ইতিহাস

নাজিবউল্লাহ আহমদযাইঃ তালেবান-পূর্ব আফগান রাজনীতির পটপরিবর্তনের সূচক

মধ্য এশিয়ার ভূমিবদ্ধ ইসলামিক রাষ্ট্র আফগানিস্তান। বিগত দুই দশকে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ প্রভাব ছিল তালেবান নামের ইসলামিক গোষ্ঠির। তালেবান শাসনের অধীনে আফগানিস্তানের চিত্রই আফগানিস্তানের পরিচয় হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী। তালেবান দখলের আগে আফগানিস্তানের শাসনব্যাবস্থা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অলৌকিক বলে মনে হতে পারে। আর্থ-সামাজিক সকল প্রেক্ষাপটে পটপরিবর্তনের ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট আফগান ইতিহাসে।

১৯৯৩ সালে তালেবান ক্ষমতায়নের ঠিক আগেই আফগানিস্তান একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন মোহম্মদ নাজিবউল্লাহ আহমেদযাই। ১৯৮৬-১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাধারণ চর্চায় তাকে ড. নাজিব সম্মোধন করা হত।

নাজিবউল্লাহ আহমেদযাই ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জন্মগ্রহণ করেন। কাবুলের হাবিবিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও ভারতের সেইন্ট জোসেফ স্কুল থেকে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে নাজিবউল্লাহ কম্যুনিস্ট পন্থী পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তানে(PDPA) যোগ দেন। তিনি পার্টির “পারশাম” খন্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭৮ সালে PDPA আফগানিস্তানের সার্বিক শাসন ক্ষমতা লাভ করে এবং রিভলিউশনারি কাউন্সিল গঠন করে। নাজিবউল্লাহ এই কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী “খাল্ক” খন্ডের প্রভাবে তাকে ইরান এমব্যাসিতে স্থানান্তর করা হয়। এর কিছু দিন পর তিনি ইউরোপে নির্বাসিত হন।

নাজিবউল্লাহ ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার আফগানিস্তান দখলের পর দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তখন বাবরাক কারমাল কে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে সোভিয়েত পৃষ্ঠপোষকতার একটি সরকার গঠিত হয়। ১৯৮০ সালে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা (KHAD) এর প্রধান হিসেবে নাজিবউল্লাহ নিযুক্ত হন এবং তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। KHAD এর তৎকালীন বাজেটের এক বিশাল অংশ সোভিয়েত রাশিয়া প্রদান করে।

নাজিবউল্লাহর প্রত্যবর্তনও সম্ভব হয় সোভিয়েত আনুগত্যের জের ধরে। নাজিবউল্লাহের আমলে KHAD কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। সে সাথে KHAD এর নিপীড়নের সীমাও বাড়তে থাকে। নাজিবউল্লাহ প্রধান থাকা কালে কয়েক সহস্রাধিক মানুষ গ্রেপ্তার ও বন্দী হন। এদের মধ্যে অনেকে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন যার সাথে নাজিবউল্লাহ প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত থাকতেন বলে জানা গেছে।  ১৯৮৬ সালে নাজিবউল্লাহ  PDPA এর সাধারণ সম্পাদক হন। এর ১০ দিন পর ১৫ মে তারিখে নাজিবউল্লাহ নিজেকে আফগানিস্তানের শাসক ঘোষণা করেন।

