ফ্লাডলাইট

বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি, তামিমের যোগ্য সঙ্গী হতে পারে কে?

বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি, তামিমের যোগ্য সঙ্গী হতে পারে কে?

ওয়ানডে ক্রিকেটে একটা সময় ছিলো যখন ২৫০+ রান করে দলগুলা নিজেদের নিরাপদ মনে করতো। একরকম উইনিং স্কোর। টি টুয়েন্টি ক্রিকেট আসার পর সে অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে, আর গত বিশ্বকাপের পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রানের সংখ্যা যেন রকেটের গতিতে আগাচ্ছে। ৩০০ রান এখন আর নিরাপদ না, সব দল চায় ৩৩০ রান অন্তত।

নিউজিল্যান্ডের একটা উদাহরণ দেই। টম লেথাম, যার স্ট্রাইক রেট ৮১.৩০ এবং গড় ৩৫ তাকে ওপেনিং থেকে সরিয়ে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। তার জায়গায় ওপেনার হিসেবে আনা হয়েছে কলিন মুনরোকে যার স্ট্রাইক রেট ৯৮.০৬। কারনটা নিউজিল্যান্ড কোচ সরাসরি বলেছেন ওপেনার হিসেবে শেষ তিন ম্যাচে ৫৪, ১০৪, ৮৪ রান করলেও লেথাম সেই বিধ্বংসী শুরুটা এনে দিতে পারেনি যেটা নিউজিল্যান্ড চাচ্ছে। ফলাফল, গাপটিলের সাথে ওপেনিং জুটিতে মুনরো। আর ভারত সফর থেকে লেথাম মিডিল অর্ডারে। ইনিংস বিল্ড করা, বড় রান করা, গড় সংখ্যা সব দিকে লেথাম এগিয়ে। কিন্তু লেথাম যেটা পারেননা সেটা হচ্ছে ডোমিনেট করে খেলা, ৫০ বলে ৫০ করে হয়তো স্ট্রাইক রেট ১০০ রাখা যায় কিন্তু তাতে বোলারকে বিব্রত করা যায়না, প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কপালে ভাঁজ ফেলা যায়না, প্রতিপক্ষের মনোবল তছনচ করা যায়না। আর এই কাজগুলা করানোর জন্যই মুনরো এখন নিউজিল্যান্ডের ওপেনার। তার কাজ সপাটে ব্যাট চালানো, বিগ শট নেয়া। আর ইনিংস বিল্ড করার জন্য গাপটিল আছে, সিনিয়র প্লেয়ার।

নিউজিল্যান্ড একটা উদাহরণ দিলাম, যেকোন দলের ওপেনিং জুটি খেয়াল করলে এটাই পাওয়া যাবে। একজন ইনিংস বিল্ড করবে, অন্যজন আক্রমন করে খেলবে।

বাংলাদেশ এইরকম জুটি পেয়েছিলো তামিম-সৌম্য জুটিতে। আমরা তামিমকে “বুম বুম” বলেছি আমরা একসময় আফতাব আহমেদকে “বুম বুম” ডেকেছি কিন্তু সত্যিকারের একজন মারকুটে ব্যাটসম্যান, যে প্রতিপক্ষের উপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিবে এইরকম ব্যাটসম্যান এখন পর্যন্ত আমরা কেবল সৌম্যকেই পেয়েছি। একই সাথে সে একজন ম্যাচ উইনার, যে কয়টা ম্যাচে সে ভালো খেলেছে বাংলাদেশ হেসে খেলে জয় পেয়েছে।

বর্তমান অবস্থা সবাই জানেন, নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্যাটে রান নেই, খেলার ভেতর আত্মবিশ্বাস নেই, সমালোচনা ইত্যাদি..। সৌম্য কেন দলে এই জন্য অনেকে অনেক থিওরি দেয়, আসলে কোচের প্রিয় ছাত্র বা রাজনীতি না, সৌম্য দলে কারন সৌম্যের মানের কোন ব্যাটসম্যান রিজার্ভ বেঞ্চে নাই। আর নেই বলেই সৌম্যকে নিয়ে বাজি ধরা হয়, অন্য কথায় আশায় বুক বাঁধা, যদি সে রান পায়, যদি সে ফিরে তাহলে হয়তো ভালো কিছু হবে। এতে লাভের চেয়ে মনেহয় ক্ষতি বেশি হয়েছে, প্রচুর সৌম্য “হেটার” জন্ম হয়েছে, সে নিজে হয়তো আরো আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে। সৌম্যকে ছাড়াও ম্যাচ খেলা হলো। মুশফিকের অসাধারন একটা সেঞ্চুরীর পরেও রান হয়েছে ২৭৮, অন্য ম্যাচে ২৪৯। সত্যি বলতে আমাদের ৩০০+ রান করার জন্য একজন সৌম্য বা একজন সাব্বিরের মানের ব্যাটসম্যানের দরকার আছেই। আর সেটা না হলে আমরা সবসময় ২৭০-২৮০ রানের ভেতর থেকে বের হতে পারবো না, আর এই রান আজকাল চেজ করা কোন ঘটনা না। ৩০০-এর নীচে রান তাড়া করে জেতা নিত্যদিনের ঘটনা এখন।

