লাইফস্টাইল

নবীন চিকিৎসকদের বেদনা কাব্য!

নবীন চিকিৎসকদের বেদনা কাব্য

১.
আমার এক ক্লোজড্ ফ্রেন্ড বুয়েটের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে এখন অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়েছে। কয়েকমাস আগে সে আমাকে জানালো তার এক কাজিন রিসেন্টলি ডাক্তারি পাশ করেছে, ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঠিক করতে আমার সাথে তাই কথা বলতে চায়।

‘ক্লিনিক্যাল নাকি নন-ক্লিনিক্যাল লাইন, ‘সার্জারি না মেডিসিন, ‘বিসিএস নাকি নন-বিসিএস’–ক্যারিয়ার সংক্রান্ত এ সমস্ত অপ্রিয় প্রশ্নে আমাকে প্রায়ই জর্জরিত হতে হয়। আমি হাসি হাসি মুখে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি।

বন্ধুর কাজিনের সাথে কথা হলো। তার প্রথম ও একমাত্র কথা–‘আমাকে একটা জব দেয়ার ব্যবস্থা করেন….’

নবীন চিকিৎসকদের অনেক ধরনের স্বপ্ন, প্রশ্ন ও চাহিদার সম্মুখীন আমি হয়েছি, তবে এ ধরনের চাহিদা আমার কাছে একেবারেই নতুন। আমি ভিমরি খেলাম, পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন না পড়লে মানুষের যে অবস্থা হয়, আমার তখন সেই দশা। দেশে নবীন ডাক্তারদের জব প্রাপ্তির কি করুণ দশা এবং কি দুর্দশার মাঝ দিয়ে এদের সময় অতিবাহিত হয় তা সেদিন দ্বিতীয় বারের মত আমি অনুভব করলাম।

২.
প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলি। ৪-৫ বছর আগের কথা। আমি তখন এক মোবাইল কোম্পানির ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করি- ফোনে কথা বলে চিকিৎসা সেবা প্রদান টাইপের ব্যাপার।

যতদূর মনে পড়ে- মর্নিং ডিউটিতে ৬০০ টাকা, ইভিনিং এ ৭০০ টাকা আর পুরো নাইট ডিউটি করলে তখন মিলতো ১০০০ টাকা। একদিন হিসেব করে দেখলাম প্রতি ঘন্টায় ১০০ টাকাও না।

একজন নবীন চিকিৎসক এদেশে তার মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে ঘন্টায় ১০০ টাকাও পান না! সে সময়টায় প্রথমবারের মত এদেশে নবীন চিকিৎসকদের দুর্দশার ভয়ঙ্কর রূপটি আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

৩.
মাস তিনেক আগে আম্মুর এক কলিগ বাসায় আসলেন। বিলিভ মি অর নট- উনি কেন তার ছেলেকে চিকিৎসক বানালেন তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আমার কাছে কাঁদলেন। ছেলেকে ডাক্তার বানানোর পেছনে তার যে “প্রত্যাশা ও পরবর্তী প্রাপ্তি” -এ দু’য়ের মাঝে যে এখন অনেক ফারাক।

পুরোনো ঢাকার এক হাসপাতালে ছেলেটি এখন ডাক্তার হিসেবে আছে, সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা করে মাসে ২০০ ঘন্টা ডিউটি, বেতন ২০০০০ টাকা। বেতন বেড়েছে তাহলে! ঘন্টায় এখন ১০০ টাকাও মেলে।

আমি আন্টিকে বললাম, “চাকরী বাদ দিতে বলেন, ওর ২০০০০ টাকার সাপোর্ট দেয়া আপনার জন্য কঠিন কিছু না, ট্রেনিং এ ঢুকতে বলেন।” এবার শুনলাম আরেক কাহিনী- হসপিটাল অথোরিটি নাকি সার্টফিকেট আটকে রেখেছে, ৬ মাস না হলে ফেরত দিবে না।

“কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়”- যে হাসপাতাল এসব নবীন চিকিৎসককে ব্যবহার করে হাজারে হাজার টাকা কামিয়ে এদের ঘন্টায় ১০০ টাকা দিতে গড়িমসি করে, সে একই হাসপাতাল কোন এক নবীন চিকিৎসকের সারা জীবনের অর্জিত শিক্ষা সনদ আটকে রাখতে দ্বিধা বোধ করে না। কি আস্পর্ধা! কার ছত্রছায়ায় এই কালপ্রিটরা বেড়ে উঠছে?

