টুকিটাকি

একজন সরকারী চিকিৎসকের আনন্দ এবং বিষণ্নতার গল্প!

আমার আনন্দ, আমার বিষণ্নতা

রুমের বাইরে তখনও জনা ত্রিশেক নারীপুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, রুমের ভিতর আমি একের পর এক রোগী দেখে চলেছি। এমন সময় রুমে দু’জন ষণ্ডামার্কা লোক ঢুকে ফটোকপি করা প্রায় অর্ধশত কাগজ আমার সামনে ফেলে, সত্যায়িত করে দেয়ার জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করলো। মূল সার্টিফিকেট সহ দুপুর একটার পর আসতে বলেছিলাম, কাজের কাজ কিছু হয় নাই, ষন্ডাগুলোর রুদ্রমূর্তি দেখতে হয়েছিলো।

যেভাবে এই লোকগুলো আমার রুমে ঢুকে আমাকে থ্রেট দিয়ে কাজ আদায় করতে চাইলো, একই গরম কি এরা U.N.O. বা এ.সি. ল্যান্ড বা এ.এস.পি. এর রুমে গিয়ে দেখাতে পারবে?

এদেশে প্রান্তিক পর্যায়ে এক শ্রেণীর জনপ্রতিনিধি আছে যারা মাঝে মাঝে হাসপাতালে লুঙ্গি তুলে নিতম্ব চুলকাতে চুলকাতে তাদের চিকিৎসার জন্য হাজির হয়, কাদের কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছে সে ব্যাপারে এদের ধারণা থাকে না, অবশ্য না থাকাটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে সরকারি চিকিৎসকদের এরা নিজস্ব বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করে তাদের বাসায়ও নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আমি এদের নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নই, জ্ঞানের প্রকৃত আলোছায়া হতে এরা যোজন মাইল দূরে অবস্থান করে।

ইদানীং পুরোনো এই উৎপাতের সাথে নতুন খবর চোখে পড়লো। কোন এক ডি.সি. তার অসুস্থতায় ফোনে চিকিৎসককে তার বাংলোতে তলব করলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে আসার পরামর্শ দেয়, এটি স্বাভাবিক, কেননা হাসপাতালে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব যন্ত্রাদি থাকে। এবার নির্লজ্জ একটি আফটারম্যাথ শোনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিন। কেন চিকিৎসক ডিসির বাসায় গেলেন না, এ কারণে চিকিৎসককে শাস্তিস্বরূপ ও.এস.ডি. করা হয়েছে।

আমাদের প্রাইম মিনিস্টার যেখানে হাসপাতালে গিয়ে টিকিট কেটে তাঁর শারীরিক চেকআপ করান, সেখানে ডি.সি. সাহেব কি মনে করে চিকিৎসককে তার বাসায় ডেকে পাঠান? দেশের প্রতিটি লোক যদি আজ হাসপাতালে ফোন করে চিকিৎসকদের বাসায় যেতে বলে, তবে কি সেটা মানা সম্ভব? যদি তা মানা সম্ভব না হয় তবে ডি.সি. কেন নিয়মের বাইরে গিয়ে তার জন্য আলাদাভাবে এই সুবিধা চাইলেন? দেশের সংবিধান কি বলে? একেক জনের জন্য সুযোগসুবিধা কি একেক রকম? তারা কারা যারা চিকিৎসককে এর ফলশ্রুতিতে ও.এস.ডি. করলো? ঘটনাটি তো একজনের ছত্রছায়ায় ঘটেনি, দায়িত্ববান একাধিক লোক এ আদেশে জড়িত। এই তাদের দায়িত্বের নমুনা?

যে বা যারা এই কাজের সাথে জড়িত তারা কি নিজেদের শিক্ষিত বলতে চান? অশিক্ষিত জনপ্রতিনিধিদদের সাথে এদের পার্থক্য কোথায়?

