টুকিটাকি

নোবেল পুরস্কারের সৎ ভাই- “ইগ নোবেল”!

কয়েকদিন আগেই ঘোষিত হল আলোচিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম। সাহিত্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ আরো বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন গুণী ব্যাক্তিরা। সম্ভাব্য প্রার্থীরা আশা- উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে ছিলেন হয়তো, নিজের কাজের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ফোন পাওয়া এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননার অধিকারী হিসেবে অভিনন্দন প্রাপ্তি। নিজের দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিকভাবেও উনারা এখন সম্মানিত মানুষদের মধ্যে একজন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোক তাদের এবং তাদের কাজ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, আর বাংলাদেশীদের তো বিসিএসের জন্য অবশ্য পাঠ্য। আমি নিজেও মুখস্ত করছি “যদি একটা কমন পড়ে” এই উদ্দ্যেশ্যে। কিন্তু নোবেলের কথা জানলেও ইগ নোবেলের কথা আমরা কয়জন জানি?

ইগ নোবেল হল নোবেল পুরস্কারের প্যারোডি সংস্করণ, যার মটো হচ্ছে “সম্মানজনক অর্জন, যা মানুষকে প্রথমে হাসায় এবং পরে ভাবায়”।

১৯৯১ সাল থেকে সাইন্টিফিক হিউমার ম্যাগাজিন এবং ইম্প্রোবেবল রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগে এই অদ্ভুত নোবেলটি দেয়া শুরু হয় এবং আজ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত আছে।

ওয়ান পিস মেড

ইম্প্রোবেবল রিসার্চের সম্পাদক এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক আব্রাহাম যখন এই পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তখন ঠিক করা হয় যে এমন আবিষ্কারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে যা “ক্যান নট অর শুডনট বি রিপ্রডিউসড”।
নোবেল পুরস্কারের মতই এখানেও শান্তি, চিকিৎসা, রসায়ন সহ অন্যান্য বিষয়ে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পাশাপাশি পাবলিক হেলথ, ইঞ্জিনিয়ারিং সহ অন্যান্য ইন্টারডিসিপ্লিনারি শাখাতেও পুরস্কার দেওয়ার ব্যাবস্থা আছে। প্রতিবছর দশটি শাখায় পুরস্কার প্রদান করা হয়। উদ্ভট কিন্তু প্রয়োজনীয় সব মৌলিক অবদানের জন্য।

স্যাটায়ার এবং হাস্যরস

নানা হাস্যকর আবিষ্কারের জন্য ইগ নোবল বিখ্যাত হলেও, স্যাটায়ার ধর্মী কিছু পুরস্কারও তারা দিয়ে থাকে। যেমন: কলোরাডো শিক্ষা বোর্ড এবং কানসাস শিক্ষা বোর্ডকে তাদের শিক্ষক মূল্যায়ন বাজে পদ্ধতির জন্য “হোমিওপ্যাথিক রিসার্চ” দেওয়া হয়েছিল।

ইগ নোবেল পুরস্কার

তবে ইগ নোবল কর্তৃপক্ষ প্রধানত অদ্ভুত সব আবিষ্কার নিয়ে লেখা বৈজ্ঞানিক আর্টিকেলের মধ্য থেকেই তাদের পুরস্কারের উপযুক্ত আবিষ্কারগুলোকে বাছাই করে নেয়।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান

বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই কিন্তু এই নোবেল দেওয়া হয়ে থাকে। আগে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির লেকচার হলে এই পুরস্কার প্রদান করা হলেও এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যান্ডারস থিয়েটারে অনুষ্ঠানটি পালন করা হয়।পুরো প্রোগ্রামের কো-স্পন্সর হিসেবে আছে হার্ভার্ড কম্পিউটার সোসাইটি, হার্ভার্ড- র‍্যাডক্লিফ সায়েন্স ফিকশন এসোসিয়েশন এবং হার্ভার্ড-র‍্যাডক্লিফ সোসাইটি অফ ফিজিক্স স্টুডেন্ট।

ইগ নোবেল পুরস্কারের সার্টিফিকেট

অনুষ্ঠান আরম্ভ হয় প্যারেড অফ ইগনিটারি দিয়ে। এরপর বিভিন্ন ঠাট্টা তামাশার মধ্য দিয়ে পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করা হয়। মিউজিয়াম অফ ব্যাড আর্ট থেকেও আয়োজকরা পারফর্মার নিয়ে আসেন উপস্থিত অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য। মিস সুইটি পু নামে একজন মিষ্টি ছোট মেয়েকে রাখা হয়, যদি কোনো বক্তা দীর্ঘসময় ধরে নিজের বক্তব্য দিতে থাকেন তবে এই সুইটি পু এর কাজ চিৎকার করে বলা “প্লিজ বন্ধ করুন, আমি বিরক্ত হচ্ছি”।

