বিশেষ

শুভ জন্মদিন, গুরু!

বুঝার বয়স হওয়ার পর যখন গিটারকে আপন করেছিলেন তখনই নিজের আপনজনদের কাছে পর হয়ে যান। লেখাপড়ার তো অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষটায় বাবার রোষানলে পড়ায় পরিবার- পরিজন, পড়ালেখা সব বাদ দিয়ে বেছে নেন গীটারকে। এই গীটারই তার জীবনের একমাত্র বন্ধু, আরাধ্য বস্তু। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সঙ্গীত দুনিয়ায় ব্যাতিক্রমধর্মী লিরিক এবং গানের জন্য তুমুল জনপ্রিয় হন তিনি। শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক সঙ্গীতাঙ্গনেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয়। নাম তার ফারুক মাহফুজ আনাম। এ নামে তাকে চেনার কথা না অবশ্য। তাকে মানুষ তার পুরো নাম নয় চিনে শুধু জেমস নামে। তিনি ভক্তদের কাছে ‘গুরু’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত।

ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস

আজ ২রা অক্টোবর। গুরুর জন্মদিন। বাংলাদেশের এই কালজয়ী সঙ্গীত পুরুষ আজ পা রেখেছেন ৫৪ বছর বয়সে। তিনি ১৯৬৪ সালে নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

পিতা ছিলেন শিক্ষা বিভাগের সরকারি চাকুরীজীবী। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে যোগদানের পর তার পুরো পরিবার এসে চট্টগ্রামেই বসবাস শুরু করেন। জেমসের বেড়ে ওঠা আর সঙ্গীতচর্চা সবকিছুর শুরু এই চট্টগ্রামে। পরিবারের দ্বিমত সত্ত্বেও তিনি সঙ্গীতচর্চা চালিয়ে যান। পড়ার বই ছেড়ে সারাদিন মেতে থাকতেন গান বাজনা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সাথে মনোমালিন্য, ক্লাস নাইনে পড়ার সময় এই সঙ্গীতের জন্যেই তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। ঠাঁই হয় চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং-এর বারো বাই বারো ফুটের ছোট কামরায়। এখানেই তিনি বন্ধুদের সাথে মিলে খুলেন গানের দল। সারাদিন বন্ধুদের সাথে আজিজ বোর্ডিং এর এই কামরায় করতেন ক্যাসেট প্লেয়ারে গান রেকর্ডিং। আর রাতে হোটেল আগ্রাবাদের নাইট ক্লাবে বাজাতেন। এভাবেই সংগ্রাম করে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে নিজের হাতে খুলেন তার প্রথম ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। ব্যান্ডের প্রথম দিকে জিম মরিসন, মার্ক নফলার, এরিক ক্ল্যাপটনের গাওয়া গানগুলো কভার করতেন।

ব্যান্ড ফিলিংস

চট্টগ্রামে আজিজ বোর্ডিং নিয়ে তিনি একটি গান লিখেছিলেন-

“ছোট্ট একটি ঘর, ছোট্ট একটি খাট,
ছোট্ট একটি টেবিল, একটি পানির জগ।।
ছিলো এক চিলতে আকাশ আমার
আর সেই প্রিয় গীটার,
রুম নাম্বার ছত্রিশে ছিলো আমার বসবাস;
প্রিয় আজিজ বোর্ডিং। প্রিয় আজিজ বোর্ডিং।
ছিলো ব্যাচেলার সংসার আমার,
ছিলো অগোছালো জীবন আমার”

তার গান সুরের চেয়ে বেশী নির্ভর করতো গানের কথায়। ১৯৮৫-৮৬ এর দিকে জেমস তার ব্যান্ড ‘ফিলিংস’ সাথে নিয়ে আসেন রাজধানী ঢাকা শহরে। এসময় তার ব্যান্ডে যোগ দেন অর্থহীনের বেজবাবা সুমন। নতুন ধারার গান নিয়ে ১৯৮৭ সালে ‘ফিলিংস’ এর প্রথম এলবাম ‘স্টেশান রোড’ বের হয়।

‘স্টেশান রোড’ গানের লিস্ট

বানিজ্যিক ভাবে এলবামটি সফল না হলেও এলবামের কিছু গান যেমন ‘ঝরণা থেকে নদী’, ‘স্টেশান রোড’, ‘আমাকে যেতে দাও’ অনেক শ্রোতার মনে দাগ কেটে যায়।

“স্টেশন রোডের জীবন ধারা
ফুটপাথের ঐ নগর নটিরা
ভাতের আশায় দিচ্ছে শরীর
যেন ত্রিমাত্রিক জীবন্ত ছবি”

১৯৮৮ সালে তিনি মুক্তি দেন নিজের একক এলবাম ‘অনন্যা’। এই ‘অনন্যা’ দিয়েই বাজিমাত। ‘অনন্যা’ এর প্রতিটা গানই ছিল অসাধারণ। ‘অনন্যা’, ‘ওই দূর পাহাড়ে’ গানগুলো ততকালীন তরুণ শ্রোতাদের পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

