বিশেষ

দীপনের স্মৃতিতে দীপনের স্বপ্ন, দীপনপুর

এই শহরের এক অখ্যাত নাম-পরিচয়হীন কবি একদিন স্বপ্ন খুঁজতে বেড়িয়েছিল শহরেরই রাজপথে। পিচঢালা পথে, বিদেশী গাছের শাখায়, উঁচু উঁচু দালানের খোপে আর হুশ-হুশ করে ছুটে চলা রিকশার ভিতরে বসে থাকা তরুণীর চোখে- সে খুঁজে বেড়াচ্ছিল কবিতার পঙক্তি। অনেক পান্থশালা ঘুরে দু-দণ্ড বিশ্রাম আর এক মুঠো শান্তির আশায় সে শেষমেষ আশ্রয় নিয়েছিল এই শহরের বুকে জন্ম নেয়া নতুন এক আলয়ে।

সেখানে বসতেই কবির অন্তরটা স্নিগ্ধ শীতলতায় জুড়িয়ে গেল। কী নেই সেখানে? হাজার বছরের মহামানবদের সাথে একই সাথে বসে এক পেয়ালা চা-পানের সুযোগ, শতাব্দী সঞ্চিত অমৃত আর তরুণীর পাখির নীড়ের মত চোখ। কবির অন্তরের মত বাইরের রাজপথও তখন পবিত্র জলে সিক্ত হচ্ছে। বৃষ্টির সেই অঝোর ধারায়, জ্ঞান-সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে, কোন এক অচেনা তরুণীর ঘন কালো চুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই কবির হৃদয় নিঙরে বেড়িয়ে এলো অমৃত- একটি অতিপ্রাকৃতিক কবিতা।

এখানে এলেই আপনিও যে কবির মত কবিতা লিখতে পারবেন, ব্যাপারটা হয়তো এমন নয়। তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি অসংখ্য বই, প্রিয় মানুষের সাথে আড্ডা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ- আপনাকে অন্য এক ধরণের অভিজ্ঞতা দেবে। যে জায়গাটির কথা বলছি এত হেঁয়ালি করে, হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন তার নাম- দীপনপুর

দীপনপুর- অস্থির ঢাকা শহরে একটু স্বস্তির জায়গা

সুন্দর-আলোকিত সমাজের স্বপ্ন দেখা দীপনকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে ‘জাগৃতি’ প্রকাশনীর কার্যালয়ে। কিন্তু দীপনের স্বপ্ন কী অসমাপ্তই থেকে যাবে? দীপনের মৃত্যুর পর তার সহধর্মিনী ডা. রাজিয়া রহমান জলি জাগৃতির হাল ধরেন, পাশাপাশি দীপনের স্মৃতি ও চেতনাকে সমুন্নত রাখতে রাজধানীতে প্রতিষ্ঠা করেন ভিন্নধর্মী বুকশপ ক্যাফে ‘দীপনপুর’।

‘দীপনের জাগৃতি’ – অনেক ধরনের বইয়ের সমাহার

‘দীপনপুর’- নামটি শুনলেই মনে হয় শহরের কোলাহল থেকে দূরে, নতুন কোন একটা জগৎ। আসলেই তাই। ঢাকা শহরে ভালো বই এর দোকান, কম-বেশি আছে। কিন্তু যেটার অভাব ছিল এতদিন, একটা পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলনমেলার, সেই অভাব অনেকাংশেই পূরণ করেছে দীপনপুর।

অসংখ্য বইয়ের সমাহার। পছন্দমত বই কেনার সাথে থাকছে বসে পড়ার সুযোগ। পর্যাপ্ত আসন ছড়িয়ে আছে পুরোটা জুড়েই। একই সাথে বুক-শপ আবার লাইব্রেরি। সেই সাথে আছে ক্যাফে, যেখানে স্বল্পমূল্যেই মিলবে নানা রকম খাবার। চায়ের কাপে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সেই সাথে বই- সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য তীর্থস্থানই বটে।

‘ক্যাফে দীপাঞ্জলি’- বই প্রেমীদের আড্ডার জায়গা

এছাড়াও আছে ‘দীপনতলা’ নামে একটি মঞ্চ যেখানে প্রায়ই বসে গান কিংবা কবিতার আড্ডা, কিংবা কোন সাহিত্য-সেমিনার। শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা একটি অংশ, যেখানে খেলতে খেলতে বইয়ের সাথে পরিচিত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

‘দীপনতলা’- বই নিয়ে আলোচনা কিংবা ব্যস্ত দিনের পর প্রাণ শীতল করা গানের আসর বসে যেখানে অহরহ!

‘দীপান্তর’- শিশুদের জন্য এক রঙ্গিন রাজ্য

দীপনপুর- কেবল প্রথাগত বইয়ের দোকানই নয়, বরঞ্চ লেখক-পাঠকদের মিলনমেলা। আজকের এবং আগামী দিনের সাহিত্যিকরা এখানে বসেই হয়তো রচনা করতে পারবেন তাদের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিটি, এখানে বসেই একদল তরুণ আলোচনা করে বের করে ফেলতে পারবে সামাজিক কোন সমস্যার দুর্দান্ত এক সমাধান, এখানে চায়ের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই জন্ম নিবে হয়তো কোন দেশ বদলে দেয়া আইডিয়ার।

এই অস্থির ব্যস্ত শহরে দীপনপুর তাই, ক্লান্ত পথিকের পান্থশালা।

ঘুরে আসতে পারেন দীপনপুরে নিচের ম্যাপ অনুসরণ করেঃ

Most Popular

To Top