নাগরিক কথা

রেহানে জাব্বারিঃ সম্ভ্রম বাঁচালেও প্রাণ হারাতে হয়েছিলো যার

রেহানা জাব্বারির মৃত্যুদন্ডঃ ন্যায়বিচার নাকি নারীবিদ্বেষী সরকারের ভুল

আজ ২৫শে অক্টোবর। ২০১৪ সালের এই দিনে ৭ বছর বিচার কার্য চলার পর রেহানে জাব্বারির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে ইরান সরকার। কারণ সে তার ইজ্জত বাঁচাতে খুন করেছে তাকে ধর্ষণের জন্য উধৃত এক পশুকে।

ভুলটা কার?

একজন নারীর? যে নিজের ইজ্জত বাঁচাতে খুন করেছে?

নাকি ইরান সরকারের? যে একজন নারীকে ন্যায়বিচার দেয় নি?

কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে ইরান সরকারের যুক্তি রেহানে অপরাধী। কারণ তিনি ‘মানুষ’ খুন করেছেন। তাই তার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের ‘পাপকর্ম’ থেকে অন্যরা নিজেদের বিরত রাখে। আবার অন্যদিকে রেহানের যুক্তি—তিনি খুন করেছেন; কিন্তু সেটা করতে তিনি বাধ্য ছিলেন। এদিক থেকে দেখলে রেহানের কথাও ‘সত্য’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুটি ‘সত্যে’র একটিকে ইরানের সুপ্রিম কোর্ট গ্রহণযোগ্য মনে করলো কেনো? কারণটি স্পষ্ট। ইরান পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেটা পরিপূর্ণভাবে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিচালিত। আর ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোনো কিছু প্রমাণ করতে হলে, কমপক্ষে পূর্ণবয়স্ক দুই জন পুরুষ বা চার জন নারী সাক্ষী প্রয়োজন। যেটার কোনোটাই রেহানের ছিলো না। কিন্তু তারপরও রেহানের জন্য আমরা সমব্যথী হয়ে উঠি। কারণ, এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে আমাদের মন সমর্থন করে না।

রেহানের বয়স যখন ১৯ তখন তিনি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে একটি কফি হাউজ ডিজাইন করেন, যা অনেকের কাছেই সমাদৃত হয়। তা দেখেই মোর্তেজা আব্দুল আলী সারবান্দি নামে দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের এক ব্যক্তি রেহানেকে তার অফিস ডিজাইন করার প্রস্তাব দেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে সারবান্দি রেহানেকে তার বাসায় গিয়ে বাকি কথা বলার আহ্বান জানালে রেহানে তাতে রাজি হন। বাসায় পৌঁছালে সারবান্দি রেহানেকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। তখন আত্মরক্ষার খাতিরে সারবান্দিকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে এবং তাকে ওই অবস্থায় রেখে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। মোর্তেজা আব্দুল আলী সারবান্দিকে হত্যার দায়ে ২০০৭ সালে রেহানেকে ইরানী পুলিশ গ্রেফতার করে এবং ২০০৯ সালে তার মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়। সারবান্দির পরিবারের মতে এই হত্যাকান্ড পূর্বপরিকল্পিত। কারণ রেহানে নিজে স্বীকার করেন তিনি আত্মরক্ষার জন্য হত্যার কয়েকদিন আগেই এই ছুরি কিনেছিলেন।

এহেন দোষে মৃত্যুদন্ডের সংবাদ শুনে পুরো বিশ্বের সংবাদ মাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠনগুলো যেন আগ্নেয়গিরির মত ফেটে পড়ে ইরানী শাসন ব্যবস্থার উপর। ইরানী শাসন ব্যাবস্থাকে নারী বিদ্বেষী, মানবাধিকার বিরোধী ইত্যাদি অনেক নামেই ভূষিত করে। পুরো বিশ্বের মানুষ এর প্রতিবাদ করে রেহানের ফাঁসির আদেশের বিরোধীতা করেছিল। রেহানের মা এহেন শাস্তির জন্য সরকারের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানিয়েছিল। এমনকি অনেক স্বনামধন্য মানুষ ইরান সরকারের কাছে রেহানের প্রাণভিক্ষার জন্য আকুতি জানিয়েছে। এত কিছুর পরেও ২০১৪ সালের আজকের দিনে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।

