নাগরিক কথা

কেন হাজার মাইল দূর থেকেও আমি কাতালানদের ভালবাসি?

নিয়ন আলোয়- কেন হাজার মাইল দূর থেকেও আমি কাতালানদের ভালবাসি?- Neon Aloy

আমি কাতালোনিয়াকে ভালোবাসি। শুধু এই কারণে না যে তারা সদ্যই স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট করেছে। দুনিয়ার প্রথম ইন্টারনেট যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে কিংবা বার্সেলোনা নামক প্রচন্ড জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবটি কাতালোনিয়ায় অবস্থিত। কাতালোনিয়াকে ভালোবাসার আরো অনেক কারণ আছে।

কাতালোনিয়াকে ভালোবাসি কারণ কাতালোনিয়া সবসময়ই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। কাতালোনিয়া বারংবার বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে। কাতালোনিয়া সবসময়ই তার স্বাধীনতার স্পিরিট ধরে রেখেছে। কাতালোনিয়া তার স্বতন্ত্র ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য ইতিহাস নিয়ে বহুকাল ধরেই স্প্যানিশদের থেকে ভিন্ন। কাতালোনিয়া আর বিদ্রোহ একে অপরের পরিপূরক।

১৯৩৬ সালে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময়ে রিপাবলিকানদের ক্ষমতা থেকে সরাতে স্প্যানিশ জেনারেলরা অভ্যুত্থান ঘটায়, কিন্তু স্প্যানিশ সেনাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে কাতালোনিয়ার সাধারণ জনতা। সে ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কাতালানরা অস্ত্রাগারের দখল নিয়ে নেয়। নিজেদের শহর পাহারা দিতে কাতালানরা অবস্থান নেয় রাজপথে। শ্রমিকরা দখল নেয় কারখানার, এনার্কো সিন্ডিক্যালিজমের মাধ্যমে শ্রমিকরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় কিভাবে কারখানা চালাবে (যদিও চাল ব্যবসায়ী, পরিবহন ব্যবসায়ী, চিকিৎসা ব্যবসায়ী সহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরের মুনাফাখোর রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি থেকে থেকে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটাই বাংলাদেশীদের কাছে নেতিবাচক হয়ে গেছে)। কাতালোনিয়ার কৃষকেরা ফসলের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিলাসী বিপনীবিতান পরিণত হয় হাসপাতালে। এমনকি ‘অচ্ছুৎ’, ‘অস্পৃশ্য’ যৌনকর্মীরা পর্যন্ত মুক্তির মিছিলে সামিল হয়েছিল।

কাতালোনিয়ায় প্রত্যেকেই “মানুষ”। কেউ বেশি মানুষ, কেউ কম মানুষ নয়, কোন বড় হুজুর-মেজো হুজুর-ছোট হুজুর ছিলনা সেখানে। কেউ কারোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, কাতালোনিয়ায় কোন রাষ্ট্র ছিলনা। একটা চূড়ান্ত স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলেছিল কাতালোনিয়া, গুনগুন করে উঠেছিল একই সুরে। যোদ্ধা-শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষক-গায়ক-কবি-ছাত্র সমস্ত মানুষ সমবেত হয়ে গেয়েছিল একই গান।

এনার্কিস্ট কাতালোনিয়া সেইসময়ে ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের ফ্যাসিস্টদের। হিটলার, মুসোলিনির আশীর্বাদপুষ্ট ফ্যাসিস্ট ফ্রাংকোর হাতে পতন ঘটে এনার্কিস্ট কাতালোনিয়ার। শৈল্পিক প্রতিবাদের সূতিকাগার কাতালোনিয়ার ইতিহাস চেতনা মুছে ফেলার সব রকম আয়োজন চলেছে এর পর থেকে। চলছে আজ পর্যন্ত। কিন্তু কাতালোনিয়া কখনো অবনত হয়নি। কাতালোনিয়ার তীক্ষ্ণ চেতনা কখনো সম্পূর্ণ মুছে যায়নি।

তাই এবারের স্বাধীনতার প্রশ্নে হ্যাঁ/না ভোটে সামিল হয়েছে কাতালান জাতীয়তাবাদীরা, সামিল হয়েছে বুর্জোয়া ভোটতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করা বুদ্ধিজীবী-এক্টিভিস্ট সহ সমস্ত শ্রেণীর মানুষ। মূল প্রশ্ন এখন কাতালোনিয়ার উত্থানকে তুলে ধরা। এই স্বাধীনতার কী অর্থ হবে, ছোট অর্থনীতির দেশ টিকতে পারবে কিনা, কাতালোনিয়া আরেকটা বুর্জোয়া রাষ্ট্র হবে কিনা এসব স্রেফ কুতর্ক।

কোন জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের উত্থান ঘোষণা করে, তখন তাকে বন্দুক-কামান-বুটের জোর কোন কিছু দিয়েই দমিয়ে রাখা যায়না। কাতালানদের ইতিহাসের অন্তর্গত শক্তিই তাদের নামিয়ে এনেছে রাজপথে। কাতালোনিয়া অন্তর্গতভাবেই স্বপ্নবাজ। স্বপ্ন দেখতে জানে বলেই কাতালানদের দমিয়ে রাখতে পারবেনা ফ্রাংকো-হিটলারের প্রেতাত্মারা, বরং আজ অথবা কাল এক কাতালোনিয়া জন্ম দিবে হাজারো কাতালোনিয়ার। পৃথিবী জুড়েই…
Homage to Catalonia..

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top