ইতিহাস

দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করুণ ইতিহাস

দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করুণ ইতিহাস

সময়টা ১৯২৭ সাল। ভারতবর্ষে অসহযোগ আন্দোলন ইতি টেনেছে পাঁচ বছর হল। হিন্দু- মুসলিম ঐক্যের মাইলফলক হয়ে থাকা অসহযোগ আন্দোলন তৎকালীন ভারতীয় জনগণের সম্মিলিত সহাবস্থান প্রশ্নে আশা জাগানিয়া ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস ছিল। কিন্তু উপমহাদেশীয় সেই চিরায়ত সংকট কি আর ঝড়ের মত উবে যাওয়ার? আজ এত প্রগতিশীল স্বাধীন সময়েও সাম্প্রদায়িক সমস্যা গলারকাঁটা হয়ে বিঁধে, সে জায়গায় পরাধীন ভূখণ্ডে এ সমস্যার উদ্ভব, সে তো নস্যি।

বর্তমান বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার কুলকাঠিতে সংঘটিত ‘পোনাবালিয়া হত্যাকাণ্ড’ নামক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করুণ ইতিহাস জানব আজ।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার পোনাবালিয়াতে অবস্থিত শিবমন্দির ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের আন্তর্জাতিক ৫২টি তীর্থস্থানের মধ্যে তৃতীয়।

শিবমন্দিরের অদূরে ১৯২৬ সালে নির্মিত হয় একটি মসজিদ।


১৯২৭ সালের ২ মার্চ। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাঠের যোদ্ধা সতীন্দ্রনাথ এর নেতৃত্বে হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের একটি দল রৈরৈ শব্দে কীর্তন বাজিয়ে শিবমন্দির অভিমুখে যাচ্ছিল।
ঘটনাক্রমে, মসজিদে নামাযের জন্য মুসুল্লিরা প্রস্তুত হচ্ছিল। হিন্দুদের ঢাক- ঢোলের শব্দে মুসুল্লিদের নামাযে ব্যাঘাত ঘটে। সমস্যার সমাধানকল্পে কুলকাঠি মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে মুসলমাদের একটি দল হিন্দুদের কীর্তন বন্ধ করতে অনুরোধ করে। হিন্দুরা সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে শুরু করে। তীর্থযাত্রীরা ঢাকঢোল পিটিয়ে শিবমন্দির অভিমুখে যাত্রার অটল প্রতিজ্ঞায় সংঘবদ্ধ হয়। উত্তেজিত মুসলমানগণও হিন্দুদের রুখে দাঁড়ানোর পাল্টা প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়।
ফলাফল হিসেবে বিক্ষিপ্তভাবে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঘটনা আঁচ করতে পেরে তার আগেই সতীন্দ্রনাথ কিছু হিন্দু স্বেচ্ছাসেবকের যোগান দিয়েছিলেন যাতে করে উদ্ভূত বেসামাল অবস্থা সামাল দিতে প্রয়োজনীয় সমর্থন লাভ করা যায়। মূলত সতীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উস্কানিতেই এহেন বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। চতুর সতীন্দ্রনাথ তাই আগেভাগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই. এন. ব্লান্ডিকে এ বিষয়ে অবহিত করে রাখেন। অবস্থা যখন চরম পর্যায়ে পৌছে তখনই এন ব্লান্ডি সসৈন্যে জেলা পুলিশ সুপারকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। অশিক্ষিত মুসলমানগণ ইংরেজি না জানার কারণে ব্লান্ডিকে উদ্দেশ্য করে গলার কাছে হাত দিয়ে ইশারায় বুঝাতে চেষ্টা করে যে, নিরবচ্ছিন্নভাবে নামায পড়তে না পারলে তারা এরচেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে। শিক্ষিত হিন্দুরা এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ইংরেজ বাহিনীকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, সৈন্যরা যদি আর এক পা আগায় তবে তাদের জবাই করে ফেলা হবে। হিন্দুদের মিথ্যাচারে হিপ্নোটাইজ হয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ব্ল্যান্ডি মুসলমানদের উপর গুলির নির্দেশ দেন। ঘটনাস্থলেই ২০ জন নিরপরাধ মুসুল্লি নিহত হোন, আহত হয় প্রায় শতাধিক।
হত্যাকাণ্ডের খবর বিদ্যুৎবেগে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ- ভারতের সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সহিত এ হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার করা হয়, ব্ল্যান্ডিকে নৈতিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
মাসিক সওগাত একে দ্বিতীয় ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে।

পোনাবালিয়া হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়েই শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক কলকাতা থেকে উড়ে আসেন বরিশালে। তিনি বরিশালে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে ই.এন. ব্লান্ডিকে ‘ব্লাডি’ বলে আখ্যা দেন। রাগে, ক্ষোভে তিনি আরো বলেন,

“ব্লান্ডির নাম পায়খানার বেড়ায় লিখে দিনরাত ঝাড়ু মারলেও তার শাস্তি কম হয়ে যাবে”

তিনি বক্তব্য দিতে গিয়ে এতটাই উন্মত্ত হন যে, টেবিলে হাত চাপড়াতে গিয়ে তার থাবার আঘাতে টেবিল ফেটে চুরমার হয়ে যায়। শেরে বাংলা এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে নিজে পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে জয়ী হন।
তিনি ঐসময় একটি সম্প্রীতি চুক্তি করেন, যার ফলে পুরো বরিশালে দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত আর কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি। চুক্তিটি ইতিহাসে বরিশাল চুক্তি নামে পরিচিত।

মামলায় পরাজিত হয়ে ইংরেজ সরকার নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে, মসজিদ পূনর্গঠন করে দেয় এবং ব্ল্যান্ডি এ ঘটনায় নিঃশর্ত ক্ষমা চায়। নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে কুলকাঠি উচ্চবিদ্যালয়কে ‘কুলকাঠি শহীদিয়া ইউনিয়ন একাডেমী’ নামে রূপান্তর করা হয়। ২ মার্চ কুলকাঠি হত্যা দিবস পালন করা হয়।

কুলকাঠি হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলে। ব্রিটিশ শাসনে সম্ভাব্য সব পরিণতি নিয়ে এ ঘটনা পুরো মুসলিমগোষ্ঠীকে সজাগ করে তোলে।

ছবিসূত্র: কন্ঠ ৭১, grimtravelers

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top