টুকিটাকি

ধর্ষককে দোষ দিন, তাকেই সচেতন করুন

বছর দুয়েক আগের ঘটনা এটা। আমেরিকান কমেডিয়ান সারাহ সিলভারম্যান কীভাবে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়ে একটা টুইট করেছিলেন। সেই টুইটে ধর্ষণ প্রতিরোধের দশটা তালিকা ছিলো। ধর্ষণ প্রতিরোধের এইসব তালিকা নতুন কিছু না। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা পুলিশের কাছে ধর্ষণ প্রতিরোধের ছোট্ট পুস্তিকা থাকে। এগুলোতে মেয়েরা কীভাবে নিজেদের ধর্ষণ থেকে রক্ষা করতে পারে, সে বিষয়ে উপদেশনামা দেওয়া থাকে।

সারাহ সিলভ্যারম্যানের টুইট করা তালিকা এই তালিকার মতো গতানুগতিক ছিলো না। এটা সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের তালিকা। মেয়েরা কীভাবে নিজেদের ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে পারে, সেই পদ্ধতি বলে দেবার বদলে তাঁর তালিকাতে পুরুষরা কীভাবে নিজেদের ধর্ষণ করা থেকে বিরত রাখতে পারে, সে বিষয়ে উপদেশ দেওয়া ছিলো। সারাহ যে তালিকা দিয়েছিলেন, সেটা তার নিজের করা নয়। এটা বছর পাঁচেক আগে ‘গ্যাগ’ নামের একটা ব্লগে আপলোড করা হয়েছিলো।

 

ধর্ষণ প্রতিরোধে ধর্ষকের করণীয় বিষয়ের সেই তালিকা

স্বাভাবিকভাবেই সারাহ-র এই তালিকাকে সহজভাবে নেওয়া হয়নি। তাঁর টুইটে বহু ক্ষিপ্ত পুরুষ এসে তাদের রাগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে যায় এই বলে যে, এই তালিকা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, পক্ষপাতপূর্ণ এবং এখানে অযৌক্তিকভাবে সব পুরুষকে সম্ভাব্য ধর্ষণকারী হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এটা সত্যি কথা যে সব পুরুষই ধর্ষক হয় না। কিন্তু, সারাহ-র টুইটে প্রতিক্রিয়া দেখানো পুরুষেরা যে বিষয়টাকে খেয়াল করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটা হচ্ছে, সারা বিশ্বেই ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতন মহামারীর মতো আকার নিয়েছে। উন্নত কিংবা অনুন্নত বিশ্ব বলে কথা নেই, মেয়েরা কোথাও নিরাপদ না এখন আর। ২০১১ সালের এক রিপোর্টে দেখা যায় আমেরিকার প্রতি পাঁচজন মেয়ের মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।

এতো ব্যাপক পরিমাণ ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন শুধুমাত্র আইন দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য নানা ধরনের সামাজিক বা ব্যক্তিগত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথাও নানাভাবে চিন্তা করা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে সেইসব প্রতিরোধ ব্যবস্থায় খুব সূক্ষ্মভাবে নারীকেই ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়েছে। যখন বলা হচ্ছে, এরকমভাবে চলাফেরা করো না, পার্টিতে গিয়ে বেশি ড্রিংক করো না, কিংবা অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কারো সাথে অনিরাপদ কোথাও যেও না, সংক্ষিপ্ত এবং উত্তেজক পোশাক পরো না, তখন মূলত ধর্ষকের বদলে ধর্ষিতাকেই দায়ী করার সচেতন কিংবা অসচেতন একটা প্রয়াস এগুলোর আড়ালে লক্ষ্য করা যায়। এই বিষয়টা বহুদিন ধরেই ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য আন্দোলনকারীদের হতাশ করে আসছিলো। কারণ, ধর্ষণ শুধুমাত্র যৌনতার কারণে ঘটে না। পুরুষের জন্য তাদের ক্ষমতা দেখানো এবং সহিংসতা প্রকাশের একটা প্রধান উপায় হচ্ছে এটা।

