ফ্লাডলাইট

হাই প্রোফাইল বোলিং কোচ, বিবর্ণ বোলিং এবং অতঃপর…

হাই প্রোফাইল বোলিং কোচ, বিবর্ণ বোলিং এবং অতঃপর...- Neon Aloy

একজন কোচ যত ভালোই হোক আর তার ক্যারিয়ার যতই সমৃদ্ধ হোক তার ছাত্ররা যখন ফলাফল এনে দিতে ব্যর্থ হয় তখন তার কোচিং নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কোর্টনি ওয়ালশের বেলাতেও তাই হচ্ছে।

হিথ স্ট্রিক যাবার পর থেকেই পেস বোলিং দিন দিন হতাশার সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিষয়টা বিসিবির নজরে আসেনি সেটা না, এসেছে। আসার পরেই বিসিবি চাম্পাকা রামানায়েকের সাথে যোগাযোগ করে। চাম্পাকা জিম্বাবুয়ের সাথে সিরিজ পর্যন্ত শ্রীলংকার বোলিং কোচ ছিলেন। বিসিবি চেয়েছিলো ওয়ালশকে একাডেমি এবং তরুন বোলারদের জন্য কাজে লাগাতে আর চাম্পাকাকে জাতীয় দলে আনতে। চাম্পাকাকে যারা ভুলে গেছেন তাদের মনে করিয়ে দেই চাম্পাকা রামানায়েকে বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী বোলিং কোচ। তার সময়েই মাশরাফি-নাজমুল-রাসেল এই তিন পেসার আলো ছড়িয়েছেন। টেস্টে শাহাদাত। রামানায়েকের দুই বছর মেয়াদে তৎকালীন স্পিন নির্ভর বাংলাদেশে রাসেল, নাজমুলরা যথেষ্ঠ ভালো ফলাফল দেয়। জাতীয় দলের সিনিয়র প্রতিটা প্লেয়ার চাম্পাকাকে সেরা পেস বোলিং কোচ মানে। চাম্পাকা মেয়াদ শেষে পারিশ্রমিক বাড়ানোর দাবি করলে বিসিবির সাথে মতানৈক্য থেকে তার বিদায়। অন্য কোন সমস্যা ছিলোনা।

সেই রামানায়েকে আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারতেন, কিন্তু কেন হয়নি? কারন বিসিবি সবার আগে প্লেয়ারদের মতামত নিয়েছিলো। এবং প্রতিটা প্লেয়ার ওয়ালশের পক্ষে ছিলেন। জাতীয় দলের কোচিং স্টাফদের ভেতর ওয়ালশ সর্বাধিক প্রিয় শিক্ষক। বিশেষকরে যেকোন প্লেয়ারকে মোটিভেট করার ক্ষেত্রে তার নাকি জুড়ি নেই। সবাইকে দারুন অণুপ্রানিত করেন ওয়ালশ। প্লেয়ারদের মতের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয় পরিকল্পনায়, ওয়ালশ থেকে যান জাতীয় দলে। রামানায়েকে যোগ দেন একাডেমি দলের সাথে। এটা কাগজে কলমে। জাতীয় দলের প্রায় সবার সাথেই রামানায়েকে কাজ করেন।

জাতীয় দলের রাডারে দুইজন পেস বোলিং কোচ থাকার পরেও আমাদের পেসারদের এমন নির্বিষ, নিরীহ, অকার্যকর কেন মনে হচ্ছে?

২০১৫ সালের কথা বারবার আসে। সেসময় তাসকিন, মুস্তাফিজ, রুবেল দারুন করেছেন বল হাতে। কিন্তু সমস্যা আসলে হয়েছে এই তিনজনই যখন মাঠের বাইরে চলে যান তারপর থেকে। মিলিয়ে দেখেন, তাসকিনের নিষিদ্ধ হয়ে একশান চেঞ্জ, মুস্তাফিজ আর রুবেলের ইনজুরিতে বাইরে চলে যাওয়া। তিনজনই ফেরার পর ধার হারিয়েছেন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তাসকিন আর মুস্তাফিজ তখন তুলনামূলক নতুন ছিলো, বাংলাদেশের পিচে তাসকিনের পেস আর মুস্তাফিজের কাটায় সাউথ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ভারত সবার জন্যেই অপ্রত্যাশিত ছিলো। হয়তো সেই সুবিধা আমরা তখন পেয়েছি। এখন তাদের নিয়ে যথেষ্ঠ গবেষনা হয়েছে, ফলে তারা এখান অনেকটাই খোলা বইয়ের পাতা!

ওয়ালশের ব্যর্থতা এখানেই, তাসকিন, মুস্তাফিজ অথবা রুবেল কারো ভান্ডারেই নতুন কিছুই যোগ হয়নি। আসলে কি তাই? গতবছর ইংল্যান্ডের সাথে চার উইকেট পাবার পর মাশরাফি বলেছিলেন ওয়ালশ তার বল গ্রিপ করার ধরন সামান্য বদলে দেয়, ওয়ালশ বলেন “এখন তোমার বল সাপের মতন ভেতরে ঢুকবে”। মাশরাফি নিজে বলেন এরপর থেকেই তার বল আগের চেয়ে ভেতরে বেশি ঢুকছে। সেই একই ওয়ালশ কেন তাসকিনকে ইন সুইং শেখাতে পারেনি! মুস্তাফিজ কেবল রিভার্স সুইং শিখছেন!

