নাগরিক কথা

অনলাইনে #MeToo, বাস্তবজীবনে ভীতু…

সবসময় যেটা হয়- ফেসবুকে একটা ইস্যু শুরু হয়, একটা দল সেটার পক্ষে শুরুতে একচেটিয়া কথা বলে, তার কিছুক্ষণ পর তাদের প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে যায়, এরপর দু’পক্ষের কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শেষে তৃতীয়পক্ষ আবির্ভূত হয় যেখানে কিছু মানুষ স্মার্ট সাজার চেষ্টা করে এবং এরকম কিছু একটা বলে যে “আমি তো অমুক ইস্যুতে কোন স্ট্যাটাস দেইনি, সমাজ কি আমাকে মেনে নিবে?”

তো এই চিরাচরিত চক্র অবজার্ভ করে, এবং সাম্প্রতিক #MeToo ক্যাম্পেইনের হাইপ অবলোকনপূর্বক এই আর্টিকেলের কভার ইমেজ দেখে অনেকেই আমাকে ভুল বুঝতে পারেন যে আমি-ই মনেহয় এখানে ক্যাম্পেইনের প্রতিপক্ষের ভূমিকাটা দখল করতে এসেছি। আসলে বিষয়টা সেরকম কিছু না, বরং আমি এই ক্যাম্পেইনেরই পক্ষে। তাহলে কেন এরকম শিরোনাম কিংবা কভার ইমেজ? একটু পরেই পরিষ্কার করছি।

প্রথমত আসি এই হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনটির উদ্দেশ্য আলোচনায়। ওয়েনস্টেইন স্ক্যান্ডালের জের ধরে টুইটারে যেভাবে ট্রেন্ডিং হয়েছে #MeToo হ্যাশট্যাগটি, তারই ঢেউ এসে পড়েছে ফেসবুকেও। যেহেতু বাংলাদেশে টুইটার ব্যবহারের প্রচলন তুলনামূলক কম, সেহেতু আমরা আমাদের ফেসবুক নিউজফিডেই দেখছি আমাদের পরিচিত মানুষেরা #MeToo হ্যাশট্যাগ দিয়ে জানাচ্ছে তাদের লাঞ্ছিত হবার ইতিহাস। ভাবতে অবাক লাগে, যে মানুষগুলোকে সারাদিন এত হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত দেখি, তাদের মনে এরকম চাপা কষ্ট তারা বয়ে চলেছে! সেই সাথে এটাও দেখছি, পরিচিত যাদের কম-বেশি নিগৃহীত হবার ঘটনা জানা ছিল, তাদের অনেকেই এই হ্যাশট্যাগকে পাত্তা দিচ্ছে না। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে তারা নিপীড়িত হবার দুঃখটা ভুলে গিয়েছে? না। নিপীড়িত অনেকেই মনে করছে এই হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন অনলাইনে আর দশটা হুজুগের মতই, যেটা নিয়ে দুইদিন সবাই মাতামাতি করে তৃতীয়দিন বেমালুম ভুলে যাবে! তাদের এই ভাবনা কিন্তু ভুল না, বরং এটাই বাস্তব!

তার মানে কি এই হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন শুরুতেই ব্যার্থ? কখনোই না! যেকোন একটি সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো সমস্যাটি স্বীকার করে নেওয়া। এমন না যে ঘরে-বাইরে মেয়েরা, কিংবা
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছেলেরা যে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে সেটা কেউ জানে না। সবাই জানে! কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের অতিপরিচিত মুখগুলোর চাপা যন্ত্রণা আমাদের চোখের সামনে এসে পড়ছে যেটা হয়তো আগে পড়েনি। এই হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে সমস্যাটি আমাদের স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

এবার আসি সমস্যা সমাধানের দ্বিতীয় ধাপে। সমস্যা সমাধানের দ্বিতীয় ধাপ হলো সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা। আর এই ধাপটি নিয়েই আমার মূল আলোচনা।

