নাগরিক কথা

ধনঞ্জয়ের ফাঁসিতে আমরা কি বার্তা পেয়েছিলাম?

ধনঞ্জয়ের ফাঁসিতে আমরা কি বার্তা পেয়েছিলাম?- Neon Aloy

ধনঞ্জয়কে ফাঁসি দেয়া হয় ২০০৪ সালে। এর আগে ধনঞ্জয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরী। ধনঞ্জয় বাঁকুড়া এর প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। ধনঞ্জয় সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করতো। তার উপর হেতাল পারেখেকে হত্যা করার পর পর তার শবদেহের সাথে মিলিত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়। এজন্যই ভারতীয় আদালত এই কেসটিকে রেয়ার অফ দ্যা রেয়ারেস্ট বলে আখ্যায়িত করেছে। ১৯৯০ সালে মামলা হয় এবং ২০০৪ সাল পর্যন্ত কারাভোগের পর তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। যেকোন ভাবেই এটি একটি ঘৃণিত অপরাধ এবং এখানে মৃত্যুদন্ড ছাড়া অন্যকিছুর সুযোগ নেই। কিন্তু কলকাতার একদল অধ্যাপক ও গবেষক মিলে সে সময়ের তদন্তে কিছু অসঙ্গতি খুঁজে পান। তাদের “আদালত-মিডিয়া-সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি” শীর্ষক বই প্রকাশ হওয়ার পর তোলপাড় পড়ে যায়।প্রবাল চৌধুরী, দেবাশিস সেনগুপ্ত, পরমেশ গোস্বামী কর্তৃক লিখিতে এই বইয়ে তারা দাবি করেন হেতাল পারেখ হত্যাকান্ড একটি অনার কিলিং। অনার কিলিং ভারতে বহুল প্রচলিত একটি বিষয়। অনার কিলিং বলতে নিজের পরিবারের সম্মান বজায় রাখতে নিজের পরিবারের কাউকে হত্যা করা বোঝানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তানের কু-কীর্তি ঢাকতেই এমনটা করা হয়ে থাকে। লেখকত্রয়ের মতে হেতাল পারেখ হত্যাকান্ডটিও এমন একটি হত্যাকান্ড। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ধনঞ্জয়কে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো অথচ ঘটনাস্থলে কোন প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না। মোট তিনটি পয়েন্টের উপর ভিত্তি করে ধনঞ্জয়কে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। ঘটনার সময় তাকে ফ্ল্যাটের আশেপাশে দেখতে পাওয়া। খুনের পর সে কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিলো এবং এই দুই বিষয়ে ধনঞ্জয় তার আইনজীবীর পরামর্শে মিথ্যা বলেন।

ধনঞ্জয়ের ফাঁসিতে আমরা কি বার্তা পেয়েছিলাম?

ধনঞ্জয়ের চক্রবর্তী; যাকে ২০০৪ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়

