টাকা-কড়ি

দি উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট- কতটুকু বাস্তব, কতটুকু কল্পকাহিনী?

“দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান”- শুধু এই বাক্যে না, যুগে যুগে অনেকেই মহিমান্বিত করেছেন দারিদ্র্যকে। অর্থই যে অনর্থের মুল, কিংবা ধনী-গরিব হওয়াটা যে সৃষ্টিকর্তারই হাতে- এই ধরণের কথাবার্তাও আমরা কম-বেশি শুনে শুনে অভ্যস্ত।

কিন্তু আসলেই কি তাই? নিজে কোনো রকম চেষ্টা না করে উপরওয়ালা কখন লটারিতে লক্ষ লক্ষ টাকা পাইয়ে দিবে সেই আশায় বসে থাকাটাই কি মহান হওয়ার লক্ষণ?

তবে দারিদ্র্যকে দূর করার জন্য আপনাকে অসৎ পথে টাকা উপার্জনে উৎসাহী করতে আমি এখানে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে আসিনি। আমার কথা হচ্ছে একজন মানুষ যদি চায় তবে সে ধনী হতে সক্ষম, কিন্তু কোন পথে ধনী হচ্ছে সেটাই হচ্ছে তার বিবেকের নমুনা, কারণ “পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে যায়”।

আজকে তেমন একজন মানুষকে এবং তাকে নিয়ে বানানো সিনেমার কথা বলব, যিনি অসাধারণ ব্যাবসায়িক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে শেয়ার ব্যাবসায় অনেক মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছিলেন শুধু নিজের লাভের আশায়।

“দারিদ্র্যের মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই বন্ধুরা। আমি গরিব ছিলাম এবং আমি এখন ধনী। কিন্তু আমাকে যদি দু’টোর মধ্যে বেছে নিতে বলা হয় তবে আমি ধনী অবস্থাকেই বেছে নেব। কারণ তখন সমস্যার মোকাবিলা করার সময় আমি একটা লিমো গাড়িতে বসে থাকব আর আমার হাতে থাকবে ৪০, ০০০ ডলারের সোনার ঘড়ি এবং পরনে থাকবে ২০০০ ডলারের স্যুট। ”

এটা আমার কথা না, জর্ডান বেলফোর্টের কথা। নামটা হয়তোবা অপরিচিত লাগবে অনেকের কাছে, কিন্তু তার জীবনী নিয়ে নির্মিত “দি উলফ অফ ওয়ালস্ট্রিট” এর কথা সবাই জানেন।

এক স্টকব্রোকারকে নিয়ে ২০১৩ সালে বানানো হয়েছিল এই সিনেমাটি, এবং সমালোচকদের মতে “ইকোনমি বেইজড ব্ল্যাক কমেডি ফিল্ম” এর মধ্যে এটি মাস্টারপিস। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও এই ছবির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং তা এতটাই নিখুঁত ছিল যে সবাই ভেবেছিলেন এই ছবির জন্য তিনি অস্কার পাবেন।

সিনেমার প্লটঃ

নব্বইয়ের দশকের পটভূমিতে তৈরিকৃত ছবিটির কেন্দ্রভুমি হচ্ছে জর্ডান বেলফোর্ট এবং তৎকালীন আমেরিকার শেয়ারবাজার। আপনার-আমার মতই সাধারণ মানুষ ছিলেন জর্ডান বেলফোর্ট, নিতান্তই এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম। জীবিকার জন্যে এদিক-ওদিক ধাক্কা খেয়ে শেষে তিনি যোগ দেন শেয়ারবাজারে সামান্য এক স্টকব্রোকার হিসেবে মিঃ রথসচাইল্ডের কোম্পানিতে। মার্ক হান্নাহ নামে এক মহিলার অধীনে জর্ডানের কাজ করতে হত। সেই মহিলা জর্ডানকে উপদেশ দেয় যে একজন স্টকব্রোকারের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের অর্থনৈতিক লাভ।

ক্রমে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জর্ডান আস্তে আস্তে শেয়ারব্যাবসার সাথে জড়িয়ে যায়। আরো বেশি লাভ করার আশায় সে বন্ধু ডোন্নিকে নিয়ে একটি ভুয়া কোম্পানি খুলে। কোম্পানিটিকে মানুষের কাছে পরিচিত করার জন্য সে একটা গালভরা নাম দেয় “স্ট্র্যাটন ওকমন্ট” এবং তার কয়েকজন বন্ধুকে সেখানে নিয়োগ প্রদান করে। জর্ডানের বড় গুণ ছিল মানুষকে নিজের কথার জালে ফেলে মোটিভেট করতে পারা, এটাকে পুঁজি করেই সে কোম্পানির কাজ বাড়াতে থাকে।

