টুকিটাকি

সুন্দরী প্রতিযোগিতার যত বিড়ম্বনা!

নিজেকে সুন্দর ভাবতে পছন্দ করে না কে? রুপকথার গল্পে তুষারকন্যা বা স্নো-হোয়াইটের সৎমা যেমন জাদুর আয়নায় তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন- “বলো তো আয়না, কে বেশি সুন্দর?”, তখনই আসলে বুঝা যায় নিজের সৌন্দর্য্যের স্বীকৃতি পেতে মানুষ কতটা উদগ্রীব থাকে। আর রুপকথার গল্পে যখন জাদুর আয়না উত্তর দেয় “তোমার চেয়ে তুষারকন্যা সুন্দর”- তখনই তুষারকন্যাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয় তার সৎমা। এটা কল্পকাহিনী হলেও সত্যিকার পৃথিবীতেও কিন্তু মানুষ কম মরিয়া না নিজের সৌন্দর্য্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে! আর সে সাথে যদি যুক্ত হয় বিশ্বব্যাপী খ্যাতি, কাঁড়ি-কাঁড়ি অর্থ আর অজস্র সুযোগ-সুবিধার হাতছানি- তাহলে মানুষের পাগলামী কেন সীমা ছাড়াবে না?

মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা নিয়ে গত সপ্তাহ পুরো বাংলাদেশে তুমুল আলোচনা। শুধু এ বছরই না, গত বছরও এই প্রতিযোগিতা নিয়ে হয়ে গেল পুরষ্কার হাতবদলের নানা কেচ্ছাকাহিনী। প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে ত্যানা বানিয়ে ফেলা এই বিষয় নিয়ে কথা বলে আবার বিরক্ত হতে চাইনা আমরা কেউ। তবে শুধু আমাদের দেশেই না, বিদেশেও এইসব প্রতিযোগিতা এবং প্রতিযোগীদের বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেওয়া প্রায় নিয়মিত বিষয়! আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারীদের অদ্ভুত কিছু ঘটনা নিয়েই তাই এই আয়োজন।

কারলি হে

কারলি হে

২০১৬ সালের মিস টিন আমেরিকা পুরস্কার পান টেক্সাসের এই সুন্দরী। কয়েকমাস পরে তিনি টুইটারে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় প্রচন্ড সমালোচনার মুখোমুখি হন।পরে আয়োজক মিস ইউনিভার্স কর্তৃপক্ষ টুইটের বিষয়ে জবাবদিহি করলেও তার মুকুট কেড়ে নেয়নি, এবং বিষয়টাকে অল্প বয়সের অবিবেচনার হয়েছে বলে জানায়। চাপে পড়ে কারলি হে ক্ষমা চেয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগের একাউন্টে যে পোস্ট দেন তাতেও আয়োজকদের কথার প্রতিধ্বনিই পাওয়া যায়।

ব্র্যান্ডি ঊয়েভার গেটিস

ব্র্যান্ডি ঊয়েভার গেটিস

পেনসিলভানিয়ার সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিজয়ী গেটিসের কান্ড-কারখানা শুধু অন্যায় না, বরং মানুষের সাথে প্রতারণামূলকও ছিল। তিনি প্রথমে নিজের মাথা ন্যাড়া করে ফেলেন এবং নিজেকে লিউকোমিয়ার রোগী বলে পরিচয় দেন। পরবর্তীতে মানুষের কাছ থেকে নিজের চিকিৎসার নাম করে হাজার-হাজার ডলার হাতিয়ে নেন। তার বিচার চলাকালে ডিস্ট্রিক্ট এটর্নি ব্র্যান্ডির প্রতারণার জন্য সত্যিকারের অসুস্থদের অর্থ সাহায্য যেন বন্ধ না হয় সেই বিষয়ে নিজের আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।

ক্যাথেরিন রিস

ক্যাথেরিন রিস

প্রাক্তন মিস নেভাদা ক্যাথেরিন রিস ২০০৭ সালে অশ্লীল ছবির ফটোশুট করার দায়ে খেতাবচ্যুত হন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি কোকেইন আসক্তির জন্য অফিসিয়াল সন্দেহের তালিকায় যুক্ত হন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে উত্তেজক ড্রাগ ‘মেথ’ রাখার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে উনি অম্লানবদনে সব অভিযোগ মিথ্যা বলে সাক্ষ্য দেন।