কিভাবে এদেশে চিকিৎসকদের হেনস্থা করা হয়, এই ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

বি.সি.এস. এর (স্বাস্থ্য) পোস্টিং এ আমাকে কোন গন্ডগ্রামে পাঠানো হয়েছিলো, প্রমত্তা পদ্মায় ঝড়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিভাবে সেখানে যেতে হত, সেখানে গিয়ে কোন ধ্বংসস্তুপে থাকতে বলা হয়েছিলো, বিদ্যুতবিহীন অন্ধকারে মোবাইলের টর্চ লাইটে কিভাবে চিকিৎসা দিতে হত, আয়রনযুক্ত সাপ্লাইয়ের পানির পাইপ মাটির নিচে ফেটে দুর্গন্ধময় পানি থেকে রক্ষা পেতে কিভাবে চাকরীর টাকা খরচ করে খাবার পানি কিনে খেতে হত, এ কথাগুলো পূর্বের কয়েকটি লেখায় আমি লিখেছি। নতুন করে এগুলো আর বলতে চাই না।

নতুন এক অভিজ্ঞতা বলি। জাতীয় টিকা দিবসে প্রান্তিক পর্যায়ে ঠিকঠাকমত সব বাচ্চা টিকা পাচ্ছে কিনা সেটার জন্য আমাকে পরিদর্শনে যেতে বলা হলো। যেখানে যাবার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হলো, সে এলাকার বাউন্ডারীতেই যদি আমি ঢুকতে যাই তবে আমার কর্মস্থল থেকে আমাকে মাইল বিশেক পাড়ি দিতে হবে। তারপর বিশাল বড় এরিয়া পরিদর্শনের জন্য তো পড়েই আছে। সময়টা ছিলো বর্ষাকাল, বৃষ্টিও হচ্ছিলো। পরিদর্শন না করে বাসায় চলে আসতে পারতাম, বিবেক বাঁধা দিলো। নিজের বাচ্চার টিকা নিশ্চিত করেছি, গ্রাম এলাকার শতশত বাচ্চার টিকা নিশ্চিত করবো না? সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী আছেন, ২৪ ঘন্টা হাসপাতালে ইমারজেন্সি ডিউটি করে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বৃষ্টির মাঝে একের পর এক টিকা কেন্দ্র পরিদর্শন করে গিয়েছি।

মাঠপর্যায়ে একের পর এক কাজ সম্পাদন করে এদেশের চিকিৎসকরা এদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের যানবাহনের নিশ্চয়তা নাই, এলিট ক্যাডারদের গাড়ি তো হাতের ময়লা, ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সুইমিংপুল সহ ফ্ল্যাট নির্মাণের রূপরেখা চলছে।

আমার একটা খারাপ স্বভাব হল টাইম মেনটেইন করা। খারাপ স্বভাব বলার কারণ আছে, এদেশে এটাকে কোন গুণ বলে বিবেচনা করা হয় না, ছাগলামি বলে ধরা হয়। উদাহরণ দেই,

সময় অনুযায়ী ঘড়ি ধরে বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে আমি এখনও বিব্রত অবস্থায় পড়ি, আমি ছাড়া আর কাউকে সহজে চোখে পড়ে না। সবচেয়ে বেশী ভোগ করেছি ছাত্রজীবনে প্রেম করার সময়। প্রেয়সীর সাথে দেখা করার জন্য যে সময় ঠিক করে রাখতাম, সে সময় পার হয়ে যাবার পর তার দেখা না মিললে আমার মেজাজ খারাপ হওয়া শুরু হত। দেখা হবার পর, প্রথম ৩০ মিনিট এ নিয়ে ঝগড়া লেগে থাকতো।

যাই হোক, হাসপাতালে ৮ টায় না পৌঁছাতে পারলে আমার অস্বস্তি শুরু হয়।একদিন সকাল সকাল ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি যাতে সকাল ৮ টায় হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাতে পারি। সিগন্যালে আটকা পড়লাম। ঝাড়া মিনেট বিশেক বসে থাকার পর আমার উসখুস অবস্থা দেখে ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে দায়িত্বরত পুলিশের সাথে কথা বললো। কোন লাভ হলো না। একটু পর কোন এক সরকারি লাল গাড়ি রং সাইড দিয়ে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো।

চিকিৎসকের গাড়ি আটকে থাকবে আর অন্য গাড়ী সিগন্যাল অমান্য করে চলে যাবে, এটা কি কোন সভ্য দেশে কল্পনা করা যায়?

