নাগরিক কথা

সুবোধের সাথে পরিচিত হলাম যেদিন…

সুবোধের সাথে পরিচিত হলাম যেদিন...

সুবোধের সাথে আমার পরিচয় হয় ডি জি এফ আই এর অফিস ক্যান্টনমেন্টে যাবার সময়। শ্যামলী থেকে আমরা পুরানো বিমানবন্দরের কাছে আসতেই দেখি সুবোধের সেই অতি পরিচিত গ্রাফিত্তি। পুরোনো বিমান বন্দরের দেয়ালে সেগুলো আঁকা রয়েছে।

আমার বাবা আগের দিন রাত থেকেই আমাকে তালিম দিচ্ছিলেন, “বুঝলা বাবা, ঘাউড়ামি করবা না। ডি জি এফ আই এর অফিসে গিয়ে আগে উনাদের সালাম দিবা। সুন্দর করে জানিয়ে দিবা যে তুমি আওয়ামীলীগ কর এবং জয় বাংলার সমর্থক। উনারা যা বলবে হাসিমুখে তা মেনে নিবা এবং বলবা উনারাই সঠিক আর তুমি ভুল। এই দেশ চালায় এখন ডি জি এফ আই। এদের সাথে উচ্চ বাচ্য করা যাবে না”।

আমি বাবার এইসব কথা শুনি আর মনে মনে দীর্ঘঃশ্বাস ফেলি। আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগে যখন আর্মিতে পরীক্ষা দেই, তখন আমার বাবাই বলেছিলো “আমার ছেলে কেন আর্মিতে যাবে? আমি ওকে একটা স্বাধীন জীবন দিতে চাই”।

আমি সেসব মুহুর্তেই মনে করতে থাকি। আমার ভেতরের কষ্ট দলা দলা হয়ে গলায় এসে আটকায়। সন্তানের কথা চিন্তা করে কি সব বাবারাই এমন পরাজিত হয়ে যান? কি জানি…

রাতের বেলায় আমার এক বড় ভাই মেজর (রিটায়ার্ড), তিনি আমাকে বললেন, “তুই পালিয়ে যা। ওরা তোকে ওখানে নিয়ে টর্চার করতে পারে”।

আমি চুপ করে থাকি। কোনো কথা বলিনা।

বাবার তালিম দেয়া এখানেই শেষ না। সকাল বেলাতে উঠেই তিনি আমাকে জাগানো শুরু করলেন। বললেন, আর্মিরা দেরী পছন্দ করে না। সময় মত যেতে হবে। আর কিছুক্ষন পর পর এসে বলেন, “আরে ভয়ের কিছু নাই। কিচ্ছু হবে না। তিনি আমার আশে পাশে ঘুর ঘুর করেন, আর বলেন কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হবে না।”

মা সকালে নাস্তার টেবিলে জানালেন, বাবা সারারাত এক ফোঁটা ঘুমান নি। ৬ টার মত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছেন কিন্তু ঘুম আসেনি। খাবার টেবিলের পাশে আমার মা দোয়া দুরুদ পড়ে, সুরা পড়ে আমাকে ক্রমাগত ফুঁ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

আমি বাবার এসব কর্মকান্ড দেখে একদিকে বিরক্ত অন্যদিকে একা একা হাসি। ছেলের জন্য সব বাবা-মা চিন্তা করেন। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ভয় পেয়েছেন বুঝতে পারি।

আমি অনেক জোরাজুরি করলাম যে আমি একা যাব সি এন জি তে করে। কোনোভাবেই বাবা সেটা মানবেন না। উনি সাথে যাবেন-ই। এমনকি ডি জি এফ আই এর যে রুমে বসে আমি কথা বলেছি সেখানে ঢুকবার জন্যও তিনি কর্ণেল সাহেবকে কয়েকবার অনুরোধ করলেন। বললেন “ভাই প্লিজ আমি থাকি। আমি একটা কথাও বলব না” কর্ণেল সাহেব বললেন “সরি, আমরা শুধু ছেলের সাথে কথা বলব। ফাদার ইজ নট এলাউড”।

আমার ভেতরের সে মুহুর্তের হাহাকার, যন্ত্রণা আমি হয়ত কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আহারে বাবা…আহা…

