ইতিহাস

বাঙালি মুসলমানকে আলোকিত করা এ.কে ফজলুল হক

বাঙালি মুসলমানকে আলোকিত করা এ.কে ফজলুল হক

কৃষক শ্রমিকের নেতা অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শের-এ-বাংলা এ.কে. (আবুল কাশেম) ফজলুল হকের জন্মদিন আজ ২৬শে অক্টোবর। তিনি বাংলার মানুষের অহংকার, গণমানুষের বাতিঘর। রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তিনি শের-এ-বাংলা ফজলুল হক হিসেবে বেশী পরিচিত। প্রায় অর্ধ শতাব্দীর অধিককাল তিনি কাজ করে গেছেন গণমানুষের কল্যাণে। দেশের কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলনের ফলে দেশে প্রজাস্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙ্গালী কৃষক সমাজ শোষণ থেকে মুক্ত হয়। জীবনকালে তিনি অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে অধিষ্টিত ছিলেন। কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩), পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬-৫৮) পদ অলংকৃত করেন তিনি। যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন তিনি।

শের-এ-বাংলা খ্যাত এ কৃতি সন্তান ১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র ছিলেন।

বাড়িতে মায়ের কাছ থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। বাড়িতে শিক্ষকদের কাছ থেকে আরবি, ফার্সি এবং বাংলা ভাষা শিখতেন। পর্যায়ক্রমে ১৮৮১ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হন, ১৮৮৬ সালে অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন এবং ১৮৮৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সেসময়ে ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৮৯১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৩ সালে তিনি গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ প্রথম শ্রেণিতে বি.এ. পাশ করেন। বি.এ. পাশ করার পর তিনি ইংরেজী ভাষায় এম.এ. করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার ছয় মাস আগে তার এক বন্ধুর কথার প্রতিবাদ করার জন্য ইংরেজি ছেড়ে তিনি অঙ্কশাস্ত্রে ভর্তি হন এবং মাত্র ছয় মাস অঙ্ক করেই তিনি প্রথম শ্রেণি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ১৮৯৬ সালে  নবাব আবদুল লতিফ সি.আই.ই. এর পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগকে বিয়ে করেন। সেখানে তার দুই কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করলে, তার স্ত্রীর অকাল মুত্যু হয়। খুরশিদের মৃত্যুর পর হুগলি জেলার অধিবাসি ও কলকাতায় বসবাসকারী জনাব ইবনে আহমদের মেয়ে জনাবা জিন্নাতুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করেন। নিঃসন্তান জিন্নাতুন্নেসা মারা গেলে অবশেষে ১৯৪২ সালে ভারতের মিরাটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বিদুষী  মেয়ে খাদিজা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৯৪৪ সালে খাদিজার গর্ভে একমাত্র পুত্র সন্তান এ.কে. ফাইজুল হকের জন্ম হয়।

১৮৯৭ সালে ডিষ্টিংশনসহ বি.এল. পাস করে মনীষী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে কলকাতা হাইকোর্টে যোগদান করেন। একই বছর একাডেমিক শিক্ষার সমাপ্তি টেনে তিনি কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। শিক্ষনবীশ আইনজীবী হিসাবে কিছুকাল অতিবাহিত করে ১৯০০ সালে তিনি এককভাবে কাজ শুরু করে একবছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৯০১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী তার পিতা বিশিষ্ট আইনজীবী মৌলভী কাজী ওয়াজেদ আলী মারা যান। পিতৃবিয়োগের পরে তিনি কলকাতা ছেড়ে ফিরে এলেন তার নিবাস বরিশালে। এখানে এসে তিনি নতুন ভাবে আইন ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯২৩ সালে শের-এ- বাংলার মাত্র ৩৩ বছর বয়সে পেশা জীবনের পরিবর্তন আসে। তিনি ওকালতি ও অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে তৎকালীন সরকারের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হিসাবে যোগদান করেন। ১৯১১ সালে সরকার তাকে সমবায় বিভাগের নিবন্ধকের দায়িত্ব দেন। একই সময় তিনি বরিশাল বি.এম. কলেজে ইংরেজীর অধ্যাপক এবং বরিশাল জেলা স্কুলে ফার্সি ভাষায় পরীক্ষকের কাজও করতেন। ১৯০২ সালে “ভারত সুহৃদ” নামের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন শের-এ- বাংলা।

