ইতিহাস

অবশেষে ডাক এল স্বাধীনতার……

অবশেষে ডাক এল স্বাধীনতার......

ইউরোপের স্পেন দেশটা পুরো পৃথিবীর কাছে সবচেয়ে বেশী পরিচিত এর দুই বিখ্যাত ফুটবল টিম- রিয়াল মাদ্রিদ(স্পেন) এবং বার্সোলোনা(কাতালোনিয়া) এর জন্য। বিশ্বের ফুটবল অঙ্গনে তারা যেন চির প্রতিদন্ধী। পৃথিবীজুড়ে মানুষের নজর আজ তাদের উপর। রাজনৈতিক ভাবেও স্পেন আর কাতালোনিয়া প্রতিদন্ধী হিসেবে বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে।

কাতালোনিয়া সম্পর্কে কিছু কথা
কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই কাতালোনিয়ায়। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। তাদের আছে নিজস্ব ভাষাও। বার্সেলোনা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি, ফুটবল এবং একই সাথে পর্যটনের কারণে।

কাতালোনিয়ার ইতিহাস এবং তাদের স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা
১১৬৪ সাল পর্যন্ত খুবই শক্তিশালী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল কাতালোনিয়া। তারপর এটি যুক্ত হয় অ্যারাগনের সঙ্গে। আর ১৪৬৯ সালে অ্যারাগনের রাজা ফার্দিনান্দ ও স্পেনের রানী ইসাবেলার বিবাহবন্ধনের মধ্য দিয়ে স্পেনের সঙ্গে মিলন ঘটে অ্যারাগন ও কাতালোনিয়ার। তখন থেকেই ধীরে ধীরে স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে থাকে কাতালানরা। ১৭১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয় কাতালান রাষ্ট্র। তারপর থেকেই নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ভাষা চর্চার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে বলে অভিযোগ কাতালোনিয়ার মানুষদের। যে নিপীড়ণের চরম রূপ দেখা গিয়েছে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনের (১৯৩৯-১৯৭৫) সময়। ১৯৭০ এর দশকের শেষে স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর কাতালোনিয়াকে দেওয়া হয় স্পেনের ১৭টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা। তবে ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাটাও সবসময় লালন করে গেছে কাতালানরা। সেই দাবি আরও জোড়ালো হয় ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর। নানাবিধ কৃচ্ছ্রতানীতি যারপরনাই অসন্তোষ তৈরি করে কাতালোনিয়ায়। ২০১০ সালে কাতালানরা স্প্যানিশ সরকারকে কর দিয়েছে ৬১.৮৭ বিলিয়ন ইউরো। আর তাদের কাছে এসেছে ৪৫.৩৩ বিলিয়ন। কেন্দ্রীয় স্প্যানিশ সরকারের হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা চলে না গেলে আরও উন্নয়ন করা যেত বলে কড়া মন্তব্য করেছিল কাতালোনিয়া সরকার।

সম্প্রতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা স্বাধীনতার দাবীতে আবার মুখর হয়ে উঠেছে কাতালোনিয়ার জনপথ। ২০১৪ নভেম্বরে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল একটি অনানুষ্ঠানিক গণভোট। মাদ্রিদে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল সেটা রুখে দিতে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। ২.২ মিলিয়ন ভোটারের ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল স্বাধীনতার দাবি। ৮০.৭ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে।

কাতালান পার্লামেন্টে গণভোটের প্রসঙ্গে একটি আইন তৈরি করা হয় ২০১৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে। সেখানে রাখা হয় মাত্র একটি প্রশ্ন: আপনারা কি চান কাতালোনিয়া প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে উঠুক? আর সেখানে দুটো ভোট দেওয়া উপায় রাখা হয়: হ্যাঁ অথবা না। বিতর্কিত এই আইনটিতে ভোটের ফলাফলকে মানতে বাধ্যতামূলক করা হয় এবং বলা হয় কাতালোনিয়ার নির্বাচন কমিশন গণভোটের ফলাফল করার দু’দিনের মধ্যে পার্লামেন্টে কাতালোনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। কাতালান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, অন্য কোন আদালত বা রাজনৈতিক শক্তি তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত করতে পারবে না। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাখয় এই ভোটকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেন। বলেন, “আমি অত্যন্ত নরম সুরো কিন্তু কঠোর করে বলতে চাই কোন গণভোট হবে না। এটা হবে না।”

