ফ্লাডলাইট

প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা : আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা : আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ- Neon Aloy

হাল আমলের ঘটে যাওয়া যে কোন ইস্যু নিয়ে-আলোচনা-সমালোচনা করতে আমাদের কোন জুড়ি নেই। সমালোচনা অবশ্যই ভাল ব্যাপার, তা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান ও সার্বিক উন্নয়নের পথ তৈরি করে। কিন্তু আমরা আসলে ইস্যুগুলোকে কতগুলো দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করছি, সে প্রশ্ন রয়ে যায় আমাদের আলোচনা-সমালোচনার ফাঁকফোকরে।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুর কথাই ধরা যাক, আমাদের সামনে সারাক্ষণই উঠে আসছে এই ইস্যুতে ধর্মীয় অসাম্প্রদায়িকতা ও মায়ানমারে বৌদ্ধ-মুসলিম সম্পর্কের টানাপোড়ন। কিন্তু সব ইস্যুরই যে একটা আলাদা প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিকোণ থাকতে পারে, তা আমাদের বেশিরভাগ সাধারণের মনেই কৌতুহল জন্ম দেয় না। কখনোই সাধারণের আলোচনায় বা তাদের চোখের সামনে ঠাঁই পায় না ভূ-রাজনীতি বা এশীয় অর্থনীতির পরাশক্তিদের মায়ানমার ইস্যুকে প্রভাবিত করার সম্ভাব্য কারণগুলো। মাঠের খেলায় ১১ জন খেলোয়াড়ের ব্যর্থতার সাথে আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের গ্রাফের বিন্দু মেলাতে বসে যাই, গ্রাফের অক্ষগুলো বা তার পরিমাপকসমূহ আমাদের নজর এড়িয়ে যেতে চায়। তাই কিছু পরিমাপকে নজর দেওয়া যাক আজ।

প্রথমদিকে “ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কাউন্সিল” হিসেবে গঠিত হয়ে ওঠা আইসিসি আমাদের বিশ্ব ক্রিকেটের হর্তাকর্তা। নাম থেকেই বুঝে ওঠা সম্ভব, ক্রিকেট খেলাটার মাঝেই সাম্রাজ্যবাদ ও শাসনতন্ত্রের একটা ছোঁয়া বিদ্যমান। অর্থনীতি দিয়ে মাঠের ক্রিকেটকে শাসন, বা প্রশাসনের মাধ্যমে মাধ্যমে খেলোয়াড়দের শাসন, সকল কিছুই এই গড়ে ওঠা সিস্টেমের ফসল।

শ্রীলংকান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ হয়ে আসার পর থেকেই আমাদের সাফল্য চোখে পড়ার মত। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মাটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া, তারপর দেশের মাটিতে ওয়ানডেতে পাকিস্তানকে ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়, সফলতার মুকুটে সোনালী পালক যোগ করে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয় এবং নিজেদের শততম টেস্ট ম্যাচে শ্রীলংকার মাটিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট জয়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সরাসরি বাছাই হিসেবে খেলতে নেমে সেমিফাইনালে যাওয়া বা অস্ট্রেলিয়ার সাথে প্রথম টেস্ট জয় এখনো আমাদের মাঝে সুবাস ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এই সফল দলটাতে কোচ ও ম্যানেজমেন্টের যাদু কতটুকু, তা মূল্যায়ন করার জন্য কিছু ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। ডেভ হোয়াটমোর, জেমি সিডন্স অ পরবর্তী সময়কালের কোচরাও কিন্তু আমাদের অনেক সফলতা এনে দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডকে দুইবার হোয়াটওয়াশের স্বাদ পাওয়া, ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে যাওয়া অথবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয় কিন্তু আমাদের প্রাক্তন কোচদের সফলতাও আমাদের সামনে তুলে ধরে। সেক্ষেত্রে আমাদের বড় ভূমিকার কৃতিত্ব আমাদের বর্তমান কোচ এর একার না, সম্ভবত একটা “কম্বিনেশান অফ ফ্যাক্টরস”, যার মূল চালিকা শক্তি আমাদের পঞ্চপাণ্ডব – মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ। এই সিনিয়র ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের কোচ ও ম্যানেজমেন্ট যেভাবে সফলতা বের করে আনতে পারছে, সেক্ষেত্রে প্রাক্তন কোচরা তুলনামূলক তরুণদের নিয়ে কম সফলতা পাননি। মাশরাফির বোলিং লাইন-লেংথে অভিজ্ঞতার ছাপ, তামিমের পরিণত ও ধারাবাহিক ব্যাটিং, সাকিবের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, মুশফিকের নির্ভরযোগ্যতা ও মাহমুদুল্লাহর ম্যাচ বের করে আনার মন মানসিকতাই আমাদের ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন বাধ সাধলো চলমান দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। মলিন ব্যাটিং, নখদন্তহীন বোলিং, ইনিংস ব্যাবধানে টেস্ট হার। প্রথম ওয়ানডেতে বোলারদের অসহায় আত্মসমর্পণ। আসল সমস্যাটা নিয়ে আমরা ভাবছি কি?