এরপর জর্ডান আর তার কোম্পানি মিলে “পাম্প এন্ড বাম্প” নামে এক বিজনেস স্ট্র্যাটেজি শুরু করে।

এই স্ট্র্যাটেজি অনুসারে জর্ডানের কোম্পানি প্রথমে কিছু ভুয়া শেয়ার বাজারে নিয়ে আসত। সেই শেয়ার তারা নিজেরা কিছু কিনত এবং প্রচার-প্রচারনা করে মানুষকেও আগ্রহী করে তুলত এই শেয়ার নিয়ে। সবাই যখন পাগলের মত উচ্চমুল্যে এই শেয়ার কিনে নিত, তারপর জর্ডানের কোম্পানী শেয়ারগুলো ছেড়ে দিত, ফলে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক কমে যেত। সম্পূর্ণ মুনাফা হত “স্ট্র্যাটন ওকমন্ট” কোম্পানির এবং ইনভেস্টররা হত সর্বস্বান্ত।

এভাবে করতে করতে কোম্পানিটি একসময় অনেক টাকার মালিক হয়ে যায়, বিভিন্ন ইকোনমিক্যাল পত্রিকায় তাদের নামে আর্টিকেল আসে।

জানা যায় যে, সাফল্যের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় কোম্পানিতে চাকরিরত ছিল প্রায় ১০০০ জন স্টাফ। এত সাফল্য জর্ডানের মাথা ঘুরিয়ে দেয়, সে দামী ইয়াট সহ প্লেন কিনে ফেলে, নারী এবং ড্রাগসের পিছনে অকাতরে টাকা ঢালতে থাকে। একপর্যায়ে জর্ডানের স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে সে নাওমি নামের বান্ধবীকে বিয়ে করে। নেশার ঝোঁকে জর্ডান প্রায়ই গাড়ি একসিডেন্ট করত এবং রাস্তার পাশে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকত।

চোরের দশদিন আর গৃহস্থের একদিন, একটা ভুয়া আইপি শেয়ার দিয়ে মাত্র ৩ ঘন্টায় ২২ মিলিয়ন ডলার কামাই করায় এফবিআই-এর নজরে পড়ে যায় জর্ডান আর তার কোম্পানি। তারা তদন্ত শুরু করে কোম্পানির নামে।

এফবিআই’তে জর্ডানের পরিচিত লোক থাকায় সে এ ব্যাপারে জানতে পেরে নিজের সম্পদগুলো লুকাতে চায়। পরে দ্বিতীয় স্ত্রী নাওমির আন্টি ইমাকে দিয়ে সরেল নামে অসৎ ব্যাংকারের সহায়তায় সুইস ব্যাংকে একাউন্ট খোলায় জর্ডান। এদিকে তার বন্ধু ডোন্নিও পালিয়ে যায়।

এদিকে হঠাৎ খবর আসে যে ইমা আন্টি হার্ট এট্যাকে মারা গিয়েছেন। এই খবর শুনে হতভম্ব জর্ডান নিজেই একাউন্ট সামলানোর জন্য ইয়াট নিয়ে স্ত্রীসহ সমুদ্রপথে সুইজারল্যান্ডে যাত্রা করে। কিন্তু বিধি বাম, নৌ পুলিশের হাতে ধরা না পড়ার জন্য জর্ডান ইয়টের ক্যাপ্টেনকে জোরে চালাতে বললে অর্ধপথে তাদের ইয়ট ঝড়ের কবলে পড়ে।

সে যাত্রা কোনোমতে বেঁচে যায় জর্ডানরা।

দুই বছর পর সোরেল সম্পূর্ণ ভিন্ন অপরাধে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আস্তে আস্তে জর্ডানের জালিয়াতির কথা আবার আলোচনায় আসে। পুলিশের তার বিরুদ্ধে শক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ এর অবস্থা দেখে জর্ডান উপায় না দেখে রাজি হয় আত্মসমর্পণ করার। সে পুলিশের সাথে চুক্তি করে যে তার সাজা কমিয়ে দিলে সে তার সহযোগীদের নাম এবং যাবতীয় প্রমাণপত্র পুলিশকে দিয়ে দিবে।

কিন্তু এই চুক্তির পরও ডোন্নিকে লেখা তার সতর্কবাণী পুলিশরা পেয়ে গেলে পুলিশ চুক্তি বাতিল করে দেয় এবং তাকে জেলে নিয়ে আসে। এই ছিল মুল কাহিনী।

বাস্তবে বিচার শেষ হওয়ার পরে জর্ডানকে তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় রুমমেটের কথায় সে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করে দেয়।