ধরে নিলাম ওয়ালশ নেই। আমাদের কোন বোলিং কোচই নাই ধরাযাক, তবুও তাসকিন, রুবেল, মুস্তাফিজ সবাই বয়সভিত্তিক, জাতীয় লীগ, ডিপিএল, বিপিএলে খেলে থাকেন, সেখানকার কোচরা কিছু শেখায় না? আসলে ওভারে ছয়টা বল ভালো জায়গায় ফেলতে কোচ লাগেনা, লাগে একুরেসি। আর সেজন্য প্রচুর অনুশীলন লাগে। আপনার ইয়োর্কার হয়না? ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করেন! নেটে একা একাই করা যায় সেটা। কোন এক বোলার (দুঃখিত নাম ভুলে গিয়েছি) ছিলেন তিনি পিচের উপর কয়েন রেখে সেখানে একটানা বল ফেলার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা একা একা বল করতেন! আমাদের বোলারদের তো জায়গায় বল ফেলতেই সমস্যা? কোচের দোষ কিভাবে দেই বড় করে? ব্যাটসম্যানের মেজাজ বুঝে বল করা, জায়গায় বল ফেলা, ব্যাটসম্যানকে নতুন বল খেলানোর চেষ্টা করা এই ব্যাসিক জিনিসগুলা একজন বোলার এমনিতেই জানে, তাইনা? মাশরাফির দিকে তাকাই, কোচ বদলের সাথে মাশরাফির কি আহামরি বোলিং পাল্টেছে?

রুবেল যখন বাইরে থাকে জাতীয় দলের তখন জাতীয় লীগ, বিসিএল ইত্যাদিতে পাঁচ ছয়টা উইকেট পান, জনতার দাবি উঠে দলে নেয়ার, কিন্ত জাতীয় দলে এসে কিছুই তো হয়না বলার মতন? কেন?

মুশফিকের মতে, ওয়ালশ শুধু সেখানই না, নিজে বোলিং করে দেখান নেটে, ওয়ালশের বল এখনো নেটে আমাদের ব্যাটসম্যানরা ড্রাইভ করতে পারেনা, লং অনে মারতে পারেনা। কোচ নিজে করে দেখানোর পরেও কেউ পিক করতে পারছে না বোলাররা!

আমরা এখন এটাও জানি ইনজুরির ভয়ে বোলাররা নেটে ৪/৫ ওভারের বেশি বলই করেন না। ইনজুরিতে পড়লে অনেক কিছু মিস হতে পারে, সামনে বিপিএল তারপর শ্রীলংকা সিরিজ। অথচ নেটে নিয়মিত ১০ ওভার বল করা উচিৎ একজন পেসারের সেটাও ম্যাচের মত মানসিকতা নিয়ে!

তাহলে উপায়? সরিয়ে দেন ওয়ালশকে। তবে এটাও ভাবতে হবে আমাদের বিদেশি কোচদের বিদায় ভালো হয়না। কারো বিদায় সুখের হয়নি। যার জন্য বড় আর ভালো কোচেরা বাংলাদেশে আসতে চায়না , মুরালিধরন, ম্যাকগিল, গাঙ্গুলী কেউই দীর্ঘমেয়াদে আসতে চায়নি। গ্রিনিজের বিদায়, স্টুয়ার্ট ল, সিডন্স কেউই হাসিমুখে যায়নি। তাদের সবার চেয়ে ওয়ালশের বিষয়টা আরো স্পর্শকাতর। তাকে যেনতেন করে বিদায় দিলে বাংলাদেশের উপর একটা কালো ছিল পড়ে যাবে ভবিষ্যতে।

আর ওয়ালশের পছন্দের ছাত্র শুভাশীষ, রাব্বি, শফিউল। নিউজিল্যান্ড সিরিজের পর ওয়ালশ বলেছিলেন রাব্বি ছাত্র হিসেবে সবচেয়ে ভালো, সে প্রচুর প্রশ্ন করে, টেকনিক্যাল বিষয় শিখতে চায়। কিউই সফরে বেশ ভালো করেও রাব্বি সাউথ আফ্রিকা ট্যুরে নেই কেন? তাসকিন থাকলে রাব্বিও থাকতে পারতো। শুভাশীষকেও দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে তাসকিনকে রেখে!

ওয়ালশ না হয় শিখাচ্ছে না, স্ট্রিক যা শিখেয়েছিলো সেটাও কি ভুলে গেছে পেসাররা? মাঠে যখন কিছুই হয়না তখনো তারা “ব্রেইনলেস” বোলিং করে যায় কেন?

ওয়ালশকে হয়তো বিদায় নিতে হবে, বিশেষকরে ঘরের ভেতর যখন চাম্পাকা রামানায়েকে আছে অপশন, কিন্তু পেসাররা যদি ব্যাসিক ভুল করেন তাহলে কোন লাভই হবেনা।

অনেকে বলেন বিসিবির সাথে টাকা নিয়ে বনিবনা না হবার কারনে স্ট্রিক চলে যান, ডাহা গুজব এটা। টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ চলার সময়েই স্ট্রিকের সাথে জিম্বাবুয়ে যোগাযোগ শুরু করে, এবং স্ট্রিক দেশে ফিরে প্রথম সাক্ষাৎকারেই বলেন, “নিজের দেশ যখন ডাকে তখন আর কিছুই ভাবার অবকাশ থাকেনা”। তারা হোয়াটমোরকে সরিয়ে স্ট্রিককে হেড কোচ করেছে এখন বোলিং কোচ মাখায়া এনটিনি ভালো করার পরেও তাকে সরিয়ে দিচ্ছে ডিসেম্বর মাসে।

আর পেসারদের উন্নতি চাইলে ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেটের পরিবর্তন আনতে হবে। পেস বান্ধব কিছু বাউন্সি উইকেট করতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটের ঐতিহ্য পেসাররা এক দুই ওভার মার খেলেই স্পিন আনার কালচার বদলাতে হবে। কারন শিক্ষা ঘর থেকেই শুরু হয়।

Most Popular

To Top