আমাদের পঞ্চপাণ্ডবের সাথে আমাদের কোচ, ম্যানেজমেন্ট ও ক্রিকেট প্রশাসন এর সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন কখনো না কখনো উঠেছে। তামিম এর সাথে সমস্যা কখনো প্রতীয়মান হয় নি, তবে বাকিদের ক্ষেত্রে যথেষ্টই তা প্রতীয়মান। সাকিবের উপর আমাদের বোর্ড প্রেসিডেন্টের অতীত কঠোর শাস্তি ও নীতির প্রয়োগ, মাহমুদুল্লাহর উপর টেস্টে নির্ভরশীলতা হারানো তারই ছাপ রেখে গিয়েছে। মাশরাফির টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়ানো বেশিদিন হয়নি আমাদের সামনে অনেক প্রশ্ন রেখে গিয়েছে। সর্বশেষ ইস্যু প্রসংগেই আসা যাক, আমাদের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিক।

ক্রিকেট খেলাকে বলা হয় অধিনায়কের খেলা, ফুটবল হল কোচের খেলা। তার প্রমাণস্বরুপ ভারতীয় ক্রিকেটে অধিনায়ক বিরাট কোহলির অপছন্দের কারণে অনিল কুম্বলের মত তুলনামূলক সফল কোচকে অপসারণের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই আমরা দেখেছি। আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট ও কোচ প্রসঙ্গে আসলে, আমরা সবাই জানি, আমাদের কোচ কতটুকু স্বায়ত্বশাসন পছন্দ করেন, বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে কত বেশি স্বাধীনতা দেয়। খেলোয়াড় নির্বাচন (শুভাগত হোমের মত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাদামাটা পারফর্মার), একাদশ নির্বাচন (মুমিনুল, নাসির, আল আমিন কে সুযোগ না দেয়া), পছন্দের খেলোয়াড়কে নিয়ে পরীক্ষণ ও যখন খুশি ছুঁড়ে ফেলা (জুবায়ের লিখন ও তানবীর হায়দার), ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে প্রয়োজন অতিরিক্ত পরীক্ষণ ও খেলোয়াড়ের নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার পজিশন পরিবর্তন (সাব্বির ও ইমরুল কায়েস) সহ বিতর্কসমূহ বারবার কোচের ক্ষমতার পরিসরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কিন্তু অধিনায়ককে একাদশ নির্বাচনে কম গুরুত্ব দেয়া, এমনকি সে আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে কোথায় ফিল্ডিং করবে, সেই স্বাধীনতাটুকু না দেয়াটা কতটুকু যৌক্তিক, সে প্রশ্নের উত্তর শুধুমাত্র তাঁকে ক্ষমতা দেয়া ক্রিকেট বোর্ডই আমাদের দিতে পারে। মুশফিকের মিডিয়াতে খোলামেলা কথা নিয়ে ক্রিকেট বোর্ড মন্তব্য করলো, অথচ কোচের যাচ্ছেতাই নীতির সমস্যাগুলোর সাথে মাঠের খেলার অবনতির যে মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে, তা জনসাধারণের তো দূর, আমাদের বোর্ডেরও বোধগম্য নয়। কারণ আমরা মুশফিককে দোষ দিয়েই আমাদের দায় সারছি, আমরা কখনই আমাদের বোর্ড ও কোচের স্বেচ্ছাচারীতাকে দলের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বিবেচনা করার চিন্তাভাবনার জায়গা তৈরি করি নি নিজেদের মাঝে। ১৪০-১৫০ কিমি গতির ইন্সুংগিং বল খেলতে নামা আমার দলের খেলোয়াড় অবশ্যই সুস্থভাবে ব্যাটিং করতে পারবে না যদি তার মাথা চিন্তামুক্ত ও ফাঁকা না থাকে। সেখানে দলের অধিনায়কের উপর দল-একাদশ-ব্যাটিং-বোলিং-টস-ফিল্ডিং-মিডিয়া এর চাপ থাকার পর বাড়তি চাপ এর ফলাফল সম্ভবত আমাদের সকলের বোধগম্য নয়।

