ফ্লাডলাইট

হাথুরুর ভালো, হাথুরুর মন্দ (প্রথম পর্ব)

নিয়ন আলোয়- হাথুরুর ভালো, হাথুরুর মন্দ (প্রথম পর্ব)- Neon Aloy

অনেক খেলাতেই ‘হোম এন্ড এওয়ে’ পদ্ধতি চালু থাকলেও ক্রিকেটের মতো আর কোনো খেলায় ‘হোম কন্ডিশন’ ব্যাপারটা এত গেড়ে বসতে পেরেছে বলে মনে হয় না। একদিবসী ক্রিকেটে যেমনতেমন, টেস্ট ক্রিকেট তো এখন যেন পুরোটাই ‘হোম কন্ডিশন’ নির্ভর। নিজভূমের জল-হাওয়ায় ভারত রীতিমতো দুর্ভেদ্য। আর নিজেদের চেনা মাটিতে সাউথ আফ্রিকা, অজেয়!

গত বছর পাঁচেকে টেস্টে সবচেয়ে কম রানে অলআউট হওয়া দলগুলোর তালিকা নিয়ে বসলে দেখা যায়, রেকর্ডগুলোর মালিকানা হাতবদল হলেও ঘটনাস্থল সবসময় একই, ওই দক্ষিণ আফ্রিকা। এই দশ বছরের মাঝে পাকিস্তান সেখানে অলআউট হয়ে এসেছে ৪৯ রানে। ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ , ‘উপমহাদেশের দল’, ‘পেস বল খেলতে পারে না’ বলে আপনি একটা সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা চালাতে পারেন। তবে প্রতিবছর গণ্ডায় গণ্ডায় ফাস্ট বোলার জন্ম দেয়া অস্ট্রেলিয়ার সেখানে ৪৭ রানে অলআউট হওয়াকে কি বলবেন?

তবে তারপরও সাউথ আফ্রিকার কাছে ১ম টেস্টে ৩৩৩ রানে হারটা মেনে নেয়া কঠিনই বটে। একে তো চোটের কারণে স্টেইন, ফিল্যান্ডার ছিলেন দলের বাইরে, মরকেলও ২য় ইনিংসে চোট পেয়ে চলে গিয়েছিলেন মাঠের বাইরে। তার উপর উইকেটটিও ‘টিপিক্যাল আফ্রিকান উইকেট’ বলতে যেই বাউন্স-সুইংয়ের দৃশ্য মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়, তেমন কিছু ছিলো না। দানবীয় ৩৩৩ রানে জয়ের পরও ফ্যাফ ডু প্লেসি যা বললেন, তার ভাবানুবাদ দাঁড়ায়, “ না, এটা তো আমাদের উইকেট নয়।”

তবে এমন উইকেটে ওই ট্রিপল নেলসন রানে হারের ব্যাখ্যা কি? ৫ম দিনের প্রথম ঘণ্টাতেই সাত উইকেট হারিয়ে ফেলার ব্যাখ্যাই বা কি?

সাউথ আফ্রিকার হাজার মাইল দূরে বসে ব্যাখ্যা করা কি, ম্যাচ সম্পর্কে টুঁ শব্দটিও করা কঠিন। তবে, ইদানীংকালে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে মন্তব্য করা বড্ড বেশি-ই সোজা। যেকোনো ক্রিকেট সংক্রান্ত অভিযোগেই ফেসবুকসহ সব সামাজিক মাধ্যমে যে আলোচনার ঝড় ওঠে, তার সারমর্ম, ‘যত দোষ, হাতুরু ঘোষ।’

এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বোলাররা উইকেট নিতে ব্যর্থ, ব্যাটসম্যানরা বিপক্ষের বোলিং সামলাতে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আলোচনা এই ম্যাচের টস নিয়ে। ব্যাটিং উইকেটে টস জিতে টিম ম্যানেজমেন্ট কিভাবে ফিল্ডিং নেয়, তা মাথায় ঢুকেনি এ দেশের অনেকেরই। ম্যানেজমেন্ট শব্দটি নেহায়েত-ই বিনয়, অভিযোগের তির তো ওই শ্রীলংকান ভদ্রলোক, জনাব চন্দিকা হাতুরুসিংহের দিকে।

