টুকিটাকি

ভালোবাসার মি.বিন

ভালোবাসার মি.বিন

রোয়ান সেবাস্টিয়ান এটকিনসনকে চিনেন তো?

অক্সফোর্ডের কুইন্স কলেজ থেকে এমএসসি করেছেন, ছিলেন প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রেসিডেন্ট টনি ব্লেয়ারের ক্লাসমেটও। আরেহ, মিস্টার বিনের কথা বলছি আমি, এবার চিনেছেন? আসলে মিস্টার বিনকে চেনে না এমন মানুষ পৃথিবীতে মনে হয় খুবই কম আছে। কোনোরকম কথা বলা ছাড়াই শুধুমাত্র ফিজিক্যাল কমেডির মাধ্যমে তিনি নিজেকে এবং কমেডিকে নিয়ে গিয়েছেন অন্য উচ্চতায়। অথচ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স করা এই মানুষটির হওয়ার কথা ছিল কোনো নামকরা কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু আজ তিনি একজন বিখ্যাত কমেডিয়ান।

৬ জানুয়ারী ১৯৫৫ সালে ইংল্যান্ডের ডারহামে জন্ম নেনে রোয়ান এটকিনসন। বাবা একটি কোম্পানির ডিরেক্টর ছিলেন আর মা গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। এংগ্লিকান হিসেবে বড় হওয়া রোয়ান হাইস্কুল পাস করেন সেন্ট বিস হাইস্কুল থেকে। পরবর্তীতে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিগ্রী নেনে নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি থেকে। রোয়ানের বাবা ১৯৩৫ সালে অক্সফোর্ডের কুইনস কলেজ থেকে পাস করেন, তাই রোয়ান মাস্টার্সের জন্য সেখানেই ভর্তি হন।

 

ক্যারিয়ারের শুরু

রোয়ান প্রথম নজর কাড়েন ১৯৭৬ সালের এডিনবার্গ ফেস্টিভ্যালে অক্সফোরডের কমেডি ক্লাব অক্সফোর্ড রেভ্যুর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সেই উৎসবে অক্সফোর্ড ড্রামাটিক স্কুল এবং এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার ক্লাবের হয়ে রোয়ান পারফর্ম করেন। পরে অনুষ্ঠানে রোয়ানের সাথে পরিচয় হয় লেখক রিচারড কার্টিস এবং কম্পোসার হাওয়ারড গুডওল এর সাথে, এদেরকে নিয়েই তার ক্যারিয়ার শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে বিবিসি রেডিওতে ‘দি এটকিনসন পিপল’ নামে একটি সিরিজ প্রোগ্রাম আরম্ভ হয়।কোনো ফিকশনাল বিখ্যাত লোকের সাথে নানা স্যাটারিকাল কথোপকথন হত প্রোগ্রামে, রোয়ান এটকিনসন সেই ফিকশনাল বিখ্যাত লোকদের চরিত্র অভিনয় করতেন। গ্রিফ জোনসের পরিচালিত এই শো’তে রিচারড কার্টিস এবং রোয়ান দুজনেই একত্রে সংলাপ লিখতেন।

ইউনিভার্সিটি শেষ করেন রোয়ান আবার বিবিসির মাধ্যমে টিভিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। নট দি নাইন ও ক্লক নামে বিবিসির প্রোগ্রামে পামেলা স্টিফেনসন, মেল স্মিথ এবং গ্রিফ জোনসের সাথে রোয়ান অভিনয় করেন। শোটি প্রচুর জনপ্রিয় হয়েছিল দর্শকদের মাঝে।

ব্ল্যাকএডার সিরিজ

নট নাইন ও ক্লকের জনপ্রিয়তা রোয়ান এটকিনসনকে এনে দেয় দারুণ সাফল্য এবং নতুন নতুন অভিনয়ের প্রস্তাব। তিনি শুরু করেন ‘ব্ল্যাক এডার’ নামের সিচুয়েশনাল কমেডী সিরিজ। অনেকগুলো পর্বে বিভক্ত এই সিরিজটি রোয়ানের সাফল্যের মুকুটে যোগ করে আরেকটি পালক। ব্ল্যাক এডার এর ট্রিলজির সাথে সাথে সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে ব্ল্যাক এডার সিরিজ সম্প্রচারিত হত, যেমন ব্ল্যাক এডার ক্রিসমাস ক্যারল কিংবা ব্ল্যাক এডার ক্যাভেলাইর ইয়ার। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে নিয়ে বানানো ব্ল্যাকএডার গোস ফোরথ সিরিজটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়, ব্ল্যাক এডারের সেখানে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানের দৃশ্য নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।

