টুকিটাকি

আমাদের সুলতান

আমাদের সুলতান

হুমায়ূন আহমেদঃ “আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে যা লিখে সত্যি না”

শিল্পীঃ “পত্রিকার এরা বানিয়ে বানিয়ে লেখে, বানানো লেখা পড়ে আমার মনটা খারাপ হয়, এক পত্রিকায় লিখেছে আমি নাকি বেজী পুষি।”

হুমায়ূন আহমেদঃ “আপনি বেজি পুষেন না?

শিল্পীঃ (খানিকটা বিরক্তির স্বরে) “না আমি সাপ পুষি। আমদের বাড়িতে আমার গোটা দশেক কেউটে আছে। বড়ই লক্ষ্মী, যখন একেবেঁকে যায় খুবই মায়া লাগে দেখতে।আপনি দেখবেন?”

উপরের কথোপকথনটুকু বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনীমূলক বই থেকে নেওয়া, আর এখানে যে শিল্পীর সাথে হুমায়ূন আহমেদ কথা বলছেন তিনি হলেন আমাদের প্রিয় শিল্পী এস.এম. সুলতান। এই কথাবার্তা থেকেই মানুষটার খেয়ালিপনার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।

এদেশের প্রথম সারির কয়েকজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পীর কথা আসলে তার মধ্যে এস.এম. সুলতান অবশ্যই থাকবেন। আর যদি রহস্যময় শিল্পীর কথা বলি, তবে সেখানে সুলতানের নাম থাকবে সবার উপরে।

মাতৃহারা এক স্নেহের কাঙাল
বরেণ্য শিল্পী এস. এম. সুলতান নড়াইলের এক ছায়াঢাকা গ্রাম মাছিমদিয়াতে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট দরিদ্র ঘরে জন্ম নেন। বাবা শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন স্থানীয় জমিদার বাড়িতে। শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতো।গরিবের সংসারে স্কুলে পড়ালেখা আকাশ-কুসুম কল্পনা, কিন্তু বাবা মেছের আলি চেয়েছিলেন ছেলে কষ্ট করে হলেও পড়া-লেখা করুক।

নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে এস এম সুলতান পাঁচ বছর পড়ালেখা করেন, কিন্তু দিনদিন বাড়তে থাকা দারিদ্র্য পড়ালেখার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিচ্ছিল। সেসময় হঠাত করে সুলতানের মা মারা যান, বাড়িতে আসেন সৎ মা। সৎ মার অনাদর অবহেলা আর দারিদ্র্যের কারণে সুলতান স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেন, বাবা মেছের আলির সাথে যোগ দেন রাজমিস্ত্রির কাজে।

শিল্পী হয়ে উঠা​
আমাদের লাল মিয়া ছিলেন জাত শিল্পী, প্রকৃতির রঙ আর সৌন্দর্য সবসময় তাকে আকৃষ্ট করে যেত। বাবা জমিদারবাড়ির দালানকোঠা বানাতেন আর সুলতান সেখানে এঁকে দিতেন অপূর্ব সব নকশা, সন্ধ্যা হলে চলে যেতেন বাঁশি হাতে নদীর পারে। যখন স্কুলে পড়তেন তখন একবার শিক্ষাবিদ ডঃশ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি স্কুল পরিদর্শনে আসেন। লাজুক সুলতানের হাতে আঁকা ছবিগুলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেন এবং তাকে কলকাতায় গিয়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে বলেন। সুলতানের মনে খুবই ইচ্ছা ছবি আঁকা শেখার, কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার অর্থ পাবেন কোথা থেকে। সেসময় এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের চোখে পড়েন তিনি, তার পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার বাড়িতে গিয়ে উঠেন সুলতান। কিন্তু আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার মত শিক্ষাগত যোগ্যতা তার ছিলনা, তাহলে উপায়?

তৎকালীন কলকাতা আর্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সদস্য ছিলেন বিখ্যাত শাহেদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তিনি এই প্রতিভাবান যুবকের কাজ দেখে মুগ্ধ হন এবং তার প্রচেষ্টায় ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে সুলতানের ভর্তি হয়ে যায়। অর্থের অভাবে পড়াশোনায় যেন সমস্যা না হয় তার জন্য শাহেদ সোহরাওয়ারদী সুলতানকে বিনামুল্যে থাকা খাওয়ারও ব্যাবস্থা করে দেন।

জন্ম ভবঘুরে
“কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বভাবিক আকুতি” এস.এম. সুলতানকে নিয়ে আহমেদ ছফার এই লেখাটুকুতে ফুটে উঠেছে, জাগতিক সবকিছুর প্রতি সম্পূর্ণ নিঃস্পৃহ এক মানুষের ছবি।

