নাগরিক কথা

“আচ্ছা বাবা, পৃথিবীর সব টিচারই কি ভাল?”

"আচ্ছা বাবা, পৃথিবীর সব টিচারই কি ভাল?"

একদিন সকালে স্কুলে যেতে যেতে মেয়েটা বলছে, “বাবালা – অল দ্যা টিচার্স ইন দিস ওয়ার্ল্ড আর গুড, আরন্ট দে?” আমি হাঁটতে হাঁটতে আড়চোখে তার দিকে তাকালাম। তাকে দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, সে এই ব্যাপারে নিশ্চিত- তারপরও শুধু আমার কাছ থেকে একবার শুনতে চাচ্ছে। নিতান্তই সহজ সরল, দেখতে- শুনতে একদম গোবেচারা টাইপ প্রশ্ন। শতকরা ৯৯.৯% মানুষ ভাবে, এই প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত- হ্যাঁ, এবং সেটা কোনরকমের কালক্ষেপণ ছাড়া। কিন্তু, আসলেই কি এটা এমন সহজ সরল প্রশ্ন?

এই বিষয় নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত দু-একটা খারাপ স্মৃতি, গত কিছুদিনে অকারণেই মনে পড়েছে। আর এই কারণেই কয়েক মূহুর্ত কালক্ষেপণ করছিলাম উত্তর দিতে। স্কুলে পড়ার সময় এক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়িনি বলে, একটা দীর্ঘ সময় উনার সাথে দেখা হলেই- আমি এসএসসি পরীক্ষা পাশ করতে পারবোনা বলে একরকম প্রকাশ্যেই অভিসম্পাত করতেন আমাকে। আমি জীবনে প্রথম “বৈষম্য” এবং “বুলিয়িং” ব্যাপার দুটো প্রথম দেখেছি আমার শিক্ষকদের মাঝে। লিঙ্গবৈষম্য, ধর্ম বৈষম্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতায় চিন্তা-ভাবনা করতে আমি প্রথম দেখেছি আমার শিক্ষকদের মাঝে। ব্যাপারগুলো তখন বুঝতে না পারলেও এখন চিন্তা করলে এক ধরণের অস্থিরতা বোধ করি। এই ঘটনাগুলো আমি দেখেছি খোদ ঢাকা শহরের মতো জায়গার কেন্দ্রস্থলে, তাও সেই কত বছর আগে- যখন আমাদের পথে পথে এখনকার মতো সাম্প্রদায়িকতার ভাগাড় খুলে বসেনি। দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলগুলোর স্কুল-কলেজগুলোর কি অবস্থা ছিল, এখন অনুমান করতে পারি? না, আমার এই লেখাটা শিক্ষকতার মতো একটা মহান পেশাকে সমালোচনা করা বা আমার কোন শিক্ষকের প্রতি বিষোদগারের জন্য নয়, সেই যোগ্যতা বা ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই- কখনো যেন না হয়, সেটাই চাই। বরং এই লেখার উদ্দেশ্য ঠিক এর উল্টো। কিন্তু এই খারাপ স্মৃতিগুলো দিয়ে লেখাটা শুরু করার কারণটা একটু পরে বলছি।