মিস্টার বিন

১৯৯০ সালের নববর্ষের দিনে প্রথম মিস্টার বিনের সিরিজ থেইমস চ্যানেলে আধা ঘন্টার জন্য সম্প্রচারিত হয়। সিরিজটি প্রথম শোতেই জনপ্রিয়তা পায়, এতে পর পর অনেকগুলো সিরিজ বানানো হয়। রোয়ানের নট নাইন ও ক্লক শো এর সহকর্মী মেল স্মিথ ১৯৯৭ সালে ‘বিন’ নামের সিনেমা বানান। এরপর ২০০৭ সালে আসে দ্বিতীয় সিনেমা “মিস্টার বিন’স হলিডে”। ২০১২ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে মিস্টার বিন হিসেবে চ্যারিওটস অফ ফায়ার চলাকালে রোয়ান হাজির হন। এবং সেখানে স্বপ্নে অলিম্পিকের দৌড়বিদদের সাথে তিনিও প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন এমন একটি দৃশ্য মঞ্চায়িত করেন।

অন্যধাচের কমেডি

রোয়ানের তোতলামির সমস্যা ছিল, তাই অভিনয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। পরে নিজের এই সমস্যাকে ঢাকার জন্য রোয়ান ওভার-আরটিকুলেশনের আশ্রয় নেন। ইংরেজি “বি” শব্দ সহ বিভিন্ন যুক্তাক্ষর উচ্চারণ করতে রোয়ান আটকে যেতেন, তাই অদ্ভুত উচ্চারন এবং অঙ্গভঙ্গি দিয়ে এই সমস্যাকে পুষিয়ে নিতেন। তার এই বিচিত্র অঙ্গভঙ্গিই দর্শকের মন জয় করে নেয়। যেখানে সমসাময়িক অন্য কমেডিয়ানরা ভারী ভারী ডায়লগ এবং কাল্পনিক মনোলগ দিয়ে নিজেদের শোগুলো করতেন,  সেখানে রোয়ানের কমেডিগুলো হত শুধু মুখের এবং শরীরের এক্সপ্রেশনকে দিয়েই। এবং এ কারণে একই ধাঁচের বিখ্যাত কমেডিয়ান বব কিয়েটন এর সাথে রোয়ানকে সমান পাল্লায় তুলনা করা হয়।

সিনেমায় মিস্টার বিন

১৯৮৩ সালে জেমস বন্ডের ছবি “নেভার সে নেভার এগেইন” এ কৌতুকপূর্ণ নিগেল স্মল ফায়চেট নামের পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রোয়ান এটকিনসনের প্রথম সিনেমায় অভিষেক হয়। সিরিয়াস জেমস বন্ডকে ব্যাঙ্গ করে ২০০৩ সালে বানানো হয় “জনি ইংলিশ” নামক সিনেমা এবং এতে নায়ক হিসেবে থাকেন রোয়ান এটকিনসন। সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার পরে ২০১১তে সিকুয়েল আসে জনি ইংলিশের এবং আগামী বছর আসবে জনি ইংলিশ এর তৃতীয় পর্ব। এছাড়া ‘টল গাই’ এবং ‘হট শট’ সহ আরো কয়েকটি সিনেমাতে অভিনয় করেন রোয়ান এটকিনসন। এসবের পাশাপাশি থিয়েটারেও তিনি মাঝেমাঝে অভিনয় করেন, চ্যারিটি বা অন্য কাজে। ‘লায়ন কিং’ সিনেমায় জাজু নামের হরনবিলের চরিত্রে কণ্ঠদানে কিংবা ‘স্কুবিডুবি’ সিনেমায় অতিথি অভিনেতা হিসেবেও রোয়ানকে দেখা যায়।

আর নয় মিস্টার বিন

১৯৯০ সাল থেকে শুরু করা মিস্টার বিন সিরিজটিকে ২০১২ সালে এসে বিদায় জানান রোয়ান এটকিনসন। ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে রোয়ান নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অংশ হিসেবে মিস্টার বিনের চরিত্রটির কথা উল্লেখ করেন এবং বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে মিস্টার বিনের ফিজিক্যাল কমেডি করার মত এনার্জি আর নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে ২০১৪ সালে স্নিকারস কোম্পানির এক বিজ্ঞাপনে এবং একটি চাইনিজ ফিল্মে রোয়ানকে মিস্টার বিন চরিত্রে কিছুক্ষণের জন্য দেখা যায়। সম্প্রতি মিস্টার বিনকে নিয়ে এনিমেটেড কার্টুন শো চালু হয়েছে টিভিতে।

