নাগরিক কথা

মুখোমুখি সাংবাদিক এবং পুলিশঃ জনসাধারণ কি ভাবছেন?

মুখোমুখি সাংবাদিক এবং পুলিশঃ জনসাধারণ কি ভাবছেন?- Neon Aloy

গতকাল থেকেই কয়েকটি ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের সবার ফেসবুক নিউজফীডে- একজন সাংবাদিকের পরনের টিশার্ট টেনে ধরেছেন একজন ট্রাফিক পুলিশ এবং পুলিশ সার্জেন্টের হাতে একটি ক্যামেরা। মুহুর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ফটো সাংবাদিক মো. নাসির উদ্দিন এবং ট্রাফিক সার্জেন্ট মুস্তাইন এ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বাংলানিউজ২৪ ডটকম কে ফটোজার্নালিস্ট নাসির উদ্দিন জানান, “বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রেসক্লাব থেকে অফিসে যাওয়ার পথে মৎস্য ভবনের সামনে আমাকে আটকে গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চান সার্জেন্ট মুস্তাইন। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও সঙ্গে হেলমেট না থাকায় একটি মামলা দিতে চান ওই সার্জেন্ট। আমি সার্জেন্টকে জানাই, তিনদিন আগে আমার হেলমেট চুরি হয়েছে। বেতন পেলে কিনে ফেলবো। কিন্তু তিনি কোন কথা না শুনেই আমাকে মামলা দেন। আমি ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলেই সার্জেন্ট মুস্তাইন আমার টি-শার্টের কলার ধরে এবং ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে অন্য এক পুলিশ সদস্যের হাতে দেন। ওই পুলিশ সদস্য আমাকে চর-থাপ্পর মেরে পুলিশ বক্সে নিয়ে যান। পরে সিনিয়র সাংবাদিকরা এসে আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করেন।”

এ ঘটনার ফলশ্রুতিতে ট্রাফিক সার্জেন্ট মুস্তাইন এর ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ এর কারণে তাকে ক্লোজড করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশী ফেসবুক ইউজারদের বয়ানে এ ঘটনাটিতে পাওয়া গিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ সহমর্মীতা জানিয়েছেন সাংবাদিক নাসির উদ্দিনের প্রতি, কেউ ভাবছেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মুস্তাইন ভুল কিছু করেননি। আবার অনেকে আঙ্গুল তুলছেন সাংবাদিক এবং পুলিশ- উভয়েরই পেশাদারী স্বেচ্ছাচারিতার অপসংস্কৃতির দিকে। সে মতামতগুলোই এখানে তুলে ধরা হলো।

দিদারুল আলম বলেছেন,

“মুস্তাইন কেন বিশ্বাস করবে বলুন। তার হয়ত বেতনের টাকা দিয়ে কিছুই কিনতে হয়না। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো নিজেকে দিয়ে অন্যকে বিচার করা। মুস্তাইনও হয়ত তাই করেছে। নাসির উদ্দিনের কথায় আমরা পাবলিক অবাক না হলেও মুস্তাইন যুক্তিযুক্তভাবে অবাক হয়েছে। মুস্তাইন অবাক না হলেই আমরা অবাক হতাম”।

গিয়াস আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন,

“পুলিশের নির্যাতনের শিকার আমিও। পুলিশ আমাদের কারো ভাই, আত্মীয়। এরা তো কলাগাছ ফুড়ে পৃথিবীতে নাজিল হয়নি। কোনো মায়ের গর্ভেই তো মুস্তাইনদের জন্ম। তবু কখনো কেন এরা কুকুরস্বভাবী হয়ে ওঠে! অমানুষ হয়ে যায়? পুলিশরা কেন আর মানুষ হয়ে ওঠে না! নাসিরউদ্দিনকে এভাবে নাজেহাল ও নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানাই। এই মুস্তাইন পশুদের বিচার করতে হবে”।

হোসাইন মোহাম্মদ দিদার বলেছেন,

“পুলিশ নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে তার ক্ষমতা দেখালো, হয়তো মানবজমিন পত্রিকার ফটো সাংবাদিক বলে কলার ধরেছে যার কারনে এ কুলাংকার সার্জন্টের আইনের মাধ্যমে যথাযোগ্য বিচার হবে কিন্তু বড় দুঃসহভাবে বলতে হয় আমাদের দেশে এ পুলিশ ভাইয়েরা এ রকম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছেন হয়তো তা পর্দার আড়ালে চলে যায় কারন সেই মানুষগুলো প্রতিবাদ কিংবা বিচার চাওয়ার সাহস দেখাতে পারেনা, মুস্তাইনের মতো এমন পুলিশ বাহিনী পুলিশদের গৌরব ম্লান করে দেশের বারোটা বাজায়, তাই এখনি জাগতে হবে জনতাকে!”

গৌরাঙ্গ দেবনাথ বলেছেন,

“কেবল সাংবাদিক কেন, কারও শরীরেইতো পুলিশ প্রকাশ্যে/অপ্রকাশ্যে ক্ষমার অযোগ্য এমন নির্দয় আচরণ করতে পারে না। এর প্রতিকার হওয়া দরকার। এমনকি ওই পুলিশ অফিসারের শাস্তিও দরকার। কিন্তু একজন সাংবাদিক তাঁর পরিচয় দেওয়ার পর আমার বিশ্বাস, কোন পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে নির্দয় হতে পারে না। তাই ওই সাংবাদিক ভাই তাঁর কথিত ক্ষমতা(!) অপব্যবহার করেছিলেন কিনা, সেটিও ক্ষতিয়ে দেখা উচিৎ। কারণ, আজকাল সাংবাদিকদের অনেকেই নিজেকে “রাজা-বাদশা” মনে করে অনেক অপকর্ম করে গোটা সাংবাদিক সমাজকে কলুষিত করছে। সুতরাং ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীর কঠোর শাস্তির দাবি করছি”।