২০১৪-২০১৭, বাংলাদেশের হয়ে তার তিন বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে, বারেবারে শিরোনাম হয়েছেন তিনি। অনলাইনে নানা স্ট্যাটাস কিংবা পোস্টে উঠে এসেছেন তিনি। তবে সে আলোচনা তার জন্য মোটেই সুখকর কিছু ছিলো না। কেননা আলোচনা যতটা না তার সাফল্যের কারণে, তার চেয়েও বেশি তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। সর্বশেষ টস বিতর্কের আগেও দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, স্বেচ্ছাচারী আচরণ, জাতীয় দলের নেটে দেখে খেলোয়াড়কে দলে টেনে নেয়াসহ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি বেশ লম্বা। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময়ের ‘নেপথ্য কলকাঠি’ নেড়েছেন তিনিই। বাংলাদেশের ‘মিনোজ’ থেকে ‘বিগ ফিশ’ হয়ে ওঠার রণকৌশল সাজিয়েছেন তিনিই। তবে, নানা সময়ের নানা বিতর্ক দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, তার হাত ধরে ঠিকপথে এগোচ্ছে তো দেশের ক্রিকেট? জাগাটাও খুব স্বাভাবিক। এই কৌতূহল থেকেই নিচের ধারাবাহিক:

টস বিতর্কের আগে তাকে ঘিরে তর্ক উঠেছিলো, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মুমিনুল হককে স্কোয়াডের বাইরে রেখে সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান কিংবা ইমরুল কায়েসকে নিয়ে দল সাজানোর কারণে। দেশের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যানকে একাদশের বাইরে রাখার দুঃসাহস দেখানো হলে, বিতর্কের যথেষ্টই অবকাশ রয়েছে। বিতর্কটা একটু তলিয়েই দেখা যাক।

ওই মিরপুর টেস্টে সৌম্য, সাব্বির কিংবা ইমরুল কায়েস তিনজনের কেউই তেমন কোনো পারফর্ম করতে পারেননি, কাঠগড়ায় তাকে উঠতেই হতো। কেন তারা দলে, এমন প্রশ্নে তার যুক্তিটি কিন্তু অননুমেয় নয়। এমনকি ফেলনাও নয়।

মিরপুরে বেশ এক রুদ্ধশ্বাস টেস্ট ম্যাচের সাক্ষী হয়েছিলো দর্শকেরা। জয়-পরাজয়ের মাঝে ব্যবধান ২০ রান, ফলাফলই ম্যাচের অনেক কিছু বলে। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ কঠিন ছিলো, দুদলের ব্যাটসম্যানরাই তা স্বীকার করেছিলেন। দু’শো বল খেলে ফেলার পরও ওই মিরপুরের উইকেটে কোনো ব্যাটসম্যানকেই ‘উইকেটে গেড়ে বসেছেন’ এ বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় না, কেননা ২০১ নাম্বার বল উইকেটে পড়ে কেমন আচরণ করবে, তা স্বয়ং বোলারও জানেন না। ওই উইকেটে টিকে থাকলে রান আসবে না, বরং দ্রুত চালিয়ে খেলে আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত রান করতে হবে, খেলা দেখেছেন এমন যে কোনো দর্শকই এ যুক্তি বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেবেন। এমনকি স্কোরকার্ডও বলছে, চালিয়ে খেলেই ওই ম্যাচের একমাত্র সেঞ্চুরি করেছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার, সাকিবের ব্যাটে এসেছিলো ম্যাচজয়ী ৮৪ রানের ইনিংস। তাই সৌম্য সরকার কিংবা সাব্বির রহমান, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের দুই প্রতিচ্ছবি সুযোগ দাবি করেন-ই। এক্ষেত্রে অন্তত হাতুরুসিংহেকে দোষ দেবার কারণ দেখছি না, রান পাওয়ার কাজটা তো আর তার ছিলো না।

তবে আলোচনার প্রসঙ্গ যখন ইমরুল কায়েস, মুমিনুল হক বেশ জোরেশোরে দলে জায়গা পাবার দাবি তুলতেই পারেন। স্কোয়াড সিলেকশনের সময় হাতুরুসিংহে দাবি করেছিলেন, সাম্প্রতিককালে মুমিনুলের ব্যাটে রান নেই আর রান থাকলেও অন্যদের ব্যাটে রান তার চেয়ে ঢের বেশি। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, সাম্প্রতিক সময় বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন?