মৃত্যুর পূর্বে রেহানে তার মাকে যে চিঠি লিখেছিল তা সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয় কাঁপিয়ে দিয়ে গিয়েছে। এই মৃত্যুকে তিনি নিয়তির বিধান বলে অবহিত করলেও বিন্দুমাত্র অনুতাপ করেননি। বরং ফাঁসির পর তার মাকে অনুরোধ করেছেন দেহের নানা অংশ যার জীবন লাভের জন্য দরকার তাকেই দিয়ে দিতে। তবে তার পরিচয় যেন গোপন রাখা হয়। মা কেন ফাঁসির হুকুম তাকে আগে জানায়নি তা নিয়ে রেহানে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছেন,

“তোমার কি মনে হয়নি এটা আমার আগেই জানা উচিত ছিল? তুমি দুঃখে ভেঙে পড়েছ জেনে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি। ফাঁসির আদেশ শোনার পর তোমার আর বাবার হাতে চুমু খেতে দাওনি কেন আমায়?”

আত্মরক্ষার্থে, সম্ভ্রম রক্ষায় তিনি ধর্ষককে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু বিচারে তারই ফাঁসি হলো! দেশে দেশে যুগে যুগে এমন বিচার প্রহসনের বিচার হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে। মাকে লেখা চিঠিতে রেহানে জাব্বারি যখন বলছে,

“দুনিয়া আমায় ১৯ বছর বাঁচতে দিয়েছে। সেই অভিশপ্ত রাতে আমারই তো মরে যাওয়া উচিত ছিল, তাই না? আমার মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলার কথা ছিল শহরের কোনো অজ্ঞাত কোনে। কয়েক দিন পর মর্গে যা শনাক্ত করার কথা ছিল তোমার। সঙ্গে এটাও জানতে পারতে যে, হত্যার আগে আমাকে ধর্ষণও করা হয়েছিল। হত্যাকারীরা অবশ্যই ধরা পড়ত না, কারণ আমাদের না আছে অর্থ, না আছে ক্ষমতা। তারপর বাকি জীবনটা সীমাহীন শোক, অসহ্য লজ্জায় কাটিয়ে কয়েক বছর পর তোমারও মৃত্যু হতো। এটাই যে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে রাতের আকস্মিক আঘাত সব কিছু ওলট-পালট করে দিল। শহরের কোনো গলি নয়, আমার শরীরটা প্রথমে এভিন জেলের নিঃসঙ্গ কুঠুরিতে। আর সেখান থেকে কবরের মতো রাজায়ি শাহর কারাগারের সেলে। কিন্তু এ নিয়ে অনুযোগ করো না মা, এটাই নিয়তির বিধান। আর তুমি তো জানো যে, মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না”।

একজন ইরানী তরুণী ফাঁসির রশি গলার সামনে রেখে সাহসিকতার সঙ্গে তার মাকে এই চিঠি লেখার মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্ববিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে গেছে, গ্লানির স্পর্শ দিয়ে গেছে।

সে তার মাকে আরও লিখেছে,

“তুমিই তো শিখিয়েছ অভিজ্ঞতা লাভ ও শিক্ষা পাওয়ার জন্যই আমাদের জন্ম। মাঝে মাঝে লড়াই করতে হয়, সে শিক্ষা তো তোমার থেকেই পেয়েছি। সেই গল্পটা মনে পড়ছে, চাবুকের ঝাপটা সহ্য করতে করতে একবার প্রতিবাদ জানানোর ফলে আরও নির্মমতার শিকার হয়েছিল এক ব্যক্তি। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। কিন্তু প্রতিবাদ তো সে করেছিল। আমি শিখেছি, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে অধ্যবসায় প্রয়োজন। তার জন্য যদি মৃত্যুও আসে তাকেই মেনে নিতে হয়। স্কুলে যাওয়ার সময় তুমি শিখিয়েছিলে নালিশ ও ঝগড়াঝাটির মাঝেও যেন নিজের নারীসত্তা বিসর্জন না দিই। তোমার মনে আছে মা- কত যত্ন করেই না মেয়েদের খুঁটিনাটি সহবত শিখিয়েছিলে আমাদের?

