নিসর্গ

পার্পেল ড্রিম (হোটেল ও আপেল বিভ্রাট!!)

পার্পেল ড্রিম (হোটেল ও আপেল বিভ্রাট!!)

মানালি পৌঁছে, গাড়ি থেকে নেমে, সবাইকে মল রোডের এক কোনায় ব্যাগ-প্যাকসহ ঘাপটি মেরে বসে থাকতে বলা হল, যেন এতজন একসাথে এসেছি সেটা কেউ বুঝতে না পারে। পাছে কোন দালালের খপ্পরে পরি সেই আশঙ্কায়। মল রোড ঘেসেই একটি হোটেলে ঢুকলাম কাঠের সিঁড়ি বেঁয়ে। এক তলা মাড়িয়ে দোতলায়। অভ্যার্থনায় কথা বলে আর পাশের রুম দেখে তো বেশ অবাক। মোটামুটি ভালোই রুম দুইজন আরামে আর একটি এদিক সেদিক করলে তিনজন মিলেই এক রুমে থাকা যাবে। ভাড়া ৬০০ টাকা। একটু কথা বলে সেটা ৫০০ তে নামিয়ে এনেছি প্রায়।
এরই মধ্যে সেই হোটেলেই রুম নিতে এলো এক দম্পতি বা তেমন এক জোড়া কপোত- কপোতী। তারাও তিন তলার রুম দেখতে যাবেন। তো তাদের দেখে তো আমার সহযাত্রী চক্ষু কপালে উঠে গেছে। বলেই ফেলল ভাই এ যে দেখছি আপেল। চলমান আপেল!! নারে ভাই আপেল গাছ আর সাথে আপেল। যাই হোক সুশীল ভাসায় সেই আপেলের বর্ণনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভবনা বলে বাদই দিলাম। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উহা আমরা যারা দেখিয়াছি তাহাদের হৃদয়ে গোপন আনন্দ হয়েই নাহয় রেখে দিলুম।

চলেন ভাই উপরে যাই, উপরের রুমগুলো কেমন একটু দেখে আসি?
চলেন, একটু রুম দেখতেই তো যাবেন এ আর কি? সাথে যদি ফ্রি ফ্রি আপেল দেখতে পান সমস্যার তো কিছু নাই। তাই চলে গেলাম উপরের তিন তলার রুম আর সাথে চলমান আপেলের পিছে পিছে। উপরে গিয়ে রুম দেখে পছন্দ হয়ে গেল। না হয়ে উপায় আছে কোন পাশের রুমেই যদি আপেল থাকে।
নিচে এসে মোটামুটি রুম ফাইনাল করে ফেলবো এমন সময় এক মুরব্বী জানালো যে, রুম ৫০০ রুপীতেই দেয়া যাবে কিন্তু এক রুমে তিনজন থাকা যাবেনা। তবুও এখানেই রুম নেব বলে বলে নিচে চলে গেলাম অন্যদেরকে নিয়ে আসতে। রুম আর সাথে আপেল একই সাথে পেয়ে গেলাম।

পাশাপাশি অন্য এর একটি হোটেল দেখা হল, একদম মল রোডের মাঝে। ঠিক একই দামের আর মানের, তবে বাড়তি সুবিধা এই যে এখানে এক রুমে তিনজন থাকতে দেবে, বেডটাও বেশ বড়, তিনজন আরামে হয়ে যাবে। দুই যায়গায় দুই হোটেল দেখে অন্যদের সাথে করে নিয়ে আসবো, তাই ছুটলাম। কিন্তু নিচে গিয়ে দেখি আরও এক ব্যাচ ব্যাগপত্র রেখে বেরিয়েছেনে রুম দেখতে। তারা ফিরে আসতে আসতে অন্যদেরকে রুম আর তরতাজা আপেলের বর্ণনা দিতে দিতে অন্যরাও আপেলেসহ রুমে যেতে এক পায়ে রাজি। এখানেই উঠবে আর রাতভর আপেল খেতে না পারুক দেখে দেখেই সুখ পাবে। ঐ যে কথায় আছেনা, ক্ষুধার্ত কুকুর অন্যের খাওয়া দেখেই সুখ পায়। ঠিক সেই রকম।

কিন্তু এর মধ্যে অন্য একটা গ্রুপ এরচেয়েও কম দামের রুম পেয়ে মোটামুটি ঠিক করে এসেছে, জাস্ট সবার সম্মতি নিয়ে দেখিয়ে উঠবে বলে কনফার্ম করেনি। এরপর নানা তর্ক- বিতর্কে আর যুক্তির মাধ্যেমে ঠিক হল যে ঠিক মল রোডের মাঝখানেও হোটেলে উঠবো। যেন মল রোডে হাটতে চাইলেই নিচে নেমে উপভোগ করা যায়। বা রুম থেকে নিচে নেমে না গিয়ে, হোটেলের বেলকোনিতে বসেই উপভোগ করা যায় অলস মানালির মুগ্ধতা ছড়ানো মল রোডের রূপ- রস- গন্ধ আর আপেলের বাগান।

অলস মানালির বারান্দা থেকে

এইসব যুক্তি মেনে নিয়ে সবাই মিলে হোটেলের দিকে যাচ্ছি, কিন্তু একজন যিনি প্রথম হোটেলে গিয়েছিলেন আর রুমের পাশাপাশি আপেল দেখে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিনেল সেই আপেল বাগানের মাঝে, তিনি আমাদের যুক্তি- তর্ক সাপেক্ষের রুমের দিকে না গিয়ে আপেল বাগানের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে টি- শার্ট টেনে ধরে জিজ্ঞাসা করা হল,
-ভাই আপনি কই যান?
-কেন হোটেলে, আপেল বাগানসহ যে হোটেল প্রথমে দেখলাম।
-আরে না ভাই, ওই হোটেলের এক রুমে তো তিনজন একসাথে থাকতে দেবেনা, দাম অনেক বেশী পরে যাবে তাই দ্বিতীয় যে হোটেল দেখেছিলাম সেখানে যাচ্ছি, এক রুমে তিনজন থাকতে, ৫০০ রুপীতে। জনপ্রতি মাত্র ১৩৩ রুপীর বিলাসী রুমে।
না ভাই, আমি ওই হোটেলে যাব না, আমি আপেল বাগানের রুমে যাব।

বেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে ফেরানো গেলেও অন্য আর একজন তার আপেল বাগানের প্রতি বিশেষ ঝোঁক দেখে প্রস্তাব দিল, চলেন ভাই আপনার এতো আপেল আপেল করছেন কেন, আমিও না হয় একটু হোটেলটা, রুমগুলা আর আপেলটা দেখে আসি?
ওরে নারে ভাই, আপনি ওই হোটেলে গেলে আর আপেল যদি চোখে পরে যায়, তবে আপনাকে আর ওই হোটেলের কাছ থেকে ফেরানো যাবেনা। আপনি তখন ১০০০ টাকা দিয়েই হলেও ওই আপেল বাগানের পাশের রুমে থাকতে চাইবেন। যেটা আমাদের বাজেটে কুলাবেনা। চলেন ভাই, আপেল জীবনে অনেক পাইবেন, কিন্তু ১৩৩ টাকায় জনপ্রতি রুম পাওয়া খুব কঠিন।
অবশেষে তাহাদেরকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আপেলের বিভ্রাট থেকে মুক্ত করে।

রাতের মানালি

Most Popular

To Top