বিশেষ

ওল্ডবয়ঃ প্রতিহিংসা, সত্যান্বেষণ ও আয়নায় দেখা আমাদের প্রতিবিম্ব

নিয়ন আলোয়-ওল্ডবয়ঃ প্রতিহিংসা, সত্যান্বেষণ ও আয়নায় দেখা আমাদের প্রতিবিম্ব- Neon Aloy

(শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, এটা ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কোরিয়ান সিনেমা “ওল্ডবয়” -এর রিভিউ। একই নামে, স্পাইক লি পরিচালিত ২০১৩ এর হলিউডি রিমেক এই রিভিউ এর আওতামুক্ত)

চলুন, দশ সেকেন্ড এর জন্য চোখ বন্ধ করে একটু কল্পনার জগত থেকে ঘুরে আসি। মনে করুন, আপনি হঠাৎ একদিন নিজেকে চিরচেনা পারিপার্শ্বের বাইরে এক অচেনা, অজানা, সস্তা হোটেলের রুমে আবিষ্কার করলেন। কে বা কারা আপনাকে সেখানে নিয়ে গেছে, কিজন্যেই বা নিয়ে গেছে সেটা জানেন না আপনি। রুমটার দেয়ালে মলিন ওয়ালপেপার আর অদ্ভুত কিছু পেইন্টিং। একটা পেইন্টিং এর নিচে লেখা, “যখন তুমি হাসবে তখন তোমার সাথে পুরো পৃথিবীর সবাই হাসবে, আর যখন তুমি কাঁদবে তখন তুমি একাই কাঁদবে”। অদ্ভুত, তাই না?

ওল্ডবয় সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র দাই-সুর সাথেও এমনটাই হয়েছিলো। এক রাতে মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে উপহার কিনে ফেরার সময় মাতাল অবস্থায় সে অপহৃত হয়। তারপর তাঁকে জীবনের ১৫ বছর এরকম একটা হোটেল রুমে বন্দী জীবনযাপন করতে হয়। সময়মত তাকে খাবার দেয়া হয়, তাঁর নিত্যপ্রয়োজনীয় সব চাহিদাও মেটানো হয়। সেইসাথে প্রতিদিন সময় করে তাঁর রুমে দেয়া হয় হিপনোটিক ড্রাগ। না, রুমে সে একেবারে একা নয়, তাঁর সঙ্গী একটি টেলিভিশন সেট।  টেলিভিশনের পর্দায় গোটা বিশ্ব চোখের সামনে বদলে যেতে থাকে, বদলায় না শুধু দাই-সুর একঘেয়ে জীবন। তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করা হয়, হত্যার দায় দেয়া হয় দাই-সুকে, সেই খবরও সে টিভিতে দেখে। এত কিছুর পরও দাই-সু থেমে থাকে না। অপহরণকারীদের কাছে তাঁর চাওয়া খুব বেশি ছিলো না। তাঁর জিজ্ঞাসা একটাই, কেন? কি কারণে তাকে অপহরণ করা হলো? এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে দাই-সু অন্য পথ বেছে নেয়। দেয়ালে গর্ত করতে শুরু করে। সেইসাথে দেয়ালে আঁকে তাঁর বাস্তব শত্রুর কাল্পনিক ছবি। ছবির সাথে অনুশীলন শুরু করে, কিভাবে এখান থেকে বের হয়ে ঘায়েল করবে তাঁর অপহরণকারীদের। দেয়ালে তাঁর গর্ত যখন তাঁকে পার করে দেয়ার জন্য তৈরি, তখন হঠাৎ করেই তাঁকে দেয়া হয় মুক্তি। এতদিনের প্রত্যাশিত মুক্তি হঠাত করে পেয়ে দিশেহারা হয়ে যায় দাই-সু। তাঁর মনে আগের প্রশ্নের জায়গায় উদয় হয় নতুন প্রশ্নের, যে প্রশ্নের উত্তর জানা তাঁর আরো বেশি জরুরিঃ কেন? কি কারণে ১৫ বছর তাঁকে মুক্তি দেয়া হলো?