আর্ট স্কুলে কোনোমতে তিন বছর পার করলেও এরপরে আর বাঁধাধরা নিয়মে থাকতে পারলেননা সুলতান, করলেন নিরুদ্দেশ যাত্রা।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে তখন পৃথিবী টালমাটাল, সেই চরম মুহূর্তে সুলতান বেড়িয়েছেন পৃথিবী ঘুরতে। ভারতে চলে গেলেন, নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকা শুরু করলেন। এক স্থানে বেশিদিন থাকতেন না, কখনো কাশ্মীর আবার কখনো অন্য প্রদেশে ঘুরে বেড়াতেন।

সেসময়ে ভারতে অনেক বিদেশী সৈন্য থাকত, এদের কাছে নিজের ছবিগুলো বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে জীবন ধারণ করতেন সুলতান। ১৯৪৬ সালে সিমলায় প্রথম প্রদর্শনী হওয়ার পরে বিভিন্ন জায়গায় আরো কয়েকটি প্রদর্শনী হলে শিল্পী হিসেবে একটূ পরিচিতি পান তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেসব ছবির কোনো স্মৃতিচিহ্ন তো দূরের কথা, একটা ফটোগ্রাফ পর্যন্ত নেই নিজের কাছে।

“দেশে দেশে ঘুরেছি। সেখানে এঁকেছি। আর সেখানেই রেখে চলে এসেছি।”-নিজের সৃষ্টি নিয়ে এমন খামখেয়ালীপনা শুধু সুলতানকেই মানায়।দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে গিয়ে করাচিতে কয়েকবছর চাকরি করেন, সেখানে চুঘতাই এবং শাকের আলীর মত বিখ্যাত শিল্পীদের সংস্পর্শে আসেন সুলতান। ১৯৫০ সালে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বোস্টনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় এবং কিছুদিন পরে লন্ডনেও নিজের আঁকা ছবির প্রদর্শনী করেন তিনি। যুদ্ধের পরে প্রবাসে নিজের কর্মজীবনকে বিস্তৃত না করে আবার এসে যান নড়াইলে।

স্বতন্ত্র অংকনশৈলী
শিল্পীজীবনের প্রথমভাগে সুলতান সাধারণত ল্যান্ডস্কেপ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ছবিগুলো আঁকতেন।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার আঁকার ধরণে নানা পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে অবয়বধর্মী শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন সুলতান। তাঁর ছবিতে ফুটে উঠতে থাকে গ্রামীণ জীবনের মুহূর্তগুলো, কৃষকদের সুখদুঃখ আর বাংলার প্রকৃতি।

সুলতানের আঁকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সেখানে মানবদেহের শক্তিমান রূপের প্রকাশ। তার আঁকার ধরণ ছিল অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, রেনেসা যুগের শিল্পীদের মত মানবদেহকে থিম হিসেবে নিয়ে কাজ করলেও তাদের মত দেবতারুপে মানুষকে না দেখিয়ে দ্রোহের প্রতীকরুপে দেখিয়েছেন। তিনি নিজের ছবিগুলোতে খেটে খাওয়া মানুষদের শক্তিশালী হিসেবে দেখাতে চাইতেন, কৃষকরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার বুঝে নিচ্ছে এমনভাবে তাদের চিত্রায়িত করতেন। তিনি চাইতেন কৃষকরা যেন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হয়, তাদের সাথে করা অন্যায়কে প্রতিবাদ করে।

সুলতানের ভাষায় “আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা। আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রু্গ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়,ফসল ফলায়”।​

খেয়ালি সুলতান​
সুলতানকে নিয়ে নানা কথা প্রচলিত ছিল মানুষের মধ্যে। তিনি নাকি পকেটে বিড়াল নিয়ে ঘুরে বেড়ান এবং এক পকেটমার তার পকেটে হাত ঢূকালে বেড়ালগুলো হাত কামড়ে ধরে এমন গল্প শোনা যায়। এই গল্পের সত্যতা জানা না গেলেও পশুপাখির প্রতি তার ভালোবাসার প্রমাণ নিজের বাড়িতে তৈরি করা চিড়িয়াখানার প্রাণীদের প্রতি মমত্ব দেখলেই বোঝা যায়।সেখানে পাখি, বাদর এমনকি নিজের পোষা পঁচিশটার মত বিড়ালকে তিনি অনেক পছন্দ করতেন। মানুষ বিষধর কালকেউটের ভয়ে যখন ছুটে পালাত, তখন সুলতান গিয়ে পরম আনন্দে তাকে তুলে নিতেন। প্রাণীরাও মনে হয় তার ভালোবাসার কথা বুঝতে পারত, তাই তাকে কখনো আঘাত করতনা।

