শিল্প ও সংস্কৃতি

ত্রিভুজের শেষ বিন্দুর খোঁজে…

কেউ কি বলতে পারবে ত্রিভুজের প্রারম্ভ বিন্দু কিংবা শেষ বিন্দু কোনটি? বলা কি সম্ভব? না, কখনো সম্ভব না।
এই ছোট তত্ত্বটিকে যে এত সুন্দর এবং বিশদভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, মানুষকে গভীর চিন্তায় ফেলে দিতে পারে এরকম সিনেমা যে বানিয়ে ফেলা যায়, তা ক্রিস্টোফার স্মিথের ‘ট্রায়াঙ্গেল’ না দেখলে বোঝার কোন উপায় নেই।

ট্রায়াঙ্গেল মুভিটি একটি সুপারন্যাচারাল থ্রিলার। মুভিটি অনেক দর্শকের মনে দাগ কাটতে পারলেও বেশির ভাগ মানুষ বুঝে উঠতে পারে নি এর ভাবার্থ কি। রটেন টমেটোস, আইএমডিবি’র মত মুভি রেটিং সাইটগুলোতেও এর রেটিং অনেক কম।

মুভিটি নিয়ে কিছু বলার আগে গল্পটা নিয়ে একটু বলে নেই।

গল্প শুরু হয় (আসলেই কি শুরু!) জেস তার বন্ধুদের সাথে ‘ট্রায়াঙ্গেল’ নামক ইয়টে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সাথে সাথে। সমুদ্রে ঝড়কবলিত হয়ে তাদের এই ইয়টটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তারা পরবর্তীতে আশ্রয় নেয় ‘এওলাস’ নামক একটি রহস্যময় জাহাজে যেখানে কোন জনমানবের চিহ্ন নেই। তারপর একে একে রহস্য বাড়তে থাকে। জেস জাহাজেই দেখতে পায় তারই চেহারার একজনকে। এইভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে গল্প…

পাঠকদের আগেই বলে নিচ্ছি পুরো লেখাটা পড়লে স্পয়লার পাওয়ার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে। তো যারা মুভিটি দেখেন নি তাদের বলছি আগে একবার মুভিটি দেখে নিন। আর যারা দেখেছেন এবং মর্মোদ্ধার করতে পারেন নি তারা লেখাটি পড়লে আশা করি তাদের কাঙ্ক্ষিত সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

মুভিটি বুঝার জন্য সবার আগে যেটি বুঝতে হবে সেটি হল জাহাজে একই সাথে ৩ জন জেস আছে। যখন জেস (যে কিছুই জানে না) ট্রায়াঙ্গেল ছেড়ে এওলাসে উঠে তখন জাহাজে আরো দুইজন জেস উপস্থিত আছে। জেস (যে সবকিছু শিখছে ) এবং জেস (যে এখন সবকিছুই জানে এবং নিষ্ঠুর)।

এইখানে এখন জেস চরিত্রটি চক্রাকারে ঘুরতে থাকে।প্রথমে সে কিছুই জানে না, এরপর আস্তে আস্তে শিখতে থাকে এবং শেষে সবকিছুই সে জানে এবং নিষ্ঠুর জেস এ রূপান্তরিত হয়।

পুরো জিনিসটার আবার পুনরাবৃত্তি হয় আরেকটা ট্রায়াঙ্গেল ইয়টের আগমনের মাধ্যমে। সহজ কথায় প্রথমে জেস-১ (যে কিছুই জানে না) আশপাশ দেখতে দেখতে জেস-২ (যে সবকিছু শিখছে) এ রূপান্তরিত হয়।

তারপর সে বুঝতে পারে সবাইকে বাঁচাতে হলে একে একে প্রত্যেকেই মারতে হবে। তখন সে জেস-৩ (নিষ্ঠুর) এ পরিণত হয়। ঘটনাটি চক্রাকারে চলতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না জেস-১ জেস-৩ (নিষ্ঠুর) কে মেরে পানিতে ফেলে দেয়। আর জেস-৩ সমুদ্রের তীরে আবার এসে পড়ে যাতে সে আবার ট্রায়াঙ্গেল হয়ে এওলাসে আসতে পারে জেস-১ হয়ে। চক্রটি যখন চলছে তখন প্রতিবারেই জেস-১ যে কিনা কিছুই জানে না তার ট্রায়াঙ্গেল এর পূর্ববর্তী কোন স্মৃতিই থাকে না, তার কাছে পুরো ব্যাপারটাই যেন দেজা-ভু।আর বাকি দুইজনের ততক্ষনে টাইম লুপ সম্পর্কে ভালোই ধারণা হয়ে যায়।

এখন মুভির কাহিনীচিত্রটি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রথমেই জেসকে যেমন আলাদা করা হয়েছে ৩বার সেরকম করে তার গ্রুপটিকেও (যাদের সাথে তার এই সমুদ্র ভ্রমণ) ৩ বার আলাদা করি। গ্রুপ-১ যাদের সাথে জেস-১ এওলাসে উঠে।

১. জেস-১ যখন ট্রায়াঙ্গেলে উঠে তখন তার সাথে ছিল- গ্রেগ (যে কিনা ইয়টের মালিক), ডাউনি এবং শেলি (স্বামী-স্ত্রী), ভিক্টর এবং হেদার। ঝড়ের কবলে পড়ার পর যখন গ্রুপ-১ এর সকলে (জেস-১ সহ) এওলাসে উঠে তখন জাহাজে হাঁটতে হাঁটতে নিজের চাবি পায় জেস-১। তারপর আস্তে আস্তে ডাইনিং এর দিকে যাত্রা করে। সেখানে তাকে ভিক্টর-১ আক্রমণ করে। নিজের জীবন বাঁচাতে গিয়ে জেস তাকেই মেরে ফেলে। তারপর সে দেখে মুখোশ পরহিত একজন একে একে তাদের সবাইকে মেরে ফেলছে। শেষে যখন এই মুখোশ পরিহিত খুনী জেস-১ কে মারতে আশে সে কখন ওই খুনীকে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিতে সক্ষম হয় গ্রুপ-২ (জেস-২ সহ) আসার আগেই।