৪.
FCPS ট্রেনিং ও কোর্স কমপ্লিট করে BCS এ জয়েন করবো কি করবো না, সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ছিলাম। এমন সময় এক বিজ্ঞাপন নজরে পড়লো, এক প্রাইভেট হাসপাতালে এক জন ডাক্তার নিবে, বেতন আহামরি কিছু না।

হাসপাতালটা বাসার কাছেই, হাঁটা দূরত্বে, তাই যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। নির্ধারিত দিনে ভাইভার জন্য হাসপাতালে গিয়ে ওয়েটিং রুমে ঢুকে আমি থতমত খেলাম। For God’s sake! এক পোস্টের জন্য ৩৭ জন ভাইভা দিতে এসেছে।

নিজের মেডিকেলের দু’তিন জন জুনিয়র মেয়েকেও দেখলাম যারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাইভার জন্য পড়ছে। এ কি অবস্থা? এক চিকিৎসক তো চল্লিশোর্ধ!

একবার ভাবলাম-‘ফুটি’, তখনই আমার ডাক পড়লো, ভেতরে ঢোকার আগে চল্লিশোর্ধ লোকের বিধস্ত চেহারাটা নজরে এলো। ভাইভা শেষ হবার পর ভাইভার টেবিলেই আমাকে জয়েন করার জন্য বলা হলো। চল্লিশোর্ধ ব্যক্তির বিধ্বস্ত চেহারাটা কেন যেন মনে ভেসে উঠলো, আমি ভাইভার টেবিলেই জয়েন করবো না- তা জানিয়ে বের হয়ে এলাম। আমার মনে হয়েছিলো চাকরিটা আমার থেকে বাকীদের বেশী প্রয়োজন।

৫.
এই হলো আমার দেশের নবীন ডাক্তারদের অবস্থা। একে তো তেমন Job Scope নেই, আর যদিও জব পাওয়া যায়- সে তুলনায় ক্যান্ডিডেট অনেক।

Economics এর একটা পপুলার টপিক “Law of Supply and Demand”- যার মূল কথা “যখন চাহিদার (Demand) চেয়ে সরবরাহ (Supply) বেড়ে যায়, তখন পণ্যের দাম তার যৌক্তিক মূল্যের নিচে চলে যায়”…..

যে হারে এদেশে পিপড়ার সারির মত ডাক্তার বের হচ্ছে, সেই হারে কি নতুন নতুন Job Vacancy ক্রিয়েট হচ্ছে? ছোটো এই দেশে এত এত নতুন ডাক্তারের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? তাই সুযোগের ভালোই সদ্ব্যবহার করে হাসপাতালের মালিকগুলো।

দেশে যদি এই হারে আরও নতুন নতুন চিকিৎসক তৈরি হতে থাকে তবে নিশ্চিত থাকুন, এই প্রাইভেট হাসপাতালগুলোও একসময় অনারারী সিস্টেম চালু করবে। এমন সময় আসবে যে, প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র সকাল, দুপুর ও রাতের খাওয়া পাওয়া যাবে, তারপর পারফরমেন্স বিবেচনায় বেতনাদি দেয়া যেতে পারে। বিশ্বাস হচ্ছে না? অপেক্ষা করুন…..

৬.
বছর চারেক আগে এক নামী-দামী বাস সার্ভিসে কক্সবাজার যাচ্ছি। রাত ১০ টার দিকে বাস ছাড়লো। প্রতিটা ট্রিপেই শার্ট-টাই পড়া কোম্পানির একজন লোক থাকে সাহায্যকারী হিসেবে, পদের নাম সুপারভাইজার। ভাব জমালাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে যে মোটামুটি ঘন্টা দশেক সময় লাগে তার জন্য উনি পান ২৫০০ টাকার মত, ড্রাইভার সাহেব প্রতি ট্রিপে ৫০০০ টাকা পকেটস্থ করতে পারেন। শুনে মাথা একটু চক্কর খেল। আমি তখন ডাক্তার হিসেবে ঘন্টায় ১০০ টাকারও কম পাই। ২৪ ঘন্টা ডিউটি করলে হাতে পেতাম ২৩০০ টাকা। আর সুপারভাইজারের অবশ্য ধারণা- আমরা মাসে লাখ লাখ টাকা কামাই করি। কথা না বাড়িয়ে লজ্জায় নিজেকে সুপারভাইজারের কাছ থেকে গুটিয়ে নিলাম।

ইউরোপ- আমেরিকায় একজন নবীন চিকিৎসকদের বেতন কত- সে উদাহরণ আর টানতে চাই না। অসভ্য দেশে সভ্য দেশের নজির টানা অর্থহীন। মেধার মূল্যায়ন তো দূরের কথা, গ্রাজুয়েট তরুণ ডাক্তাররা তো এখন শ্রমিক হিসেবে অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতালে তাদের মজুরীটুকুও ঠিকমত পায় না। বাস ড্রাইভাররাও তাদের থেকে বেশী মজুরী পায়। ২৪ ঘন্টা ডিউটির জন্য একজন গ্রাজুয়েট তরুণ চিকিৎসক যদি এক বাস ড্রাইভারের দশ ঘন্টার ট্রিপের সমতুল্য অর্থ দাবী করেন- তবে সেটা কি খুব বেশী চাওয়া?