কিন্তু তুমি ভুল জানতে মা। এসব ঘটনার সময় আমার সেসব তালিম একেবারেই কাজে লাগেনি। আদালতে আমায় এক ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে পেশ করা হয়। কিন্তু আমি চোখের পানি ফেলিনি। ভিক্ষাও করিনি। আমি কাঁদিনি কারণ আইনের প্রতি আমার অটুট আস্থা ছিল। কিন্তু বিচারে বলা হলো, খুনের অভিযোগের মুখেও নাকি আমি নিরুত্তাপ। আচ্ছা মা, আমি তো কোনো দিন একটা মশাও মারিনি। আরশোলাদের চটিপেটা না করে শুঁড় ধরে জানালার বাইরে ফেলে দিয়েছি। সেই আমিই নাকি মাথা খাটিয়ে মানুষ খুন করেছি! উল্টো ছেলেবেলার ওই কথাগুলো শুনে বিচারপতি বললেন, আমি নাকি মনে মনে পুরুষালি। তিনি একবার চেয়েও দেখলেন না আমার হাতের লম্বা নখের ওপর কী সুন্দর নেইল পালিশ ছিল। হাতের তালু কত নরম তুলতুলে ছিল। নারীত্বের পুরস্কার হিসেবে মাথা মুড়িয়ে ১১ দিনের নির্জন বাসের হুকুম দেওয়া হলো। দেখেছ মা, তোমার ছোট্ট রেহানে এই কদিনে কত বড় হয়ে গেছে?”

এতকিছু তো দেখলাম রেহানের কথা। শুধু কি তার কথা শুনলেই হবে? এবার ইরানী সরকারের কথা শোনা যাক।

ইরান সরকারের মতে প্রকৃত সত্য হলো রেহানে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন করেন নি। ঘটনাটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইরানের বিচার বিভাগ এতটা নারী বিদ্বেষী নয় যে, অন্যায়ভাবে একজন নারীকে ফাঁসি দেবে। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। ওই মহিলা তার দোষও স্বীকার করেছেন আদালতে। রেহানে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণেও ব্যর্থ হয়েছেন। ঘটানাটি হচ্ছে দু’জনের অবৈধ সম্পর্কের জের ধরে এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে টানাপোড়ন সৃষ্টি হয় এবং এই খুনের ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে পুরুষ লোকটি যে ভালো মানুষ ছিলেন তা বলার সুযোগ নেই। টানাপোড়নের একটি পর্যায়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে রেহানে লোকটিকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন। খুনের দুই দিন আগে রেহানে নতুন ছুরি কিনেছিলেন এবং তার এক বান্ধবীকে এসএমএস করেছিলেন যে, খুনের ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে। এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার। তা হলো- এই মহিলার সঙ্গে ইরানের আদালতের এমন কোনো ঘটনা ঘটে নি যে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে দেবে। অথবা এই মহিলা ইরানের জন্য কোনো হুমকি ছিলেন, সে কারণে তার ফাঁসি কার্যকর করা হলো। বরং যদি এমন হতো যে, খুন হয় নি বরং অবৈধ সম্পর্ক বা ধর্ষণের ঘটনার বিচার হচ্ছে, তাহলে ওই পুরুষ লোকটাও মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়তো এবং এ ক্ষেত্রেও ইরানের আইন অনুসরণ করা হতো। দেখা হতো না কে পুরুষ আর কে নারী। যেমনটি দেখা হয় নি রেহানের ক্ষেত্রে।

দু পক্ষই তাদের আত্মপক্ষের যুক্তিতে অটল। এখন কে সঠিক কে ভুল তার সিদ্ধান্ত আপনারাই নিন। যদিও এখন আমার আপনার সিদ্ধান্তে রেহানে জাব্বারি আর ফিরে আসবে না। কিন্তু পরেরবার থেকে আমরা সকলে যাতে একবার চিন্তা করি এবং কে ভুল তার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

Most Popular

To Top