এমিলি কাছোটে

এমিলি কাছোটে

মিস জিম্বাবুয়ে আয়োজকদের শর্ত মতে কোনো প্রতিযোগীই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পরে বাকি জীবনে কখনো কোথাও নগ্ন ফটোশুট করতে পারবেন না। এমনকি মিস জিম্বাবুয়ে যারা হতে পারবেন না, তাদেরও এই নিয়ম মানতে হবে। যারা মিস জিম্বাবুয়ে হতে পারেননি তাদের কথা জানিনা, কিন্তু ২০১৪ সালের মিস জিম্বাবুয়ে থাবিসি পিরি এবং ২০১৫ সালের এমিলি কাছোটে নগ্ন ফটোশুটের জন্য নিজের খেতাব হারিয়েছেন।

স্যালি গ্রেইজ এবং ডোরেন মাতালন

স্যালি গ্রেইজ এবং ডোরেন মাতালন

দুজনেই নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হয়েছিলেন মিস ইউনিভার্স ২০১৫ প্রতিযোগিতায়, স্যালি লেবাননের হয়ে এবং ডোরেন ইসরায়েলের হন।
সেখানে মিস জাপান এবং মিস স্লোভেনিয়ার সাথে এই দুইজনও একত্রে ছবি তুলেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে যায়।

কিন্তু এতেই বাধে বিপত্তি। কারণ ২০০৬ সালে সংঘটিত হওয়া ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পরে লেবানন সরকার ঘোষণা করে যে ইসরাইলীদের সাথে যদি কোনো লেবাননের নাগরিক ছবি তুলে, তবে তাকে জেলে পাঠানো হবে। স্যালির এই ছবি তোলার ইস্যু নিয়ে তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়া অনেকদিন সরগরম ছিল।
পরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে স্যালি বলেন যে তিনি অনেক সচেতন ছিলেন মিস ইসরাইলের সাথে যেন ছবি না আসে। কিন্তু এই ছবিটা তোলার সময় হঠাৎ করেই ডোরিন এসে পড়ে ফ্রেমের মধ্যে।

জেমি ফ্রান্স

জেমি ফ্রান্স

মিস টিন ওরিগন ২০০৯ বিজেতা জেমি ফ্রান্স খেতাব জয়ের পরে লো-প্রোফাইল চলাফেরা করলেও ২০১৪ সালে মাদক গ্রহণের দায়ে তার নাম খুব আলোচনায় আসে। হোটেলের একটা রুমে কোকেন-মেটামরফিন-মেথ সহ জেমি এবং আরো দুইজনকে আটক করা হয়।

আমান্ডা লংরেস

আমান্ডা লংরেস

অনেকেই বলে থাকেন যে বয়স কোনো বিষয় নয়, কিন্তু এসব প্রতিযোগিতায় বয়স অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিস ডেলাওয়ার ২০১৪ বিজয়ী হয়েও আমান্ডাকে তার খেতাব ফেরত দিতে হয়েছিল। কারণ ডেলওয়ারের হয়ে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বয়সসীমা ২৪ বছর হলেও প্রতিযোগিতার সময় আমান্ডার বয়স ছিল ২৫ বছর একমাস।

নিয়া সানচেজ

নিয়া সানচেজ

নিয়া সানচেজ নেভাদার প্রতিনিধি হিসেবে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যান। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে, নিয়া নেভাদার অধিবাসী নন। মিস ক্যালিফোর্নিয়া প্রতিযোগিতায় তিন বার অংশগ্রহণ করে ব্যর্থ হয়ে মিস নেভাদা প্রতিযোগিতায় ঠিকানা জালিয়াতি করে ঢুকে যান এবং বিজয়ী হয়ে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় আসেন। তবে এই প্রতিযোগিতায় তিনি ঠিকই মিস ক্যালিফোর্নিয়াকে হারিয়ে দেন।

এলিজাবেথ ফেচেল

এলিজাবেথ ফেচেল

মিস ফ্লোরিডা হিসেবে ২০১৪ সালের মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু মিস ফ্লোরিডা খেতাব পাওয়ার ৫ দিনের মধ্যেই প্রতিযোগিতায় নাম্বারিং-এ ভুল হয়েছে বলে জানায় আয়োজকরা। পরে খেতাব হারিয়ে ফার্স্ট রানার আপ হয়েও অবশ্য ফেচেল নিজের পজিটিভ মানসিকতাকে ধরে রেখেছেন।

