ফ্লাডলাইট

বিদেশের মাটিতে আরেকটি সিরিজ এবং বাংলাদেশের হতাশার পুনরাবৃত্তি

সাউথ আফ্রিকা সিরিজের শুরু থেকেই একটা জিনিস মাথায় আসছে না, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে আমরা কি লক্ষ্য নিয়ে যাই আসলে?
বিস্তারিত বলি, বাংলাদেশ ঘরের মাটিতে এখন বড় দল, এটা যেকোন দল মেনে নিবে। কিন্তু আমরা যখন বিদেশে যাই তখন আমাদের টার্গেট থাকে ভালো করার। এই ভালো দুই রকম হতে পারে, একটা জয়ের জন্য খেলা অন্যটা নিরাপদে থেকে সম্মানজনক হার।
টেস্ট সিরিজে আগে বল করার কারন এটাই, ম্যাচগুলাকে লম্বা করা। সাউথ আফ্রিকার কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়া আর শ্রীলংকা লাস্ট দুই সিরিজে ০-৫ ব্যবধানে হেরেছিলো। অবশ্যই বাংলাদেশ ০-৩ হলে সেটা অষ্টম আশ্চর্য হবেনা। কিন্তু কিছুটা নিরাপদ ক্রিকেট খেলে হয়তো পরাজয়ের ব্যবধান কমানো যায় বা কিছু রান করে বাংলাদেশ বলতেই পারে পর পর দুই ম্যাচে ২৭৮ আর প্রায় আড়াইশো করা নিশ্চয়ই বাজে ব্যাটিং না যেখানে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা দুইশ রানের নীচেও অল আউট হয়েছে।
এভাবে ভাবার কারন আগের সিরিজগুলার সাথে তুলনামূলক বিচারে এগিয়ে রাখা এই সফরকে। কিন্তু এভাবে কিছু অর্জন করা যায়না আসলে। সাড়ে তিনশো রানের উপর তাড়া করে খেলা যেকোন দলের জন্যেই কঠিন আর বাংলাদেশের জন্য আরো বেশি। কিন্তু তার মানে কি হারার আগেই হার মেনে নেয়া? গতকাল ওভার প্রতি আটের নীচে রান রেট দরকার ছিলো, দুই উইকেট পড়ার পরেও অন্তত ছয় বা সাত করে নেয়া যেত কারন উইকেট খুবই ভালো ছিলো। মুশফিক-ইমরুলের জুটির খেলা দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো বাংলাদেশের ওই রান তাড়া করার কোন ইচ্ছাই নেই। ডট বল ডট বল এবং ডট বল। এভাবে খেলে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ কতদূর যেত? তিনশো? সেটাও তো ওই পরাজয়ই।
এখানেই ধাঁধায় পড়ে যাই। বাংলাদেশ কি হারার জন্যেই নামে? বাংলাদেশের লক্ষ্য মনেহয় “এখানে সম্মানজনক পরাজয়, তারপর ওরা আমাদের দেশে আসুক তখন দেখায় দিবো”। আরেকটা বিষয় এতো লম্বা সময় পর পর এসব দেশে সফর হয় যে কালেভাদ্রে পাওয়া এই একটা সিরিজ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করে কি লাভ? আমি হলফ করে বলে দিলাম দেশে ফিরে তারা বলবে আগের দুই সফরের চেয়ে এবার ব্যাটিং ভালো হয়েছে। হয়তো ম্যানেজমেন্ট চায় অতীতের তুলনায় ভালো করতে, এভাবে নিরাপদ রাস্তায় কিছু রান করে নিজেদের দূর্বলতা আড়াল করতে। এটাই হয়তো তাদের ধারাবাহিকতা, প্রতি ম্যাচে আড়াইশোর উপর রান করা। আর জয়ের চিন্তা হয়তো পরবর্তী সফরে। সেই ২০২৩ সালে।
পুরা সিরিজ জুড়ে ব্যাটসম্যানদের ভেতর কিছু রান করে দলে টিকে থাকার প্রবনতা দেখছি, রান সেটা যেভাবেই আসুক। টিমগেম বলে মনেহয় এই সিরিজকে। অথচ খেলাটা অন্যভাবেও খেলা যায়, শুরু থেকে রান তাড়া করার মানসিকতা নিয়ে। এজন্য প্রচুর চার ছয় মারতে হয় সেটানা, ওভারে তিন/চারটা সিঙ্গেল নিলেই হয়, সাথে বাজে বল আসবেই মারার জন্য। আমরা কি করি? একটা ছয় মেরে চারটা ডট বল দেই।
আমি ইমরুলকে “প্রুভেন ফেইলর” বলি, কারন প্রায় দশ বছরে ইমরুল কখনো ইমপ্যাক্ট ইনিংস, ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলতে পারেনি। সুযোগ আসেনা সেটা না, কিন্তু সে পারেনা। গতকাল ম্যাচ হারলেও ইমরুলের সুযোগ ছিলো প্রশংসা কুড়ানোর। একটা বড় ভালো ইনিংস খেলে ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত জীবিত রাখার। কিন্তু ইমরুলকে দেখে মনে হয়েছে রান করে পিঠ বাঁচানোই তার উদ্দেশ্য। ফিফটির পর যেন আরো খোলসের ভেতরে ঢুকে গেলেন। এভাবে খেললে বড় ইনিংস খেলা লাগে, শেষ পর্যন্ত থাকা লাগে। ইমরুল যেভাবে গতকাল আউট হলেন সেটা ইমরান তাহির নিজেও কল্পনা করেনি। আরো একবার লাইফের সেরা ইনিংস খেলার সুযোগ পেয়েও হারালেন ইমরুল। রান যে কতটা কুৎসিত উপায়ে করা যায় সেটা ইমরুলকে না দেখলে আমি বুঝতাম না। পরিসংখ্যান বলবে লাস্ট ১৩ ম্যাচে কায়েসের গড় প্রায় ৪৬। এবং সে খেলেও যাবে এইকারনে। বেলাশেষে রানটাই নাকি আসল। কিভাবে আসলো সেটা না । অথচ দশ বছর খেলেও ইমরুল “স্টার” হতে পারলেন না।

