ফ্লাডলাইট

কেন টাইগারদের অসহায় আত্মসমর্পণ?

কেন টাইগারদের অসহায় আত্মসমর্পণ?- Neon Aloy

আপনি নিশ্চয়ই হতাশ? হতাশ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আমিও হতাশ, বাংলাদেশ যখন হারে তখন খুবই খারাপ লাগে, খারাপের চেয়েও বড় কথা হতাশ লাগে যখন সামান্যতম লড়াই দেখতে পারিনা।

নিউজিল্যান্ড সফরেও হেরেছিলাম কিন্তু সেখানে অন্তত কিছু সুযোগ তৈরী করতে পেরেছিলাম। এখানে তাও হয়নি।

কিন্তু আমি সিরিজ শুরুর আগে লিখেছিলাম এবং মনে মনে আশংকা করেছিলাম এমনটাই হবে। কারন সাউথ আফ্রিকা এক অদ্ভুত জায়গা, এখানে যেয়ে সব দল খেই হারিয়ে ফেলে। কেন ফেলে কিভাবে ফেলে এর উত্তর হয়তো কেউই জানেনা। এই তো কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা দুই দলই ০-৫ হয়েছিলো। সিরিজ হেরেছে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত।

৮/৯ বছর পর পর সাউথ আফ্রিকা যেয়ে কি আশা করবো আর? দলের অর্ধেকের বেশি চিনেই না আফ্রিকান কন্ডিশন কি, কিভাবে এখানে খেলতে হয়। অপরিচিত কন্ডিশনে ব্যাসিক জিনিস ভুল করার কথা না, কিন্তু ক্রিকেটে সেটাও হয়, সেটা শুধু বাংলাদেশের সাথে না, সবার সাথেই। নিউজিল্যান্ড দুইবার যে আমাদের দেশে এসে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিলো তার কোনবারই তাদের দল এতো খারাপ ছিলোনা যে হোয়াইটওয়াশ হয়ে যাবে। তাদের ভালো ভালো ব্যাটসম্যান সোজা সোজা বল মিস করে আউট হয়েছিলো আমাদের স্পিনারদের। এইরকম সোজা বল তারা বহুত খেলেছে, কিন্তু সেবার হয়নি। এরকম অনেক সময় হয়, যখন কিছুই পক্ষে যায়না। বাংলাদেশের এই সিরিজটা সেরকম গেলো। কিছুই পক্ষে যায়নি।

আমাদের বোলিং খুব বাজে হয়েছে, কারন বলি, বাতাসে নাই সুইং, উইকেটে নাই ময়েশ্চার। গতি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ গড়ে। বিশ্বাস করেন সাউথ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের জন্য এগুলা হাতের মোয়া। ওরা ১৪৫ কি.মি/ঘন্টার বল ঘরোয়া ক্রিকেটে, নেটে প্রতিদিন খেলে। হয়তো এটা ইংল্যান্ড হলে কিছু সুইং পাওয়া যেত বাতাস কাজে লাগিয়ে। এখানে হবেনা! এই বোলিং লাইন আপ দেশে বল করুক, এতো খারাপ লাগবেনা। হয়তো আমাদের বোলারদের লাইন ভালো ছিলোনা সত্যিই তবে এটাও ঠিক সাউথ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা অতিরিক্ত ভালো ব্যাট করে। এরা ভালো বল গুলাকেও রানে পরিনত করে ফেলে, খারাপ গুলাকে চার ছয়!

স্পিন তো ধরেই না! তাহিরের বল আহামরি কোন স্পিন করেনা। শুধু জায়গা মতো বল ফেলে যায় আর ব্যাটসম্যানের দূর্বলতা জানে। আমাদের মূল স্পিনার সাকিব, সেও বিগ টার্নার না, জায়গায় বল না ফেললে ধরা! আর মিরাজের তো বহুত শেখার বাকি। নাসির পার্ট টাইমার!

ক্রিকেট যতনা টেকনিক্যাল খেলা তারচেয়ে বেশি মানসিক। সম্ভবত এজন্যই বিদেশে যেয়ে আমরা এবং এখন প্রায় সব দলই সাফার করে। এই সফরের আগে আমরা দেশের মাটিতে টেস্ট খেলেছি, সেখানে একরকম মানসিক প্রস্তুতি, সাউথ আফ্রিকায় অন্যরকম। এশেজের এক মাস আগে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে, নিউজিল্যান্ডের “এ” দল ভারতে ছিলো, সেখান থেকে ছয়জনকে দলে নেয়া হয়েছে বর্তমান স্কোয়াডের, বাকি নয়জন ভারতে প্রচুর ম্যাচ খেলেছে জীবনে। প্রস্তুতি এভাবে নিতে হয়!!

শন পলক একটা গুরুত্বপুর্ন কথা বলেছেন, বাংলাদেশ এতো লম্বা সময় পর পর সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া সফরে যায় যে সেজন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেয়া কি জরুরী? তারা ঘরের মাঠে ভয়ংকর দল, এশিয়ার ভেতর শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, এর বাইরে জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড দূর্বল, ইংল্যান্ডের মাটিতে ম্যাচ জিতেছে আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কন্ডিশন এশিয়ার মতোই, তাহলে এতো সময় পর পর সাউথ আফ্রিকার একটা সিরিজ নিয়ে কেন চিন্তা করবে? বরং এই সিরিজে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এসে ফিরতি সিরিজে সাউথ আফ্রিকাকে ঘরের মাটিতে হারানোর চিন্তাই হয়তো বাংলাদেশ করবে! কথাটা আমার না, লিজেন্ড পলকের।

আচ্ছা ছয় বছর পর আমরা যখন আবার সাউথ আফ্রিকা যাবো তখন এই দলের কয়জন থাকবে? ভালো খারাপ যেমনই হোক একটা অভিজ্ঞতা তরুনদের হয়েছে, সেটা কি ছয় বছর পর কাজে লাগানোর জন্য তারা থাকবে?