গত কয়েক বছর ধরে একটি ট্রেন্ড লক্ষ্য করছি। চিকিৎসক বা ইঞ্জিনিয়ারদের একটি অংশ বি.সি.এস. এ টেকনিক্যাল ক্যাডারে না গিয়ে জেনারেল ক্যাডারের মাঝে প্রশাসন, পররাষ্ট্র বা পুলিশে ঢুকছে।

আমি আনন্দিত। আমাদের যে অনুজরা আজ টেকনিক্যাল ক্যাডার বাদ দিয়ে তথাকথিত এলিট ক্যাডারে যাচ্ছে তাদেরকে আর গন্ডগ্রামে গিয়ে পাতি নেতার ঝাড়ি সহ্য করতে হবে না, তাদের সুসজ্জিত বাসস্থান থাকবে, খাবার পানি নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের করতে হবে না, তাদের চলাচলের জন্য সরকারী পরিবহন পুল থেকে যানবাহনের ব্যবস্থা থাকবে, তাদের এখন থাকবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, তারা এখন থেকে প্রোটোকল নিয়ে চলাফেরা করবে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গেলে তাদের জন্য সরকারি বাংলো রেডী করা থাকবে, কর্মস্থল থেকে বের হলে প্রতি কদমের জন্য সরকারি টাকা বরাদ্দ থাকবে। পরবর্তী জীবনের কথা বাদ দিলাম, মোটামুটি ছোট এক স্বর্গরাজ্য তাদের জন্য তৈরি করা আছে।

দেশকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে যে সেবাটা তারা করতে পারতো, সেটি অনেকটা বাদই বলা চলে। তবে তারা তাদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা এখন অন্য সেক্টরে ব্যবহার করবে। বিনিময়ে এদেশের কিছু সংখ্যক মেধাবী এখন কিছুটা হলেও তাদের মেধার মূল্য পাবে, জব স্যাটিসফেকশন থাকবে। দেশ নিশ্চিতভাবেই আগের তুলনায় আরো দ্রুত এগিয়ে যাবে।

আমি সত্যিই তাই আনন্দিত।

এবার বিষণ্ন হবার কারণটা বলি,

একটি দেশকে আমি কল্পনা করি একটি মানব সত্ত্বার মত। একটি মানুষের যেমন হাত-পা-চোখ- কান-নাক রয়েছে,  তেমনি এদেশে অনেকগুলো ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ভ্যালু রয়েছে, ইমেজ রয়েছে। তবে টেকনিক্যাল ক্যাডারগুলোকে আমি সম্মিলিতভাবে মানব সত্ত্বার ‘স্পিরিট’ এর মত জ্ঞান করি । ‘স্পিরিট’ বাদে একটি মানব সত্ত্বা যেমন মূল্যহীন, তেমনি টেকনিক্যাল ক্যাডারের নিষ্পেষিতকরণের মাধ্যমে আমরা একটি জাতিকে ক্রমশ মুমূর্ষু করে চলছি।

এই দেশে যে কয়টা ক্যাডার সার্ভিস আছে সেগুলোর সদস্যরা প্রত্যেকে যেমন যার যার অবস্থান থেকে দেশকে সেবা করবে, তেমনি এই ক্যাডার সার্ভিসগুলোর মাঝে সুযোগ-সুবিধারও বিতরণ হওয়া উচিত ছিলো। আমি কিন্তু সমভাবে বিতরণ বলিনি, ন্যায়সঙ্গত  বলেছি, টেকনিক্যাল ক্যাডারদের সুযোগসুবিধা নিঃসন্দেহে বেশী হবার কথা ছিলো, সব সভ্য দেশেই তাই হয়। আমার কথা বাদ দেই, কায়কোবাদ স্যারের কথা বলি। অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ স্যারকেও এখন মুখ ফুটে বলতে হয় যে ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার পেশাকে এদেশে আরো আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলা উচিত ছিলো। আমরা অবশ্য তা করতে পারি নাই, কারণ আমরা সভ্য নই।