ভারত সুহৃদ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে শের-এ-বাংলা রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কে অনেক সচেতন হন। তার ফলশ্রুতিতে ১৯০২ সালে তিনি বরিশান পৌরসভা নির্বাচনে দাঁড়ালেন এবং বিপুল ভোটে জয়ীও হলেন। পরবর্তীতে তিনি জেলা বোর্ড নির্বাচনেও বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বাংলার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়লে, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ উপলব্ধি করেন মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সংগঠন দরকার। এই চিন্তা থেকেই ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স আহবান করেন। এই সম্মেলনে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ নিজে এবং যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন নবাব ভিকারুল মুলক এবং আবুল কাশেম ফজলুল হক। এর পরে ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “নিখিল ভারত শিক্ষা সম্মেলন”এর পক্ষে গোটা ভারতের মুসলমানদের একত্রিত করতে মূখ্য ভুমিকা পালন করেন তিনি। এর পরে ১৯১৩ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এ.কে ফজলুল হক। ১৯১৬ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১৮ সালে শের-এ- বাংলা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। তখন একই ব্যক্তি ইচ্ছা করলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সদস্যপদ নিতে পারতেন তিনি তাই করেছিলেন।

বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পদের বিপরীতে ঢাকা বিভাগীয় একটি কেন্দ্র হতে ১৯১৩ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এ.কে ফজলুল হক। তার সাথে অপর প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার রায় বাহাদুর মাহেন্দ্রনাথ মিত্র। এই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রমাণ করলেন যে, তিনি মুসলমান হিন্দু নির্বিশেষে সকলের প্রিয় নেতা।

১৯১৩ সালে নির্বাচিত হয়ে নতুন সদস্য হিসাবে তিনি আইন পরিষদে তথ্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। প্রথম দিনেই তিনি জ্বালাময়ী বক্তব্য উপস্থাপন করে সকলকে মুগ্ধ করেন। আইন পরিষদে উপস্থিত বাংলার লাট কারমাইকেল, শের-এ- বাংলার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে আর আসন ছেড়ে তার সাথে করমর্দন করেন করে অভিনন্দিত করেন এবং এবছরই তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সদস্যপদ লাভ করেন।

১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেয়ার পর থেকে আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়েছিলেন কৃষকদের রাজনীতি নিয়ে। ১৯২৯ সালের ৪ জুলাই বঙ্গীয় আইন পরিষদের ২৫ জন মুসলিম সদস্য কলকাতায় একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। এই সম্মেলনে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি নামে একটি দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলার কৃষকদের উন্নতি সাধনই ছিল এই সমিতির অন্যতম লক্ষ্য। ১৯২৯ সালেই নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। ঢাকায় প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। এই সম্মেলনে এ. কে. ফজলুক হক সর্বসম্মতিক্রমে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

শের-এ-বাংলা ১৯১৩ সনের আইনসভায় প্রবেশ করেই মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিশেষ জোর দেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে মুসলিম সমাজ যদি পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করে তবে সম্প্রদায় হিসেবে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। কারমাইকেল হোস্টেল, টেইলার হোস্টেল, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ, তেজগাঁও কৃষি কলেজ, ফজলুল হক হল, চাখার ফজলুল হক কলেজ, আদিনা ফজলুল হক কলেজ, হরগঙ্গা কলেজ, ঢাকা সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, সেন্ট্রাল ল কলেজ প্রভৃতি ফজলুল হকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ছিল তার সক্রিয় সহযোগিতা। তার সময় দু হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শত শত মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন শের-এ- বাংলা একে ফজলুল হক। তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের “ফাউন্ডেশন মেম্বর অব দি ফাষ্ট কোর্ট” ছিলেন।

তার শিক্ষানীতি দ্বারা মুসলিম, হিন্দু, নবশূদ্ররাও উপকৃত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ শিক্ষায়তনে হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকগণের সংখ্যাই বেশী ছিল। আজকের উভয় বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তার শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতার ফসল। তিনি গণশিক্ষা বিস্তারের জন্য আমরণ সংগ্রাম করেছেন। তখন স্কুল সমূহে হিন্দুদের প্রভাব ছিল বেশি। মুসলমান ছাত্রদের সংস্কৃত পড়তে হত। সরকারি স্কুল ছাড়া অন্য স্কুলে আরবি-ফার্সি পড়ানো হত না। তাই ফজলুল হক মন্ত্রী হয়ে আদেশ জারি করেন যে, কোনো স্কুলে সরকারি সাহায্য পেতে হলে ১ জন মুসলমান শিক্ষক ও ১ জন মৌলভী নিয়োগ করতে হবে। তিনি স্কুল, কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল কলেজে মুসলমান ছাত্রদের আসন নির্দিষ্ট করে দেন। তারা ভর্তি না হলেও সীট খালি থাকবে। এ ব্যবস্থার ফলে কলেজে মুসলমানরা শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পেয়েছিল।

বাংলার মানুষদের জন্য শের-এ-বাংলা যেসব গুরুত্ত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন তার মধ্যে কয়েকটি নিচে উল্লেখ করলাম-

