বিশেষ

ব্যর্থতা, চেষ্টা এবং সফলতার এক অদ্ভুত বাস্তবিক মিশেল

নিয়ন আলোয়- ব্যর্থতা, চেষ্টা এবং সফলতার এক অদ্ভুত বাস্তবিক মিশেল- Neon Aloy

আজকাল দেখা যায় মানুষ কোন কাজে একটু ব্যর্থ হলেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়।কি কারণ? আজকাল দেখা যায় মানুষ কোন কাজে একটু ব্যর্থ হলেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কি কারণ? কারণ হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, এক চেষ্টায় ফলাফল বিপরীতে গেলেই ভেঙ্গে পড়া, ধৈর্যচ্যুত হওয়া, অল্পতে খুশি না হওয়া সহ আরো অনেক কারণ। মোটামুটি এইসব কারণগুলি যদি একবার আপনাকে উপর থেকে নিচে নামিয়ে নিস্তেজ করে দেয়, আপনার মনোবলকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় তাহলে আপনার আর ইচ্ছে করবে না এই সাধের পৃথিবীতে থাকার। তখন আপনার কাছে মনে হবে এই পৃথিবীটা হিংস্র প্রাণীতে পরিপূর্ণ এক ভয়ঙ্কর জঙ্গল। মানুষ কত শত সমস্যা নিয়ে পৃথিবী নামক এই পরীক্ষাকেন্দ্রে নিজ সাধ্যমত প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে  যাচ্ছে সে হিসেব কারো নেই।

পারিবারিক সমস্যা,স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা,সংসার চালাতে সমস্যা, ছেলেমেয়ে নিয়ে সমস্যা, খাদ্যের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার সমস্যা, ভালোমত জীবন উপভোগ না করতে পারার সমস্যা, চাকরি নিয়ে সমস্যা, ব্যবসা নিয়ে সমস্যা, দেশে সমস্যা, বিদেশে সমস্যা, ধর্ম নিয়ে সমস্যা, জাত নিয়ে সমস্যা, গায়ের রঙ নিয়ে সমস্যা এবং কি খোদা প্রদত্ত এই মাটি নিয়েও সমস্যা। সমস্যা সমস্য আর সমস্যা! কোথায় সমস্যা নেই? কে সমস্যা ছাড়া আছে বলবেন কি? দেশে দেশে সমস্যা, জাতে জাতে সমস্যা, সমাজে সমাজে সমস্যা। যেন দুনিয়াটা সমস্যা এক বিশাল বড় আড়ৎ! এত শত সমস্যা কেনো? মানুষ খাবে, কর্ম করবে, ঘুমাবে এমনি ভাবে জীবন কেটে গেলে কি হত না? কেনো সেখানে আবার ভবিষ্যৎের চিন্তা তার মাথায় ঢুকিয়ে তাকে পাগল কিরে দেয়া হল. আবার সেখানে যোগ হল আরাম আয়েশ আর উপভোগের জীবন। এই গুলোই যত সমস্যার জন্মদাতা নয় কি? আরাম-আয়েশ খুঁজতে গিয়ে আমরা খুঁজে বের করি সমস্যাকে আর যখন আমরা আরাম-আয়েশ খুঁজে পাই তখন আমরা মাটির নিচে অনন্তকালের ঠিকানায় চলে যাই।এত শত সমস্যা থাকার পর ও যারা সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে এগিয়ে যায় তারাই তো জীবনযুদ্ধের আসল বীর। কোন বাধাকে তোয়াক্কা না করে, সব কষ্টকে আপন করে নিয়ে শেষ গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো মানুষরাই তো প্রকৃতভাবে দুনিয়াতে বেঁচে থাকার অধিকার রাখে।

আচ্ছা, এবার একটু শান্ত হই। একটু বাস্তবতায় ফিরে আসি। সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুইটা বড় নিশ্বাস নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য এই লেখা কেন্দ্রিক  এক সিনেমা নিয়েসিনেমাটির নাম ‘Pursuit Of Happyness’
Directed by : Gabriele Muccino
Produced by : Will Smith,Todd Black
Written by : Steven Conrad Based on The Pursuit of Happyness by Chris Gardner
Starring : Will Smith, Thandie Newton, Jaden Smith
Music by : Andrea Guerra
Cinematography : Phedon Papamichael
Edited by : Hughes Winborne
Country: United States
Language: English
Budget : $55 million
Box office : $307.1 million

