বিশেষ

ঢাকা অ্যাটাকঃ মানবতার মূর্তপ্রতীক যেখানে পুলিশের চরিত্র

চুয়েট নিয়ন আলোয় neonaloy পুলিশের চরিত্র......

শুক্রবার মুক্তি পাবে “ঢাকা অ্যাটাক”। মঙ্গলবার রাতে বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে যাবার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পথিমধ্যে আলোচনা করে ঠিক করা হল ফেরার পথে আমরা চট্রগ্রামের “আলমাস” সিনেমা হলে “ঢাকা অ্যাটাক” দেখে ঢাকা ফিরবো। দুই দিনেই টাকা পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ায় বৃহষ্পতিবার বিকেলে আমরা ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিকেলে কক্সবাজার থেকে চট্রগ্রাম চলে গেলাম। প্রথমে ট্রেনে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও সিদ্ধান্ত হল ট্রেনে নয় বাসে ফেরা হবে।

সকাল ৬ টায় কুড়িল পৌঁছানোর কথা, পৌছালাম সকাল ৯ টার পরে। “ঢাকা অ্যাটাক” মুক্তির দিন সেদিন। সকালের শো শুরু হতে তখনো দেড় ঘন্টা বাকি। উত্তরা চলে গেলাম। নতুন সিনেমা হল ‘ফ্যান্টাসি’ তে। তাদের সকালে কোন শো নেই। প্রথম শো শুরু হবে সাড়ে বারোটায়। এত দেরি করে “ঢাকা অ্যাটাক” দেখার কোন মানে নেই। এত আগ্রহের একটা সিনেমা। কাছাকাছি আর টঙ্গির ‘চম্পাকলি’ সিনেমা হলে আনা হয়েছে এই সিনেমা। চলে গেলাম সেখানে। সেখান থেকেও হতাশ হয়ে ফিরতে হল। এই হতাশা আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শরীর বলল বিশ্রাম দরকার। চলে গেলাম বাসায়। মুক্তির দিন তো না ই তার পরদিনও দেখা হল না এত দিনের অপেক্ষার সিনেমা। দেখলাম তৃতীয় দিনের সন্ধ্যার শো তে।

টান টান উত্তেজনা আর রোমাঞ্চকর গল্পের এই সিনেমা দেখে ফেরার পর থেকেই আবার আগের মত রিভিউ লেখার তুমুল সদিচ্ছা আড়মোড়া ভেঙে উঠেছে। আলসেমি ঝেড়ে ফেলে, আমিও বসে গেলাম কেমন দেখলাম “ঢাকা অ্যাটাক” তা লিখতে।

নামকরণ :
ঢাকা আক্রমণের পরিকল্পনা, ঘটনা প্রবাহ নিয়ে নিয়ে সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে বলে সিনেমার নাম রাখা হয়েছে “ঢাকা অ্যাটাক”।

কুশীলব:
আরেফিন শুভ
মাহিয়া মাহি
এবিএম সুমন
কাজী নওশাবা আহমেদ
শতাব্দী ওয়াদুদ
আফজাল হোসেন
তাসকিন রহমান
হাসান ইমাম
আলমগীর
এহসানুর রহমান
মিমো
শীপন মিত্র

গল্পের প্রেক্ষাপট :
ঢাকা শহরে একটি কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। দুই দিন পরেই সেই ডাকাতির সাথে জড়িতরা রহস্যজনক ভাবে খুন হয়। লাশগুলোর গায় পাওয়া যায় কিছু কোড। এই দুই ঘটনার কোন কূল-কিনারা পাওয়ার আগেই ঘটে আরেকটি বোমা হামলার ঘটনা। পুলিশ এবার আরো তৎপর হয়ে মাঠে নামল। পরপর ঘটে যাওয়া এই তিন ঘটনার মাঝে কোন যোগসাজশ রয়েছে নাকি বিদেশী পরাশক্তির ষড়যন্ত্র-তা খুঁজে বের করেতে গঠন করা হয় দুটি দল। শুরু হয় অভিযান। এরই মধ্যে হুমকি আসে আরো বড় বোমা হামলার।