সৌম্য মানে সৌম্য সরকার না, তার মতো একজন ওপেনার দরকার তাকে সরাতে হলে। কারনটা বলি, আমাদের প্রথম দশ ওভার কাজে লাগাতেই হয়, কারন দশ থেকে চল্লিশ এই সময়ে আমাদের প্রচুর ডট বল যায়, ইদানিং তামিম ইনিংস বিল্ড করে খেলেন ফলে তারও কিছু ডট বল যায়। এরপর সাকিবকে বাদ দিলে আর যারা আছেন মুশফিক, রিয়াদ, নাসির সবাই ডট দেয় প্রচুর। প্রথম ম্যাচে মুশফিকের সেঞ্চুরীতে ৫৪ টা ডট বল ছিলো মানে পুরা নয় ওভার। দ্বিতীয় ম্যাচেও রিয়াদ, মুশফিক, ইমরুল ডট বল দিয়েই প্রেসার বানিয়েছেন নিজেদের উপর। আর শেষ দশ ওভারে সার্কেলের বাইরে পাঁচজন ফিল্ডার থাকায় আমাদের আরো সমস্যা, দলে নেই এমন কোন বিগ হিটার যে বড় বড় ছয় মেরে রান তুলে দিবে। পাঁচজন ফিল্ডার থাকায় চার মারাও কঠিন হয়ে যায়। সুতরাং আমাদের টার্গেট প্রথম দশ ওভারই। রান এখানেই তুলে নিতে হবে।

আমাদের হাতে সৌম্য সরকারের বিকল্প হিসেবে আছেন ইমরুল কায়েস, এনামুল হক বিজয়, শাহরিয়ার নাফিস, মেহেদি মারুফ আর লিটন কুমার দাস।

তামিম ইকবালের সাথে ইমরুলের জুটি অনেক হয়েছে। তার ফলাফল সবাই জানেন। ইমরুলকে বদলে বিজয়কে হয়তো এখন আনা হবে, বিজয় সবচেয়ে এগিয়ে আমার চোখে, কারন সে ধারাবাহিক রান পাচ্ছে এখন। বিজয় হয়তো জাতীয় দলে এক পা দিয়েই রেখেছেন, আর সৌম্য সরকারের এক পা কবরে প্রায়।

বিজয়ের একটা জিনিস ভালো, বিজয় রান করতে পারেন। জাতীয় দলে আসার আগে বিজয়ের মতো সেঞ্চুরী পকেটে পুরে কেউ এসেছিলো না। জাতীয় দলেও তিন সেঞ্চুরী তার। বিজয়ের রান করার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নাই কারও। কিন্তু এখন তামিম আর আগের মতো মেরে খেলেন না, সেই সাথে বিজয় থাকলে আমরা আবার সেই ২৬০-২৭০ এর যুগে ফিরে যেতে পারি এই আশংকা আছে। বিজয় আজকেও আয়ারল্যান্ড “এ” দলের সাথে ২০ রান করেছেন ২৩ বলে, যার ভেতর ১৬ টাই ডট বল!

রান করাটাই যদি মূখ্য হয় তাহলে বিজয়কে আনারই বা কি এমনই বিশেষ দরকার? ইমরুল কায়েসের শেষ ১৪ ম্যাচে গড় ৪৫ এর আশেপাশে, তাহলে তাকেই সৌম্য সরকারের জায়গায় তামিমের সঙ্গী করা হোক চূড়ান্তভাবে! কিন্তু ইমরুল? সে খুব ভালো খেললে বাংলাদেশের বড়জোর একটা সম্মানজনক পরাজয় আসবে। এইতো? এরচেয়ে বেশি কি হবে? ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা ইমরুলের কি আছে?

