ইতিহাস

চির রহস্যময় রাসপুটিনের উপর কিঞ্চিৎ বার্তালাপ

চির রহস্যময় রাসপুটিনের উপর কিঞ্চিৎ বার্তালাপ

এই লোকটির নাম প্রথম শুনি একটা গানে। BONY-M এর ‘রা রা রাসপুটিন’ এর সুর বড় আকর্ষক ছিল, বয়স অল্প ছিল, গানটি বেশ ভালোই লেগেছিল কিন্তু এই রাসপুটিন লোকটি কে ওটা বুঝে উঠতে পারি নি। পরে যাও বা কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল তাতে এতো ভুল ছিল যে, লোকটিকে একটি অন্য মাত্রার কিছু মনে হয়েছিল। যাই হোক গানবাজনা থাকুক, আসুন জানি এই চির-রহস্যময় লোকটি সমন্ধে।

গ্রিগরি ইয়াফিমোভিচ রাসপুটিন জন্মেছিলেন রাশিয়ার সাইবেরিয়াতে, ১৮৬৯ সালে। ছোটবেলা থেকে গ্রামবাসীর কাছে তার কুখ্যাতি বা সুখ্যাতি ছিল এক অলৌকিক ক্ষমতার কারণে। যৌবনে রাসপুটিন ‘খিলস্টস’ (Khlysts) বলে একটি খ্রিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে, যারা ধর্ম আর অবাধ যৌনাচারের উপর নিজস্ব আচরণ নিয়ে চলতো। বস্তুতঃ পরবর্তীতে রাসপুটিনের নিজস্ব কাজকর্মের ধাঁচ অনেকটাই ওই ধরনের হয়। এরপর সে হাজির হয় ভের্খটুর গির্জায়, সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য কিন্তু ওটা আর হয় নি তার বদলে ১৯ বছরে বিয়ে করে ফেলে। তার বিয়ে হয় প্রাসকোভিয়া নামের এক মহিলার সাথে। তিনটি সন্তানও হয়।

রাসপুটিন খিলস্টস

অতঃপর ১৯০১ সালে রাসপুটিন বেরিয়ে যায় এবং ভবঘুরের জীবন যাপন করতে থাকে। ইতিমধ্যে তার এই অলৌকিক ক্ষমতা বেশ ছড়িয়ে পরে। তার খ্যাতি ছিল সে তার ক্ষমতাবলে দুরারোগ্য রোগীকে ভালো করে দেওয়া । এই ভালো করে দেওয়ার সাথে তার বিবিধ নিজের উদ্দেশ্য বিশেষতঃ তার কাম বাসনা চরিতার্থতার কুখ্যাতিও ছড়িয়ে পরে। ক্ৰমশঃ সে একটি গডম্যান মানে প্রায় ঈশ্বর গোছের ভাবমূর্তি পেয়ে যায়। পিটসবার্গ এ থাকার সময় তৎকালীন রাশিয়ার রাজা মানে জার্ এর সভার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সংস্পর্শে আসে এবং তাদের গুরু হয়ে যায়।

বস্তুতঃ এই রাসপুটিন এর ছিল সম্মোহন করার কিছু বিদ্যা আর ছিল নিজের লালসা এবং ইচ্ছা চরিতার্থ করার প্রবল ইচ্ছা। ওটা সে ব্যবহার করতো মানুষের দুর্বলতা দেখলেই। যাই হোক, এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাহচর্যের ফলে তার এই তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতা বিশেষতঃ মানুষকে ভালো করে দেওয়ার খবর রাশিয়ার জারের কানে যেতে বেশি দেরি হয় নি। এক বছরের মধ্যেই এই চাষির পরিবারের সামান্য লোকটি হয়ে যায় জার্ এর সবচেয়ে কাছের লোক। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় লোকটি বিশেষ করে জারিনার মানে জার্ নিকোলাস (দ্বিতীয়) এর পত্নী আলেকজান্দ্রার্ খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে।


বস্তুতঃ প্রচুর অতিরঞ্জনের মাঝে মাঝে কিছু সত্যকথা ও খুঁজে পাওয়া যায়। রাসপুটিন ওই উপরে বলা ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি অদ্ভুত কাজকে নিজের ধর্মীয় আচরণের অংশ করে কুখ্যাত বা বিখ্যাত হয়েছিল। অনেকটা এক অবাধ যৌন আচরণ এর আসর ভাবতে পারেন। এক অদ্ভুত বিশ্বাস নিয়ে ওই গোষ্ঠী তাদের প্রচারণা চালাতো , তাদের মতে মানুষের এই প্রবৃত্তি কে নিবৃত্তি দিয়ে ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার সুযোগ আসবে ওটাই ছিল মূল ভাবনা। সোজা কথায় এই যৌন ইচ্ছা কে একটা প্রলোভনের অস্ত্র করে ফেলা।

