ফ্লাডলাইট

জন ট্রাইকোসঃ মিশরে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!

জন ট্রাইকোসঃ মিশরে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!

ক্রিকেট ইতিহাসে নন-টেস্ট প্লেয়িং দেশে জন্মেছেন কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন এরকম ৪৪ জন ক্রিকেটার রয়েছেন। তাদের ভেতর সবারই অরিজিন বা শেকড় জন্ম নেয়া দেশে এমন নয়, যেমন পাকিস্তানের শান মাসুদের জন্ম কুয়েতে কারন তার পিতামাতা সেখানে কর্মসূত্রে বসবাস করতেন। আবার মোয়সেস হেনরিক্সসের বাবা পর্তুগীজ হলেও মা অস্ট্রেলিয়ান। ঘটনাচক্রে স্টিভ ও’কিফ জন্মেছিলেন মালেয়শিয়াতে। কলোনিয়ান যুগে বিভিন্ন ব্রিটিশ কলোনীতে জন্ম নিয়েছেন অনেক ইংলিশ টেস্ট ক্রিকেটার। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের প্লেয়ারদের ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলাও নতুন নয়।

অ্যাথানাসিওস জন ট্রাইকোস সেই দিক থেকে ব্যতিক্রম। মিশরের জাগাজিগ নামক স্থানে ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন ট্রাইকোস। তার বাবা এবং নানী ছিলেন গ্রিক বংশোদ্ভূত, মা এবং নানা মিশরীয়। অর্থাৎ, টেস্ট ক্রিকেট যেমন তেমন ক্রিকেট খেলুড়ে কোন দেশের সাথেই তার কোন যোগসূত্র ছিলোনা জন্মসূত্রে।

খুব ছোটবেলাতেই ট্রাইকোসের পরিবার রোডেশিয়াতে (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) পাড়ি জমায়। ট্রাইকোসের বেড়ে ওঠা সেখানেই। রোডেশিয়া তখন ব্রিটিশ কলোনী। আর ক্রিকেট খেলে সাউথ আফ্রিকার একটি স্টেট হিসেবে। সাউথ আফ্রিকার নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় সাবেক সাউথ আফ্রিকান লিজেন্ড ট্রেভর গোদার্ডকে পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় দলের কোচ হিসেবে। ১৯৬৭ সালে ট্রাইকোস “সাউথ আফ্রিকান ইউনিভার্সিটিজ” দলের হয়ে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন “ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়” দলের বিপক্ষে। অভিষেক ম্যাচেই ৫৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নজর কাড়েন।

জন ট্রাইকোসঃ মিশরে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!- নিয়ন আলোয়

১৯৬৮ সালে রোডেশিয়ার হয়ে সাউথ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই। আর তখনই তিনি সাউথ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক আলি বুখারের নজরে আসেন। আলি বুখারের অনুরোধে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে সাউথ আফ্রিকা দলে সুযোগ পান জন ট্রাইকোস যিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। ১৯৭০ সালের সেই সাউথ আফ্রিকা দল ছিলো সর্বকালের সেরা দলের একটি, ব্যারি রিচার্ডস, গ্রায়েম পলক, এডি বারলো, আলি বুখার, পিটার পলক, লি আরভিন, মাইক প্রক্টর ছিলেন সেই দলের সদস্য। অস্ট্রেলিয়াকে বিধ্বংস করা (৪-০) সেই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে অভিষেক হয় ট্রাইকোসের। অভিষেক ম্যাচে তিনি তিনটি উইকেট এবং চারটি ক্যাচ নেন। সিরিজের শেষ দুই টেস্ট খেলার পরই ঘটে যায় ইতিহাসের কালো একটি ঘটনা। তিন টেস্টের ঐ সিরিজের পর বর্ণবৈষম্যবাদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার উপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে নিষিদ্ধতা আসায় তিনি আর খেলতে পারেননি।

এরপর রোডেশিয়ার হয়ে খেলতে থাকেন তিনি। কিন্তু ব্রিটিশ কলোনী রোডেশিয়া ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজেদের স্বাধীন ঘোষনা করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিষিদ্ধ করা হয় তাদের। নানান সমঝোতার পর ১৯৮০ সালে রোডেশিয়া নতুন নাম “জিম্বাবুয়ে” নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরে আসে। জন ট্রাইকোস জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলা শুরু করেন। ১৯৮২ সালের আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয় জিম্বাবুয়ে, দলের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট নেন ট্রাইকোস। এই জয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় জিম্বাবুয়ে। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় জিম্বাবুয়ে! জিম্বাবুয়ের দেয়া ২৪০ রানের লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়া থেমে যায় ২২৬/৭ রানে। ট্রাইকোস ১২ ওভারে মাত্র ২৭ রান দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রানের চাকায় লাগাম টেনে ধরেন।

জন ট্রাইকোসঃ মিশরে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!- নিয়ন আলোয়

১৯৮৭ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক ছিলেন জন ট্রাইকোস। এছাড়া তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৯০ আইসিসি ট্রফিতে জিম্বাবুয়ের পক্ষে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আপসেট ঘটায় জিম্বাবুয়ে। দুই দেশের শীতল রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই জয় ছিলো অনেক বড় ঘটনা। জিম্বাবুয়ের দেয়া ১৩৫ রানের টার্গেট নিয়ে ইংল্যান্ড অবিশ্বাস্যভাবে অল আউট হয় ১২৫ রানে। ট্রাইকোস অসাধারন কিপটে বোলিং করেন, ১০-৪-১৬-০!