কিন্তু তার আগে প্রশ্ন হলো- আপনি যদি সমস্যাটির সাথে কোনভাবে সম্পৃক্তই না হন, কিংবা সমস্যাটি তৈরি’র ক্ষেত্রে যদি আপনার কোন ভূমিকাই না থাকে তাহলে আপনি সমাধানের পথ খুঁজে কি লাভ? এখানেই আমাদের আত্মোপলব্ধির প্রশ্নটা দাঁড়িয়ে যায়- আমরা কেউ কি এই ভয়াবহ সমস্যাটির পিছনে নিজের দায় এড়াতে পারি? কখনোই না, আমরা সবাই নিঃশব্দে মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়া এই সমস্যাটির পিছনে কোন না কোনভাবে দায়ী।

যেহেতু মেজরিটি কেইসে মেয়েরাই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়, এবং সেই সিনারিওটা দেখেই আমরা বেশি অভ্যস্ত- তাই সেই পারস্পেক্টিভ থেকেই আলোচনা করলাম এখানে। তার মানে এই না যে নিপীড়নের শিকার পুরুষদের আলাপ এখানে করা হচ্ছে না। মনে রাখবেন, এখানে পক্ষ দুইটা- নিপীড়ক এবং নিপীড়িত। আলোচনার সুবিধার্থে শুধুমাত্র নারী নির্যাতনের সিনারিওগুলো তুলে ধরলাম।

যখনই একটি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ঘটনা ঘটে, তখনই কেন যেন হঠাৎ করে শুরুতেই আশেপাশের মানুষজন ভিক্টিমের দোষ খুঁজা শুরু করে। এবং এই দোষে আমরা সবাই কম-বেশি দুষ্ট। এই অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আপনি কি সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করবেন #IamAshamed হ্যাশট্যাগ দিয়ে?

যখনই একটি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ঘটনা ঘটে, তখনই ভিক্টিমের পরিবার-বন্ধুবান্ধব সবাই সচেতন হয়ে উঠে তার “সম্মান” রক্ষা করার জন্য। পরামর্শ একটাই- “চেপে যাও, নাহলে লজ্জা তোমারই। সমাজ কি বলবে?” ভেবে দেখুন, আপনি কি কখনো কাউকে এই পরামর্শ দেননি যেখানে অপরাধীকে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় দিচ্ছেন আপনি, যখন কিনা ভিক্টিমের এখানে লজ্জার কিছু নেই? চোর চুরি করলে তো আপনি কোনদিন গেরস্থকে বলেন না ঘটনা চেপে যেতে, বরং চোরকে হাতের কাছে পেলে মেরে আধমরা করে দেন। সেক্ষেত্রে কাউকে যৌন নিপীড়ন করা কি আরো বড় অপরাধ না? তাহলে কেন ভিক্টিমের ট্রমা বাড়াচ্ছেন তার “কাছের মানুষ” হয়েও! এজন্য কি আপনি #IamAshamed হ্যাশট্যাগে স্ট্যাটাস আপডেট করে অনুতাপ প্রকাশ করার সাহস রাখেন?

আপনারা কি করবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। তবে আমার পয়েন্টটা আমি বলি। বিদেশী হাইপে আমদানী হওয়া ট্রেন্ডে আমার আসলে খুব বেশি ভরসা নাই। এরকম ট্রেন্ড আসে-যায়, দিনশেষে পড়ে থাকে ঘোড়ার আন্ডা! ওয়েনস্টেইন স্ক্যান্ডালে ভিক্টিমরা অনেকদিন মুখ বন্ধ করে ছিলো, যখন সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে, তখনই সবাই মুখ খুলতে শুরু করেছে। সে তুলনায় আমরা সেই থ্রেশহোল্ড পার করে এসেছি অনেক আগেই। এ অবস্থায় #MeToo হ্যাশট্যাগ দেওয়া, আর ক্যান্সারের পেশেন্টকে এন্টিবায়োটিক দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করা প্রায় সমপর্যায়ের বালখিল্যতা। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদেরকেই খুঁজতে হবে, আমেরিকায় কি হবে না হবে তাতে আমাদের কিচ্ছুটি আসবে-যাবে না। মনে রাখবেন, যেই দেশে ওয়েনস্টেইন নাকানি-চুবানি খাচ্ছে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের বিতর্কে, সেই একই দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট- যে নিজে বলেছে “Grab ’em by the pussy”!