মনে রাখবেন এই সময় ছিল অতীব ডামাডোলের। এক দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার শোচনীয় অবস্থা অন্য দিকে দেশের মানুষের মানবেতর জীবন যাপন- এক দ্রোহকালের সূচনার পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল দেশটি কে। রাসপুটিন কে জারিনার প্রেমিক অথবা যৌন সঙ্গী এবং বিবিধ অলৌকিকতার সুনাম এবং দুর্নামে এখনো রাশিয়ানরা চেনে।পৃথিবীও অনেকটাই সেই ভাবে জানে। এই লোকটির শেষ পর্যায়ের ঘটনা এবং তার পরিণতি নিয়ে ও অজস্র গল্পকথা এবং আরো সোজাসুজি বললে রূপকথার ছড়াছড়ি হয়ে আছে। এর উপর কিছু আলোকপাত করার জন্য এই লেখা। রাসপুটিন যে নিতান্ত একটি মানুষ এবং এর অলৌকিক ভাবমূর্তি কে যে কি ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ওটা ও আলোচনা করবো।

কি ভাবে রাসপুটিন রাশিয়ার জার্ পরিবারের এতো কাছে এলো?

জার্ নিকোলাস(দ্বিতীয়) এর ছেলে এলেক্সিস হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত ছিল। এই রোগ সম্পর্কে যারা অবগত না তাদের জন্য বলি, এই রোগে রক্ত তঞ্চন মানে কেটে গেলে রক্তক্ষরণ বন্ধ হতো না। সেই সময়ে এই রোগের কোনো প্রথাগত চিকিৎসা ছিল না। জারিনা মানে আলেক্সান্ড্রিয়ার প্রবল চিন্তার বিষয় ছিল এটি। একে তো সন্তান তার উপর ভবিষ্যতের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর স্বাস্থ্য এইরকম হলে পুরো অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল। রাসপুটিন ছেলেটির এই সমস্যা সেই সময়ের মতো দূর করে ১৯০৬ সালে।


কেউ জানে না ঠিক কি ভাবে ওটা সে করেছিল। আন্দাজ করা যায় হিপ্নোটিজম এর মাধ্যমে একটা সেলফ হিলিং মানে শরীরের নিজস্ব সারিয়ে তোলার পদ্ধতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। এই সেলফ হিলিং এ ফেইথ হিলিং ও অনেক অংশে কাজ করে ,আশা রাখি কোনো সময়ে এর উপর কিছু লিখবো। যাই হোক, নিরাময় যে হয় নি তার প্রমান পাওয়া যায় ১৯১২ তে আবার এলেক্সিস এর এই অবস্থা হয় যখন ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় পরে গিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আবার বিপন্ন জার্ পরিবার তার স্মরনাপন্ন হয়। তখন এলাকার বাইরে থাকা রাসপুটিন টেলিগ্রাম করে জানায় (জারিনা কে) যে তার সন্তান সেই রাতে মোটেই মারা যাবে না। পরের দিন এলেস্কিস সেরে উঠলে রাসপুটিন এর প্রভাব আরো বেড়ে যায়।

এই ভন্ড বাবা /পীর /সাধু ইত্যাদির সুবিধা হলো এরা বিফল হলে লোকে মনে রাখে না কিন্তু সফলতা এলেই তাদের নাম চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে ও তাই হলো, ১৯১২ তে রাসপুটিন এর জয়জয়কার বা কুখ্যাত হওয়ার চরম সীমা এসে গেল। এর আগে অন্যতম পথের কাঁটা জার্ এর প্রধানমন্ত্রী এবং রাসপুটিনের অন্যতম শত্রু পিটার স্তলিপিন তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলেও নিজেই আততায়ীর হাতে আক্রান্ত হয়ে যান। ১৯১১ সালে তাকে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারী গুলি করে। তিনদিন বাদে মারা যান তিনি। এই রকম এক ভালো সময়ে প্রচুর গুজব ছড়িয়ে যায় রাসপুটিনের উপর। তার অলৌকিক যৌন ক্ষমতা এবং অন্যান্য ক্ষমতার সাথে জারিনার সাথে মুখরোচক সম্পর্ক গোটা রাশিয়া এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় আলোচিত হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত বলা যায় রাসপুটিন জার্ এবং জারিনা কে ‘পাপা ‘ এবং ‘মামা ‘ বলতো বা বলার অধিকার পেয়েছিল।