তামিম ইকবালের সাথে ইমরুল কায়েস-এনামুল হক বিজয় যাকেই দেয়া হোক না কেন ৩০০+ রানের জন্য যেই শুরু দরকার সেটা আসবেনা। হয়তো দুইজনই রান পাবেন কিন্তু ঝড়ো সূচনা হবেনা। বরং দ্রুত রানের চিন্তায় তামিম আবার “বুম বুম” হবার চেষ্টা করে ফর্ম হারাতে পারেন বাজে আউট হয়ে।

আরেকটা অপশন হচ্ছেন শাহরিয়ার নাফিস, বেশিরভাগ দলে একজন অভিজ্ঞ, একজন তরুন এভাবে ওপেনিং জুটি সাজানো হয়। আমাদের যদি তামিম না থাকতেন তাহলে শাহরিয়ার নাফিসই অভিজ্ঞ হিসেবে দলে থাকতেন। তামিম, নাফিস দুইজনই কাছাকাছি ধরনের প্লেয়ার। কেউই এখন ঝড় তুলেন না, বরং লম্বা ইনিংস খেলে এক প্রান্ত ধরে রাখার ভূমিকা পালন করেন। আর দুইজন সিনিয়র থাকলে ভবিষ্যতে শূন্যতা তৈরী হতে পারে। ওপেনিং পার্টনার এমন হওয়া উচিৎ যখন একজন অবসরে যাবেন তখন অপরজন যেন সিনিয়র প্লেয়ারের জায়গাটা নিতে পারেন। তবে নাফিস অবশ্যই দলে আসতে পারেন তবে সেটা তামিমের জায়গায় যদি তামিম ইনজুরিতে থাকেন বা বিশ্রামে থাকেন। অথবা বহুল আলোচিত তিন নাম্বার পজিশনে। একটা তথ্য লাস্ট ডিপিএলে নাফিসের স্ট্রাইক রেট ছিলো অবিশ্বাস্য কম। মাত্র ৬২.৬৯ (১৬ ম্যাচে)।

অনেকে বলেন মেহেদি মারুফের কথা। মারুফ অনেক সিনিয়র প্লেয়ার, মুশফিকের ব্যাচ। মারুফ যদি জাতীয় দলের ম্যাটেরিয়াল হতেন তবে বহু আগেই জাতীয় দলে আসতেন। গত বিপিএলের আগে মারুফকে নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয়নি। আর বিপিএলের পড় ডিপিএলে মারুফের পরিসংখ্যান এমন, গড় ৪৫ আর স্ট্রাইক রেট ৮৪.০০। মারুফের উপরে আছেন লিটন দাস, মার্শাল আইয়ুব, ইমতিয়াজ হোসেন। আর স্ট্রাইক রেটের বিচারে তার উপরে আছেন এনামুল (৯০) এবং তরুন সাইফ হাসান (৮৭)। সুতরাং মেহেদি মারুফকে নিয়ে আশাবাদি হবার কারন দেখিনা খুব বেশি। জাতীয় লীগেও মারুফ তেমন কিছু করছেন না। তবুও তার হাতে বিগ শট আছে, তাকে একবার বাজিয়ে দেখা যায়। হয়তো সৌম্যের মত একজন স্ট্রোক মেকার পাওয়া যেতেও পারে।

আমার মতামত, যদি সৌম্য বাদ পড়েন তাহলে তার জায়গায় লিটনকে আনা উচিৎ। অন্তত হোম সিরিজে তামিম-লিটন জুটি একবার বাজিয়ে দেখা যায়। যদিও বলতে পারেন লিটন সাউথ আফ্রিকা সিরিজে কি করলেন? আমি বলবো সাউথ আফ্রিকা সিরিজ দিয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসা উচিৎ না। বিশেষকরে লাস্ট ডিপিএলে প্রায় ৫৩ গড় আর ১০৯ স্ট্রাইক রেটে সর্বোচ্চ রান করা লিটনকে ঘরের মাটিতে একটা সুযোগ না দেয়াটাই অন্যায় হবে। প্রতিপক্ষ যখন শ্রীলংকা-জিম্বাবুয়ে তখন সুযোগ দেয়া উচিৎ। অনেক কম্বিনেশন দেখা হয়েছে, তামিম-লিটন জুটি অন্তত একবার দেখা উচিৎ।