যাই হোক, চিন্তাভাবনা যত গভীরে যাচ্ছে, চলতি হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড ততই অসার মনে হচ্ছে। কেননা পারপেট্রেটররা কখনোই ভাবে না ভিক্টিমের উপর দিয়ে কি ঝড় যায়। ভাবলে কখনোই তারা এগুলো করতো না। তাহলে কি লাভ এই হাইপের? তার থেকে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের দায়, লজ্জা, অপরাধ, অনুশোচনা যে পুরোপুরি অপরাধীর প্রাপ্য, ভিক্টিমের না- সে ধারণাটা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই কি উচিৎ না?

তাই আমি আমার নিজের লজ্জার এবং অনুশোচনার কথা শেয়ার করবো #IamAshamed হ্যাশট্যাগে, কেননা এটাই এ মুহুর্তে বেশি প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে।

#IamAshamed
কারণ, কলেজলাইফে যখন আমার ক্লাসমেটরাই আমার দুই বান্ধবীকে টিজ করেছে তখন সেটা আমার পক্ষে থামানো সম্ভব হয় নাই।

#IamAshamed
কারণ, কলেজলাইফের শিক্ষা নিয়ে ভার্সিটিতে উঠে “কুল গ্যাং” এর মেম্বারশিপ বজায় রাখার জন্য আশেপাশের মানুষদের ইভটিজিং দেখেও না দেখার ভান করেছি যতক্ষণ না পর্যন্ত এর শিকার আমার পরিচিত কেউ হয়েছে।

#IamAshamed
কারণ, ভার্সিটির জনৈক উচ্চশিক্ষিত বড়ভাই যখন আড্ডার ছলে বলেছিলো “মেয়েরা সাইকেল চালায় কেন জানস? সাইকেলের সিটের সাথে ক্লিটে ঘষা খেয়ে ফিল নেওয়ার জন্য” তখন তার মুখের উপর গালি দিয়ে অপমান করি নাই।

#IamAshamed
কারণ, আমি জানি আমার ছোটবোনটার জন্য নিরাপদ পৃথিবী তৈরী করতে পারিনি আমি।

আর এসব লজ্জা যে শুধু পুরুষদের, তা না। মেয়েদেরও আমি দোষ কম দেখছি না। দুর্বলের উপর সবল সবসময়ই অত্যাচার করে এসেছে, করছে, এবং ভবিষ্যতেও করবে। শুনতে খারাপ শোনালেও এটাই জগতের নিয়ম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি নিজে নিজেকে দুর্বল ভাবতেই থাকবেন , ঘরে-বাইরে হ্যারাসড হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদবেন, নাকি “এগুলো মেয়েদের মানায় না” মানসিকতা ডাস্টবিনে ফেলে সেলফ-ডিফেন্স কোর্সে ভর্তি হবেন? উদাহরণ আপনার সামনেই আছে দেশে এবং বিদেশে। সিদ্ধান্ত আপনার।

তাই, অনলাইনে #MeToo আর অফলাইনে ভীতু থাকার ট্রেন্ডকে অস্বীকার করছি আমি। সমস্যা চিহ্নিত আর স্বীকার করে নেওয়ার পর্যায় পার করে এসেছি আমরা অনেক আগেই, এখন সময় সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার। নাহলে এরপরের তনু, পূজা কিংবা ডাঃ ইভা’র সাথে হতে যাওয়া অন্যায়ের দায় কিন্তু আপনিও এড়াতে পারবেন না।

মনে রাখবেন, ফেসবুক ট্রেন্ডে শামিল হওয়া সহজ। আত্মসমালোচনা-আত্মজিজ্ঞাসা-আত্মশুদ্ধি সহজ না। কঠিন পথটাই নাহয় বেছে নিলেন একবার! যে সাহসটা আমরা দেখাচ্ছি অনলাইনে, সেটা অফলাইনেও নাহয় দেখানো অভ্যাস করি!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top