স্ত্রী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত দাই-সুকে বাইরের জগতে এসে গা ঢাকা দিয়েই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। ঘটনাক্রমে দেখা হয় মি-ডো নামের এক তরুণীর সাথে। তাঁকে সাথে নিয়ে দাই-সু বেরিয়ে পড়ে জীবনের রহস্য উন্মোচনে। দুজনের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোতে এগোতে অবশেষে দাই-সু খুঁজে পায় তাঁর অপহরণকারীকে। সে কি আদৌ জানতে পারবে এই নির্মমতার পেছনে কি কারণ ছিলো? সেই কারণটাই বা কি যথেষ্ঠ ছিলো একজনের মানুষের জীবনের ১৫ বছর কেড়ে নেয়ার জন্য, তাঁর সংসার ধ্বংস করে দেয়ার জন্য? জানতে হলে এখনই দেখে ফেলুন এই কোরিয়ান রেভেঞ্জ থ্রিলারটি। আর যদি সিনেমাটি ইতিমধ্যে দেখে থাকেন এবং শেষে কি হলো সেটা না বুঝে থাকেন, তাহলে এই লেখার শেষে দেয়া স্পয়লারযুক্ত ব্যাখ্যাতে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।

পরিচালক চ্যান-উক পার্কের বিখ্যাত “ভেঞ্জেন্স ট্রিলজি” এর দ্বিতীয় কিস্তি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা “ওল্ডবয়”। এই সিনেমাত্রয়ের প্রত্যেকটিতেই চিরাচরিত প্রতিশোধের গল্পকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষত “ওল্ডবয়”-এর পরিচালনায় চ্যান-উকের মুন্সিয়ানা ছিলো চোখে পড়ার মতো। বাস্তবতার মোড়কে এমন সিনেমা তৈরির দুরূহ কাজটি তিনি বেশ ভালোই ভাবেই করেছেন। ঠিক ২ ঘন্টা ব্যাপ্তির সিনেমাটির প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টেই ছিলো যত্নের ছাপ।

৮টি ভলিউম আর ৭৯টি চ্যাপ্টারসমৃদ্ধ জাপানিজ মাঙ্গা “ওল্ডবয়” থেকে দুই ঘন্টার চিত্রনাট্য তৈরি করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেন পরিচালক চ্যান-উক, তাঁর সাথে ছিলেন জো-ইয়ুন হোয়াং এবং জুন-হিউয়োং ইম। গুরুদায়িত্ব শুধুমাত্র ঠিকঠাকভাবেই না, তাক লাগানোর মতো ভালোভাবে পালন করেছেন। মাঙ্গাটিকে হুবহু পর্দায় তুলে দেয়ার ধৃষ্টতা দেখাননি। প্রেম, কাম, শোধ এবং সর্বোপরি করুণ সত্যের মালা গেঁথে জুড়ে দিয়েছেন গ্রিক পুরাণের কালজয়ী গল্প; যা জন্ম দিয়েছে একটি যথার্থ অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লে। সিম্বলিজমের মাধ্যমে নাটকীয় গল্পের আড়ালে তুলে ধরেছেন আমাদের গৎবাঁধা জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের বন্দী করে চলেছি প্রতিনিয়ত। আর একথা তো অনেকেরই জানা যে, সার্চ ইঞ্জিনগুলোয় “Greatest twist in movies” ধাঁচের সার্চের ফলাফলে এই সিনেমা কেমন অবস্থানে থাকে।