ইমরুল আউট হওয়ার পর সাউথ আফ্রিকার উল্লাস

ইংল্যান্ডের সাথে আশরাফুলের ৫২ বলে ৯৪ রানের ইনিংসের কথা মনে পড়ে, সেদিনও ইংল্যান্ডের পাহাড়সমান রানের চাপায় পড়া বাংলাদেশ অন্তত চোখ রাঙাচ্ছিলো আশরাফুলের ব্যাটে। ওই ম্যাচটা আমাদের ভুলে যাবার কথা ছিলো, অথচ আমরা মনে রেখেছি শুধু আশরাফুলের ইনিংসের জন্য। গতকাল কেউ একজন একরকম একটা ইনিংস খেলতো। সাউথ আফ্রিকাকে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতো। এভাবে পরিষ্কার হার মেনে নিয়ে খেলে মিডিয়া, প্রতিপক্ষ, সমর্থক, দর্শক কারো সম্মান আদায় করা যায়না। ক্রিকেটে এখন সম্মানজনক পরাজয়ের দাম নেই। সাউথ আফ্রিকাতে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকাও আড়াইশো এমনকি দুইশো রানের নীচে আউট হয়েছে কিন্তু সেফ সাইডে থাকেনি, আক্রমন করেই খেলেছে।
মুশফিকের দূর্ভাগ্য, আগে এতো ডট বল দিয়েছিলেন যে ওই সময় মারতেই হতো। মারার বল ছিলো, কিন্তু বলটা এলিভেশন (উচ্চাতা) পায়নি। পুরা সিরিজে সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিক, তার নিজের ডট বল কম না। প্রথম ম্যাচে প্রায় পঞ্চাশটা বল ডট দিয়েছিলেন। যত ভালোই খেলেন দিনশেষে দলীয় খাতায় এটার প্রভাব পড়বেই। ভালো কিছু ফলাফল পেতে ডট বল কমাতেই হবে, বিকল্প নেই।
আমাদের এবিডিভির মতো সুপারম্যান নেই তবে সাকিবের উপর একটা ভরসা থাকে। এইরকম ব্যাটিং স্বর্গে সাকিব হতাশ করলেন দুই ম্যাচেই। বিশ্রাম নিয়ে ফিরেছেন তবে শরীরের ভাষায় ক্লান্তি স্পষ্ট। এখানে বড় রান করার সুযোগ হেলায় হারাচ্ছেন সাকিব। অস্ট্রেলিয়ার সিরিজে লায়ন দেখিয়েছিলেন অফ স্ট্যাম্পের বাইরে দূর্বলতা, এবার তাহির দেখালেন, একই ধরনের বলে, আগের দিন স্লিপে, গতকাল কিপারের কাছে। বিশ্রাম মানে কি বিশ্রামই? টেকনিক্যাল বিষয়ে কাজ করা যায়না?
নাসিরের বিষয়ে কিছু বলবো না, তবে এইটুকু বলি এভাবে পাওয়া সুযোগ নষ্ট করার মূল্য তাকে দিতে হবে, মোসাদ্দেক কিন্তু সুস্থ হয়ে গিয়েছেন। ব্যাট বল ফিল্ডিং কোন বিভাগেই মোসাদ্দেক পিছিয়ে নেই।
সাব্বিরের ব্যাপারে বলবো ইনিংস বিল্ড করার চেষ্টা করছে ইদানিং। হার্ড হিটার ব্যাটসম্যান হিসেবে যেটা একটু অবাক করে। তবে খেলুক, সাত নাম্বারে এরচেয়ে ভালো অপশন আমি আর দেখিনা। তবে হ্যা, সৌম্যকে নীচে খেলিয়ে দেখা যায়। সেটা জরুরী না, সাব্বির খেলুক দেখা যাক কি হয়।