আলিসিয়া মাচাডো

আলিসিয়া মাচাডো

২০১৬ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আলিসিয়া মাচাডো ছিলেন হট টপিক। ১৯৯৬ সালে মিস ইউনিভার্স খেতাব জেতার পরে এই প্রতিযোগী তার অতিরিক্ত ওজনের জন্য নানা সমালোচনার সম্মুখীন হন। এমনকি এই প্রতিযোগিতার আয়োজকদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প (!) হাওয়ার্ড স্টার্নের একটি রেডিও শোতে আলিসিয়াকে “ইটিং মেশিন” বলে বিদ্রুপ করেন। পরবর্তীতে হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনের পূর্বে এই ইস্যু নিয়ে বক্তৃতা দেন এবং আলিসিয়া হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় যথেষ্ট দৌড়ঝাঁপ করেন।

ভেনেসা উইলিয়ামস

ভেনেসা উইলিয়ামস

আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ “মিস আমেরিকা” ছিলেন তিনি। তবে খেতাব পাওয়ার কয়েক মাস পরে একটি দৈনিকে তার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আগে তোলা নগ্ন ছবি প্রকাশিত হয়। তখন এক সাক্ষাতকারে ভেনেসা বলেন “নিজেকে আমার বলির পাঁঠা বলে মনে হচ্ছে, অতীত যেন আমাকে আঘাত করে গেল”। তবে খেতাব হারালেও পরবর্তীতে ভেনেসা গায়িকা এবং অভিনেত্রী হিসেবে অনেক পুরষ্কার ও খ্যাতি লাভ করেন। খেতাব হারানোর ৩২ বছর পরে তিনি বিচারক হিসেবে মিস আমেরিকা প্রতিযোগিতায় আসেন এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সিইও পূর্বের ভুলের জন্য তার কাছে জনসমক্ষে ক্ষমা চান।

টারা কোনার

টারা কোনার

২০০৬ সালের মিস ইউএসএ খেতাব জয়ের ৮ মাসের মধ্যেই ড্রাগের মামলায় অভিযুক্ত হন। পরে আয়োজক ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সংবাদ সম্মেলন করে খেতাব ফেরত না নিয়ে তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। প্রস্তাবে রাজি হয়ে কোনান মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে যান। এখন তিনি ক্যারন ট্রিটমেন্ট সেন্টারের পাবলিক এডভোকেসি কনসাল্টেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

রিমা ফকিহ

রিমা ফকিহ

লেবানিজ বংশোদ্ভূত মিশিগানের এই সুন্দরী ২০১১ সালে মিস ইউএসএ নির্বাচিত হন। কিন্তু পরবর্তীতে খ্যাতি তাকে এতটাই কাবু করে ফেলে যে, রিমা নাইট ক্লাবে মাতাল হয়ে যাওয়ার কারণে সিএনএন-এর সাথে একটি ইন্টারভিউ পর্যন্ত মিস করে ফেলেন।
বারে স্ট্রিপ ডান্স এর ছবি পত্রিকায় চলে আসলে, আয়োজকরা এটিকে ডান্স ক্লাসের অনুষঙ্গ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাও রিমার উশৃঙ্খল জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আসায় তাকে নিজ শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ক্যারি প্রিজিন

ক্যারি প্রিজিন

২০০৯ সালের মিস ইউএসএ প্রতিযোগিতায় সমকামী বিচারক পেরেজ হিলটনের সমকামী বিয়ে সম্পর্কে প্রিজিনের মনোভাব কি জানতে চাইলে প্রশ্নের জবাবে প্রিজিন বলেন, “আমি মনে করি বিয়ে ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে হওয়া উচিত”। প্রিজিনের এই মন্ত্যব্য চারদিকে আলোচিত হয়, তবে তিনি মিস ইউএসএ খেতাব পান। কিন্তু পরবর্তীতে মিস ইউএসএ অর্গানাইজেশনের মুখপাত্র হয়ে কাজ করতে না চাইলে চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে তার খেতাব নিয়ে নেওয়া হয়।

 

এসব ছাড়াও আরো নানা রকম কারণেই অনেক আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচিত সুন্দরীরা নিজেদের ইতিবাচক কাজের সাথে সাথে নেতিবাচক কাজের জন্যও সংবাদের শিরোনাম হয়ে নিজের খেতাব হারিয়েছেন।

Most Popular

To Top