প্রাইভেটে জব করা এই গ্রাজুয়েট তরুণ চিকিৎসকদের দেখলে আমার মনে পড়ে দীনবন্ধু মিত্রের “নীল দর্পণ” নাটকের কথা। এদেশের মানুষকে যেমন তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নীলচাষে বাধ্য করা হতো, ঠিক তেমনি এদেশের ছেলেমেয়েদের তাদের অভিভাবকেরা ডাক্তারি পড়তে বাধ্য করে, একটার পর একটা সরকারী ও বেসরকারী মেডিকেলের অনুমোদন দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে বিভীষিকাময় অবস্থাকে আরো Facilitate করেছে। নীলচাষীদের উপর নীলকররা যেমন অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিলো, ডাক্তার হবার পর ঘন্টায় শ’খানেক টাকা মজুরী দিয়ে অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকেরাও সেই নীলকরদের ভূমিকায়ই অবতীর্ণ হয়েছে।

নীলচাষীরা এরপরও সাহসী ও ভাগ্যবান, ৫০ বছর ধরে নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়ে “নীলবিদ্রোহে”র সূচনার মাধ্যমে এই অত্যাচারের যবনিকাপাত তারা করতে পেরেছিলো। আমি নিশ্চিত- এই চিকিৎসকেরা আগামী ৫০০ বছরেও তাদের উপর চলা এই আর্থিক নির্যাতনের ব্যাপারে একত্র হয়ে টু’শব্দটিও করবে না।

Arthropoda পর্বের অন্তর্গত তেলাপোকা নাকি বেশ অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন প্রাণী। গ্রাজুয়েট ডাক্তার প্রজাতিটি তেলাপোকার মতই। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো এদের উপার্জনকে যদি আরো রেস্ট্রিকটেড করে, তবুও এরা সেটা নিয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করবে। আফসোস! শরৎচন্দ্রের “বিলাসী” গল্পের লাইনটা প্রায়শই মনে উঁকি দেয়–
“অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে”। নবীন ও প্রবীণ এই গ্রাজুয়েট ডাক্তাররা এভাবে আর কতদিন ‘টিকিয়া’ থাকবেন বলে পণ করেছেন?

বাংলা সাহিত্যে এক অসাধারণ ছোটগল্প “জোঁক”…আবু ইাসহাকের এই রচনাটি সত্যিকার অর্থে একটি মাস্টারপিস। এর প্রধান চরিত্র বর্গাচাষী ওসমান পঁচা পানিতে পাট কাটতে গেলে জোঁক তার পায়ে সেটে গিয়ে রক্ত চুষতে থাকে, ওসমানের ছেলে তোতা তা দেখিয়ে দিলে সে যাত্রা সে রক্ষা পায়।

এসময় বর্গাচাষী ওসমান ও তার ছেলে তোতা’র মাঝে যে কথোপকথন তা নিঃসন্দেহে বাংলা-সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদঃ

“—বা’জান কেমুন কইরা জোঁক ধরল তোমারে, টের পাও নাই?
—না রে বাজান, এগুলো কেমুন কইরা যে চুমুক লাগায় কিছুই টের পাওয়া যায় না। টের পাইলে কি আর রক্ত খাইতে পারে?
—জোঁকটা কত বড়, বাপপুসরে—
—দুও বোকা! এইডা আর এমুন কী জোঁক। এরচে বড় জোঁকও আছে…..”

কয়েকটি মাত্র লাইন, কিন্তু কি অসাধারণ! কি ব্যাপকতা! কি ভয়ঙ্কর গভীরতা লাইনগুলোয়!

দেশের স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিনিয়ত অবদান রাখা এই তরুণ চিকিৎসকদের রক্তও কিন্তু নীরবে নিয়মিত চোষা হচ্ছে। তরুণ চিকিৎসকদের রক্ত চুষে যারা টইটুম্বুর হচ্ছে, আমরা কি সেই বড় জোঁকগুলোকে চিনতে পারছি?

Most Popular

To Top