১৯৯২ সালে জিম্বাবুয়ে টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত পরিবারে যোগ দেয়। ১৮ অক্টোবর ১৯৯২ সালে হারারে স্পোর্টস ক্লাবে ভারতের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের অভিষেক টেস্টে আবার টেস্ট ক্রিকেট খেলতে নামেন জন ট্রাইকোস। এর ভেতর ক্যালেন্ডারের পাতায় পার হয়ে গিয়েছে ২২ বছর ২২২ দিন!

সাউথ আফ্রিকার হয়ে শেষ টেস্ট খেলেছিলেন ১৯৭০ সালে, জিম্বাবুয়ের হয়ে পরের টেস্ট ১৯৯২ সালে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুই টেস্টের ভেতর গ্যাপের হিসাবে এটাই সর্বোচ্চ গ্যাপের রেকর্ড। জিম্বাবুয়ের অভিষেক টেস্টের সময় ট্রাইকোসের বয়স ছিলো ৪৫ বছর ৩০৪ দিন! “বুড়ো” টেস্ট ক্রিকেটারদের তালিকায় দ্বাদশ ব্যক্তি তিনি। বয়স যেন কোন বাঁধা নয়, ওই বয়সেও তিনি ছিলেন জিম্বাবুয়ের সেরা গালি ফিল্ডার, দূর্দান্ত সব রিফ্লেক্স ক্যাচ নিতেন গালি এবং স্লিপে। যে কারনে ট্রাইকোসকে ক্রিকেটের “এভারগ্রীণ” অফ স্পিনার বলা হয়। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে তার রয়েছে ১০৯ টি ক্যাচ!

জন ট্রাইকোসঃ মিশরে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার!- নিয়ন আলোয়

ইতিহাসে সেবারই প্রথম কোন দেশের অভিষেক টেস্টের একাদশে একজন টেস্ট খেলা প্লেয়ার আর দশজন অভিষিক্ত ছিলেন।

বিখ্যাত ব্যক্তির উইকেটের তালিকায় বিখ্যাত প্লেয়ার না থাকলে কি হয়! জিম্বাবুয়ের হয়ে অভিষেকে তার প্রথম উইকেট তাই ছিলো লিটল মাস্টার শচীন রমেশ টেন্ডুলকারের! ট্রাইকোসের বলে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে টেন্ডুলকার আউট হন শূন্য রানে। প্রথম ইনিংসে তার বোলিং ফিগার এরকমঃ ৫০-১৬-৮৬-৫! প্রায় ৪৬ বছরে ইনিংসে পঞ্চাশ ওভার বল করা কম কথা নয়! তার শিকারের তালিকায় ছিলেন টেন্ডুলকার, কপিল দেব, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, ভি রাজু এবং মনোজ প্রভাকর। জিম্বাবুয়ের ৪৫৬ রানের জবাবে ভারত একসময় ১০১/৫! সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারের সেঞ্চুরী ফলো অনের আশংকা থেকে বাঁচায় ভারতকে। ভারত অল আউট হয় ৩০৭ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে জিম্বাবুয়ে ১৪৬/৪ করার পর ম্যাচ ড্র হয়। ইতিহাসের প্রথম টেস্ট বাদ দিলে জিম্বাবুয়ে একমাত্র দেশ যারা নিজেদের অভিষেক টেস্টে পরাজয় এড়াতে সক্ষম হয়। জন ট্রাইকোস ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হন।

আধুনিক যুগে দুই দেশের হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ টেস্ট ক্রিকেট খেলা মাত্র দুইজন প্লেয়ারের একজন হলেন জন ট্রাইকোস এবং অপরজন হলেন কেপলার ভেসেলস্।

ট্রাইকোস জিম্বাবুয়ের হয়ে পরে আরো তিনটি টেস্ট খেলেন এবং ৪৬ বছর বয়সে ফর্মের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেই পাকিস্তান সফরের দলে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পারিবারিক ব্যবসায় সময় দেয়ার কারনে নিজেই নাম প্রত্যাহার করেন এবং ক্রিকেট থেকে অবসরে যান।

জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে ১৯৯৭ সালে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান ট্রাইকোস। অবসরে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ক্লাবে স্পিন পরামর্শক হিসেবে বর্তমানে কাজ করেছেন তিনি।

Most Popular

To Top