পারিবারিক জীবন

১৯৮৮ সালে ব্ল্যাক এডার সিরিজটি করার সময় রোয়ান এটকিনসনের সাথে পরিচয় হয় সেই সিরিজের বিবিসি মেকাপম্যান সুনেত্রা শাস্ত্রীর সঙ্গে। দুই বছর রোমান্স করে ১৯৯০ সালে তারা ঘর বাঁধেন, বেন এবং লিলি নামে দুটি সন্তানও রয়েছে তাদের।তবে ২০১৪ সালে সুনেত্রার সাথে রোয়ানের ডিভোর্স হয়ে যায় এবং এরপর থেকে তিনি লুইস ফোরডের সাথে সম্পর্কে আছেন।

গাড়িপ্রীতি

পর্দায় কমেডি চরিত্রে অভিনয় করলেও অভিনেতা রোয়ান কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যরকম। এই কমেডি স্টারের গাড়ির প্রতি ভালোবাসার কথা বিখ্যাত। লরির চালানো তার এতই পছন্দের ছিল যে, এর জন্য তিনি ১৯৮১ সালে লরি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন এবং মজার বিষয় হল ড্রাইভিংএ তার দক্ষতার জন্য ক্লাস ওয়ান লাইসেন্স দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে নিজের লেখা “দি ড্রাইভেন ম্যান” নামের এক সিরিজে রোয়ানকে গাড়ির প্রতি “অবসেসড” এক চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়, যে কিনা লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ট্যাক্সি ড্রাইভার, গাড়ির সেলসম্যান আর ট্রাফিক পুলিশদের সাথে সারাদিন গাড়ি নিয়ে কথা বলে বেড়ায়।

“জনি ইংলিশ” সিনেমায় যে এস্টন মারটিন গাড়িটি তিনি ব্যাবহার করেন তা ছিল তার নিজের গাড়ি। এই গাড়িটি ছাড়াও রোয়ানের অডি এ-এইট, ম্যাকলারেন এফওয়ান এবং স্কোডা সুপারব এবং হোন্ডা সিভিক মডেলের কয়েকটি গাড়ি আছে। এসব গাড়ি দিয়ে রোয়ান নিয়মিত বিভিন্ন রেসে অংশ নেন। রোয়ান তার দুষ্প্রাপ্য ম্যাকলারন এফওয়ান মডেলের গাড়ি নিয়ে দুইবার এক্সিডেন্টের স্বীকার হন এবং এর জন্য তিনি অনেক বড় অংকের ক্ষতিপূরণ পান বীমাকোম্পানির কাছ থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরে কোম্পানী যখন গাড়িটি বিক্রি করে দেয় তখন নিলাম থেকে রোয়ানের এক ভক্ত অনেকদাম দিয়ে গাড়িটি কিনে নেন।

গাড়ির প্রতি এই ভালোবাসার জন্যই, ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মিস্টার বিনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গাড়িতে ভ্রমণে বের হন রোয়ান। ২০০১ সালের মার্চে রোয়ান তার পরিবার নিয়ে কেনিয়াতে হলিডে ট্রিপ করতে যান নিজের ব্যাক্তিগত বিমানে করে। কিন্তু পথিমধ্যে বিমানের পাইলট অজ্ঞান হয়ে যান, তখন নিজে বিমানটাকে ম্যানেজ করেন পাইলটের জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত এবং বিমানটিকে নাইরোবির উইলসন এয়ারপোর্টে অবতরণ করাতে সক্ষম হন।

 

সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান

নানা বিতর্কিত আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে রোয়ান সবসময় কথা বলেছেন। ২০০৫ সালে যখন শিল্পের নানা বিষয়ে সেন্সরশিপের জন্য ধর্মীয় দলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে বিল প্রণয়ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন রোয়ান এটকিনসন অন্য অভিনেতাদের সাথে এই বিলের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ২০০৯ সালের সমকামী বিবাহ বন্ধের বিল এবং ২০১২ সালের বাকস্বাধীনতা বন্ধের বিলের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। ক্রোনেনবারগ ফুজিফিল্মের ক্যাম্পেইনে তিনি যোগ দেন এবং রক্তদান করেন।

কাজের সম্মাননা

রোয়ান এটকিনসন রানী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে ‘কমান্ডার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার’ পদকে ভূষিত হন, ২০১৩ সালে ড্রামা এবং চ্যারিটিতে অবদানের জন্য। দি অবসারভার নিউজপেপার তাকে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্ডাসট্রির ৫০ জন ফানি অভিনেতাদের একজন বলে নাম ঘোষণা করে।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি মনে হয় তিনি পেয়েছেন দর্শকদের কাছ থেকে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিস্টার বিনের প্রতি ছেলে বুড়ো সবার ভালোবাসাই তার উদাহরণ।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top