জাতীয় দলে আরেকটা সমস্যা হচ্ছে তিন নাম্বার পজিশন। এই জায়গায় এনামুল, নাফিস অথবা মমিনুলের যেকোন একজনকে একটা সুযোগ দেয়া যায়। যদিও মমিনুলের উপর “টেস্ট” ক্রিকেটার তকমা দেয়া আছে তবে শেষ ডিপিএলে মমিনুল ১৬ ম্যাচে ৫৮৪ রান করেছেন প্রায় ৩৯ গড়ে, স্ট্রাইক রেট দারুন, ৯২.৪০। যেহেতু মমিনুল স্কোয়াডে আছেন সুতরাং তাকে সুযোগ দেয়ার পক্ষে আমি সামনের হোম সিরিজে। তবে এনামুল বা নাফিস হলেও সমস্যা নেই। আর ভবিষ্যতের জন্য চাইবো নাজমুল হোসেন শান্তকে।

এবার গুরুত্বপুর্ন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি! সৌম্য সরকার কি তাহলে একেবারে ছিটকে পড়বেন? আমার উত্তর না। তিনি ফিরতে পারেন। সেজন্য তাকে বিপিএলে রান পেতে হবে। সৌম্য একবার রান পেলেই তার আত্মবিশ্বাস ফিরবে। সেটা যেখানেই হোক। দল গঠন করা হয় প্রতিপক্ষ, কন্ডিশন আর প্লেয়ারের সক্ষমতা দেখে। বাংলাদেশ এই বছর ঘরের মাটিতে কোন ওয়ানডে খেলেনি। কাজেই হোম সিরিজে সে একটা সুযোগ পাবে যদি বিপিএলে রান পায়। এশিয়ার মাটিতে শ্রীলংকা আর ভারতে সে রান পেয়েছিলো, রান পেয়েছে আয়ারল্যান্ডের ট্রাই নেশনেও। সেই শ্রীলংকা এবং জিম্বাবুয়ের মতো তূলনামুলক দূর্বল প্রতিপক্ষের সাথে সে সুযোগ একটা পাবে তবে শর্ত একটাই বিপিএলে রান পেতে হবে। অন্যথায় সৌম্য সরকার চূড়ান্তভাবে ছিটকে যাবেন।

সৌম্য আরো দুটি সুযোগ পাচ্ছেন সাউথ আফ্রিকার সাথে টি টুয়েন্টি সিরিজে। পরিসংখ্যান তাকে সেই সুযোগ দিবে। শেষ এক বছরে টি টুয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান তারই।

সৌম্য বাদ যাবে কি না আর বিজয় দলে আসবে কিনা এর উত্তর অনেকটাই বিপিএলের উপর নির্ভর করবে। বিজয়ের স্ট্রাইক রোটেট ক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে সেটাও দেখা যাবে তখনই। তবে এটা বলতে পারি, ম্যানেজমেন্ট চায়না সৌম্য হারিয়ে যাক। কেন চাইবে? এরকম একজন ম্যাচ উইনার হারাক এটা কেউই চাইবে না। যদি সৌম্য এবং বাকি সবাই একই সাথে রান পায় তাহলে সবার আগে সৌম্যই বিবেচনায় আসবে এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন। তবে মেহেদী মারুফ যদি এই বিপিএলেও আগের ফর্ম ধরে রাখতে পারেন তাহলে একটা সুযোগ পেতে পারেন অন্তত টি টুয়েন্টি ফরম্যাটে।

একটা ব্যক্তিগত মতামত দেই, এই সাউথ আফ্রিকা সিরিজ দিয়ে কারো ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলা উচিৎ হবেনা। আশাকরি ম্যানেজমেন্ট সেটা করবেনা। সেটা নাসির, লিটন, সৌম্য, সাব্বির, তাসকিন যেই হোক না কেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পরবর্তী হোম সিরিজ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিৎ।

আর একটা জিনিস দেখি অনেকেই বলেন তামিমের খারাপ সময়ে বার বার সুযোগ পাবার কারন তখন নাকি আমাদের হাতে বিকল্প ছিলোনা, এটা ভুল। বিকল্প ছিলো, তামিমের জায়গায় তখন শাহরিয়ার নাফিস চোখ বন্ধ করে সুযোগ পেতে পারতেন। শাহরিয়ার সুযোগ পাননি তার কারন এটা না যে তার যোগ্যতা ছিলোনা, কারন এটা যে টিম ম্যানেজমেন্ট জানতেন তামিম কি এবং তার দ্বারা কি সম্ভব। আর তামিম সেটা করেও দেখাচ্ছেন এখন।

Most Popular

To Top