এমতবস্থায় ১৯১৪ তেই তার শত্রু বৃদ্ধি বেড়ে যায়। এই বছরের শুরুতে ইতালিয়ান এক সাংবাদিক কে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে রাসপুটিন সগৌরবে ঘোষণা করে যে যুদ্ধ হবে না এবং সেই বিষয়ে সে ‘কাজ ‘ করছে। যা হয়, ঝড়ে রোজ বক মরে না তাই যুদ্ধ বেঁধে যায়। জার্ যায় যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে আর জারিনা কে দিয়ে যায় অভ্যন্তরীণ রাজত্ব চালানোর ভার। অর্থাৎ শুরু হয় রাসপুটিনের বকলমে রাজত্ব। জারিনা রাসপুটিন কে বিশেষ পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ করার পর, রাসপুটিন নিজের ইচ্ছামতো সরকারি পদগুলোতে নিজের পচ্ছন্দমত মানুষ বসানো শুরু করে।

এই সময়েই রাসপুটিন এর উপর প্রথম প্রাণে মারার হামলা হয়। তারই ‘বিশেষ পরিচিত ‘ এক মহিলা Khioniya Kozmishna  ১৬ই জুন,১৯১৪ তে তাকে তলপেটে ছুরিকাহত করে। প্রাণে না মরলেও বড় আঘাত পায়। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে আঘাত ছিল প্রাণঘাতী আর রাসপুটিনের পেটের অন্ত্র ইত্যাদি বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে রাসপুটিন এই আঘাত সামলে নেয় কয়েক সপ্তাহে।

এই সময়ে মানে ১৯১৬ সালে সরকারি বেশ কিছু মানুষ এই ঈশ্বরের বরপুত্র বা গডম্যান কে উপরে পাঠানোর পরিকল্পনা করে। গ্র্যান্ড ডিউক দিমিত্রি আর রাজকুমার ফেলিক্স এই খুন করার জন্য প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিল। তারা একাধিক জার্ এর অমাত্য আর ঘনিষ্ট মানুষদের সাথে মিলে এই পরিকল্পনা করে। বস্তুতঃ রাশিয়ার যুদ্ধে অবস্থা অতীব শোচনীয় হচ্ছিল। ঘরে বাইরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল প্রচন্ড পরিমাণে। এই অবস্থায় এই লোকটি কে মারলে দেশের অশেষ ভালো হবে বা পক্ষান্তরে দেশ রক্ষা হবে, এইরকম একটি যুক্তি এই গোষ্ঠীকে একমত করতে সক্ষম হয়। ফেলিক্স এর স্ত্রী ইরিনার নাম করে প্রলুব্ধ করা হয় রাসপুটিন কে। ২৯শে ডিসেম্বর , ১৯১৬ সালে ফেলিক্স রাসপুটিন কে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো ইরিনা ছিল জার্ এর ভাগ্নি।


অতঃপর রাসপুটিন আসার পর তাকে আপ্যায়ন করা হয় বিষ মিশ্রিত পেস্ট্রি এবং মদ সহকারে। বলা হয়ে থাকে তার খাবারে যে পরিমাণ সায়ানাইড মিশানো হয়েছিল তাতে বেশ কয়েকজন মানুষের মরে যাওয়ার কথা কিন্তু রাসপুটিন ওই খাওয়ার হজম করে ফেলে এবং ইরিনার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে।

এই অলৌকিক কান্ড ফেলিক্স কে আতংকিত করে ফেলে। আর অপেক্ষা না করে নিজের পিস্তল থেকে রাসপুটিন এর মাথায় গুলি করে। অতঃপর রাসপুটিন মাটিতে পরে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে উপরে নিজের বন্ধুবর্গ নিয়ে উপর তলায় ফুর্তি করতে চলে যায়। পরে আবার এসে মৃত্য নিশ্চিত হয়েছে দেখার জন্য তার নাড়ি মানে পালস দেখে। এই অবস্থায় তার জবানবন্দি মতে, স্বত্রাসে দেখতে পায়, রাসপুটিন তার চোখ খুলেছে। তার মতে সাপের মতো চোখের ছিল ওই চাহনি। এরপরেই রাসপুটিন ওখান থেকে ছুটে পালাতে গেলে ফেলিক্স এবং বাকি ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে তাড়া করে। বাইরের বাগানে আরো দুটো গুলি করে এবং একটি ভোঁতা রাবারের গদার মতো জিনিস দিয়ে আঘাত করে। এরপর পাকাপাকি মৃত্যু নিশ্চিত করতে রাসপুটিন এর দেহ একটা কম্বলে মুড়ে নেভা নদীতে ফেলে দেয়।