এবার পরবর্তী প্রসঙ্গে আসি, আমাদের পেসারদের দুরবস্থা। একটা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়ন এর দায়ভার সম্পূর্ণভাবে ক্রিকেট বোর্ডের। আমাদের এন সি এল অথবা ঢাকা লীগে আজন্মই তৈরি করা হচ্ছে স্লো উইকেট, অথবা চতুর্থ পঞ্চম দিনে ফাটল ধরা কিছুটা স্পিন সহায়ক উইকেট। ঘাস সমৃদ্ধ উইকেট বা পেসবান্ধব বাউন্সি উইকেটে আমাদের পেসাররা খেলার সুযোগ পায় না। খেলার জন্য বাড়ানো হয় না ভেন্যু, আলাদা আলাদা রকম পিচ এ খেলার সুযোগ পায় না আমাদের উঠতি বোলার ও ব্যাটসম্যানরা। বেশির ভাগ ম্যাচই শেষ হয় একজন বা দুজন পেসার নিয়ে, দলের বোলিং লাইন আপ গড়া হয় স্পিন নির্ভর। এতে করে আমরা পেসার পাই হাতেগোণা সংখ্যক, আমাদের পেসারদের গড়ে ওঠা হয় না আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উপযুক্ত হয়ে। আর যারা গড়ে ওঠে, তাদেরকে সফলতার লোভে পরিচর্যা না করেই পাঠিয়ে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দানে। ফলশ্রুতিতে নাজমুল হোসাইন, তালহা জুবায়ের এর মত সম্ভাবনাময় পেসাররা হারিয়ে যায়, মুস্তাফিজ এর সংগ্রাম চলে ফিটনেসের সাথে। অথচ, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রসঙ্গেই যদি বলা হয়, এক সময়কার তুলনামূলক দুর্বল পেস বোলিং লাইন আপ এর দেশ ভারত আর তাদের দীলিপ ট্রফি-রঞ্জি ট্রফি-আই পি এল এর কল্যাণে উঠে আসে উপযুক্ততা নিয়ে। তাদের পেসাররা প্রস্তুত হয় কখনো কানপুরের স্পিনবান্ধব পিচে সংগ্রাম করে, কখনো হায়দারাবাদের ফ্ল্যাট উইকেটে লাইন-লেংথের পরীক্ষা দিয়ে, কখনো ধর্মশালার সবুজের গালিচা ঢাকা ময়দানে সুইং যাদু শিখে। ভুবনেশ্বর-শামী-বুমরাহ-উমেশ এর উপর নির্ভরশীলতা তারই উদাহরণ। ১২৫-১৩০ গতিতে সাধারণ সিম বোলিং করা ভুবনেশ্বরও সুযোগ পায় নিজেকে ধারালো করে ১৪০ এর বেশি গতি ও দুইদিকে বল সুইং করানোর যাদু শিখে বছরখানেক পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার। আর তাদের সেই সুযোগ তৈরি করে দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের টেকনিক্যাল ডেচেলপমেন্ট টিম, তাদের বয়সভিত্তিক ও রাজ্যভিত্তিক ক্রিকেট ও বিচিত্র রাজ্যসমূহের বিচিত্র সব আবহাওয়া ও পিচ। যেখানে আমাদের সিলেট-বগুড়ার মত মাঠ পড়ে থাকে অপেক্ষায়, ফতুল্লা খান সাহেবে জমে হাঁটু পানি।

আমাদের বোর্ড কতটুকু স্বাধীনতা দিবে ও চাপহীনভাবে খেলার সুযোগ করে দেবে আমাদের খেলোয়াড়দের, কতটুকু পরিচর্যা করবে ঘরোয়া ক্রিকেটের, সেটা বোর্ডের দায়বদ্ধতা। খেলার সফলতা নির্ভর করে সুস্থ ক্রীড়া কাঠামোর উপর, যার শুধু সম্মুখভাগটুকুই আমরা ১১ জন হিসেবে দেখি। বোর্ড কি তাৎক্ষনিক সফলতাকে বেশি বিবেচনায় নিবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের ক্রিকেটকে দেশ ও বিদেশের মাটিতে সমানভাবে খেলার উপযুক্ত করে তুলবে, সেটাই আলোচনার বিষয়। এক ঝাঁক তরুণ এসে জায়গা নিবে আজকের সাকিব-তামিম-মুশিদের জায়গায়, নাকি তাদের অবসরের পর আমরা পরিণত হব এক মাহেলা-সাংগাহীন শ্রীলংকায়, সেটা নির্ভর করে একটা টেস্ট বা ওয়ানডে না, আমাদের বোর্ডের উপর, আমাদের ব্যবস্থাপনার উপর। আমাদের দৃষ্টিকোণ তাই একটা খেলাকেন্দ্রিক না, আমাদের ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়নকেন্দ্রিক হওয়াটা জরুরী।

ক্রিকেটকে দূরে সরিয়ে রেখে শেষ করি একটা প্রসঙ্গ টেনে। আমাদের বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিকের ‘পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র’ বইয়ের ৬৩৪ নম্বর পৃষ্ঠায় স্টিফেন হকিং এর জায়গায় অভিনেতা এডি রেডমাইনের ছবি ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে । এডি রেডমাইন “দা থিওরি অফ এভ্রিথিং” চলচ্চিত্রে তে স্টিফেন হকিং এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এর দায়ভার অবশ্যই বইটির লেখক তপন-আজিজ-রানা স্যারদের উপর বর্তায়। কিন্তু আমাদের মনে কি কখনো প্রশ্ন উঠেছে, আমাদের পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ও মূল্যায়ন কমিটি, যারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, যাদের দায়িত্বশীলতা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এমন ভুল করার পরও সেই বই বাজারে পৌছালো, সেই দায়ভার তারা কেন নিবেন না ?

Most Popular

To Top