প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত কাতালোনিয়ার ওই আইনটিকে বাতিল করে দেয়। এতে কাতালানরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এবং তারপর থেকেই স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ার অর্থনীতি ও পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। গণভোটের আয়োজনকারী কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে। জব্দ করা হয় এক কোটি ব্যালট পেপার এবং যেসব ওয়েবসাইটে এই গণভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ দিনটি ধার্য করা হয়েছিল প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য। সুস্থ এবং সুন্দর এই ভোট রুখতে কাতালোনিয়ার সরকারের চেষ্টার কোন কমতি ছিল না।কিন্তু স্পেন সরকার এই নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে। অপর দিকে কাতালোনয়ার স্থানীয় সরকার জনগণকে ভোট সফল করার আহ্বান জানায়। ভোট ঠেকানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ায় হাজার হাজার ন্যাশনাল পুলিশের কর্মকর্তাকে মোতায়েন করেছে। যে স্কুলগুলোতে ভোটকেন্দ্র হবার কথা সেরকম ২০,৩১৫টি স্কুলের মধে ১৩,৯৯টিই আজ পুলিশ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এই ভোট কেন্দ্রগুলো যাতে বন্ধ করে দেয়া না যায় সে জন্য বহু কাতালান অভিভাবক গ্রেফতার হবার ঝুঁকি নিয়েও স্কুলের ভেতরে ঘুমান। এ ছাড়াও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেবার জন্য কাতালোনিয়ার সরকারের টেলিযোগাযোগ ও আইটি দফতরটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গণভোটের পক্ষের কর্মীরা যে স্কুলগুলোতে ভোট কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে সেগুলোর অনেকগুলো পাহারা দিয়েছে। কাতালোনিয়ার সরকার বলেছে, তারা ৬ হাজার ব্যালট বাক্স তৈরি করেছে এবং সেগুলো গোপন জায়গায় রাখা হয়েছে। যেহেতু স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার এই গণভোট বিঘ্নিত করার জন্য নানা কিছু করেছে তাই কাতালান কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের কাজটা হবে বেশ কঠিন। এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অনেকখানি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে সেই স্বাধীনতার দাবি। কাতালোনিয়ান পার্লামেন্টের ১৩৫টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে কাতালানরা। ভোটাভুটির ফলাফল ঘোষণার পর পরই এমপিরা কাতালোনিয়ার জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করেন। কাতালোনিয়ান সরকার অনুযায়ী ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ তেই হতে পারে তাদের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। কিন্তু সে ঘোষণা আসতেও কিছুটা দেরি হয়ে গেলো। গতকাল ২৭ অক্টোবর ২০১৭ এর দিবাগত রাতে কাতালোনিয়ান পার্লামেন্ট স্পেন হতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করে।

শুক্রবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ৭০ জন এমপি স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়েছে ১০টি। দুটি ব্যালট ফাঁকা ছিল। তবে বিরোধী দলের এমপিরা ভোটাভুটিতে অংশ নেননি। ভোটাভুটির আগে আগে তারা পার্লামেন্ট থেকে ওয়াক আউট করেন। কাতালোনিয়ার পার্লামেন্টে যে প্রস্তাবটির প্রশ্নে ভোটাভুটি হয়েছে সেখানে লেখা ছিল: ‘আমরা কাতালোনিয়া প্রজাতন্ত্রকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, আইনের শাসনে পরিচালিত গণতান্ত্রিক ও সামাজিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলব।’

প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর বার্সেলোনায় পার্লামেন্টের বাইরে জড়ো হওয়া স্বাধীনতাপন্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তবে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা গেছে মাদ্রিদে। স্প্যানিশ সরকার যখন কাতালোনিয়ার ওপর সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে তখনই আঞ্চলিক পার্লামেন্ট এ রায় দিলো। আবার স্পেন থেকে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা লাভের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বলছে, তাদের কাছে কাতালোনিয়া স্পেনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নতুন করে ভাবাবে ইউরোপিয়ান ফুটবল অঙ্গনকেও। কাতালোনিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেলে বার্সেলোনা-ভ্যালেন্সিয়ার মতো দলগুলো স্প্যানিশ লিগে খেলবে না, বার্সেলোনা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নিতে পারবে না- বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে স্পেন সরকার। তো এখন বলতে হয় বার্সোলোনাহীন স্পেনিশ লিগ দেখার দিন শুরু। বার্সোলোনার সাপোর্টারদের জন্য যদিও খবরটা সুখকর নয়। তাও খেলার জন্য আমরা একটা দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তো যেতে পারব না। স্বাধীনতার অধিকার প্রত্যেকের জন্মগত অধিকার। আত্মকেন্দ্রিক এইসব চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে এখন আমাদের উচিত নতুন সৃষ্ট কাতালোনিয়া রাষ্ট্রকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের উত্তর উত্তর উন্নতি কামনা করা।

Most Popular

To Top