গান:
একটি আইটেম গান সহ সিনেমায় মোট ছয়টি গানের ব্যবহার করা হয়েছে। আইটেম সং বাদে পাঁচটির একটি সিনেমার শেষে আর একটি গানের অংশবিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে দৃশ্যের প্রয়োজনে। সেটিকে এই সিনেমার গান না বললেও ভুল হবে না। বাকি তিনটি গানের ব্যবহার করা হয়েছে গল্পের সাথে সামঞ্জস্যতা রেখেই। প্রতিটি গানই হয়েছে অসম্ভব রকম সুন্দর। বিশেষ করে অদীতের “পথ যে বাকি” গানটা হয়েছে অসাধারণ। এই গান আর দৃশ্যের মিলনে এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তের অবতারণা ঘটে পর্দায়। তবে অরিজিৎ সিং এর “টুপ টাপ” শিরোনামের গানটিকেও পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কোনই সুযোগ নেই।

সার্বিক মূল্যায়ন:
ভ্রমণ আরামদায়ক তখনই যখন রাস্তা আর বাহন ভাল থাকে।রাস্তা যত বেশি নিভাঁজ, রাস্তায় ভ্রমণ তত বেশী পরিতোষপূর্ণ। একটা সিনেমা যদি একটা ভ্রমণ হয় হয় তবে “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমাটি একটি সন্তোষজনক ভ্রমণ বলে আমার মনে হয়েছে। এর পেছনের মূল কারন দুইটি ;

একটি হল মসৃণ রাস্তা তথা সিনেমার সুবিন্যস্ত গল্প আর বাহন তথা সিনেমায় কলাকুশলীদের পরিপক্ক অভিনয় দক্ষতা। তবে একটা ভ্রমণে একজন ড্রাইভার কিংবা পাইলটের অসামান্য স্বাচ্ছল্য যেমন একেবারেই অনস্বীকার্য তেমনি সিনেমার ক্ষেত্রে সে দায় বর্তায় সিনেমার পরিচালকের কর্মদক্ষতার উপর। প্রথম সিনেমা হলেও “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় পরিচালক তার হাতের কাজের সুনিপুণ পারদর্শিতার ভালই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। প্রথম সিনেমা হিসেবে তিনি দশে আট থেকে সাড়ে নয় পর্যন্ত দাবী করতেই পারেন।

গল্প আর পরিচালকের কথা তো বলা হল, এবার আসি যারা অভিনয় করলেন তাদের অভিনয়ের পর্যালোচনায়। সত্যি বলতে এই সিনেমাতে যারা অভিনয় করেছেন, তারা প্রত্যেকেই খুব ভাল অভিনয় শিল্পী। কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোতে অভিনয় করা আরেফিন শুভ, মাহিয়া মাহি, শতাব্দি ওয়াদুদ, নওশাবা আহমেদ, এবিএম সুমন কিংবা আফজাল হোসেন প্রত্যেকেই সু-অভিনেতা। এদের মধ্যে এবিএম সুমন অনেকটা নবীন হলেও ক্লাস ওয়ান হয়েছে তার পারফর্মেন্স। তার জুটি নওশাবা আহমেদ সব সময়ই ভাল অভিনয় করেন, সে ধারাবাহিতা এই সিনেমাতেও বজায় ছিল। শতাব্দি ওয়াদুদ আর আরেফিন শুভ কে নিয়ে বলার কিছু নেই। তারা দুজনেই দূর্দান্ত অভিনেতা। আমার মনে হয়েছে “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় শুভ তার এযাবৎ ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ অভিনয় দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। সবার এত এত ভাল অভিনয়ের মাঝে কিছুটা আপস এন্ড ডাউনস ছিল মাহিয়া মাহীর অভিনয়ে। যদিও তিনি খুব ভাল অভিনয় করেন। কিন্তু “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় তার অভিনয়ে খুব বড় না হলেও ছোট ছোট কিছু গ্যাপ থেকে গেছে। এছাড়া অভিনয় অংশটা মোটামুটি নিখুঁতই ছিল।