রহস্য আরো ঘনীভূত হয় তার মৃতদেহের অটোপ্সি মানে ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে। দেখা যায়, তার একটি হাত খোলা অর্থাৎ বাঁধন ছিল না, আর সামনের থেকে কপালে গুলির আঘাত এবং বরফ জলের কারণে মৃত্যু হয় নি (হাইপোথার্মিয়া ), বলা হচ্ছে, মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। তার পেটে কোনো বিষ পাওয়া যায় নি! আরো গুজব ছড়িয়ে যায় তার পুরুষাঙ্গ নাকি কেটে নেওয়া হয়েছিল। ওটাও অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।

এর কয়েক মাস বাদে আরো হওয়া গরম হয়ে যায় যখন বলশেভিক বিপ্লবের ফলে গোটা জার্ পরিবার কে গুলিতে খুন করার পর জারিনার হেফাজতে একটি চিঠি পাওয়া যায় এই রাসপুটিনের। তাতে সে নাকি জারিনাকে বলেছিল,তার পরিবারের কেউ যদি রাসপুটিন কে হত্যা করে, তা হলে জার্ এর গোটা পরিবার নির্বংশ হয়ে যাবে দু বছরের মধ্যে। প্রসঙ্গত জুলাই ১৬, ১৯১৮ তে জার্ নিকোলাস দ্বিতীয় ,জারিনা এবং তার পাঁচ সন্তান কে লেলিনের প্রশাসন গুলি করে হত্যা করে।

গড ম্যান এর অলৌকিক মৃত্যুর পরবর্তী রহস্যের উন্মোচন এবং একটু এম আই সিক্স বা জেমস বন্ড ধাঁচের উপসংহার।

এই ফেলিক্স এর বহুল প্রচলিত এবং বিক্রি হওয়া এই ঘটনার স্বীকারোক্তি মূলক একটি বই আছে নাম ” Lost Splendour and the Death of Rasputin by Prince Felix Yusupov ” অর্থাৎ হৃত গৌরব এবং রাসপুটিনের মৃত্যু। এই বই এর জবানবন্দি ধরে নতুন করে অনুসন্ধান করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এর অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা রিচার্ড কুলেন এবং ইতিহাসবিদ এন্ড্রু কুক নতুন সূত্র নিয়ে আসেন ২০০৪ সালে। তারা দাবি করেন এই রাসপুটিন এর মৃত্যুর পিছনে ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের দুই অফিসার অসওয়াল্ড রেনার এবং জন স্কেলস এই কাজ করেন। তারা ওই ফেলিক্স এবং রেনার এর সম্পর্ক কে প্রমাণ করেন এবং স্কেলস এর কাছে থাকা তথ্যাদি দিয়ে এই তত্ত্ব কে দাঁড় করান।


রিচার্ড কুলেন রাশিয়া সফর করেন এবং সেই সময়ের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পরীক্ষা করেন। এই রিপোর্ট পরীক্ষা করে তিনি দেখেন, ওই ফেলিক্স এর কিতাব এ বর্ণিত হত্যার বিবরণ এর সাথে তো মোটেই মিলছে না! তিনি তার তুরুপের তাস মানে মূল যুক্তি নিয়ে আসেন রাসপুটিন এর মৃত্যুর পরের প্রধান ছবির একটি – যেখানে লাশের কপালে গুলি করার প্রমাণ আছে। আর ওই গুলির ধাঁচ একদম পেশাদার কারোর কাজের প্রমাণ দেয়।

আরো আছে, অনেক ফাঁক রয়ে গিয়েছিল ওই গপ্পতে। রাসপুটিন মিষ্টি জাতীয় বস্তু খেতো না ,তার বিশ্বাস ছিল ওতে তার ক্ষমতা চলে যায়।পুরো কাহিনী একটা প্রচলিত ভুতের গপ্পের ধাঁচে সাজানো হয়েছিল।

তিনি আরো প্রমাণ তুলে ধরেন ওই স্বীকারোক্তিমূলক বইটিকে তুলে ধরে দেখান যে, ফেলিক্স এর ওই বিষ প্রয়োগ এর প্রমাণ পাওয়া যায় নি। এছাড়া ফেলিক্স এর নিজের স্মৃতিকথা থেকেই উঠে এসেছে একটি ব্রিটিশ চরিত্র যাকে ফেলিক্স অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির লোক বলেছিলেন। সেই লোকটি হলো অসওয়াল্ড রেনার। পাঠক কি বুঝছেন ? আর চরিত্রটি হঠাৎ এসেছে ওই খুনের ঘটনার সময়ে।