হতে পারে, সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচগুলোতে পারফরমেন্স। সৌম্য সরকার আর সাব্বির রহমান মুমিনুলকে পার করতে পারলেও তবে, ইমরুল কায়েস কোনোভাবেই মুমিনুলকে এই সময়ে রান করায় টেক্কা দিতে পারেন না। ওই সিরিজের পূর্বে, লাস্ট ১০ টেস্ট ইনিংসে মুমিনুলের সংগ্রহ ছিলো ২৩২ রান, বিপরীতে ইমরুল কায়েসের সংগ্রহ ২১৬ রান। এমনকি মুমিনুল হক তার সর্বশেষ চার টেস্টে ২টি অর্ধশতাধিক রানের ইনিংস খেললেও, ইমরুলের সবশেষ অর্ধশতক চার টেস্ট পূর্বে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে নিজেদের মধ্যে খেলা প্রস্তুতি ম্যাচেও ৭৩ রানের ইনিংসে মুমিনুল হক ছাপ রেখেছিলেন নিজের সামর্থ্যের। তবে কোন যুক্তিতে মুমিনুল দলের বাইরে ছিলেন, ঠিক বুঝে আসছে না। তবে কি কোচ নিজের পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে দল গড়েন? অধিনায়কের কোনো ভূমিকা নেই এক্ষেত্রে?

কোচের পছন্দ-অপছন্দের কথা যখন এসেই পড়লো, নিতে হচ্ছে সৌম্য সরকারের নাম। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দারুণ এক মৌসুম কাটিয়ে সেই যে দলে এলেন, মাঝে টানা ব্যর্থতাও ওই ধারায় ছেদ ফেলতে ব্যর্থ। ওয়ানডে, টি২০ হয়ে তিনি এখন টেস্ট দলেরও নিয়মিত সদস্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তার টেস্ট দলে আসার প্রসেসগুলো কি ঠিক ছিলো?

টেস্ট টিমে মিডল অর্ডারে শুরু করলেও, তার জায়গা পাকা হয় মূলত ওয়েলিংটনে ওপেনিং-য়ে নেমে ৮৬ রানের এক ঝকঝকে ইনিংসে। ইমরুল কায়েসের ইনজুরির সুযোগে, যেখানে তিনি এসেছিলেন। এরপর তাকে জায়গা করে দিতে, ইমরুল নেমে যান তিনে। ব্যাটিং অর্ডারে কেবল এক ধাপই তিনি নেমে যাননি, তার ব্যাটে রানও যেন ভাটার পানির মতো নেমে গিয়েছে।

এতটুকু বলে, একটি উদাহরণ আমাকে তুলে ধরতেই হচ্ছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ট্রিপল সেঞ্চুরির পরও করুণ নায়ার পরবর্তী ম্যাচে দলে জায়গা পাননি। কেননা, ইঞ্জুরি থেকে ফিরেছিলেন আজিঙ্কা রাহানে। ‘নায়ার কেন নেই’ প্রশ্নের জবাবে যে উত্তর বিরাট কোহলি দিয়েছিলেন, দল নির্বাচনের টেবিলে সে বক্তব্যই ‘আদি তথা শেষ’ বলে বিবেচ্য হওয়া উচিৎ বলে মনে করি। “এক টেস্টের পারফরমেন্সের জন্য দুই বছরের পরিশ্রমকে আপনি অবমূল্যায়ন করতে পারেন না।” ২০১৪-১৫ সালে প্রায় ৫৪ গড়ে ইমরুল কায়েস রান করেছিলেন ৭০৩, ২০১৬ সালে ২ টেস্ট খেলে এক ফিফটি। কোহলির ব্যাখ্যায় বলা যায়, ওয়েলিংটনে ৮৬ রানের এক ঝকঝকে ইনিংস খেলার পরও সৌম্য সরকার তাই কোনোভাবেই ইমরুল কায়েসের জায়গা নিতে পারেন না। দুই বছর ধরে যে জায়গা তিনি অর্জন করেছিলেন।