প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পীদের বাহিরে “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় আরেকজন দুর্দান্ত অভিনয় করছেন। তিনি তাসকীন রহমান । সিনেমার প্রধান খল চরিত্র। খল চরিত্র না বলে মূল চরিত্র বললেও ভুল বলা হবে না। কারণ তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সিনেমার গল্প। মূল বা খল যাই বলিনা কেন, তাসকীন হাসান প্রথম সিনেমাতেই তার অভিনয়ের জাত চিনিয়েছেন। নায়কোচিত এমন সুদর্শন খল নায়ক বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আগে এসেছি কিনা জানি না, তবে এবার বা আবার যখন পাওয়া গেছে তার পরিচর্যায় যেন কোন ঘটতি না হয় এটুকু চাওয়া।

সিনেমার কারিগর দিক আমি খুব কমই বুঝি। তারপরও যেটুকু বুঝি তাতে “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় আমি কেমন যেন একটু পশ্চিমা স্বাদ পাচ্ছিলাম। ব্যাপার টা অনেকটা ঘরে বানানো পিৎজার মত।সিনেমার ভিএফএক্স নিয়ে কথা বলা অনুচিত কারণ এখানে বাজেট বড় একটা বিষয়। তারপরও মোটের উপর খারাপ হয় নি। দৌড়ানোর মত সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলেও নিজ পায়ে চলার মতন হয়েছে।

যে বিষয়টি বারবার লিখবো লিখবো ভাবছি আর ভুলে যাচ্ছি তা হল সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। অনেক ভাল হয়েছে এই সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। রান্নার সময় তরকারিতে যতটুকু লবণ প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই পরিমাণ মত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা হয়েছে এক কথায় দুর্দান্ত।

সব তো বলা হয়েই গেল। ১৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই সিনেমার ১৩০ মিনিটই কাটবে টান টান উত্তেজনায়। বাকি যে দশ মিনিট বাদ দিলাম তার কারণ সিনেমার গান ও অন্যান্য বিষয়। তবে গানগুলো আসলে উত্তেজনার পর একটু বিশ্রমের জন্যই রাখা হয়েছে। ঠিক গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে হেঁটে আসা পথিকের জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা জলের মত।

পরিশিষ্ট :
“ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমার অন্তরালে আমাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রদানে নিয়োজিত থাকা “মানুষগুলো” তথা পুলিশ সদস্যদের জীবনের গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই গল্পটা যতটা না সিনেম্যাটিক তার চাইতে অনেক বেশি মানবিক। আপনি যখন তপ্ত গরমে এয়ার কন্ডিশন্ড বেডরুমে ফুল পাওয়ারে এসি ছেড়ে দিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকেন, তখন আপনার এই ঘুম নির্বিঘ্ন করতে গুটি কয়েক মানুষ রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জেগে থাকেন। গুটি কয়েক সেই মানুষগুলো হল পুলিশ তথা আইন-শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী। আপনাকে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তারা যে তাদের জীবনের বিশেষ মূহর্তে প্রিয়জনের পাশে থাকতে পারছে না বা পারেনা সেই মানবিক গল্পগুলো “ঢাকা অ্যাটাক” সিনেমায় পরিচালক বলার চেষ্টা করেছেন। প্রেক্ষাগৃহে যান, সিনেমাটি দেখুন। কথা দিচ্ছি বিরক্ত হবেন না।
জয় হোক “ঢাকা অ্যাটাক” এর। জয় হোক বাংলা সিনেমার।

পুনশ্চ:
আপনারা যারা ভালো বাংলা সিনেমা হয় না বলে হলে যেতে পারেন না, তারা এই সিনেমাটি হলে গিয়ে দেখতে পারেন। দেখুন। তারপর সমালোচনা করুন। আর খেয়াল রাখবেন বোঝা বা দেখার চেয়ে বলাটা যেন বেশি না হয়ে যায়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top