ইতিহাস

একমাত্র আমরাই কি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলাম?

আজ ভাগলে কালকে আমরা নাই

-মিস সত্যি! আমরা ছাড়াও মাতৃভাষার জন্য অন্য কোন জাতি প্রাণ দিয়েছে?
-ঠিক শুনেছো ফারিহা।
-কিন্তু মিস আমি তো আগে কখনো এই বিষয়ে পড়িওনি এবং শুনিওনি।
-তোমার মতো অনেকেই আছে যারা এ বিষয় সম্পর্কে অবগত নয়।

বাহান্নয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারেরা যে পথে মায়ের ভাষার মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, তার ঠিক নয় বছর পর একষট্টি সালে ‘ঈশান বাংলা’ হিসাবে পরিচিত আসামের বরাক উপত্যকায়ও তেমনি মাতৃভাষার জ্ঞাতার্থে  প্রাণ উৎসর্গ করে মায়ের মুখের বাণীকে রক্ষা করেছিলেন এগারোজন তরুণ তরুণী। খুব বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার এক বড় অংশের সচেতন শিক্ষিত মহলও এ বিষয়ে সম্যকভাবে অবহিত নন।

ব্রিটিশ আমল থেকেই গোয়ালপাড়া আর সিলেট জেলাকে আসাম রাজ্যের সাথে যোগ বিয়োগের যেন এক অদ্ভুত খেলা চলছিলো। স্বাধীনতার পর রাজ্য গঠনের ভুল নীতির কারনে আসাম গড়ে উঠে অনেক জাতি-উপজাতি নিয়ে। পাহাড় ঘেরা আসাম রাজ্য থেকে সংগৃহীত রাজস্ব দিয়ে রাজ্য চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ছিলো। উপায়ন্তর না পেয়ে রাজ্য সরকার শস্য শ্যামলে ভরা সিলেট আর গোয়ালপাড়াকে আবার রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য জুড়ে দেয়। কিন্তু ঐ যে জাতিগত কৃষ্টি আর ভাষায় ঘোর ভিন্নতা -তাই কিছুদিন বাদে আবার ছাটাই করে দেয় এই দুটি জেলাকে। এ সুবাদে অনেক বাঙালি স্থায়ী ভাবে ওখানে বসবাস শুরু করে। ভৌগলিকভাবে আসাম পাহাড় ঘেরা হলেও পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বারাক উপত্যকার দিকটা আবার বেশ সমতল। এই ভূমি আবাদযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পরিশ্রম বিমুখতার জন্য পতিত হয়ে পড়ে থাকে। রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ জমি আবাদ করার জন্য ময়মনসিংহ ও রংপুর জেলা থেকে অনেক কৃষককে আহবান করে এনে এখানে বসতি স্থাপন করান। এভাবে প্রচুর বাঙালি চাকুরী, ব্যবসা, কৃষি ইত্যাদি সূত্রে বসবাস শুরু করেন। এছাড়া দেশভাগের বলি হয়েও অনেক বাঙালি স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। তারা বিভিন্ন জাতির সাথে শান্তি আর সৌহার্দপূর্নভাবে থাকতে শুরু করেন।

ভাষার জন্য মিছিল

কিছুকাল পরে আসাম রাজ্যে বাঙালিদের এমন বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক রাজ্য সরকারের নজর কাড়ল। ভিন্নতার মাঝে ঐক্য- এই সত্যকে হজম করতে যেন বেশ কষ্ট হচ্ছিলো জাতীয়তাবাদীদের। তাইতো আসাম সরকার পাঁচের দশকের শেষের দিকে রাজ্যে এক রাজ্য, এক ভাষা, এক কৃষ্টি,এ ক পরিচয়ের ভুল নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত হয়ে পরেন। রাজ্যের স্কুলগুলোতেও অসমীয়া ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য অগণতান্ত্রিক সিধান্ত নেন। গোটা রাজ্যের অনসমীয়া জনগণ বিক্ষোভে ফেটে উঠে। রাজ্যের শাসকদলও তাদের নীতিতে অটল। এমনকি  বারাক উপত্যকায় নির্বাচিত শাসকদলের বাঙালি বিধায়কের অধিকাংশ সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে ওকালতি করতে থাকেন। বারাকে ৮৫ শতাংশ জনগণ বারাকে বাংলাভাষী হওয়ার কারণে প্রতিরোধ এখানেই হয় সর্বত্র। বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন হতে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকারও না বুঝার ভান করে থাকে। অবশেষে বাংলার ভাষা আন্দোলনের ঠিক নয় বছর পর ইতিহাস পুনঃবৃত্তি হয়।

