্পাসের বাহিরের কিছু। ডাস এর লাসসির স্বাদ জিহ্বায় সেই একই রকম থাকবে আজীবন। বুয়েটের হলের ছেলেদের মধ্যে এমন কাউকেই সম্ভবত পাওয়া যাবেনা যে কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন হলে তার কোন বন্ধুর সাথে থাকেনি। তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের মধ্যেও কাউকে পাওয়া যাবেনা যার বুয়েটে অন্তত একজন ফ্রেন্ড অথবা বড়ভাই বা ছোটভাই নাই। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে বুয়েটের ছেলেদের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে’ এটা ঠিক ততটাই অগ্রহণযোগ্য ঘটনা যতটা অগ্রহণযোগ্য ঘটনা হল, এক ভাই আরেক ভাই এর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া।

প্রথম যে জিনিসটা দরকার সেটা হল এই ঘটনাটার সুষ্ঠু তদন্ত। তারপর সুষ্ঠু বিচার। তারপর পরবর্তী দিনের কথা চিন্তা করে পুরো বিষয়টা স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যাচাই। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সমগ্র সমগ্র বুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় দুটো হল আর টি.এস.সি.র সমান হবে হয়ত। বুয়েটে যারা পড়তে আসে তাদের বেশিরভাগই সাধারণ পড়ুয়া ছেলেপেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি এদের অনেকের সঙ্গীত, শিল্পকলা, চলচ্চিত্রে আগ্রহ থাকে। কিন্তু শক্তভাবে মারপিট করতে সক্ষম এরকম ছেলেপেলে বুয়েটে একেবারেই হাতেগোনা। কাজেই কেউ যদি মনে করে, দলবল নিয়ে এসে বুয়েট শহীদমিনারে বসা, পলাশী টং এর দোকানে চা খেতে থাকা, ক্যাফের সামনে বসে আড্ডা দিতে থাকা বুয়েটের ছেলেদের আচ্ছামত পিটিয়ে যাবে তাহলে খুব বেশি প্রতিরোধের মুখে তারা পড়ার কথা না।

কারণ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব জায়গায় ত আর সারাক্ষণ পুলিশ প্রহরা বসিয়ে রাখা যায়না। এমতাবস্থায় যদি আশেপাশের বড় কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেপেলের মাঝে এমন ভাবনার উদয় হয় যে ‘ওরা ত দুবলা-পাতলা, ওদের ত চাইলেই পিটিয়ে আসা যায়’ তাহলে সেটা ভয়ঙ্কর। এবং সেটা নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বুয়েট প্রশাসন দুটোরই ভাবা উচিৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাবা উচিৎ কারণ ‘গায়ে গতরে দুবলা পাতলা হলেই কাউকে পিটিয়ে আসা যায়’ এই চিন্তাটাই একটা অসভ্য বুনো চিন্তা। এই চিন্তার খপ্পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছেলেগুলো পড়েছে তারা আজকে বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে বুয়েটের ছেলেদের পিটাবে, কালকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর্বল কোন প্রতিপক্ষকে পিটাবে, পেশি শক্তি প্রয়োগ করে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রের সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে চাইবে এবং এদের সারাজীবনের পেশি শক্তি প্রদর্শনের বলি হবে অসংখ্য সাধারণ নিরীহ মানুষ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ডিগ্রীর দোকান না হয়ে যদি আসলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ‘সফল নষ্ট প্রজন্ম’ তৈরি হচ্ছে কিনা সেটা দেখাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়ীত্ব। বুয়েট প্রশাসনের ভাবা উচিৎ কারণ বুয়েটের ছেলেপেলেরা সংখ্যালঘু হবার কারণ হল বুয়েটে আসন সংখ্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় কম। বুয়েটে ভর্তি হবার জন্য তেমন বেশি যোগ্যতাও লাগেনা। একটু মাথা পরিস্কার হলে, একটু অঙ্ক বুঝলে, একটু ফিজিক্স বুঝলে মারামারিতে একেবারেই অক্ষম, অসম্ভব দুবলা পাতলা ছেলে বা মেয়েটাও বুয়েটে ভর্তি হতে পারে। পৃথিবী যদি এখনো আদিম বুনো পর্যায়ে থাকত তাহলে এই একটু অঙ্ক বোঝা, ফিজিক্স বোঝা ছেলেমেয়েগুলো দেশের বা পৃথিবীর কোন উপকারেই আসতনা, বরং সেইসব শক্তিশালী মাসলম্যানদের বোঝা হয়েই তাদের জীবনযাপন করতে হত। কিন্তু এখনকার পৃথিবীতে যেহেতু অনেক প্ল্যান্ট ডিজাইন করতে হয়, ব্রিজ ডিজাইন করতে হয়, নেটওয়ার্ক ডিজাইন করতে হয় তাই দেখা গেছে এই দুবলা পাতলা ছেলেমেয়েগুলোর পরিস্কার মাথাটা একটু কাজে লাগে। কারণ,পরীক্ষা করে দেখা গেছে মারামারিতে সবচে এক্সপার্ট ছেলেটা ঘুসি মেরে ব্রিজ বানানোর কাঁকর ভাংতে সক্ষম হলেও ব্রিজ ডিজাইন করতে ততটা পারদর্শী নয়, যতটা পারদর্শী সেই দূব্বল পাতল নরম হাড্ডির ছেলেটা। বুয়েট যেহেতু দেশের একটি চেনা পরিচিত প্রতিষ্ঠান এবং সারা বিশ্বেই বুয়েটের দুবল পাতল ছেলেমেয়েগুলোর কাজের সুনাম আছে কাজেই বুয়েট প্রশাসনের উচিৎ তাদের একটু সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। অন্তত বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে যাতে বুয়েটের ছাত্রছাত্রীদের কেউ পিটিয়ে যেতে না পারে সেদিকে কার্যকর দৃষ্টি রাখা উচিৎ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আমি অনেকদিন থেকেছি। সারাদেশের তুলনামুলক শিক্ষিত, আলোকিত এবং উজ্জ্বল ছেলেমেয়েগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে- এটা আমার নিজের চোখে দেখা। এর মধ্যে পেশি শক্তির প্রদর্শন যারা করে তারা কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তারা হল নেহাত সর্ষের মধ্যে ভূত। কিন্তু সর্ষের ভূত তাড়াতে চাইলে, আগে ভূত যে আছে সেটা স্বীকার করতে হবে। না হলে ভূতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে এবং একসময় ভূতের অত্যাচারে হয় সর্ষেরা পালাবে অথবা নিজেরাই ভূতের চামচায় পরিণত হবে।

লেখকঃ মহিউদ্দিন খালেদ
যন্ত্র প্রকৌশলী, ১৯৯৩ ব্যাচ, বুয়েট।

Most Popular

To Top