বিশেষ

কোন পথে যাচ্ছে আমাদের ব্যান্ড মিউজিক?

বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের একটা শক্ত অবস্থান আছে। অবশ্য অনেক ত্যাগের পরেই বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক আজকের এই অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। পথটা মোটেও কিন্তু পিচঢালা ছিল না। তথাকথিত রক্ষণশীলেরা তো ব্যান্ড মিউজিককে রীতিমতো অপসংস্কৃতি বলে আখ্যা দিয়েছেন এক সময়। ব্যান্ড মিউজিককে কোন গানের মধ্যে ফেলতেই তো নারাজ ছিলেন তারা। কিন্তু সময় বদলেছে। আজম খানের হাত ধরে যারা যাত্রা শুরু হয়েছিল যে তথাকথিত অপসংস্কৃতির, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যান্ডের হাত ধরে আমাদের মনে তা বিশাল একটা জায়গা অর্জন করে নিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত ব্যান্ড কনসার্টে উপচে পড়া মানুষের ভিড়, হাজারো কিশোর তরুণের হেডব্যাং তো সেটারই সাক্ষ্য দেয়।

আজম খানের হাত ধরে যারা যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের ব্যান্ড সংস্কৃতির

আমরা জীবনের নানা পর্যায়ে ব্যান্ড মিউজিককে আঁকড়ে ধরেছি। আমাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে কিছু কালজয়ী গানের মাধ্যমে। হতাশার সময়ে আমাদের আশার আলো দেখিয়েছে। প্রথম প্রেমের অনুভূতি যখন কাউকে প্রকাশ করতে পারছি না, তখনই হয়তোবা কানের কাছে ওয়ারফেজের ‘যতো দূরে থাকো রবে আমারই’ ছেড়ে দিয়েছি। কিংবা শেকল ভাঙ্গার প্রত্যয়ে ওয়ারফেজের ‘অসামাজিক’ ছেড়েছি। কখনো প্রিয়জনের প্রতারণায় মাইলসের ‘ফিরিয়ে দাও’ শুনে মনের ঝাল মিটিয়েছি। কিংবা প্রেমিকার প্রস্থানে এলআরবি’র ‘সেই তুমি’ শুনেছি। বিশেষ কাউকে দেখলে সারা দিন-রাত সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ সহ এরকম অনেক গান আছে যেগুলো আমাদের রাতের পর রাত বিশ্বস্ত বন্ধুর মত পাশে থেকেছে।

হাজারো তরুণের কাছে ব্যান্ড মিউজিক মানে তৃষ্ণার্ত মরুর পথিকের কাছে পানির মত। কত গান আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে, কত গান আমাদের ভাবতে শিখিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। বলার কথা বলে বলছি না, আসলেই আমাদের ব্যান্ড মিউজিকে ভাল গানের কোন অভাব নেই।

বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের ব্যান্ড মিউজিকে ভাঙ্গনের সুর দেখছি। যার সর্বশেষ সংযোজন শিরোনামহীন ব্যান্ডের ভোকালিস্ট তুহিন। ব্যক্তিগত কারণ হোক আর দলের সাথে বোঝাপড়ার অভাব হোক, ব্যান্ডে ভাঙ্গন ধরা অতি স্বাভাবিক বিষয়। অন্য কেউ এসে ব্যান্ড ছেড়ে যাওয়া সদস্যদের শূন্যস্থান পূরণ করবে। কিন্তু সবকিছুরই একটা কিন্তু থাকে, শিরোনামহীনের বেলায়ও একটা কিন্তু আছে। সেই কিন্তুটা হলো তুহিনের অভাব কি আসলেই পূরণ করার মত? তুহিনের গাওয়া গান কি দর্শকরা অন্য কোন কন্ঠশিল্পীর কাছ থেকে শুনতে চাইবে? দুটি প্রশ্নেরই সোজা সাপ্টা উত্তর হলো- “না”। কেন না- এই প্রশ্নের জবাবটা একটু অন্যভাবে দেওয়া যাক।

আমাদের দেশে একজন ভোকালিস্টকে সবাই যেভাবে চেনে, একজন গিটারিস্ট, ড্রামার কিংবা কিবোর্ডিস্টকে সেভাবে চেনে না। আমি বাজী ধরে বলতে পারি কাউকে যদি জিজ্ঞেস করি নেমেসিসের ভোকাল কে, সহজেই বলতে পারবে। ড্রামার কিংবা গিটারিস্টের নাম ধরলে অধিকাংশই পারবে না। তাই যেকোন ব্যান্ড জনপ্রিয় হওয়ার আগে সেই ব্যান্ডের ভোকালকে আমজনতাকে খুশি করার মত কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় এবং আমাদের দেশের প্রতিটি খ্যাতি পাওয়া ব্যান্ডের ভোকাল সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

তুহিনকে ছাড়া শিরোনামহীন কি আগের মত শ্রোতাদের টানবে?