সবচেয়ে খারাপ লেগেছে রিয়াদের ব্যাটিং। ওই সময় ওইরকম “টেস্ট” ক্রিকেট কেউ খেলে। নিজের নামের পাশে কিছু রান জমবে কিন্তু মানুষ বিরক্ত হয় এতে। প্রচন্ড নেগেটিভ ব্যাটিং ছিলো। মাঠে এতো বাঙালি, বাঙালি হেরে যাচ্ছে সেই সময় একটা ছয় মারলেও দারুন খুশি হয়, অথচ আমরা ভাবলাম না ওই মানুষগুলা একেবারে নিরাশ হবে কেন? হারা ম্যাচে অন্তত তাদের জন্য কিছু বিগ শট খেলা উচিৎ ছিলো। দেশের বাইরে থাকে, দূর দূরান্ত থেকে খেলা দেখতে আসে।
মোদ্দা কথা হারুক, কিন্তু এভাবে কেন? অন্তত চোখে চোখ রেখে লড়ুক। পজিটিভ ক্রিকেট খেলুক। “আগের চেয়ে এই সফর ভালো হয়েছে” এটা নিউজিল্যান্ড সফরে শুনেছি, এবারো শুনবো। আর কত শুনবো।
আরেকটা বিষয় বেশ ভোগাচ্ছে, রিভিউ নেয়া। কোনটা রিভিউ নিতে হবে আর কোনটা না সেটা আমদের বুঝতে হবে। ইমরুল নন স্ট্রাইকে থাকলে ভয়াবহ ভুল সব রিভিউ হচ্ছে। একজন ব্যাটসম্যান একমাত্র নন স্ট্রাইকারের সাথেই আলোচনা করতে পারে, সেজন্য ইমরুলকে অনেক মনযোগ দিতে হবে। গতকাল তার উচিৎ ছিলো তামিমকে ফেরানো, বলা যে এটা সর্বোচ্চ আম্পায়ারস কল হবে তুমি রিভিউ নাও। আর লিটনকে মিনিমাম ডাউট থাকলেও সিনিয়র হিসেবে বাঁধা দেয়াও তার দ্বায়িত্বের ভেতর পড়ে।
সিরিজের আর একটা ওয়ানডে আছে, বাংলাদেশ অন্তত দল হয়ে খেলুক, লড়াই করে খেলুক এটাই চাই সেই ম্যাচে।
শেষ করি মুগ্ধতা দিয়ে, আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স এই প্লেয়ারটার প্রচন্ড ভক্ত আমি। ব্যাটিং জিনিসটাকে অন্য লেভেলে নিয়ে গিয়েছেন। ৩৬০ ডিগ্রী প্লেয়ার। গতকাল শুরুতে চাচ্ছিলাম যত দ্রুত ফেরানো যায় কিন্তু সময় যত যাচ্ছিলো ততোই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আর শেষ দিকে যখন বুঝেছি ম্যাচ বাংলাদেশের হাতের বাইরে চলেই গিয়েছে তখন চেয়েছি এবিডিভি ডাবল করুক। কারন এবির মতো একজন ব্যাটসম্যানের নামের পাশে ডাবল সেঞ্চুরী না থাকলে সেটা ক্রিকেটের জন্যেই লজ্জার বিষয়।

গতকাল আবার দেখলাম এবি নিজের স্কোর নিয়ে ভাবেনা যেটা ম্যাচ সেরা হবার পর নিজেও জানালেন। অন্য অনেক ব্যাটসম্যান ওই সময় হয়তো শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে শট নিতো না কারন দলের রান যথেষ্ঠ উঠছে, ওভার আছে হাতে তিনটা, নিজের ডাবল নিয়ে ভাবাই যায় তখন।
জীবনে গতকালই প্রথম প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যান যাতে আউট না হয় সেই প্রার্থণা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি, রুবেল কিন্তু এইবারই প্রথম উইকেট নিয়েও আমাকে “হ্যাপি” করতে পারেনি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top