টেস্ট টিমে সৌম্য সরকারের সুযোগ পাওয়াটাও কি যথাযথ ছিলো? উত্তর দিতে আবারও ফিরে যাই করুণ নায়ারের কাছে। রঞ্জি ট্রফিতে মোটামুটি রানের বন্যা বইয়ে দিয়ে ইন্ডিয়া টিমে তিনি জায়গা পেয়েছিলেন রাহানের বিকল্প হিসেবে। পঞ্চাশের উপর গড় নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের ‘টেস্টে’। প্রায় সমসংখ্যক ম্যাচ খেললেও আমাদের দেশের সৌম্যের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে গড় ২৮.৭৮। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিম্ন, পিকনিক ক্রিকেট হয় এদেশের ঘরোয়া লিগে এ অভিযোগগুলো একপাশে রেখে তাই দাবি করতে পারি, সৌম্য সরকার ওই ‘পিকনিক ক্রিকেটেও’ রান করতে পারেননি। ফার্স্ট ক্লাসে তার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র শতক, জাতীয় দলে জায়গা পাবার পরে। তবে তিনি টেস্ট টিমে কিভাবে এবং কেন? প্রতি বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে মুড়িমুড়কির মতো রান করা ব্যাটসম্যানদের তবে কি হবে?

এর দুটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারি। এক. তিনি অসীম সম্ভাবনার অধিকারী। দুই. নির্বাচক কিংবা কোচের গুডবুকে তার নাম সর্বাগ্রে।

তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা কোনোকালেই উচিৎ নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তো তাঁর ব্যাটেই লেখা হবে। তবে, সামর্থ্যের প্রমাণের মঞ্চ তো জাতীয় দল নয় বরং সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েই জাতীয় দলে আসতে হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নির্বাচকেরা ‘কোচের পুতুল’ বলে খ্যাত। তাই, কেবলমাত্র কোচের গুডবুকে থাকার কারণটিই হালে পানি পায়।

সৌম্য সরকার কোচের গুডবুকে কেন? এ প্রসঙ্গে হাতুরুসিংহের শরণাপন্ন হতে পারলেই ভালো হয়। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ৮৮ আর ৯০ রানের দুটি ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলার পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “বড় প্লেয়ার হবার সব গুণই ওর মাঝে আছে। হাতে রিস্টব্যান্ড পরা, ফিল্ডিংয়ের সময় ট্রাউজারে রুমাল গুঁজে রাখা এ সবই বড় প্লেয়ারদের লক্ষণ যা তার মাঝে রয়েছে” (সূত্র: দৈনিক সমকাল, সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। আর সৌম্য সরকার কিংবা সাব্বির রহমানের ‘ভয়ডরহীন ব্যাটিং’য়ের সবচেয়ে বড় ভক্ত বোধহয় এই শ্রীলঙ্কানই। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করছি, সৌম্যের টানা বাজে ফর্মের পরও কোচ যে তার উপর আস্থা হারাননি, তার কারণ বোধহয় ওই ভয়ডরহীনতাই। অদ্যাবধি যেই ভয়ডরহীনতা তাকে এনে দিয়েছে টেস্ট ম্যাচে ওপেনিংয়ের টিকেট।

এ পর্যায়ে এসে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে,তবে কি কেবল ভয়ডরহীনতাই টেক্কা দিয়ে যাবে টেস্ট খেলার পূর্বশর্ত টেম্পারমেন্টকে, বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্যকে? ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দেয়া ব্যাটসম্যানদেরই বা কি হবে?

উত্তর আগামী পর্বে।

(চলবে)

Most Popular

To Top