১৯৮৬ সালে নাজিবউল্লাহ ন্যাশনাল কম্প্রোমাইজ কমিশন(NCC) গঠন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ৪০০০০ বিপ্লবী এর সাথে সরকার পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়। বছরের শেষ দিকে সিজ ফায়ারের মাধ্যমে আলোচনা পর্বের সূচনা হয়। এর সফলতার মাধ্যমে ঐক্যজোট ভিত্তিক সরকার গঠনের ক্ষীণ সম্ভাবনার উদ্রেক হয়। তবে কমিশনটি ব্যর্থ হওয়ার পর PDPA এর সাথে অনেক মুজাহিদ বিপ্লবী জড়িয়ে পড়েন। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে সংবিধান পুনঃনির্ধারণ করা হয়। নাজিবউল্লাহ সত্যিকার ঐক্যজোট সরকার গঠনের পথ উন্মোচনকারী আইন প্রণয়ন করেন। ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। একই বছর PDPA এর ইসলাম পরিপন্থী পরিচিতি প্রশমনের জন্য ড. নাজিব নামের শেষে “উল্লাহ” পুনোরায় যুক্ত করেন। তার কপটতায় PDPA এর প্রতি সাধারন জনতার মনোভাবের তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। এর কারণ ছিল, জনগণের কাছে মুজাহিদ বিপ্লবীরাই ইসলামের পক্ষে আর PDPA সরকার ছিল সোভিয়েত কাঠপুতুল। এই চিন্তা ধারণা ধামা-চাপা দিতে ১৯৮৭ সালে ইসলাম কে আফগানিস্তানের রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা করা হয়। শাসক পদের জন্য আফগান মুসলিম পুরুষ ব্যতিত কেউ বিবেচিত হতে পারবে না বলেও ঘোষণা করা হয়। আফগান সংবিধান থেকে সকল কমিউনিস্ট প্রথা বাতিল করা হয় একই সময়ে।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে। এর ৪ দিনের মাথায় নাজিবউল্লাহ সরকার জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে। নাজিবউল্লাহ শাসনে আফগান সামরিক ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে পড়ে এবং সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য সোভিয়েত সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। নাজিবউল্লাহের কথা বিবেচনায় রেখে সোভিয়েত সরকার ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও ৫০০০০০ টন গম পাঠাতে রাজি হয়। এছাড়াও আনুমানিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নাজিবউল্লাহ সরকারের হাতে তুলে দেয়া হয়। ত্রাণ ও সহায়তার সম্পর্কের সমাপ্তি হয় ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে। পাকিস্তানি সহায়তায় মুজাহিদ বিপ্লবীদের প্রকোপ বেড়ে ওঠে এবং কাবুল জঙ্গী হামলার তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। NCC গঠনের ৫ম বর্ষপূর্তিতে নাজিবউল্লাহ সোভিয়েত রাশিয়া কে আফগানিস্তানের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেন।

১৯৯২ সালের ১৪ই এপ্রিল নাজিবউল্লাহ সরকরের পতন হয়। ক্ষমতা হারানোর পর নাজিবউল্লাহ জাতিসংঘের কাছে রাজক্ষমা প্রার্থনা করেন যা মঞ্জুর করা হয়, কিন্তু নাজিবউল্লাহ আফগানিস্তান ত্যাগ করতে ব্যর্থ হন।  নাজিবউল্লাহ এই সময়ে পিটার হপকির্ক এর “দ্যা গ্রেট গেইম” এর পশতু ভাষায় অনুবাদ করেন। এর মাঝে তাকে ২ বার পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হলেও তিনিই তা উপাখ্যান করেন। তার ধারণা ছিল পশতু বংশোদ্ভূত তালেবানরা তার প্রাণনাশ করবে না।

১৯৯৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তালেবান জঙ্গীরা জাতিসংঘের ভবনটি দখল করে। নাজিবউল্লাহ কে অপহরণ করার পর তার অন্ডকোষ কেটে ফেলা হয় এবং তাকে একটি টয়োটা পিক আপের পেছনে বেধে কাবুলের রাস্তায় টেনে হত্যা করা হয়। নাজিবউল্লাহ ও তার ভাই শাহপুর আহমেদযাই এর মরদেহ জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। তাদের মরদেহের মাধ্যমে তালেবান শাসনকালের সূচনা হয় আফগানিস্তানে।

নাজিবউল্লাহ নিয়ন আলোয় neon aloy

অমানবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা নাজিবউল্লাহ’র ঝুলন্ত মৃতদেহের সামনে উল্লসিত এক তালেবান যোদ্ধা।

তীব্র আন্তর্জাতিক নিন্দার আর জাতিসংঘের হুশিয়ারির উত্তরে তালেবান সকল মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজিবীদের হত্যার পরোয়ানা জারি করে। নাজিবউল্লাহ পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সরকার তালেবান দমনে যুক্তফ্রন্টকে সহায়তার আশ্বাস দেয়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top