সিনেমাটি ক্রিস গার্ডনার নামের আমেরিকান  এক ব্যক্তিকে নিয়ে। যিনি একাধারে মাল্টি মিলিয়নিয়র ব্যবসায়ী, স্টকব্রোকার, লেখক, বিনিয়োগকারী, মোটিভেশনাল স্পিকার। সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছে ক্রিস গার্ডনারের ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় এক বছরের দুর্বিষহ জীবন সংগ্রাম নিয়ে। এই বিপর্যস্ত সময়টাতে সবসময় সাথে ছিল তার বড় ছেলে ক্রিস্টোফার জুনিয়র। স্ক্রিনে যার চরিত্র নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কারাতে কিড Jaden Smith। ক্রিস গার্ডনার চরিত্রে ছিলেন হলিউডের মেন ইন ব্ল্যাক তারকা Will Smith আর তার স্ত্রী লিন্ডা চরিত্রে ছিলেন Thandie Newton। একজন মানুষ কত কষ্টে তার জীবন অতিবাহিত করেছিলেন এবং একসময় তিনি সফলতার শীর্ষে অবগাহন করেন সিনেমাটি  না দেখলে তা অনুধাবন করতে পারতাম না। সমস্যা, সমাধান চেষ্টা, ব্যর্থতা এবং সফলতা এই চারটি জিনিস ই হল ‘দ্যা পারসুইট অফ হ্যাপিনেস’ সিনেমাটির মূল বিষয়বস্তু। কত রিভিউ দেখলাম এই সিনেমা নিয়ে হিসেব নেই। সবাই লিখেছিল এই সিনেমা দেখার পর অকপটেই আপনার চোখ ভিজে যাবে। তখনই পণ করেছিলাম আমি যখন দেখবো অন্তত মনকে এমন শক্ত করব যাতে আমার চোখে কোন পানি না আসে! কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম। সিনেমার একসময় দেখলাম ভাড়া দিতে না পারায় তাদের বাবা-ছেলেকে মোটেল থেকে বের করে দেওয়া হল তখন তারা এখানে ওখানে ছোটাছুটি করেও থাকার কোন ব্যবস্থা করতে পারতেছি না। তখন রেলস্টেশনের পাবলিক টয়লেটে তারা তাদের রাত অতিবাহিত করে। এই দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। ঠিক এই দৃশ্যটা আর স্টকব্রোকার হওয়ার সময় ওই দৃশ্যটা আমার চোখে জল আনতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক সফল মানুষের পিছনে তার স্ত্রীর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু যখন আপনি সফলতা লাভে ব্যর্থ হচ্ছেন আর ঠিক সেইসময় আপনার অর্ধাঙ্গিনী আপনাকে ছেড়ে চলে যায় তখন আপনার কেমন অনুভূতি হবে? একটা সময় ক্রিস গার্ডনার পরিবারের ভরণপোষণ, বাসা ভাড়া, ট্যাক্স বিল ইত্যাদি নানান অর্থ জোগাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, প্রতিদিন স্ত্রীর রাগান্বিত স্বরের বিপক্ষে শুধু ‘I m trying, I m trying’ বলে ছোট্ট প্রতিবাদ সে করে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই একদিন তার স্ত্রী তাকে জানিয়ে দেয় সে চলে যাচ্ছে, এভাবে আর সে তার সংসার করতে পারবে না। কিন্তু সন্তান কার কাছে থাকবে? সিদ্ধান্ত হয়ে একসময় জুনিয়র ক্রিস্টোফার তার বাবা গার্ডনারের কাছেই থাকবে। স্ত্রী ছেড়ে গেল, থাকার মত বাসস্থানও রইলো না, চাকরিও নড়বড়ে এমতাবস্থায় আজ এখানে কাটে তো কাল ওখানে তবুও দমে যাননি তিনি। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, মনোবল, কাজের প্রতি ভালোবাসা এইসব কিছু তাকে তার সঠিক লক্ষ্যপথেই নিয়ে গেছে। কোন ধরনের সংকট তাকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। যেমন তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী ঠিক সন্তানকেও তেমনি শিক্ষা দিয়েছেনতাইতো তিনি তার ছেলে ক্রিস্টোফারকে একসময় বলেন,

Don’t ever let someone tell you that you can’t do something,Not even me.You got a dream you gotta protect it.When people can’t do something themselves,They’re gonna tell you that you can’t do it.You want something,Go get it.

রিমোট আর নেটের এই যুগে দুইঘন্টা আপনাকে যেকোনো পর্দার সামনে বসিয়ে রাখা পরিচালক/অভিনেতাদের জন্য খুবই কষ্টের  কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারব এই সিনেমা দেখার পর আপনার কখনো একঘেয়েমি মনে হবে না। মনে হবে যেন ইংরেজি ভাষায় আপনি আপনার জীবনের গল্প দেখতেছেন। তাই তো গার্ডিয়ানের Philip French এবং Peter Bradshaw সিনেমাটি নিয়ে যা বলেন তা হলঃ

Philip French :  This is the cinematic equivalent of the most trashy self-help paperback you ever read, The Pursuit of Happyness.
Peter Bradshaw: An old-fashioned Hollywood heart warmer.

মানুষ যখন কিছু করতে অক্ষম, সবসময় ভাগ্যকেই দোষ দিয়ে যায় আর কিছু পাওয়ার  জন্য খোদার উপর ভরসা করেই বসে থাকে! লেখার এই শেষপ্রান্তে এসে সেসব মানুষদের একটা গল্প বলে যাবো, যেটা  ক্রিস্টোফার জুনিয়র সিনেমায় তার বাবাকে বলেছিল। একটা লোক পানিতে লাফ দিল, সে সাতার কাটতে পারতেছে না, তো এক মাঝি এসে তাকে বলল, ভায়া আপনি ডুবে যাবেন, আসেন আমার নৌকায়। তিনি উত্তর দিলেন, আপনি যান, আমাকে আমার খোদা বাঁচাবে। কিছুক্ষণ পর আরেক নৌকার মাঝি এসে বলল, ভাই আপনি ডুবে মরে যাবেন তো, নৌকায় আসেন। সে আবারো একই উত্তর দিল। অবশেষে সে মরে স্বর্গে চলে গেল এবং গিয়ে খোদাকে জিজ্ঞেস করল, হে খোদা আপনি আমাকে বাঁচালেন না কেনো? খোদা উত্তর দিলেন, হায়রে বোকা, আমি তো তোকে বাঁচানোর জন্য দুইটা নৌকা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তুই তো উঠিস নাই!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top