বিশেষ

পেতেই হবে এ প্লাস, অতঃপর….

“ভাবি, আপনার ছেলের খবর কী? আমার মেয়ে কিন্তু গোল্ডেন পেয়েছে!”

প্রতিবছর  বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এমন প্রশ্নগুলো আমাদের অভিভাবক মহলে বেশ আনাগোনা করে। যাদের সন্তান ভাল ফল করে তারা আগ বাড়িয়ে খোঁজখবর  নিতে উৎসুক থাকেন, আবার উত্তর দিতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু যেসব অভিভাবকের সন্তান প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তারা কিছুদিনের জন্য ঘরকুনো হয়ে যান। প্রয়োজনের তাগিদে বের হলেও মুখোমুখি হতে হয় নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির।

কিন্তু কেন এই অবস্থা? বর্তমান সময়ে সন্তানদের পরীক্ষার ফলাফল অভিভাবকদের মর্যাদার মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে । পড়াশুনা আর ভাল কাজের মাধ্যমে সন্তান পিতা-মাতার মুখ উজ্জ্বল করবে- এটাই তো নিয়ম। কিন্তু সুশিক্ষা, জ্ঞানার্জন আর নৈতিকতার চেয়ে বরং গ্রেড পয়েন্ট যখন মর্যাদার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, বিপত্তিটা বাধে তখন।

অনুকরণপ্রিয়তা আমাদের একটি বিশেষ গুন। অনুকরণ করে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেমন গোল্লায় পাঠিয়েছি, তেমনি পরীক্ষা দিলেই ‘এ প্লাস’ পেতে হবে এই চিন্তাধারা আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে চরমভাবে সংক্রমিত হয়েছে।

সংক্রমণ ভয়ংকররূপে বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব, শহরে-গ্রামে সকল অভিভাবকদের চিন্তাধারা একরেখায় চলছে।

কিন্তু চিন্তা করেই ক্ষান্ত হননি তারা। বাস্তবায়নও করছেন সফলভাবে। সন্তানকে বড় করতে কত কিছুই না করেন পিতা-মাতা! কত ত্যাগ স্বীকার, কত পরিশ্রম! আর সামান্য এ প্লাস পাওয়াতে কিছুই করবেন না- তা কি হয়?

কিন্তু কী করছেন আমাদের সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ? সন্তানকে শিক্ষিত করছেন নাকি নিজেদের মর্যাদার মুকুটটা আর একটু উঁচুতে তুলতে তাদেরকে যুদ্ধে নামিয়ে দিচ্ছেন? যে যুদ্ধে আবার সন্তানকে পরাজিত হওয়া চলবে না!

বয়স তিন-চার হতেই স্কুলে পাঠানো হচ্ছে শিশুদের। যে সময়ে খেলাধুলা করে আর মায়ের আঁচলে অপার স্নেহে অল্প অল্প করে পড়াশুনার ভিত তৈরী হওয়ার কথা, সেময়ে অতিরিক্ত বই বোঝাই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তাদেরকে ছুটতে হচ্ছে স্কুলে।

রেহাই নেই স্কুল ছুটি হওয়ার পরও। কোনরকমে নাকে-মুখে কিছু দিয়েই যাত্রা শুরু কোচিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে। কোচিং এর প্রয়োজনীয়তা ও মান যাই হোক, তবুও তাদেরকে পাঠানো হচ্ছে সেখানে। কারণ প্রতিবেশীর সন্তান যে কোচিং করে।

আজকের অভিভাবকরা এ প্লাস পাওয়াকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন যে, সন্তানকে সামাজিকতা শিক্ষা দিতে ভুলেই গেছেন। পড়াশুনা নিয়ে এতটাই নিমগ্ন থাকতে বাধ্য হয় যে, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কেউ বেড়াতে এলে আন্তরিকতা বা সৌজন্য প্রদর্শনের সময় তাদের হাতে থাকে না।

শিশুকাল থেকেই সন্তানদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয় যে বড় হয়ে তাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে নতুবা বড় কোন চাকরি করতে হবে। এই মানসিক প্রস্তুতির জন্য পিতা-মাতা তাদের সামনে বেশকিছু বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন। যেমন, অনেক টাকা পয়সা, মর্যাদা বা সম্মান, বিলাসী জীবন ইত্যাদি। কিন্তু এই শিক্ষায় নৈতিকতা, মূল্যবোধ, পরোপকারী সর্বোপরি একজন ভাল মানুষ হয়ে উঠার অনুপ্রেরণা থাকে না। ফলে ধীরে ধীরে সন্তান হয়ে পড়ছে আত্মকেন্দ্রিক এবং নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ।

বড় হওয়ার সাথে সাথে সন্তানের চারদিকটাও বিস্তৃত হতে থাকে। জগতের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় তার কৌতূহলী মন। কিন্তু সেসময় কোথায়? তার চারপাশটা যে এ প্লাস আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

নিজের পছন্দ-অপছন্দের মূল্য কতটুকু আমাদের শিক্ষার্থীদের? ফটোগ্রাফি ভালবাসা ছেলেটি হয়তো বাধ্য হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে, সাংবাদিকতার প্রতি প্যাশন থাকলেও কাউকে পড়তে হচ্ছে অর্থনীতি। আবার অনেকে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে লড়ছে চিকিৎসাবিদ্যায়।

অভিভাবকবৃন্দ কি এ পর্যন্ত করেই থামছেন?

না। নিজের প্রত্যাশার জায়গায় সন্তানকে দেখতে যেসব পদ্ধতির অবলম্বন  করছেন তার মধ্যে নিষ্কৃষ্টতম হচ্ছে প্রশ্নফাঁস শিক্ষার্থীরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিচ্ছে আর অভিভাবকরা সেটাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কখনো নিজেরাই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

সন্তানের সবচেয়ে কাছের ও ভাল বন্ধু তার পিতা-মাতা। কিন্তু ছোটবেলা থেকে তাদের কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণে সন্তানের মনে বৈরাগ্য তৈরী হয়। বেড়ে যায় সন্তান-অভিভাবকের দূরত্ব। সৃষ্টি হয় বিপদগামি হওয়ার সম্ভাবনা।

পরিশেষে ‘ গ্রেড পয়েন্ট, টাকা-পয়সার মধ্যে সন্তানের সুখ খোঁজা, নাকি সুশিক্ষিত, আদর্শ সন্তানের পিতা-মাতা হিসেবে গর্ববোধ করা’ কোনটিকে বেছে নেবেন? সিদ্ধান্ত অভিভাবকবৃন্দের।

Most Popular

To Top