একজন জালিয়াত কিনা মোটিভেশনাল স্পিকারঃ

পরিহাসের বিষয় হল সাজার মেয়াদ শেষে জর্ডান মানুষকে কথা দিয়ে প্রভাবিত করার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এখন মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে কাজ করছে। সে বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ব্যাবসা নিয়ে বক্তৃতা দেয় এবং তার মাসিক আয় সত্যিই ঈর্ষণীয়। পরিচালকের কাছে নিজের জীবনী সিনেমা হিসেবে বানাতে দেওয়ার সত্ত্ব বিক্রির বিনিময়ে এক মিলিয়ন ডলার আদায় করার মাধ্যমে এখানেও জর্ডানের তুখোড় ব্যাবসায়িক বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।

রিল লাইফে রিয়েল লাইফের কতটুকু প্রতিফলন ঘটেছে?

অদ্ভুত এই মানুষটার জীবন নিয়ে সিনেমা বানাতে আগ্রহী হন প্রখ্যাত পরিচালক পিটার স্কোরেস এবং চরিত্রে তার প্রথম পছন্দ ছিলেন লিওনার্দো। সিনেমাটিতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে শেয়ারবাজারের নানা অন্ধকার দিক এবং একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের পরিণতির কথা বলা হয়েছে। ১০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের ১৭৯ মিনিটের এই সিনেমাটি এককথায় ছিল সবরকম মসলা দিয়ে বানানো একটি রেসিপি।

আর লিওনার্দো যে পরিচালকের আস্থার মান রেখেছেন তা এই সিনেমাটি দেখলেই বোঝা যায়। ছোট ছোট সিচুয়েশনাল কমেডি টাইপ কথাবার্তা এবং ফিজিক্যাল কমেডির জন্য তার শারীরিক ভাবভঙ্গি দেখেই অভিনেতা হিসেবে লিওনার্দো’র লেভেল চেনা যায়। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয়কারীরাও যার যার ক্ষেত্রে একদম পারফেক্ট ছিলেন।

তবে ছবিটির নামের সাথে কিছু নেগেটিভ তকমাও লেগে গিয়েছে। অতিমাত্রায় ড্রাগ এবং অশ্লীল শব্দের ব্যাবহারসহ এডাল্ট কনটেন্টের জন্যও এটি সমালোচিত হয়েছে।

এছাড়া সিনেমায় খানিকটা হলেও জর্ডানকে মহিমান্বিত করে দেখানো হয়েছে। ফিল্মে লিওনার্দো স্টাফদের যেভাবে মোটিভেশনাল স্পিচ দেয় সেভাবে জর্ডানও দিত, তবে তা ছিল অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই। সিনেমায় অফিসে একটা শিম্পাঞ্জিকে দেখানো হলেও বাস্তবে “স্ট্র্যাটন ওকমন্ট” এর অফিসে সিনেমার মতো কোনো শিম্পাঞ্জিও ছিলনা।

জর্ডানের সিনেমা বাজারে আসার পর এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেদের সম্পর্কে লেখা কথাগুলো পুরোপুরি স্বীকার করেননি, অনেকেই মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন।

তাছাড়া পাঠক, দর্শক এবং ভুক্তভোগী অনেক ইনভেস্টরই জর্ডানের এত কম মেয়াদের সাজার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এতকিছুর পরেও সিনেমাটি প্রচুর জনপ্রিয় হয় এবং ৩৯২ মিলিয়ন ডলার ব্যাবসা করে নেয়।

কেন দেখবেন এই সিনেমা?

অসাধারণ এই সিনেমাটি কেন দেখতেই হবে আমার থেকে যদি জানতে চান, তবে আমি বলব দুটি কারণে আপনি এটি দেখতে পারেনঃ

১। মানুষ কিভাবে শূন্য থেকে নিজের প্রচেষ্টায় বড় হয় তা দেখার জন্য।

২। অসাধারণ ক্ষমতা থাকার পরেও তার অপব্যাবহার মানুষের জীবনে কি দুর্গতি নিয়ে আসে তা দেখার জন্য। এখন সিনেমাটা দেখার পর আপনি কোনটাকে শিক্ষণীয় হিসেবে নিবেন সেটা আপনার বিষয়।

তবে শেয়ারবাজারের এবং অর্থনীতির এতসব কাঠখোট্টা বিষয়কে এমন হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করায় পরিচালক আর অভিনেতাদের ধন্যবাদ দিতেই হয়।

সিনেমাটি দেখার পর আমার মনে হয়েছিল, আহা! বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অসৎ রুই-কাতলাদের যদি এভাবে ধরা যেত!

তথ্যসূত্রঃ

ওয়ালস্ট্রিট সারভাইভার ব্লগ

দা ওডিসি অনলাইন

উইকিপিডিয়া

দা গার্ডিয়ান

Most Popular

To Top