সাধারণত শিক্ষকেরা যেমন ছাত্র-ছাত্রী পেলে খুশী হন, গর্ববোধ করেন, আমি ছাত্র হিসাবে কখনোই নিজেকে সেই পর্যায়ে নিতে পারিনি। কিন্তু তারপরও আমার পড়ালেখার প্রতিটি ধাপে আমার প্রতিটি শিক্ষক অনেক যত্ন করে ভালোবেসে আমাকে শিখিয়েছেন। মানুষ হিসাবে- একটা “দাগ” রেখে যাওয়ার ইচ্ছে সবসময়ই মনের কোণে জানান দেয়, এখনো কিছুই করতে পারিনি- কখনো কিছু করতে পারবো কিনা, জানিনা। তবে এই যে, আজ এতটুকু চিন্তা করতে পারছি- সেটাও আমার শিক্ষকদেরই অবদান। তাদের প্রতি যেভাবেই কৃতজ্ঞতা জানাই না কেন সেটা কম হবে। এবার আসি শুরুর কারণে, একটা সময় মনে হতো সমাজ বদলায় ছাত্র-ছাত্রীরা, কিন্তু এখন বুঝি আসলে এই কাজটা করেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। ছাত্র-ছাত্রীরা কেবল “ফিনিশিং টাচ” দেয় (এরজন্যও শিক্ষক শিক্ষিকারাই তাদের তৈরী করে দেন), আনসাং হিরো শিক্ষক-শিক্ষিকারা সেই কৃতিত্ব কখনো দাবী করেন না, শুধু প্রাপ্য সম্মানটুকু ছাড়া।

এখন আমাদের বর্তমান সমাজের চিত্রটা একবার দেখুন। আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা যতটা না ব্যস্ত ভবিষ্যৎ এ কারিগর গড়তে, তারচেয়ে বেশী ব্যস্ত রাজনীতি করতে, কোচিং করাতে, ভর্তি ব্যাবসায় নামতে, বিভিন্ন জালিয়াতি করতে, এমনকি শ্লীলতাহানির ঘটনাও এখন অনেক ভয়াবহ রকমের। সমাজের এই অবস্থা একদিনে হয়নি কারণ শিক্ষকদের এই অবক্ষয়ের শুরুও তো আজ হয়নি। এখন এই অবক্ষয় প্রায় নির্লজ্জের মতো মাত্রা ছাড়া, এখনই এর রাশ টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে এই অবস্থা আরো খারাপ হবে সেটা বলাই বাহুল্য!

আর শিক্ষকরাই যদি অধ:পতনের নেতৃত্বে থাকেন, একবার চিন্তা করে দেখুন ১০ বছর বা ২০ বছর পরে এই সমাজটা কোথায় দাঁড়াবে! কি, টের পাচ্ছেন কিছু শিড়দাঁড়ায়? অথচ খেয়াল করে দেখুন, আমাদের বর্তমান প্রবাসীদের মাঝে একটা বিশাল অংশ শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে, এরা শুধু শুন্য নম্বর পুরনের কাজে না, এরা অন্য অসংখ্য বিদেশী শিক্ষকদের চেয়ে নিজেদের যোগ্যতায় অনেক ভালো অবস্থানে নিয়ে গিয়েছেন নিজেদের। এরা আলোকিত করছেন- হয়তো তৈরী করে দিচ্ছেন সারা বিশ্বের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, অথচ আমাদের নিজেদের ঘর পড়ে থাকবে অন্ধকারে-আফসোস। দেশের সত্যিকারের ভিভিআইপি তালিকায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নাম থাকা উচিত, তারাই যে দেশের ভবিষ্যৎ ভিআইপি তৈরী করবেন!

কিন্তু এত কিছুর পরও আশার কথা, পেশাটার নাম শিক্ষকতা- নৈতিকতাতেই যার শুরু এবং শেষ। এখনো অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন যারা শুধুমাত্র এই পেশাটির সম্মানের জন্য নিজেদের শত কষ্ট মুখ বুঝে সহ্য করে যাচ্ছেন। হয়তো ভবিষ্যৎ সমাজের কথা ভেবে, নিজের দায়িত্ববোধের কথা ভেবে অথবা অন্তত নিজের সন্তানদের কথা ভেবে- বাকী শিক্ষকেরা আবার সমাজ আলোকিত করবেন। শিক্ষক দিবস উপলক্ষে (গত ৫ অক্টোবর) যারা শিক্ষকতা কে পেশা-নেশা হিসাবে নিয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান, দোয়া রইলো, তাদের সকলের সুস্থতা কামনা করছি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top