মজার বিষয় হচ্ছে ইগ নোবেল মনোনয়ন প্রাপ্তদেরকে খোদ সত্যিকারের নোবেল জয়ীর হাত দিয়েই পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠান এর শেষ পর্ব হল ঐতিহ্যবাহী কাগজের প্লেইন উড়ানোর উৎসব। পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসর রয় জে গ্লোবারকে এই অনুষ্ঠানের অফিসিয়ালি “কিপার অফ দি ব্রুম” মানে ঝাড়ুদারের পদ দেওয়ায় উনাকে সবসময় অনুষ্ঠানের পরদিন ভার্সিটির সুইপারের সাথে এসব কাগজের প্লেন পরিস্কারে হাত লাগাতে হয়। তবে তিনি ২০০৫ সালে এই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, কারণ তখন সত্যিকারের নোবেল পুরস্কার নেওয়ার জন্য গ্লোবারকে স্টকহোম যেতে হয়েছিল।

কাগজের বিমান উড়ানোর মাধ্যমে পুরস্কার বিতরণের সমাপ্তি

সবার শেষে একটা বাক্য বলে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো উৎসবের সমাপ্তি করা হয় “আপনি যদি পুরস্কার না পেয়ে থাকেন কিংবা পেয়েও থাকেন, আপনাকে পরবর্তী বছরের জন্য শুভকামনা রইল”।

সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি  জাতীয় রেডিও চ্যানেলে রেকর্ড করা হয় এবং ইন্টারনেটে লাইভ দেখা যায়। এছাড়া প্রতিবছর থ্যাংকস গিভিং ডে’র পরবর্তী শুক্রবারে এই প্রোগ্রাম আবার ব্রডকাস্ট করা হয়।

ইগ নোবেল জয়ীদের নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্যুর করানো হয়, যার মধ্যে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া এবং ইটালির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।

২০১৭ সালের ইগ নোবেল বিজয়ীরা এবং তাদের অদ্ভুত আবিষ্কার

পদার্থবিজ্ঞান
মার্ক এন্টোইন ফারডিন একটি বিড়াল কি একই সাথে সলিড এবং লিকুইড দুটোই হতে পারে কিনা এই প্রশ্নের প্রমাণ দেওয়ার জন্য ফ্লুইড ডায়নামিক্স ব্যাবহার করেন। ফ্লুইড ডায়নামিক্সের এমন অগতানুগতিক ব্যাবহারের জন্যই তাকে মনোনিত করা হয়।

শান্তি
ডীডিগেরো কি জানেন? আমেরিকা সহ বিভিন্ন জায়গার আদিবাসীরা শিকারের জন্য যে ব্লোপাইপ ব্যাবহার করত তাদের এই নামে ডাকা হত। মিলো পুহান, এলেক্স সুয়ারেজ, ক্রিসচিয়ান লো ক্যাসিও, মারকুস এইটজ এবং অটো ব্রান্ডেলি এই মোট পাঁচ জন মানুষ স্লিপ এপ্নিয়া এবং নাক ডাকার সমস্যার কার্যকরী চিকিৎসা হিসেবে ডীডিগেরোর প্রাত্যহিক ব্যাবহারকে ডেমনেস্ট্রেট করে দেখান। তাদের সফল আবিষ্কারই শান্তিতে ইগ নোবেল এনে দেয় এই পাঁচজনকে।

ইকোনমিক্স
আপনি কি জুয়া খেলেন? জুয়া না খেললে নাই, কিন্তু যদি খেলেন তবে আপনার কাছে একটা প্রশ্ন আছে “আজকে আপনি যদি কোনো কুমিরের সংস্পর্শে আসেন তবে কালকে কি আপনার জুয়া খেলার ইচ্ছা হয়?” আমাকে নিশ্চয়ই পাগল ভাবছেন, কারণ জুয়া খেলা আর কুমির দুইটা দুই মেরু। এই দুই মেরুর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার জন্য অর্থনীতির ইগ নোবেলটা ম্যাথু রক্লফ এবং ন্যান্সি গ্রিরকে অবশ্যই দেওয়া যায়।

এনাটমি
আমির খানকে দেখে প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল তার কানগুলো এমন পাখার মত কেন? অনেকেরই মুখের চেয়ে সাইজে বড় কান দেখা যায়। কিন্তু জেমস হিথকোটের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল “কেন বৃদ্ধ মানুষদের কান বড় হয়?” এই জিনিস নিয়ে যে গবেষণা করা যায় সেটাই আমি জানতাম না। যাই হোক, মহান এবং যুগান্তকারী এমন গবেষণার জন্য ইগ নোবেল ঠিক লোকের হাতেই গিয়েছে।