এতেই থেমে থাকেন নি কুলেন এবং এই রহস্যভেদের সংগঠক এন্ড্রু কুক। তারা পুরোনো নথি থেকে বের করেন অসওয়াল্ড রেনার এবং জন স্কেলস ছিলেন দুই ব্রিটিশ এজেন্ট। স্কেলস এর মেয়ে এই কাজে সহায়তা করেন, এ ছাড়া কুক সেই সময়ের ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স এর গোপন নথি ও খুঁজে বের করেন যাতে ওই কাজ করার নির্দেশ পরিষ্কার ভাবে ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগ এর থেকে এসেছিল এবং তাদের দ্বারাই হয়েছিল ওটা প্রমাণ হয়।

রাসপুটিন কেন ?

কারণ ছিল সেই আন্তর্জাতিক প্যাঁচ। তৎকালীন জার্ কারোর পছন্দের লোক ছিল না। একে তো ঘরের মানে দেশের মানুষ ছিল ক্ষেপে তার উপর ব্রিটিশদের দরকার ছিল রাশিয়ার উপস্থিতি যাতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান শক্তিকে পরাস্ত করা যায়। কি করে? ওটাই প্যাঁচ ! পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মান বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার সমূহ কারণ ছিল, তাই জার্মান শক্তিকে দুটি দিকে ব্যস্ত করার দরকার ছিল। রাশিয়া মানে জার্ ওই যুদ্ধের থেকে নিজেদের অব্যাহতি আর জার্মানির সাথে হাত মেলানোর একটা পরিকল্পনা করছে, এইরকম একটা খবর ছিল ব্রিটেনের। এর উপর রাসপুটিন এর আগের সাক্ষাৎকার এবং তার প্রভাবে জার্ যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারে এই অনুমান করেছিল ব্রিটিশ শক্তি। সুতরাং, রাসপুটিন এর সরে যাওয়াই ছিল দরকার।

পাঠক খেয়াল করুন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও একই কাজ হয়েছিল, মানে যতদিন জার্মানি সোভিয়েত রণাঙ্গন এর দিকে যায়নি মানে সখ্যতা রেখেছিল , ততদিন মিত্রপক্ষের অবস্থা ছিল অতীব শোচনীয়। হিটলার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি!

পুরো রিপোর্ট থেকে একটাই কথা মনে হয় , লোকটি একটি প্রথম শ্রেণীর ঠগবাজ এবং সম্মোহন আর মানুষের উপর প্রভাব বিস্তারের কিছু গুণাবলী সম্পন্ন ছিল তবে সুযোগ নিয়েছিল সেই সময়ের মানুষের অজ্ঞানতার কারণে। অবশ্য এখনো বিবিধ পীর বা বাবা যা খেলা দেখাচ্ছে তাতে মানুষের আত্ম-উন্নয়ন এর উপর প্রায়শই শ্রদ্ধা উঠে যায়। রাসপুটিন এর যৌনক্ষমতা বা অন্য কাঁদা ঘাঁটার কাজ করলাম না, কারণ এর মূল রহস্য ভেদ এর উপর লেখাটাই ছিল আমার উদ্দেশ্য।

হয়তো আরো অনেককিছু সংযোজন করতে ভুলে গিয়েছি। চোখে পড়লে বলবেন, অসঙ্গতি দেখলেও বলবেন। আমি নির্দ্বিধায় সংশোধন করবো। আবার বলছি, এই ব্যস্ততার মধ্যে লেখাটা পড়ে ফেলার জন্য অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই।

তথ্যসূত্র :
১. http://time.com/4606775/5-myths-rasputin/
২. http://www.bbc.com/news/world-europe-38469903
৩. http://www.telegraph.co.uk/…/Britain-killed-Rasputin-claims…
৪. Yusupov, Felix. “Lost Splendor: the amazing memoirs of the man who killed Rasputin.”
৫. http://www.bbc.co.uk/…/…/2004/09_september/19/rasputin.shtml
৬. http://www.telegraph.co.uk/…/British-spy-fired-the-shot-tha…
৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Oswald_Rayner
৮. চাইলে পুরো ডকুমেন্টারিটি দেখতে পারেন https://www.youtube.com/watch?v=bZObqTuk_Hs
৯. শেষ পাতে ,একদম বিষয় বহির্ভুত তবু বনি এম এর এই গানটি দিলাম। বেশ সুখশ্রাব্য, শুনে থাকবেন, সে ক্ষেত্রে এড়িয়ে যান। আর না শুনলে শুনে নিন।  https://www.youtube.com/watch?v=kvDMlk3kSYg

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top