আমরা যখন পুরোনো বিমানবন্দরের সামনে এলাম তখন সুবোধকে দেখে। চমকে উঠি। বাবাকে বললাম, “আব্বা এই এই দেয়ালের ছবি দেখসেন? এটা কিন্তু আমাদের মত ছেলেরা কিংবা আমি”।

আব্বা আমার কথা শুনে প্রচন্ড বিরক্ত হয়। বলেন “কি সব এঁকে দেয়াল নষ্ট করসে। যত্তসব। আল্লাহ আল্লাহ কর। ফাবে আইয়ে আলা রাব্বেকুমা তু কাজ্জিবান পড়তে থাকো। মিলিটারি বড় শক্ত জিনিস”।

বাবার এই কথা শুনে আমি হো হো করে হাসি। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা আমার ফুফাতো ভাইও আমার হাসিতে বিরক্ত হয়।

আমার বুকটা ভেতরে ভেতরে রক্ত ক্ষরণে বিদীর্ণ হয়ে রয়েছে। কেন বিদীর্ণ হয়ে রয়েছে আমি তা জানিনা। জানলেও এসব বলতে আমার ইচ্ছে করেনা।

আমার চাচা, ফুফু, মামা, খালা, আত্নীয়-স্বজন সবাই শুধু আমাকে বলে, “আমি কেন লিখি। এসব লিখে কি হবে? এসব লিখে শুধু শধু সবাইকে আমি নাকি বিপদে ফেলেছি। আমাকে হয় মোল্লারা তা না হয় সরকার মেরে ফেলবে। আমি কি মৃত্যুকে ভয় পাইনা?”

এমন সব অসংখ্য প্রশ্ন আমার দিকে ধেয়ে আসতে থাকে।

আমি এসবের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনা। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে আমাকে বড় কঠিন করে বলতে হবে। দু’দিনের জন্য দেশে বেড়াতে এসে আমি কাউকে আহত করতে চাইনি। আমি তাই চুপচাপ বসে থাকি…

ডি জি এফ আই অফিসের ১১ তলায় ইন্টারনাল এফেয়ার্স ব্যুরোতে গিয়ে মেজর রফিক (ছদ্দনাম) ভদ্রলোককে দেখে আমার খানিকটা অবাক লাগে। সুদর্শন, স্মার্ট। অনায়াসে এই ভদ্রলোককে সিনেমায় নামিয়ে দেয়া যায়। একবার ভাবলাম তাঁকে আমার ভেতরের দহনের কথাটা বলি। কাউকে খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো সব কথা। পরের মুহুর্তেই ভাবি, দুই বছরের ট্রেনিং-এ এরা বোধশূন্য হয়ে গেছে। বলে কোনো লাভ নেই।

প্রশ্ন পর্বের শুরুতেই কর্ণেল সাহেব আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “মজুমদার সাহেব বলেন দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি কেমন?”

এই প্রশ্ন করেই ভদ্রলোক তাঁর ভাইবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তার ঠিক পর পর একটা ফোন আসে। উত্তরটা আর কষ্ট করে দিতে হয়নি আমাকে…

শুরুটা করেছিলাম সুবোধের গ্রাফিত্তি দিয়ে। শেষও করি সুবোধকে দিয়ে।

আমরা প্রত্যেকেই এখন এক একজন সুবোধ। আমাদের সময় পক্ষে না। আমাদের বুকের উপর এসে থানার এস আই এসে চোখ খুলে নেয়, আমাদের চোখে গুলি করে আমাদের চোখ অন্ধ করে দেয়, সরকার আবার এই অন্ধ আমাদের চাকুরীর ব্যবস্থা করে। আমরা আজকে সুবোধ বলে বাসের মধ্যে আমাদেরকে ধর্ষন করা যায়, আমাদেরকে গুম করে ফেলা যায়, আমাদেরকে হাত বেঁধে, চোখ বেঁধে হত্যা করা যায়।

আমরা প্রত্যেকে আজ সুবোধ। সেই উষ্কু খুষ্ক চুলের, উদ্ভ্রান্ত চাহনির সুবোধ। এই দেশ এখন আমাদের নয়। এই দেশের মাটি, এই দেশের হাওয়া এখন শুধু মাত্র রাজনীতিবিদ্দের, শুধু ক্ষমতাসীনদের।

আমার পরিচিত নিখিলেশ নামের কোনো বন্ধু নেই। তা না হলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে অন্তত বলা যেতে পারতো,

“আমরা কেমন করে বেঁচে আছি, তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ…দেখে যা”।

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top