১. এ.কে ফজলুল হক কৃষিশিক্ষা, প্রদর্শনী খামার, প্রচার, বাজার ঋণ প্রদান, গবেষণা, বিকল্প কর্মসংস্থান প্রভৃতি কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আধুনিক কৃষি বিস্তারের লক্ষ্যে ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনার দৌলতপুরে কৃষি ইনস্টিটিউট ও ঢাকায় ডেইরি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৮ সনের ১৬ ডিসেম্বর ফজলুল হক ঢাকার তেজগাঁও কৃষি ইন্সটিটিউটের ভিত্তি স্থাপন করেন। ফার্মগেট থেকে শুরু করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল পর্যন্ত ডেইরী ফার্ম ও কৃষি ইন্সটিটিউট বিস্তৃৃত ছিল। পশু সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তিনি উন্নত জাতের গবাদি পশু আমদানী এবং পশুপালন উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেন। গবাদি পশু পালন ও দুগ্ধ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

২. বাংলার লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার জন্য ১৯৪০ সনে ‘মহাজনী আইন’ পাস করেন। এই আইনে সুদের উচ্চহার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। চক্রবৃদ্ধি সুদ বন্ধ করা হয়। সাধারণ সুদের হার ও বন্ধক রেখে সুদ করলে সুদের হার শতকরা ৮% এবং বিনা বন্ধকে ঋণ গ্রহণ করলে সুদের হার বেশি হতে পারবেনা।

৩. নারী কর্মচারী ও শ্রমিকদের কল্যাণে ১৯৩৯ সালে ‘ম্যাটারনিটি বেনিফিট এ্যাক্ট’ বা ‘মাতৃমঙ্গল আইন’ প্রণয়ন করেন। নারী চাকুরীজীবিরা সন্তান প্রসবের পূর্বে ১ মাস ও পরে ১ মাস বেতন ভাতাদিসহ ছুটি ভোগের অধিকার লাভ করে।

৪. শিশু শ্রমিকদের কল্যাণে শিশুশ্রম বন্ধের জন্য ১৯৩৮ সালে শিশু নিয়োগ আইন প্রণয়ন করেন। এ আইনে ১২ বছর পর্যন্ত বয়স্ক শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ বন্ধ করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়।

৫. ১৯৪৩ সালে ‘ভবঘুরে আইন’ প্রণয়ন করে আশ্রয়হীন নারী ও শিশুদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। শের-এ-বাংলার উদ্যোগে বাংলাদেশে অনেক এতিমখানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

৬. তিনি জনগণের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য হক মন্ত্রীসভা কুইনাইন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা উন্নত করা হয়।

৭. চাকুরী বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে তিনি মুসলমানদের শতকরা ৫০ ভাগ এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য শতকরা ১৫ ভাগ চাকুরীর নিশ্চয়তা প্রদান করে বিধি জারি করেন।

এমনিভাবে আইন প্রণয়ন, বিধিজারী ও কর্মসূচি গ্রহণ করে বাংলার নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষদের জন্য মুক্তির দ্বার উদঘাটন করেন ফজলুল হক।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল বা ‘কপ’-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দলোনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের এটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এ. কে. ফজলুক হক সমর্থন দেন।

এ.কে.ফজলুল হকের জীবনী পড়লে জানা যায় কৈশোরে তার উচ্চতা ছিল প্রায় ৬ফুট। লং জাম্প, দৌড়, সাঁতার, পাঞ্জা, কাবাডি ইত্যাদি খেলায় তিনি ছিলেন অনন্য। কাবাডিতে তাকে ৫ জন মিলে ধরে আটকে রাখতে পারত না। তিনি শখের বশে ঘুষি হাঁকিয়ে ঝুনা নারকেল ছিলতেন। আস্ত শুপারি তিনি দাঁত দিয়ে ভাঙ্গতে পারতেন। একবার এক আফগানের সাথে পাঞ্জা লড়তে গিয়ে তার হাত মচকে দেন এ.কে.ফজলুল হক। লোকেমুখে এও শোনা যায় তিনি খালি হাতে একবার কুমিরকেও পরাস্থ করেছিলেন। খাওয়াতেও তিনি ছিলেন কিংবদন্তী। এক সঙ্গে ২০ টি ডাবের পানি আর ৪ জগ খেজুর রস খাওয়ার রেকর্ড তার দখলে। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমত্রিত্ত্ব করার সময় তিনি এক বসায় ৪৫ টার অধিক ফজলি আম খেয়ে সাবাড় করেন।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০ টা ২০ মিনিটে শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুক হক ৮৬ বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। ২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত তার মরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় তার ২৭. এম. দাস লেনের বাসায় রাখা হয়। সেদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়। একই স্থানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে। তাদের তিনজনের সমাধিস্থলই ঐতিহাসিক তিন নেতার মাজার নামে পরিচিত।

এক কথায় শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস। তিনি ছিলেন কৃষকদের প্রিয় ‘হক সাহেব’। বাঙালি মুসলমানদের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে ছিলো তার অসামান্য অবদান। তার মহান ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন তাকে অল্প সময়ে করে তোলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত। শিক্ষা প্রসারের জন্য এ. কে. ফজলুল হকের অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

Most Popular

To Top