জীববিজ্ঞান
পিউর সাইন্সের ব্রাঞ্চের পুরষ্কার পেতে হলে আবিষ্কার নিশ্চয়ই পিউর হতে হবে, তেমনি এক পিউর(!) আবিষ্কার করেছেন কাজুনরি ইয়োশিজাওয়া, রোড্রিগো ফেরেরিয়া, চার্লস লিনহারড এবং ইয়োশিতাকা কামিমুরা। উনারা গুহার কিছু পোকার উপর পর্যবেক্ষণ করে ফিমেল পেনিস এবং মেল ভ্যাজাইনা আবিষ্কার করেছেন।

ফ্লুইড ডায়নামিক্স
ধরুন, আপনার হাতে একটা কফির কাপ আছে যাতে গরম কফি টলটল করছে,আপনি সেই কাপ হাতে পিছনদিকে হাঁটা আরম্ভ করলেন এবং আপনার দৃষ্টি কিন্তু সামনের দিকে। এমন অবস্থায় কফি কাপ থেকে কফি পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। এখন বিষয়টা হচ্ছে, কফিটা যে পড়ে যাবে তার ডাইনামিক্সটা কেমন? কফির লিকুইড স্লোশিং এর ডায়নামিক্স নিয়ে কাজ করেই জিয়োন হান ফ্লুইড ডায়নামিক্সের ইগ নোবেল লরিয়েট হয়েছেন।

পুষ্টি
ভ্যাম্পায়ারদের নিয়ে আমরা সেই প্রাচীনকাল থেকেই কত হাবিজাবি বলে বেড়াচ্ছি। কিন্তু তাদের পুষ্টির কথা একবারো কেউ চিন্তাই করিনি। কিন্তু এতবছর পরে ফারনান্ডা ইটো, এন্রিকো বারনারড এবং রদ্রিগো টোরেস এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেছেন। তবে সমস্যা হচ্ছে আসল ভ্যাম্পায়ারতো আর পাওয়া যাবেনা এবং পাওয়া গেলেও তারা গবেষনায় কতটুকু সাহায্য করবে সেটাও দেখার বিষয়। অগ্যতা ভ্যাম্পায়ারের বদলে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটের ডায়েটে মানুষের রক্তের প্রভাব নিয়ে কাজ করেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এই মহান কাজের স্বীকৃতি দিয়ে ইগ নোবেল কর্তৃপক্ষও ধন্য হয়েছে।

মেডিসিন
কারো চিজ বা পনির ভালো লাগে আবার কারো ভালো লাগেনা। কিন্তু কেন ভালো লাগেনা সেটা নিয়ে নিশ্চয় কারোর কোনো মাথাব্যাথা নেই। তবে কিছু খাপছাড়া মানুষ এই ভালো না লাগার কারণ খুজতে ব্রেইন স্ক্যানিং টেকনিক পর্যন্ত ব্যাবহার করেছেন।
এমন গবেষণার জন্য জিন রয়েট,ডেভিড মিউনির,নিকোলাস টরকেট,আন্নি মেরি মউলি এবং টাউ জিয়াং পেয়েছেন মেডিসিনে ইগ নোবেল।

কগনিশন
মাতেও মারটিনি, ইলারিয়া বুফালারি, মারিয়া আন্তোনিত্তা স্টাজি এবং সাল্ভাতোর মারিয়া আগ্লিওতীর ইগ নোবেল প্রাপ্ত গবেষনার বিষয়বস্তু ছিল “অনেক আইডেন্টিক্যাল টুইন নিজেদের দৃশ্যমানভাবে আলাদা করতে পারেনা”।

অবস্ট্রেটিক্স
প্রেগনেন্ট মায়ের শরীরের অন্য স্থানের চেয়ে যদি পেটে ইলেক্ট্রোমেকানিকালি গান বাজানো হয়, তবে বাচ্চা গানের প্রতি বেশি সাড়া দেয়। এমন অদ্ভুত গবেষণা করে ইগ নোবেল পেয়েছেন মারিসা লোপেজ টেইজন, আলেক্স গারসিয়া ফোরা, পারটস গ্যালিনো এবং লুইস পালারেস আনিওরতে। তারা এই গবেষণার ভিত্তিতে পেটের বাচ্চার জন্য বেবিপড নামে একটি গান শোনার যন্ত্র বাজারজাতকরণের চিন্তা করছেন।

এমন অদ্ভুত সব গবেষণার কথা চিন্তা করলে সত্যিই হাসি পায়। আপনিও চেষ্টা করে দেখুন নাহয়,পরবর্তী ইগ নোবেল হয়তো ভাগ্যে জুটেও যেতে পারে!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top