অন্যদিকে হেতাল পারেখ খুন হয়েছিলো দুপুরে ফ্ল্যাটের মধ্যে, সে হিসাবে তার মাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা যায়। আর ধনঞ্জয়কে কেউ ফ্ল্যাটের মধ্যে দেখেনি। সবচেয়ে বড় কথা ফরেনসিক রিপোর্টে অনুযায়ী পারেখের মৃত্যুর আগে যৌন মিলনের ঘটনায় জোর-জবরদস্তি ছিল না। তাই তাকে ধর্ষণের জন্য হত্যা করা হয়েছে এখানেই এই তত্ত্বের সমাপ্তি। বরং তার এই ঘটনা বাইরে জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় এবং পরিবারের সম্মান বজায় রাখতে হত্যা করা হয় অর্থাৎ অনার কিলিং-এর বিষয়টা আবার সামনে চলে আসে। মৃতদেহ দেখেই পারেখের মা তাকে হাসপাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য লিফটে ওঠেন কিন্তু তিনি একতলায় পৌছে মৃতদেহ নিয়ে নানারকম বিলাপ করে একঘন্টা কাটিয়ে দেন। যেটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। পারেখের পরিবার থেকে পুলিশকে জানাতে প্রায় তিনঘন্টা সময় নেয়। যেটাও প্রচুর প্রশ্নের জন্ম দেয়। তদন্তকে ভিন্ন চাইলেই ভিন্ন পথে প্রবাধিত করা যেত কিন্তু তা করা হয়নি। তার মূলে ছিল মিডিয়া। শুরু থেকেই মিডিয়া ধনঞ্জয়ের পাশে ছিল না। স্বাভাবিক ভাবে থাকার কথাও না। কিন্তু, কোন মিডিয়াকে কোন প্রকার অনুসন্ধান রিপোর্ট করতে। আর মিডিয়া শুধু একপেশে ভাবে একপক্ষের বক্তব্যই মানুষের কাছে তুলে ধরেছে , তাই অন্য কোন তথ্য আসার উপায় ছিল না। ফলে গণমানুষের মনে তীব্র রোষের জন্ম নেয়। পাশাপাশি ভোট ব্যাংকের কথাও বলা যায়। এরকম একটা ঘটনায় ফাঁসি দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা জনমন সন্তুষ্ট করে ফায়দা লুটবে এমনটা ভাবাও অন্যায় না।

এখানে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বোঝাই যাচ্ছে তখন যদি এত অসঙ্গতির কিছুটাও তুলে ধরা হতো মিডিয়ায় তবে ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হতো না। তখন মিডিয়া শুধুমাত্র মিথ্যে হাইপ তুলে কাটতি বাড়িয়েছে। এখন চলুন আমাদের দেশের একটা ঘটনার কথা মনে করি ,যেখানে আমরা মিথ্যে হাইপ তুলে নিজেদের মুখে কালি দিয়েছিলাম। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে ফেসবুকে উত্তম বড়ুয়া নামের একজনের ছবিকে কেন্দ্র করে রামু, উখিয়া, টেকনাফে সাম্প্রদায়িক তান্ডব চালালো তথাকথিত ধর্ম রক্ষাকারীদের দল। ধনঞ্জয়ের ঘটনা আর এই রামুর ঘটনা কিন্তু একই সূত্রে বাধা। দুই ক্ষেত্রেই চরম অপব্যবহার হয়েছের মিডিয়ার। পার্থক্য বলতে সেই সময় মিডিয়া ছিল কিছু সুশীলের হাতে, যারা সত্য ঘটনা চেপে রেখেছিল আর রামুর ক্ষেত্রে কিছু মগজহীন মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে ব্লু হোয়েল নিয়ে এমন একটা প্রচার চালাচ্ছে আমাদের মিডিয়া যার কোন ভিত্তি নেই। অযাচিত হাইপ তুলে জনগণের মনে আরো ভয়ের বীজ বুনে দেয়া হচ্ছে।

মিডিয়া ব্যবহারে আমাদের অতি সতর্কতা অবলম্বন করা সহজাত হওয়া উচিত। কারণ অনেক ঘটনার যথার্ততা যাচাই না করেই আমরা তার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারে লেগে পড়ি যা মোটেও কাজের কথা না। তবে আমরা কিন্তু পজিটিভ ভাবেও মিডিয়াকে ইউজ করেছি। রাজন হত্যাকান্ডের আসামী ধরা পড়ায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব কিন্তু এই মিডিয়ারই। কারণ আমাদের দুর্বল শাসন ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কামরুল কিন্তু পগারপার হয়েই গিয়েছিলো। আমরা মিডিয়াতে যথাযথ ভাবে সংঘবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ করতে পেরেছিলাম বলেই কিন্তু এত দ্রুততার মধ্যে বিচার পেয়েছিলাম।

Most Popular

To Top