আমাদের বনানীর ধর্ষণের ক্ষেত্রেই দেখুন। যারা ধর্ষণ করেছে, তারা যৌনতা বঞ্চিত বুভুক্ষু মানুষ না। এদের অফুরন্ত টাকা আছে, সেই সাথে অসংখ্য বান্ধবী আছে। ঢাকা শহরে বিপুল পরিমাণ টাকা থাকলে, শারীরিক এই চাহিদা মেটানোর জন্য ধর্ষণের মতো ঝামেলায় যাওয়া লাগে না। সহজেই তা মেটানো সম্ভব। তারপরেও, ধর্ষণের মতো ভয়াবহ নোংরা এবং অপরাধমূলক কাজে তারা গিয়েছে এই ক্ষমতার দম্ভ দেখানো এবং সহিংসতা প্রকাশের মানসিকতা থেকেই। যৌনতা এখানে গৌণ, নারীকে চরমভাবে অপমান করা, তাকে পদদলিত করে কুক্ষিগত করা এবং সমূলে ধ্বংস করে দেবার পুরুষতান্ত্রিক পিছিয়ে পড়া মানসিকতাই এখানে মুখ্য।

এই টুইটের পরে কেউ কেউ এই রকম যুক্তি নিয়েও হাজির হলো যে, আমরা যখন বাড়ির মালিককে চোর-ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করার নানা উপায় বাতলে দেই, তখন কি সেটা খারাপ কাজ? আমাদের কি তাহলে বাড়ির মালিকদের কিছু না বলে চোর-ডাকাতদের উপদেশ বিলানো এই বলে যে বাবারা তোমরা চুরি-ডাকাতি করো না, কারণ এটা খারাপ কাজ।

সারাহ তাঁর এই টুইট এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেখে বলেন যে, “এই তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্যে এটা না যে সম্ভাব্য ধর্ষকরা এটা পড়বে এবং এটা পড়ে তারা নিজেদের শুধরে নিয়ে ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকবে। আমি বরং যে কাজটা করতে চেয়েছি, সেটা হচ্ছে বর্তমানের ভিক্টিম ব্লেমের কালচারকে ব্যঙ্গ করা এবং যারা এইসব অপকর্ম করছে তাদের মানসিকতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা না থাকাকে সবার সামনে তুলে ধরা। ভিক্টিমদের সেফটি টিপ দেওয়াকে আমি খারাপ কিছু মনে করি না। নিজের ঘর-বাড়িকে চুরি-চামারির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপত্তামূলক উপদেশ দেওয়া যেতেই পারে। এগুলো দিয়ে তারা তাদের বাড়িকে আরো নিরাপদ করতে পারে। কিন্তু, এটা ধর্ষণের সাথে তুলনীয় না। ধর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের পুরো ফোকাসটাই থাকে ধর্ষিতার প্রতি। ধর্ষকের সংস্কৃতি, শিক্ষা, মানসিকতা পরিবর্তনের কোনো প্রয়াসই সেখানে থাকে না। এতে করে মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। মেয়েরা প্রচণ্ডরকমভাবে নিরাপত্তাবেস্টনীর মধ্যে থাকলেও, ধর্ষণের শিকার হয় এইসব আক্রমণাত্মক পুরুষদের হাতে।

নানা ধরনের প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন ভাষার ব্যবহার করে মেয়েদের দোষারোপ করে, তাদের কোন কাজটা সঠিক হয়েছে বা হয়নি, তারা দিনে বের হয়েছে না রাতে বের হয়েছে, একা গেছে, না সঙ্গে কাউকে নিয়ে গেছে, পার্টিতে গেছে, নাকি পত্রিকা অফিসে গেছে, নিরাপদ জায়গায় গেছে, না অনিরাপদ জায়গায় গেছে, পোশাক সঠিক ছিলো কি ছিলো না, এইসব নানা তর্ক-বিতর্ক করে আর অজুহাত তুলে এনে ভিক্টিম ব্লেমের এই সংস্কৃতি থেকে যতদিন পর্যন্ত না আমরা বের হয়ে আসতে পারবো, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করা সম্ভবপর হবে না।

আমাদের সমাজে ধর্ষণ প্রতিরোধের সব দায় যেন কেবল নারীর একার। পুরুষের কোনো দায় নেই এখানে। অথচ হওয়া উচিত ছিলো পুরো উল্টোটা। কারণ, সুন্দরবনের শিশ্নধারী শার্দুল সেই, নারী তার অসহায় শিকারমাত্র।

Most Popular

To Top