২. জাহাজে উঠার পর আগের ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি হয়। জেস-২ তার চাবি খুঁজে পায়। জেস-১ গ্রুপ-২ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে জাহাজে ঘুরে বেড়াতে থাকে। ভিক্টর-২ তাকে দেখে ফেলে এবং তার পিছে ছুটে। ফলাফল ভিক্টরের মৃত্যু। জেস-১ ঘুরতে ঘুরতে একটা রুমে এসে পৌছায় যেখানে শটগান এর সাথে সাথে ছিল একটি চিরকুট। তাতে লিখা “kill everyone who boards”। তারপর জেস-১ মুভি থিয়েটারে যায় এবং সেখানে তার দেখা হয় মুখোশধারী খুনীর সাথে। জেস তাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে এবং তাকে জাহাজ থেকে ফেলে দেয়।

৩. জেস-১ এবং জেস-২ গ্রুপ-৩ কে জাহাজে উঠতে দেখে। জেস-১ তখন আস্তে আস্তে আঁচ করতে পারে টাইম লুপের কথা। সে তারপর আস্তে আস্তে সকলকে খুন করতে থাকে। চেষ্টা করতে থাকে যাতে আর কেউ যাতে জাহাজে উঠতে না পারে কারণ সে তার ছেলের কাছে ফিরে যেতে ব্যাকুল। তারপর জেস-১ আয়নায় লিখে দেয় “Go To Theatre”। এরপর জেস-১ মুখোশ পরে আর গ্রেগ-৩ কে মেরে ফেলে। জেস-৩ মুখোশধারী জেস-১ কে জাহাজ থেকে ফেলে দেয়। জেস-১ সমুদ্রে ভেসে তীরে এসে পৌছায় এবং নিজের ঘরে গিয়ে দেখে অন্য আরেক জেস যে কিনা তার ছেলেকে মারছে। জেস-১ তাকেও মেরে ফেলে। ওই লাশ গাড়ির ট্রাঙ্কে নিয়ে যাওয়ার সময় আবার দুর্ঘটনায় তার ছেলে মারা যায়।

উপরের লিখা পড়তে পড়তে আপনারাও হয়তো পড়ে গেছেন লুপে। তাহলে এখন আসল ঘটনায় আসি……

সিনেমার এই কখনোই শেষ না হওয়া লুপ এর একমাত্র কারণ জেস। জেস স্বল্প বেতনের একজন ওয়েট্রেস। তার অটিস্টিক ছেলেকে নিয়েই তার সংসার। অভাবের টানাপোড়নে প্রায় তার মেজাজ থাকে গরম। এমনি এক দিনে তার ছেলে খেলাচ্ছলে দেয়ালে রঙ নিয়ে আঁকিবুকি করে। তাতেই জেসের মেজাজ চড়ে। রাগের মাথায় ভুল করে ছেলেকে মেরে ফেলে।

জেস এর এই তিরিক্ষি মেজাজ, তার ছেলের উপর অত্যাচার এবং ছেলেকে মেরে ফেলার শাস্তি হিসেবে এই লুপের সূচনা হয়। লুপের শুরু হয় ৮টা ১৭ মিনিটে। ছেলেকে মারার সাথে সাথে। তার ক্রোধ ও নৈরাশ্য এর ফলাফল তার ছেলের মৃত্যু। জাহাজ ফেরত জেস যখন বাসায় এসে দেখে অন্য আরেকজন জেস ওই ছেলেকে মারছে। তা দেখে জেসই তার আরেক সত্ত্বাকে মেরে ফেলে আর তার ভুল বুঝতে পেরে ছেলেকে বলে এখন থেকে সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। পুরো মুভিটাই জেসের এই অপরাধবোধ নিয়ে। সে প্রতিবার চেষ্টা করে যায় ছেলেকে বাঁচানোর।

জাহাজ থেকে ঘরে এসে তার আরেক সত্ত্বাকে মারার পর সে তার ছেলেকে নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা করে। কিন্তু মাঝখানেই এক্সিডেন্টে তার ছেলে মারা যায়। আবার লুপের সূচনা। পুনরায় শুরু হয় সবকিছু। এভাবে চলতে চলতে জেস বুঝতে পারে এই ট্রায়াঙ্গেলের শেষ নেই। তার ক্ষমতার বাইরে সবকিছু। তখনই একজন রহস্যজনক ট্যাক্সি ড্রাইভার জেসকে মনে করিয়ে দেয় যে সে তার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। এবং সে তাকে মুক্তি দিবে যদি জেস স্বীকার করে যে সেই তার ছেলেকে মেরেছে। কিন্তু তা হয় না। জেস তার লুপে চলতেই থাকে। আসলে এই ট্যাক্সি ড্রাইভার হল মৃত্যুর বার্তাবাহক। সে অপেক্ষা করছিল কখন জেস স্বীকার করবে এবং তাকে মুক্তি দিবে।

শেষ পর্যন্ত জেস কি মুক্তি পায়, নাকি ট্রায়াঙ্গেল এ ঘুরতেই থাকে… ঘুরতেই থাকে………

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top