১৯৬১ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ, মাতৃভাষা শিক্ষালাভের দাবিতে শিলচরে রেল রেখো কর্মসূচী গ্রহন করা হয়। রাত পোহাতেই দলে দলে স্বেচ্ছাসেবীরা রেল স্টেশনে জমায়েত হয়ে রেল লাইনে বসে পড়ে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রেলের চাকা ঘুরতে দেবেন না। তার দমন নীতি নিয়ে তৈরি ছিল সরকারও। পুলিশে পুলিশে স্টেশন চত্বর ছিল ছয়লাপ। এর মধ্যেও অটল ছিলেন রেল অবরোধকারী ভাষা সংগ্রামীরাও। মাঝে মধ্যেই পুলিশ লাঠি চালায়। আহত হলেও কেউ রেল লাইন ছেড়ে উঠে যাননি।

রেল রেখো কর্মসূচী

১৯ এর ভাষা শহীদ

খবর চলে যায় শিলঙে, রাজ্য সরকারের কাছে। সেখান থেকে নির্দেশ আসে, মাথা নোয়ানো চলবে না, যে করেই হোক রেল চালাতে হবে। বেলা দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিটে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত আন্দোলনকারীদের উপর বিনা প্ররোচনায় গুলি চালায় কংগ্রেস সরকারের পুলিশ। স্তম্ভিত হয়ে যায় সারা দেশ। নিরস্ত্র, নিরুপদ্রব সত্যাগ্রহীদের উপর সরকার ও পুলিশের এহেন আচরণ কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি। চোখ আর মাথা ভেদ করে যাওয়া গুলিতে লুটিয়ে পরেন সে বছর মেট্রিক পরীক্ষার্থিনী সপ্তদশী কমলা ভট্টাচার্য। আরও কয়েকজন অকুস্থলেই প্রাণ হারান। অনেকেই মারাত্মক আহত। তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতেও প্রথমে বাধা দেয় পুলিশ। পরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে অসংখ্য আহত সত্যাগ্রহীকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। মোট শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় এগারো। শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, চণ্ডিচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, কুমুদ দাস, সত্যেন্দ্র দেব এবং শহীদ কমলা ভট্টাচার্য। আহতের সংখ্যা অগণিত।

চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে প্রাণে বেঁচে রইলেন কয়েকজন। ঘৃণায়, ক্ষোভে, প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে সারা রাজ্য। প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে কলকাতার রাজপথেও। অঢেল রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে সেদিন ঈশান বাংলার মানুষ শাসকদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনলেন মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার। ওই অপকর্মের পরও শিক্ষা হয়নি উগ্র জাতীয়তাবাদী শাসকদের। বিভিন্ন কৌশলে তারা বারংবার চেষ্টা করে গেছে মাতৃভাষার অধিকার খর্ব করতে। ফলে মাতৃদুগ্ধসম মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় ৭২এ একজন, ৮৬তে দুইজন এবং ৯১সালে আরও একজনকে প্রাণ আহূতি দিতে হয়েছে মাতৃভাষার বেদীমূলে। সেদিন মাতৃভাষার জন্য যে ১১ জন বীর শহীদ আত্মবলি দেন তাদের মধ্যে ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষাশহীদ সতের বছরের তরুনী কমলা ভট্টাচার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র দুজন নারী মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন- একজন শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় জন শহীদ সুদেষ্ণা সিংহ যিনি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলনে শহীদ হন। আবার ঈশান বাংলার মাটি দুই ভিন্ন ভাষার আন্দোলনে রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।

-মিস নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট লাগছে। আমি একজন  সিলেটি হওয়া  সত্ত্বেও এই ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নই। আজ থেকে সবাইকে আমি এই ভাষা আন্দলনের ইতিহাস জানাবো।

-খুব ভালো উদ্যোগ ফারিহা। চলো তোমাকে এই ভাষা আন্দোলন নিয়ে “Whale in the Pond” এর একটা গান শুনাই।

“রিস্কাওয়ালা আইজ থাক্তাম না, জলদি কইরা তারাপুর লই যাও
হাফ্লংতিকা কাকু আইবো ব্রডগেজ ট্রেইনো মালা ফোরাইতাম
ব্রডগেজ লাইনোর ফইসা খাঊরা নেতা হালা বাইজ্ঞা যাইবো
পদ্মফুল অখন আমরা লাইন লাগাইয়া রৌদ্র ও দাঁড়াইতাম।
ডরাইতে আয় আর বন্দুকের আওয়াজ শুনায়,
রক্ত জইমা যায়, আমি পরিচয় হারাইতাম না।
নিতে দিতাম না,আইজ ভাগলে কালকে আমরা নাই
আইজ আমি বাড়ি ফিরতাম না……………….”

 

তথ্যসূত্রঃ
সিলেট ইয়ুথ ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশন এবং অন্যান্য অনলাইন প্রকাশনা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top