টুকিটাকি

জিন ঝুই এর চায়না মমি!

জিন ঝুই এর চায়না মমি!

আমরা মিশরের মমির কথা শুনেছি, মায়া সভ্যতার মমি এবং প্রাকৃতিক সংরক্ষিত ইউরোপীয় মমি ইত্যাদি সমন্ধেও জানি। এই কাজ এশিয়ায় কতটা হয়েছিল? মিশরের লাগোয়া ইয়েমেনে হয়েছিল ওটা জানা গিয়েছে। একটু খোঁচাখুঁচি করলেই সৌদি আরবেও হয়তো পাওয়া যাবে। এর বাইরে? হ্যাঁ, আছে। অনেকেই জানেন, ওটা পাওয়া গিয়েছে চীনে এবং এছাড়াও পাওয়া গেছে পিরামিড। যাই হোক পিরামিড নিয়ে পরে কোন দিন কিছু বলা যাবে। আপাতত, একটি অদ্ভুত মমির উপর কিছু বলবো। মমিটির নাম জিন ঝুই বা লেডি দাই।

মমিটির উপর বিস্তারিত জানার আগে একটু এর ছবিটি দেখে নিন। দেখেছেন? এবার এর পার্থিব রূপ কিরকম ছিল ওটার ছবি ও দেখুন। দেখেছেন? আসুন এবার এই মহিলার মমি থেকে এর উপর বিস্তারিত কি জানা যায় ওটা দেখি।

যেমন বলেছি , উনার নাম ছিল জিন ঝুই, হান গোষ্ঠীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লি চ্যাং এর স্ত্রী ছিলেন এই জিন। পঞ্চাশ বছর বয়সে উনি মারা যান। আজকের হিসেবে অনেক কম বয়স। মৃত্যুর কারণ হার্ট এট্যাক। আরো জানা যায়, এই হার্ট এট্যাক এর কারণ অতিরিক্ত ওবেসিটি মানে স্থূলতা, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করা এবং অপর্যাপ্ত ভালো মন্দ খাওয়া। মানে বেশ রসে বশে ছিলেন মহিলা।

যাই হোক, এই নিয়ে হিংসে বা লোভ ইত্যাদি করে লাভ নেই কারণ এর উর্দ্ধে এখন উনি। আসল কারণ কিন্তু ওটা না, আসল কারণ হলো এই ২০০০ বছর পুরোনো মমি হিসেবে এর সংরক্ষণ আর প্রায় অটুট থাকা হলো আমাদের বিস্ময়ের বস্তু। আপাতত, এই মমিটির স্থান হুনান প্রদেশের জাদুঘরে এবং বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় কারন এর এতো ভালো সংরক্ষণ।

আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ এ একদল শ্রমিক একটি যুদ্ধোত্তর বাঙ্কার এর খনন এর সময় চাংসা বলে একটি জায়গায় এই মমির সংস্পর্শে আসে। একটি ফানেল এর মতো আকৃতির গোটা নির্মাণ বস্তুর ভিতরে ছিল ১ হাজার এর মতো বিবিধ সামগ্রী ,আরো ছিল ঘর সাজানোর কাঠের জিনিস , ১৬২ টি মানুষের আকৃতির পুতুল মানে উপরের কাজের লোক এর প্রতীক এবং প্রসাধনী সামগ্রী। আরো ছিল একটি অন্তিম যাত্রার সুখাদ্যের ব্যবস্থা করা থালা।

ওতে কি কাজ হয় তার উপর হাসি ঠাট্টা না করে আসুন এর মূল বৈশিষ্ট একটু তুলে ধরি। এই মমি অত্যাশ্চর্যের কারণ এর প্রায় অবিকল থাকার জন্যে। যখন এটি খোলা হয় তখন মানুষ অবাক হয়ে যায় এই দেখে যে এই মমি করা মানুষটির ত্বকের অবস্থা ও একই আছে প্রায়। চামড়ার পেলব ভাব, স্বাভাবিক নমনীয়তা, জৈবিক আদ্রতা সবই অটুট ছিল! মাথায় চুল একই ছিল এমনকি নাক বা কানের অভ্যন্তরের চুল ও ছিল অবিকৃত! চোখের পাতা বা ভুরু সব ছিল আগের মতোই!