তাই বলা যায়, আমাদের দেশের ব্যান্ড মিউজিকের জন্য টিমওয়ার্কের চাইতে ভোকালের কারিশমাটা বেশি জরুরি। তুহিন হলো সেই জাতের একজন ভোকাল যার ক্যাপাবিলিটি আছে এবং দর্শকদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছেন তিনি। শিরোনামহীনের যেসব বিখ্যাত গান দর্শকেরা তুহিনের মুখে শুনতে অভ্যস্ত, তারা সহজেই নতুন ভোকালকে মেনে নিতে পারবে না সে তার যতোই সক্ষমতা থাকুন না কেন। এই বিষয়টার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ওয়ারফেজের বর্তমান ভোকাল পলাশ। পলাশ নিঃসন্দেহে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন ভোকাল, তবে ওয়ারফেজের দর্শকেরা কিন্তু মিজানের প্রস্থানকে মোটেও ভালভাবে নেয়নি এবং পলাশ নিজেও দর্শকদের মন জয় করতে পারেনি। ওয়ারফেজের লাইভ শো কমে এসেছে। কারণ টা কি জানেন? না জানলেও এতক্ষণে জেনে গিয়েছেন আশা করি। অনেকে এডাপ্টেশনের কথা বলবেন যে মিজান তো ওয়ারফেজের প্রথম ভোকাল না হয়েও দিবি স্যুট করে গেছেন। কিন্তু এরকম কয়টা ক্ষেত্রে হয়েছে? ওয়ারফেজের বর্তমান অবস্থা তো আগেই বলেছি।

এবার বর্তমানে ফিডব্যাকের অবস্থাটা দেখুন। মাকসুদ লিভ নেওয়ার পর কি ব্যান্ডটা কি আগের মত আছে? এসব থেকেই বোঝা যায় আমাদের ব্যান্ড মিউজিকে টিমওয়ার্কের চেয়ে ভোকাল বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলে। কটূ শোনালেও এটাই বাস্তবতা।

এবার আসা যাক কাদা ছোড়াছুঁড়ির বিষয়ে। শিরোনামহীনের ভোকাল তুহিন বলেন এক কথা, শিরোনামহীনের বাকি সদস্যরা বলেন আরেক কথা। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অসুস্থ থাকা অবস্থায় ব্যান্ড সদস্যরা তার দিকে না তাকিয়ে তাদের শো-এর কথা চিন্তা করেছে। তার অনুমতি না নিয়ে গেস্ট ভোকাল রাখা হয়েছে। তুহিনকে আবার ব্যাক করতে হলে সেই ভোকালের সাথে স্টেজ শেয়ার করতে হবে। তারা নাকি কিছু করপোরেট শো-তে ইংরেজি গান গাওয়ার জন্য সেই ভোকালকে এপয়েন্ট করে। কিন্তু ব্যান্ডের লিডার জিয়া জানায় তুহিনই নাকি তাদের গেস্ট ভোকাল রাখার কথা বলে। আরও বলেন তারা এখন পর্যন্ত কোন ভোকাল রাখেননি এবং তুহিনের আচরণে মর্মাহত। আরও একটা বিষয় খুব খারাপ হয়েছে তুহিন তার গাওয়া গানগুলোর স্বত্ব চেয়েছেন। তুহিন ব্যান্ড থেকে বের হয়ে যেতে পারেন কিন্তু কোন গানের স্বত্ব এককভাবে নিতে পারেন না কারণ প্রতিটি গান সৃষ্টিতে প্রত্যেকটা ব্যান্ড মেম্বারের ছোঁয়া থাকে। প্রতিটি গান তাদের কাছে সন্তান স্বরূপ; কোন ব্যান্ড মেম্বারের একার সম্পত্তি নয়।

এই লেখাটা লেখার সময় বাংলা ট্রিবিউনের “আবারো মাইলস ছাড়ছেন শাফিন?” লেখাটা পড়লাম। শাফিন কিন্তু এর আগেও মাইলস ছেড়ে রিদম অভ লাইফ নামে একটা ব্যান্ড ফর্ম করেছিলেন। পরে আবার সে বছরেই মাইলসে ব্যাক করেছিলেন। মাইলস পিওর ক্লাসি ব্যান্ড, কিন্তু বারবার তাদের এ নাটক কাঁহাতক সহ্য হয়?

মাইলস- ভাঙ্গনের সুর শোনা যাচ্ছে কি আবারো?

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে কিছু যুগান্তকারী ও সময়ের বাঁধা পেরিয়ে যাওয়া গানের জন্ম দিয়েছেন আপনারা। আমাদের মন খারাপের সাথী হয়েছেন। আমাদের মধ্যে আগুন জ্বেলে দিয়েছেন। আমরা আপনাদের বিচ্ছেদ চাই না। আমরা অলরেডি অনেক বিচ্ছেদ দেখেছি। অতি সম্প্রতি সময়ের কথা যদি বলা যায় মিজান ওয়ারফেইজ ছেড়ে দিয়েছে, পিন্টু চিরকুট ছেড়েছেন, আর্টসেলের নিত্যনৈমিত্তিক নাটক তো আছেই। আমরা আর নতুন কোন নাটকের মঞ্চায়ন চাই না।

একে তো আমাদের দেশের ব্যান্ড আগের মতো আর কালজয়ী গান সৃষ্টি করতে পাছে না, তার উপর তাদের আভ্যন্তরীণ কোন্দল মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে। আমাদের এই ছোট দেশে যে অল্প কিছু জিনিস নিয়ে গর্ব করা যায় তার মধ্যে ব্যান্ড মিউজিক অন্যতম। আপনারা অনেকেই আমাদের চাইল্ডহুড হিরো। আপনারা নিজেরাই আপনাদের তৈরী আসন ভেঙ্গে দিবেন না। আমরা আর নেতিবাচক কারণে ব্যান্ড মিউজিককে শিরোনামে দেখতে চাই না।

Most Popular

To Top