‘অনন্যা’ এর এলবাম কভার

১৯৯১ সালে ‘ফিলিংস’ বাজারে ছাড়ে তার দ্বিতীয় এলবাম ‘জেল থেকে বলছি’। এতে ফুটে উঠে একজন ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামির করুণ আর্তনাদ।

“দিন রাত এখানে থমকে গেছে
কনডেম সেলের পাথর দেয়ালে
প্রতি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর দিন আমি গুনছি।।
শোনো, জেল থেকে আমি বলছি”

‘জেল থেকে বলছি’ এলবাম কভার

১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় তার দ্বিতীয় একক এলবাম ‘পালাবে কোথায়’। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গানে শুরু জেমসীয় যুগের সুচনা। এই এলবামের ‘প্রিয় আকাশী’, ‘সাদা অ্যাসট্রে’, ‘ভালোবাসার যৌথ খামার’ খুব জনপ্রিয় হয়। তার এই অদ্ভুত গান লেখার জন্য ছিলেন লতিফুল ইসলাম শিবলী, বাপ্পি খান, আসাদ দেহলভি, মারজুক রাসেল, গোলাম মোরশেদ লায়ন, প্রিন্স মাহমুদদের মত গীতিকাররা।

‘পালাবে কোথায়’ এলবামের কভার

১৯৯৬ সালে বের হয় ‘ফিলিংস’ এর তৃতীয় এলবাম ‘নগর বাউল’। এই এলবামেই ছিল জেমসের কালজয়ী গান ‘তারায় তারায়’। কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘সুন্দরীতমা আমার’ কবিতাটিকে তিনি অনুমতি নিয়ে গানে রূপান্তর করেন। তারাভরা রাতে ব্যর্থ প্রেমিকের করুণ আর্তনাদ তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন খুব সুন্দর ভাবে। আজো এই গান শতকোটি হৃদয়জুড়ে বেঁচে আছে।

“সুন্দরীতমা আমার
তুমি নিলীমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারো
এই আকাশ আমার।
নীলাকাশ রবে নিরুত্তর
মানুষ আমি চেয়ে দেখো
নীলাকাশ রবে নিরুত্তর
যদি তুমি বলো আমি একান্ত তোমার,
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো আমি তোমার।”

‘নগর বাউল’ এলবামের কভার

কিশোর বয়সে বাড়ি ছাড়া হওয়া জেমস একসময় ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মডেল রথিকে। কিন্তু ব্যাক্তিগত টানাপোড়নের কারণে একসময় ইতি টানতে হয় এই সম্পর্কের। পরবর্তীতে বিয়ে করেন বেনেজির সাজ্জাদকে। তার কাছে পরিবারের আগে ছিল তার ভক্তরা। তার এই ভক্তরা ছিল তার ভাই, তার বন্ধু।

১৯৯৮ সালে ‘লেইস ফিতা’ এলবামের পরে ‘ফিলিংস’ নামের ইতি ঘটে। নতুন নাম ‘নগর বাউল’ হিসেবে একে বের করেন ‘দুষ্ট ছেলের দল’(২০০১), ‘কালযমুনা’(২০০৮) এলবামগুলো। এর সাথে সাথে বের হয় জেমসের নিজের ৩টি একক এলবাম ‘আমি তোমাদেরই লোক’(২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’(২০০৫), ‘তুফান’(২০০৬)। এই এলবামগুলোর ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘সিনায় সিনায়’, মীরাবাঈ’, ‘দুষ্ট ছেলের দল্‌ ‘দিদিমণি’, ‘কাল যমুনা’ ‘পদ্মপাতার জল’ গানগুলো পায় তুমুল জনপ্রিয়তা।

২০০৫ সালে হঠাৎ ভারতীয় সঙ্গীত পরিচালক প্রীতমের সাথে মিলে প্লেব্যাক করেন ‘গ্যাংস্টার’ নামক একটি চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রের ‘ভিগি ভিগি’ গানটি এক মাসের্ব বেশী সময় ধরে ছিল টপচার্টে। এরপর ২০০৬ সালে ‘ও লামহে’ চলচ্চিত্রে ‘চল চলে’ তারপর ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ চলচ্চিত্রে ‘রিশতে’, ‘আলভিদা’ এই দুটি গানে প্লেব্যাক করেন। এই কটি গান দিয়েই তিনি জয় করে ফেলেন বলিউড।

এরপর অনেক সময় চলে গেল। নতুন কোন এলবাম নেই। নেই সেই আগের জেমস। নিজের মতই চুপচাপ থাকেন এখন। কিন্তু পহেলা বৈশাখ, নিউ ইয়ারের কক্সবাজারের ওপেন কনসার্ট, মাদক বিরোধী অনেক কনসার্টই তিনি করেন। এখনো জানেন ভক্তদের কীভাবে মাতিয়ে রাখতে হয়।

শেষটা বলতে চাই-
‘শুভ জন্মদিন গুরু’। আপনার দীর্ঘায়ুর পাশাপাশি ভক্তদেরও যাতে মাতিয়ে রাখতে পারেন সেটাই কামনা করছি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top