অভিনয় নিয়ে যতটুকুই বলি না কেন, কম হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে স্বনামধন্য অভিনেতা মিন-সিক চই আবারো নিজের জাত চিনিয়ে দিয়ে গেছেন। দাই-সুর মানসিক দ্বন্দ্ব আর মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তিসত্ত্বা তাঁর সাবলীল চরিত্রায়নে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। আরেক কেন্দ্রীয় চরিত্র মি-ডোকে পর্দায় তুলে ধরেছেন হায়-জাং কাং। তিনি তাঁর চরিত্রের নিষ্পাপ অভিব্যক্তিকে বেশ ভালোভাবেই ধারণ করেছেন। এছাড়াও নিজের অভিনয়শৈলী আর শীতল অভিব্যক্তি দিয়ে চমকে দিয়েছেন জি-টে ইয়ু। তাঁর মুচকি হাসিতে যে ঘৃণা আর বিষাদ লুকিয়ে ছিলো তা সত্যিই মনে দাগ কেটে যায়। এছাড়াও সিনেমাটির অন্যান্য অভিনেতারাও স্ব স্ব চরিত্রে ছিলেন অনন্য।

পরিচালক চ্যান-উকের দীর্ঘদিনের সঙ্গী সিনেমাটোগ্রাফার চাং-হুন চাং এই সিনেমাতেও তাঁকে হতাশ করেননি। প্রত্যেকটা শট ছিলো যথাযথ, যত্নটা টের পাওয়া গেছে প্রত্যেকটি ফ্রেমে। ক্লোজ শটে চরিত্রের অভিব্যক্তিগুলো ফুটিয়ে তোলায় তিনি সিদ্ধহস্ত। বিভিন্ন দৃশ্যে তিনি স্লো জুম আউট করে দৃশ্যগুলোয় যেন নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। আর এই সিনেমার বিখ্যাত “করিডোর ফাইট সীন” এর কথা কে-ই ভুলতে পারে! ভিডিও গেইমের মতো করে ধারণ করা এই দৃশ্য দর্শক মনে রাখতে বাধ্য। আয়নায় চরিত্রের প্রতিবিম্বগুলো ছিলো দৃষ্টিনন্দন ও অভিনব। এক্ষেত্রে লাইটিং এর কথাও উল্লেখ করতে হয়, লাইটিং এর সাথে ক্যামেরাওয়ার্কের যুগলবন্দীটা সিনেমা জগতকে দিয়ে গেছে কালজয়ী কিছু শট।

“ওল্ডবয়”-এর সংগীতায়োজনের কথা বলতেই হচ্ছে। সিনেমার দৃশ্য থেকে মনোযোগ কেড়ে নেয়ার মতো এত ভালো আবহ সঙ্গীত খুব কম সিনেমারই আছে। প্রত্যেকটি দৃশ্যে এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ক্লাসিক সিনেমার নামে দেয়া সাউন্ড ট্র্যাকগুলো সিনেমার বাইরেও বেশ জনপ্রিয়।

এই অংশটি অ্যাকশান মুভি লাভারদের জন্য। এই সিনেমায় ফাইট সীন নেহায়েত কম নয়, যার মধ্যে একটির কথা ইতিমধ্যে বলা হয়েছে (করিডোর সীন)। বাকি দৃশ্যগুলোও অ্যাকশান এর বিচারে খুবই উপভোগ্য। তবে একে পুরোদস্তুর “অ্যাকশান মুভি” অবশ্যই বলা যাবে না, তাই শুধুমাত্র ফাইট সীন দেখতে বসলে হতাশই হতে হবে।

একটা ব্যাপার বলে নেয়া ভালো, এই সিনেমাটি তাঁর বিষয়গত ও দৃশ্যগত, দুই দিক দিয়েই শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। সিনেমার মূল থিমও যথেষ্ট ডিস্টার্বিং, যা অনেকের কাছে ভালো না-ও লাগতে পারে। সিনেমাটির গল্প ও কয়েকটি দৃশ্যে যৌনতার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। তাই এসব বিষয়ে সমস্যা থাকলে এই সিনেমা এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