ছবি আঁকার সময়ও এক অদ্ভুত অবস্থা হত, থরথর করে কাঁপতেন আর নেচে নেচে ছবি আঁকতেন। মনে হত যেন কোনো অপার্থিব শক্তি ভর করেছে তাকে। মাঝেমাঝে শাড়ী পরে অদ্ভুতভঙ্গিতে নাচতেন, কখনো নিজে রাধা হতেন আবার কখনো নিজেই কৃষ্ণ সাজতেন, মাতাল করা সুরে বাঁশি বাজাতেন।
শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের কুটিরে
সুলতান সবসময় মাটির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করতেন, তার সমসাময়িক কোনো শিল্পীই মনে হয় এতটা ছিলেন না। গ্রামের সহজ-সরল জীবন, শান্ত নদী, কৃষকদের সুখদুঃখ সবই তাকে ছুঁয়ে যেত। স্বাধীনতা পরবর্তী নতুন যুগে যখন অন্য শিল্পীরা ঢাকাকে কেন্দ্র করে নিজেদের নতুন করে জায়গা বানাচ্ছিলেন, তখন অনেকটা সময় সুলতান নিভৃতে গ্রামে কাটিয়ে দেন। পরে ১৯৭৬ সালে তার কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং এখানে ছবি আঁকার ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তীতে তাঁর আঁকা এইসব ছবি নিয়ে সে বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করে এবং এই প্রদর্শনীর মাধ্যমেই তিনি নতুন করে পরিচিতি লাভ করেন।

মানুষের জন্য, শিশুদের জন্য
অসহায় মানুষ আর শিশুদের জন্য সুলতান ছিলেন অন্তপ্রান। তরুণ অবস্থায় খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়ে আর্ত মানবতার সেবা করে বেড়াতেন। ১৯৫৩ সালে নড়াইলে এসে পরিত্যক্ত কৈলাসটিলা জমিদারবাড়ীতে গ্রামের মানুষদের মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক এবং মানসিক শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য “নন্দনকানন প্রাইমারি স্কুল” এবং “ নন্দনকানন ফাইন আর্টস স্কুল” স্থাপন করেন।
কিন্তু পরবর্তীতে নানা জটিলতায় সেই স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মনে অনেক কষ্ট পান। শেষ বয়সে তিনি নড়াইলে শিশুস্বর্গ এবং যশোরে চারুপীঠ নামে দুটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। শিশুদেরকে অনেক ভালোবাসতেন সুলতান, তাদের মাঝেই আনন্দ খুঁজে পেতেন।বাচ্চাদেরকে নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়ার জন্য অনেক বড় একটা কাঠের নৌকা বানিয়েছিলেন।কাঠের সেই নৌকায় অনেকগুলো জানালা বানিয়েছিলেন যেন বাচ্চারা সেখানে বসে বসে বাইরের দৃশ্য দেখে দেখে ছবি আঁকতে পারে। কিন্তু নিজের শারীরিক অসুস্থতার জন্য তা আর হয়ে উঠতে পারেনি।

প্রদর্শনী এবং সম্মাননা
অসামান্য প্রতিভার জন্য এস.এম.সুলতান ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের হাত থেকে পুরস্কার লাভ করেন। এরপর ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন এবং ১৯৮২ সালে পান একুশে পদক।
দেশে এবং বিদেশে নানা জায়গায় এস.এম. সুলতানের কাজের প্রদর্শনী হয় এবং লন্ডনে পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালি, জন ব্রাক, পল ক্লী, জন মার্টিন প্রমুখের সাথে যৌথ প্রদর্শনীই শিল্পী হিসেবে সুলতানের “লেভেল”কে বুঝিয়ে দেয়। মৃত্যুর আগে ১৯৯৪ সালে বেঙ্গল টোন গ্যালারিতে সর্বশেষ প্রদর্শনী হয় সুলতানের।

মৃত্যু
১৯৯৪ সালে নড়াইলে আগস্ট মাসে অনেক বড় করে তার জন্মদিন পালন করা হয় এবং এই উপলক্ষে কয়েকদিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বৃদ্ধ বয়সে সুলতান শ্বাসকষ্ট সহ নানা বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ১৯৯৪ সালের ১০ আগস্ট যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। নিজের মৃত্যুকেও তিনি মেনে নিয়েছেন হাসিমুখে, কয়জন মানুষ নিজের মৃত্যুকে নিয়ে বলতে পারে যে “আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে”।

সুলতান স্মরণে এখন নড়াইলে সুলতান মেলা এবং নৌকাবাইচ সহ নানা প্রতিযোগিতা করা হয়, দলে দলে সুলতান প্রেমীরা সেখানে জড়ো হন প্রিয় শিল্পির স্মরণে। এভাবেই মৃত্যুর পরেও সুলতান বেঁচে থাকবেন মানুষের মনে।

Most Popular

To Top