টুকিটাকি

আরাম-আয়েসের শহুরে জীবন ছেড়ে গ্রামের উন্নয়নে রিতু…

রিতু জেসওয়ালঃ গ্রামীণ মানুষের উন্নয়ণে আত্মনিয়োগকারী শহুরে নারী- Neon Aloy

পরোপকারে কত গল্পই না আমরা শুনেছি। এমন অনেক মানুষ আছে যারা নিজের মুখের খাবার অন্যের মুখে তুলে দেয়। নিজের কাপড় দিয়ে দেয়। কিন্তু কখনো শুনেছেন নিজের জীবন, সংসার, পরিবার, সন্তান, ভবিষৎ সব বাদ দিয়ে তিনি দূর গ্রামাঞ্চলে চলে গেছেন সেখানকার মানুষের জীবনকে, তাদের সংসার, তাদের ভবিষ্যৎ কে আরো উন্নত করতে? ভারতের রিতু জেসওয়াল এমন একজনেরই নাম।

রিতু জেসওয়াল ভারতের বিহারে ১৯৭৭ সালের ২৬ শে অগাস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিহারের ভাইশালি মহিলা কলেজ থেকে ইকোনমিক্স বি.এ. পাশ করেন। তার স্বামী আরুন কুমার ইন্ডিয়ান এডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের একজন অফিসার।

রিতু জেসওয়াল শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়েছেন শুধু গ্রামাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে। তিনি ভারতের বিহারের সিতামারাহি জেলার একটি গ্রামের প্রধান হিসেবে কাজ করে আসছেন যা ওই গ্রামের ভাগ্য অনেকটা পরিবর্তন করে দিয়েছে। গ্রামের মানুষরা এখন তাদের গ্রামকে রাম রাজ্যের সাথে তুলনা করছে। একজন অফিসারের স্ত্রী হিসেবে রিতুর যে শান-শওকত থাকার কথা সব ত্যাগ করেন তিনি শ্বশুরবাড়ি সিতামারাহির উন্নয়নের জন্য। তার শক্তিশালী এবং অসাধারণ নেতৃত্ব সেই এলাকায় সূচনা করেছে নতুন অধ্যায়ের। নিজের ২ সন্তানকে দিল্লীতে তার পরিবারের কাছে রেখে গ্রামে চলে আসাটা তার পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম যেদিন তিনি গ্রামে যাচ্ছিলেন ওইদিন তার গাড়ি দুইবার কাদায় আটকে যায় যা তার জন্য শতর্কবার্তা ছিলো যে এই রাস্তা তার জন্য সহজ না। দিল্লী থেকে বিহারের গ্রাম পর্যন্ত যেতে তিনি পরিবার থেকে যে সমর্থন পেয়েছেন তা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন,

“আমার স্বামী এবং আমার মেয়ে আমার এমন সিদ্ধান্তে আমাকে পূর্ণ সমর্থন করে। আমার মেয়ে আমাকে বলে সে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করবে তাও যাতে আমি গিয়ে গ্রামের দরিদ্র বাচ্চাদের পড়ালেখা করাই। তার এই কথা আমাকে আরো উদ্বুদ্ধ করে। তাকে আমি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে গ্রামে চলে আসি”।

২০১৬ সালে ৩২জন প্রতিদন্ধীকে পরাজিত করে তিনি গ্রামের প্রধান হন। সরকারি অনুদানের জন্য অপেক্ষা না করেই তিনি নিজের টাকা দিয়ে পরদিনই এলাকার উন্নয়নের কাজে নেমে পড়েন। তিনি প্রথমে হাত দেন রাস্তা নির্মানের কাজে। গ্রামের লোকজন প্রথমে রাস্তার জন্য জমি ছাড়তে নারাজ ছিল। পরে রিতুর অফুরন্ত চেষ্টা এবং উৎসাহ দেখে তারা নিজ উদ্যোগে এগিয়ে আসে। এখন পুরো গ্রাম জুড়েই আছে ঢালাই করা রাস্তা। গ্রামের মানুষ প্রথম বৈদ্যুতিক বাল্বের আলো দেখে রিতুর হাত ধরেই। গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার শোচনীয় অবস্তার ডকুমেন্টরি বানিয়ে বিভিন্ন এনজিও তে ঘুরে বেড়ান এবং তাদের সাহায্যে গ্রামে স্কুল বানান। তার এই কষ্টের ফলাফল তিনি পান যখন ওই গ্রাম থেকে ১২জন মেয়ে মাধ্যমিক পাশ করে। তার আগে গ্রামের প্রায় ৯৫% ঘরে টয়লেট ছিল না। মাত্র ৩মাসের মধ্যে তিনি প্রতিটি ঘরে টয়লেট বানানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি গ্রামের মহিলাদের সামাজিক উন্নয়নের জন্য শেলাই শিখানোর ব্যবস্থা করেন। তার হাত ধরেই বিভিন্ন এনজিও গ্রামের মহিলাদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে যা তাদের আত্মনির্ভর করতে প্রেরণা যোগাচ্ছে।

গ্রামের প্রতিটি উন্নয়নের রিতু নিজের উপস্থিতিতে তদারকি করতেন। এজন্য তাকে প্রায় মোটরসাইকেল অথবা ট্রাকটরে করে ঘুরতে দেখা যেত। গ্রামের উন্নয়নে তার এত চেষ্টার ফল স্বরূপ তাকে অনেক এওয়ার্ডে ভুষিত করা হয়।

বর্তমানে এই গ্রামের অবস্থা যদি দেখতে চান তবে ঘুরে আসতে পারেন রিতু জেসওয়ালের ওয়েবসাইট থেকে।

এখন আমরা যতই বলি না কেন দেশ উন্নত হচ্ছে, দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, আমরা কি ১০০% সঠিক? অজপাড়া গাঁয়ে কি উন্নয়ন পৌছাচ্ছে? কারো কি নজর আছে গ্রামের অসহায় মানুষদের উপর? আজকালকার নেতারা কেন জানি পাওয়ার পজিশন এইসবের জন্যেই জনপ্রতিনিধি হতে চায়। কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ত্ব করা তো পজিশন নিয়ে বসে থাকা না। এলাকার উন্নয়ন করা, মানুষের সুখ সমৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা করা এবং তার প্রতিফলন ঘটানো। আমাদের নেতারা যেদিন রিতু জেসওয়ালের পজিশনের পিছে না ছুটে উন্নয়নের পিছনে ছুটবে সেদিন সত্যিকার উন্নয়নের জোয়ার আমরা দেখতে পাব।

Most Popular

To Top