বৈজ্ঞানিক এবং নৃতাত্বিকরা এর একটি পোস্টমর্টেম করেন। তাতে আরো আশ্চর্যের বিষয় উঠে আসে, অভ্যন্তরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও ছিল অবিকৃত! আমরা এই নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছি যে মহিলার মৃত্য হয়েছিল খ্রিস্টপূর্বাব্দ ১৬৩ সালে। অর্থাৎ ২১৮০ বছর আগে তার মৃত্যু হয়েছিল। দুর্ভাগ্য যেটুকু অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসেছে এই মৃতদেহ বাইরে আসার ফলে,তাতেই কিছু বিকৃত হয়েছে ওই দেহটি। মানে ওই এক নম্বর ছবিটি তে যা ক্ষয় হয়েছে তার জন্য আমরাই দায়ী। এই জন্য আসুন এই মহিলার আসল চেহারার রূপরেখা কি রকম ছিল ওই ছবি মানে দুই নম্বর ছবিটি আবার দেখুন।

শুধু ওবেসিটি বা খাদ্যাভ্যাস না, বিজ্ঞান আরো খোঁজ দিচ্ছে মহিলার উচ্চ রক্তচাপ, যকৃৎ মানে লিভারের সমস্যা এবং উচ্চ মাত্রার কোলেস্টরেলের। এর সাথে গল ব্লাডার এর পাথর এর সমস্যাও ছিল। পাঠক, একই সমস্যা তখন আর এখনের তাই না? যাই হোক, এই পোস্টমর্টেম আরো খোঁজ দিচ্ছে মহিলা মৃত্যুর আগেই তরমুজ খেয়েছিলেন তার বিচি ও পাওয়া গেছে পেটে।

যাই হোক, কি খেয়েছেন বা খেতেন জেনে আমাদের আফসোস বা অন্য কোনো প্রতিক্রিয়া হতেই পারে কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্ন হলো এই দেহ এতো ভালো সংরক্ষণ হলো কি করে? এর কারণও পাওয়া গিয়েছে। বস্তুত ভালো একটা প্রক্রিয়া বের করেছিল তৎকালীন মানুষ তার সেই সময়ের জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে। দেহটি বায়ুনিরোধক একটা আধার এ সংরক্ষণ হলো এর প্রধান কৌশল।৪০ ফুট নিচে তিনটি পাইন কাঠের কফিনের আস্তরণের একদম শেষে ছিল মহিলার দেহটি। দেহটি ৪০ টি সিল্ক মানে রেশমের আস্তরনে আচ্ছাদিত কাপড়ে মোড়া ছিল। এর সাথে ছিল ২১ গ্যালন মানে প্রায় ৮০ লিটার এক অজানা তরলে নিমজ্জিত মানে ডুবানো। এই তরল বস্তুটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে জানা যায় স্বল্প অ্যাসিড এবং কিঞ্চিৎ ম্যাগনেশিয়াম এর উপস্থিতি ছিল। রাখার জায়গার নিচে এক ধরণের আস্তরণ তৈরী করার মতো কাঁদা বিছানো হয়েছিল। পুরো মমির চারপাশে একটা আচ্ছাদন দেওয়া হয়েছিল কাঠকয়লার যা ওই জায়গাটির আদ্রতা শুষে নেওয়ার জন্য করা হয়েছিল। অতঃপর পুরো কফিনটি বায়ু নিরোধক করার জন্য উপর থেকে অতিরিক্ত তিন ফুটের একটা কাদা দিয়ে আস্তরণ দেওয়া হয়েছিল। ভিতরের ওই আস্তরণ আর বাইরের আস্তরণ পুরো বায়ুনিরোধক আর ব্যাকটেরিয়া নিরোধক হয়ে উঠেছিল। একই সাথে অক্সিজেনের প্রবেশ ঠেকিয়ে এই দেহটি সংরক্ষণের পাকাপাকি ব্যবস্থা করা হয়।

আরো চিত্তাকর্ষক হয়েছে ওই মহিলার উদ্দেশ্যে করা চিত্রকর্ম। তাতে দেখা যায়, একটি স্বর্গের দরজা তাতে দুজন পাহারাদার। কল্পিত স্বর্গের ভিতরে মানুষের মুখের একটি ড্রাগন এবং একটি অর্ধচন্দ্রের আর সূর্যের ছবি খেয়াল করে। এছাড়া আছে দুটো কালো রঙের মাছ ,তিন ঠ্যাং এর একটি কাক, দুটো ছাগল,একটা লাল সাপ এবং আরো কিছু যা পাঠকের বের করার উপর ছেড়ে দিলাম।

সব শেষে একটাই কথা মনে হয়। সময় পাল্টায় কিন্তু মানুষগুলোর চরিত্র পাল্টায় না। মানুষ তার শুরুর দিন থেকেই অমরত্বের সন্ধানে প্রয়াসী। ওটা আমাদের জিনে ঢুকে গিয়েছে, তাই হয়তো যুগে যুগে আমরা এই প্রয়াস করে যাচ্ছি।

Most Popular

To Top