মোট ৩৮ টি পুরষ্কার এবং ১৮টি পুরষ্কারের জন্য মনোনীত এই সিনেমাটি আইএমডিবিতে ১০ এ পেয়েছে ৮.৪ আর রটেন টমেটোস এ ৮০% (ফ্রেশ)। এছাড়াও বিখ্যাত সমালোচক রজার ইবার্ট “ওল্ডবয়”-কে ৫ এ ৪ দিয়েছেন।

আপনি কোরিয়ান সিনেমা দেখে অভ্যস্ত হোন বা না হোন, আপনি রেভেঞ্জ থ্রিলার এর ভক্ত কি না এই প্রশ্নগুলোর চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আপনি কি এমন একটি সিনেমা দেখতে চান কিনা যেটি আপনাকে একই সাথে অভিভূত করবে এবং চিন্তা করতে বাধ্য করবে। যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে এই সিনেমা অবশ্যই আপনার জন্য। তাই দেরি না করে আজই দেখে ফেলুন এশিয়ার অন্যতম কালজয়ী সিনেমা “ওল্ডবয়”।

*স্পয়লার এলার্ট*
সিনেমার শেষ অংকের ব্যাখ্যা:
সিনেমার শেষে দেখা যায় যে, দাই-সুর এই পরিণতির জন্য দায়ী ছিলো দাই-সু নিজেই। দাই-সু স্কুলজীবনে কাকতালীয়ভাবে তার এক সহপাঠী মেয়েকে মেয়েটির ভাইয়ের সাথে এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দেখে ফেলে। কথায় কথায় দাই-সু এই ঘটনা তার এক বন্ধুকে বলে দেয় এবং আস্তে আস্তে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে যায় মেয়েটির এই কান্ড। যার ফলে সবার কাছে মুখ দেখানোই দায় হয়ে দাঁড়ায় তার। লজ্জার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মেয়েটি। বোনের অকালপ্রয়ানে দিশেহারা হয়ে পড়ে তার ভাই। মেয়েটির ভাই উ-জিন লি-কেই দর্শক দেখে দাই-সুর শাস্তিদায়ক হিসেবে। বোনের মৃত্যুর জন্য দাই-সু ও তার গুজব রটানোকে দায়ী করে উ-জিন লি এবং চরম প্রতিশোধের এক অনন্য পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে দাই-সুকে অপহরণ করে এবং দাই-সুর স্ত্রীকে হত্যা করে হত্যার দায় চাপিয়ে দেয় দাই-সুর উপর। এরপর দাই-সুর মেয়ের ভরণপোষণ এর দায়িত্ব নেয় লি এবং তার নতুন নাম দেয় মি-ডো। দাই-সুর মেয়ে যৌবনে পদার্পণ করলে সে সম্মোহনের মাধ্যমে দুজনের সাক্ষাত করিয়ে দেয় এবং তাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসাকে প্রভাবিত করে। এভাবে সে ধীরে ধীরে দাই-সুকে নিজের অজান্তেই প্ররোচিত করে মি-ডোর সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে। এই ভয়াবহ তথ্যই উ-জিন লি নিজে আত্মহত্যা করার আগে দাই-সুকে জানায় সিনেমার শেষে। এ কথা শুনে দাই-সু পাগলপ্রায় হয়ে পড়ে এবং নিজের জিভ কেটে ফেলে। এই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে দাই-সু সম্মোহনের সাহায্যও নেয়। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় দাই-সু তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থের মতো হাসছে এবং একটু পড়েই মুখভঙ্গি বদলে গিয়ে দেখা দেয় দুঃখভারাক্রান্ত অভিব্যক্তি। সম্মোহন আদৌ কাজ করেছে কিনা, কিংবা সেই দুঃসহ স্মৃতি সে আদৌ ভুলতে পেরেছে কিনা, এই দৃশ্যের মাধ্যমে তা এক রহস্য হিসেবেই রেখে দিয়েছেন পরিচালক চ্যান-উক পার্ক।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top