জাবেদ ইকবাল পুলিশের এহেন কাজকে অসভ্যতা উল্লেখ করে বলেন,

“এই অসভ্যতা কবে বন্ধ হবে বলতে পারেন? পুলিশ রাখা হয়েছে জনগনের টাকায় জনগনের দেখভাল বা জানমালের নিরাপত্তার জন্য। মানুষ, সে পুলিশ বা বড় যে কেউ হোক না কেন, অন্যায় করলে তাকে যথাযথভাবে বিচারের মুখোমুখি করার নিয়ম বা উচিত। কিন্তু তাই বলে কনভিক্টেড হওয়ার আগে অন্যায়ভাবে মানুষকে শাররিক নির্যাতনের ক্ষমতা পুলিশকে কে দিয়েছে? পুলিশের এহেন অন্যায় কাযর্কলাপের অবশ্যই জবাবদিহিতা কিংবা প্রয়োজনে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা থাকা উচিত”।

তবে ফেসবুকারদের মধ্যে অনেকেই আবার সার্জেন্ট মুস্তাইনের কাজকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং সাংবাদিকদের সমালোচনা করেছেন।

আলি আহসান এর মতে,

“এটা খুবই সাধারন একটা ঘটনা। সবাই এই নিয়ে লিখেছেন, কারন এর সাথে একজন সাংবাদিক জড়িত আছে। পুলিশ কি তাঁকে সাংবাদিক হিসাবে আটক করেছেন? নিশ্চয় করেননি। একজন ট্রাফিক আইন ভংগকারি হিসাবে আটক করেছেন। উল্লিখিত সাংবাদিক বেতন পান না- এর জন্য কি পুলিশ দায়ী?”

আবার এমদাদ হাসান শুধু একপক্ষেরটাই শুনতে নারাজ,

“এইটা তো শুধু একপাশেরটা শুনলাম, হয়তো এমন কিছু সাংবাদিক ভাই করেছেন বা বলেছেন যাতে পুলিশ ভাই উত্তেজিত হয়ে এই কাজ করেছেন। সাংবাদিকরাও তো আর কম জান না। আমার মনে হয় দুই পক্ষই দোষী। যাই হউক তবু একজন সার্জেন্ট কারো গায়ে হাত দিতে পারেনা আমি এই ঘটনার নিন্দা জানাই এবং সুবিচার আশা করি”।

আনোয়ারুল ইসলাম খানিকটা বিরক্তি নিয়েই বললেন,

“বিচার! সাংবাদিক যখন সত্য মিথ্যা মিলিয়ে মানুষের চরিত্র হনন করে তখন কি আপনারা একটু ভাবেন একজন মানুষের কত বড় ক্ষতি হয়। আর এই দেশে তো অনেক রকমের বিচার আছে তার মধ্যে অন্যতম হল মিডিয়া ট্রায়াল। সেই বিচারটানা হয় আপাতত চলুক”।

রাইস উদ্দিন সাংবাদিক সমাজের কাছে আইন অমান্যকারী সাংবাদিকের বিচার দাবী করেন এবং বলেন,

“পেশায় সাংবাদিক তো কী? হেলমেট ছাড়া রাস্তায় চলাচল কিংবা সবুজ বাতি ছাড়াই চৌরাস্তার মোড় অতিক্রম করার অধিকার তোমাকেই বা কে দিয়েছে? বেতন হয়নি বলে হেলমেট কিনতে পারোনি; তো বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছ কেন? এই দৃশ্যও মানুষের অচেনা নয়। আইন কি সবার জন্য আসলেই সমান?  সাধারন জনগনকে হেলমেটের জন্য মামলা দিলে তো তারা ক্যামেরা বের করতে পারেনা, তাই পুলিশ জনতা মারামারিও হয় না”।

এই ঘটনায় নিরপেক্ষ মতামত দিতে গিয়ে ফেরদৌস সোহেল বলেন,

“আজকাল সাংবাদিক মানে বেশিরভাগই নির্দিষ্ট পক্ষপাত নির্ভর বলেই মানুষ সাংঘাতিক বলে। হ্যা, এদেশে পুলিশ জনগণের বন্ধু হবার কোন যোগ্যতাই নেই সাম্প্রতিক বিবেচনায়, তাই এই অন্যায় নতুন না, সাধারণ মানুষ যেখানে আইনের লোকের দ্বারা গুম খুন মামলার শিকার হচ্ছে, তার সামনে এটা সামান্যই। তবে সামান্য হলেও অন্যায় তো অন্যায়। তবে সাংবাদিক ভাই ও কেন হেলমেট ছেড়ে বের হলেন? যারা আইনের বিষয়ে তো জানেনই, তাই না? যখন মাথা খারাপ হয়ে যায়, তখন শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই”।

সবশেষে, বাংলাদেশী ফেসবুকারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে সাংবাদিক কিংবা পুলিশ- কারো উপরই ভরসা রাখতে পারছেন না জনসাধারণ। এই দুই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোই কি নিজ নিজ পেশার প্রতি জনসাধারণের এই গণ-অসন্তোষ এবং আস্থাহীনতার জন্য দায়ী নন?

তবে পুলিশ কিংবা সাংবাদিক- আপনি কার পক্ষ নিবেন সেটা চিন্তা করার চাইতেও এই মুহুর্তে বেশি জরুরী আমাদের আত্মসচেতনতা, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। এই লিংকের আর্টিকেলটি পড়ে একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখুন তো, আপনি কতটা সৎ? সুযোগ পেলে আপনিও কি আইন ভঙ্গ করেন না?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top