আমি অস্বীকার করিনা আমরা খারাপ খেলেছি, অবশ্যই খারাপ খেলেছি তবে এইরকম খারাপ অনেক দলই খেলে বিদেশের মাটিতে। অস্ট্রেলিয়ার কথাই বলি, এশিয়ার মাটিতে তারা কেমন দল আর সিডনি বা মেলবোর্নে কেমন সেটা নিশ্চয়ই আমরা জানি? অথবা ইংল্যান্ড? এমন নিশ্চয়ই না অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা এশিয়ায় এসে ব্যাসিক ভুলে যায়! জাস্ট মানসিকভাবে হেরে থাকে আগেই এজন্য মাঠে পারেনা।

আমাদের ব্যাটসম্যানদের দেশের মাটিতে বাউন্সি পিচ বানিয়ে ১৪৫ কি.মি/ঘন্টার বল খেলানোর অভ্যাস করানো হোক, দেখি পরিবর্তন হয় কি না! দেখি তখন মনের বাঘ খায় কিনা!

এই লিটন, সাব্বির, সৌম্য, মিরাজ এরা লাইফে কখনো এই রকম বোলিং এর সামনে এই কন্ডিশনে দাড়ায়নি। রুবেল, তাসকিন, সাইফউদ্দিন জানেই না কিভাবে এই উইকেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। কিভাবে জানবে দেশে কয়টা বাউন্সি উইকেট দেয়া হয় তাদের? এদের তো অনেক আগেই “এ” দল বা একাডেমি দলের হয়ে এসব কন্ডিশনে খেলতে যাবার কথা ছিলো! তাইনা? সাকিব, মুশফিক, তামিম এরাও সেই নয় বছর আগে একবার গিয়েছিলো!

যাইহোক সাউথ আফ্রিকা সফর শেষে কিছু পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কারন সামনের বিশ্বকাপের জন্য অন্তত দেড় বছর হাতে রেখে দল গোছানো শুরু করতে হবে, যা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার এটাই শেষ সুযোগ। সামনের শ্রীলংকা সিরিজ থেকে একটা স্ট্যাবল টিম নিয়ে আগাতে হবে। বর্তমানে মুশফিক, সাকিব ছাড়া কেউই ফিক্সড পজিশনে আছে বলতে পারবেনা। আর অন্যরা সামনের সিরিজে থাকে কিনা তাই ঠিক নাই! এভাবে কিন্তু হবেনা, প্রুভেন ফেইলর, ওভাররেটেড, অসংখ্য সুযোগ পাওয়া প্লেয়ারদের বাদ দিয়ে সময় হাতে রেখেই দল করা উচিৎ আর সেই দলকে অন্তত এক দেড় বছর সময় দেয়া উচিৎ।

সত্যি বলতে প্লেয়ারদের ভেতর লড়াই করার মানসিকতার অভাব কিছুটা ছিলো, এর কারন টেস্ট সিরিজের পরই আমরা মানসিকভাবে হেরে বসে আছি। এরকম হলে পুরা সিরিজ তখন অসহ্য লাগে, মনেহয় শেষ হয়না কেন! প্রতি ম্যাচে হারার জন্য মাঠে নামা অনেকটা এরকম হয়ে যায় বিষয়টা। আজই মাইকেল ভন বলেছেন লম্বা সফরে এরকম হলে খেলার বাইরে কিছু সময় কাটাতে হয়। ঘুরেফিরে বেড়াতে হয়। টি টুয়েন্টি সিরিজের আগে দলটা ঘুরে বেড়াক আমি তাই চাই। তিন দিনের অনুশীলন আহামরি কোন পরিবর্তন আনবে না কিন্তু মানসিকভাবে চাঙা হলে হয়তো লড়াইয়ের মানসিকতা ফিরে আসবে।

এই সব কিছুর বাইরে প্লেয়ারদের একটা কথা বুঝতে হবে, ক্যারিয়ার তার নিজের, সেটাকে রক্ষা করতে, আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে তাকেই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হবে। এটা তাসকিনের বেলায় যেমন সত্যি, তেমনি সাকিবের বেলাতেও। হারা ম্যাচেও ভালো কিছু অর্জন করে নিতে হয়, সেটা নিজের ক্যারিয়ারের জন্য, নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য। ব্যক্তিগতভাবে আজ সাকিবের কাছে একটা সেঞ্চুরী চেয়েছিলাম।

শেষকথা, এই সিরিজ আমাদের ভুলে যেতে হবে, এরপর আমাদের যে সব সিরিজ আছে সেগুলা এতো খারাপ হবেনা। বেশিরভাগ এশিয়ার ভেতর খেলা, হোম সিরিজ আছে দুইটা (অন্তত), ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাবো সেখানে কন্ডিশন আমাদের মতোই। তবে আগামী বছর আগস্টে যখন অস্ট্রেলিয়া যাবো তখন ঠিক এরকম ভয়ংকর কিছুই হয়তো অপেক্ষা করবে।

Most Popular

To Top