যারা আজকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার পরও অন্য ক্যাডারে চলে গেলো, তারা কি এই মানসিকতা নিয়েই মেডিকেল বা বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলো? নিশ্চয়ই তা নয়। আমাদের দেশের দূষিত সিস্টেম তাদেরকে এই কঠোর সিন্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, আমি নিশ্চিত এই সিদ্ধান্ত নিতে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে।

“ফুলগুলো যেন কথা, পাতাগুলো যেন চারিপাশে তার পুঞ্জিত নীরবতা।”

আমাদের সদস্য হয়েও তারা আজ অন্য জায়গায় চলে গেলো, আমরা তারিফ করলাম করলাম। কি মনোবেদনা নিয়ে তারা চলে যাচ্ছেন তা কি আমরা অনুভব করি? আমরা অবশ্য ফুল দেখি, চারপাশে যে পুঞ্জিত নীরবতা থাকে সেটা দেখি না।

১৯৭৫ সালের ১৯ শে জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেনঃ

” যে সিস্টেম আজকে আমরা দেখি, সেই ব্রিটিশ কলোনিয়াল সিস্টেম, এতে দেশের মঙ্গল হতে পারে না। সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেই সিস্টেম, সেই আইন, সেই সব কিছু পরিবর্তন করার নামই বিপ্লব।”

১৯৭৫ থেকে ২০১৭, আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন আমরা করতে পারি নাই। আমরা বিপ্লব রচনা করতে পারি নাই, আমরা সাহসী হতে পারি নাই।

আমরা ভুলে গিয়েছি, “You can’t have a rainbow without a little rain.”

কয়েকদিন আগে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের একটা লেখা পড়েছিলাম। পুরো লেখাটা মনে নেই, থিমটি মনে আছে। সে লেখাতে উনি আফসোস করেছিলেন, আমরা কেন নতুন কিছু উদ্ভাবন করি না? কেন আমরা বিদেশীদের উদ্ভাবিত জিনিস খালি ব্যবহার করি? আমাদের সৃষ্টিশীলতা কোথায়? এভাবে আর কতদিন?

দুঃখিত স্যার, সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হোক, এদেশের এক শ্রেণীর লোক সেটা চায় না। যে দেশে পদে পদে সৃষ্টিশীল লোকদের অপমান করা হয়, সে দেশে আর যাই হোক নিত্যনতুন জিনিস উদ্ভাবিত হয় না।স্যারকে সামনে পেলে বলতে পারতাম,’ স্যার, আজ তবুও এরকম একটা চিন্তা করতে পারেন, আজ থেকে ২০ বছর পর আমরা যে উদ্ভাবন করতে পারি-এ চিন্তাটাও মাথায় আর আসবে না, সেই চিন্তার পথকে দিনে দিনে রুদ্ধ করা হয়েছে।’

এদেশের চিকিৎসক বা ইঞ্জিনিয়াররা আজ যেভাবে বি.সি.এস. এ টেকনিক্যাল ক্যাডারকে বিদায় জানিয়ে জেনারেল ক্যাডারে চলে যাচ্ছে, সেটি দেশের সামগ্রিক অবস্থার জন্য শুভ লক্ষণ নয়। কিন্তু দিনের পর দিন যেভাবে এদেশে এই শ্রেণীগুলোকে নিগৃহীত করা হয়েছে, ঠকানো হয়েছে, তাতে এই আত্মঘাতী প্রবণতা অনাকাঙ্খিত নয়।

মনে রাখতে হবে – Deviation is eventual when deprivation is continuously exercised. কাজেই আমারই পেশার কোন সদস্য যখন তার ট্র্যাক পরিবর্তন করে তখন বাঁধা দেবার কোন মানসিক উপায় থাকে না। সঙ্গত কারণেই কেউ যখন মেডিকেল বা বুয়েট থেকে বের হয়ে সেই পেশার সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে অন্য ক্যাডারে যায় তখন একই সাথে তার নির্বিঘ্ন ভবিষ্যতে আমি আনন্দিত হই, তেমনি দেশের সৃষ্টিশীল মেধার অপচয়ে বিষণ্নও হই। জালালুদ্দিন রুমীর কয়েকটা লাইন মাথায় ঘুরছে,

“Sometimes I laugh, I weep sometimes,
Sometimes I fall, I rise sometimes,
I whirl, I whirl.”

Most Popular

To Top