ইতিহাস

মনুষ্য নির্মিত স্বর্গ; নাকি মৃত্যু উপত্যকা?

মনুষ্য নির্মিত স্বর্গ; নাকি মৃত্যু উপত্যকা?

জান্নাতে বা স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছা কার নেই? আমাদের অনেকেরই মনের কোনে কোথাও কি লুকিয়ে নেই এই গোপন বাসনা? তার জন্য আমরা দান- দক্ষিনা কত কিছুই না করি।

আমাদের স্বর্গে বা জান্নাতে যাওয়ার এই গভীর ইচ্ছাকে পুঁজি করেই কিন্তু তৈরি হয়েছে আজকের তথাকথিত পীরবাবা- পীরমা- ফকিরবাবা থেকে আরম্ভ করে হালের রাম-রহিম সিং পর্যন্ত।

সাধারণ মানুষরা তাদেরকে উচ্চ আসনে বসিয়ে স্বাভাবিক যা কিছু করুক তাতে তেমন সমস্যা নেই, কিন্তু এসব পীর- ফকির- সাধুবাবারা যখন অসংখ্য মানুষকে প্রভাবিত করে হত্যাকান্ডে মেতে উঠে তখন সেটা অস্বাভাবিক কিছুতে পরিণত হয়। তখন তাদেরকে বলা হয় “কাল্ট” এবং এদের অনুসারী সাধারণ মানুষদের বলা হয় “কাল্টের অনুসারী”। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে না, পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুগে যুগে নানাভাবে এদের আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রাচ্যের দিকে মনে হয় এর সংখ্যা খুব বেশি, এখানে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের এবং ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে এবং তৈরি হচ্ছে অসংখ্য “কাল্ট” আর তাদের অনুসারী।

আজকে তেমনি একজন “কাল্ট” নিয়ে কথা বলব যিনি একাধারে একজন ধর্মীয় মতবাদের প্রচারক, যোদ্ধা, মাস্টার মাইন্ড, নৃশংস নেতা এবং একজন মিস্টিক ব্যাক্তি।

হাসান-ই-সাব্বাহ, তার জন্মসময় সম্বন্ধে সঠিক তথ্য জানা যায়না, তবে ধারণা করা হয় ১০৫০ সালের দিকে তার জন্ম এবং ১১২৪ সালের দিকে মৃত্যু হয় বলে গবেষকরা আন্দাজ করে থাকেন। তিনি ছিলেন “ইসমাইলি মতবাদ” এর একজন প্রধান অনুসারী।

বলা হয়ে থাকে তিনি নিজের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতার লোভ এবং নিজের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি মানুষকে প্রভাবিত করে দল বানিয়ে নিজের অনুগত করার পরিকল্পনা করেন। তবে সমসাময়িক মুসলিম নেতারা তাকে কোনো বাধা দেননি কারণ হাসান-ই-সাব্বাহ তৎকালীন ধর্মযুদ্ধে তাদের সাহায্য করছিল।

আলামুট নামের সেই মৃত্যু উপত্যকা

হাসান-ই-সাব্বাহ “কাল্ট দল” গঠন করার পরে সেটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য একটি উপযুক্ত স্থানের খোঁজ করতে থাকেন। এরপর পেয়ে যান নরদান ইরানের আলামুট এলাকার একটি দুর্গের ঠিকানা। পাহাড়ে ঘেরা এই উপত্যকার মাঝের এই দুর্গটি ছিল তার “কাল্ট দল”কে লুকিয়ে রাখার জন্য এবং শত্রুর সাথে সহজে লড়াই করার উপযুক্ত জায়গা। এখানে সবচেয়ে সাহসী লোকটাও যেতে ভয় পেত, কারন সেখানে যাওয়ার রাস্তা ছিল ভয়ানক বিপদসংকুল, নানারকম গোপন- ফাঁদ এবং মৃত্যুর বিষাক্তছোবল নিঃশ্বাস ফেলত সর্বত্র। অনেক গুপ্তচর এবং যোদ্ধাদল ঐ পাহাড় ঘেরা উপত্যকার মাঝে হাসান-ই-সাব্বাহ’র দলকে অনুসরণ কিংবা আক্রমণ করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারায়এজন্য ঐ এলাকার নাম হয়ে যায় “ভ্যালি অফ ডেথ” বা “মৃত্যু উপত্যকা”,যার নামে শিউড়ে উঠত সবাই।

আত্মঘাতী যোদ্ধারা এবং তাদের সংগ্রহের বিচিত্র উপায়

পুরো দলটি ছিল একটা আধুনিক সেনাবাহিনীর মত, যেখানে সবকিছুই চলত পদমর্যাদা অনুযায়ী। হাসান-ই-সাব্বাহ ছিলেন “গ্রেট গ্র্যান্ডমাস্টার”, তার নিচের অবস্থানে ছিলেন “গ্রেটার প্রোপাগান্ডিস্ট”, এর নিচে “প্রোপাগান্ডিস্ট”, চতুর্থ অবস্থানে “রাফিক বা সহচর” এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে “লাসিক”রা ছিল।

এই “লাসিক”দেরকেই নানাবিষয়ে ট্রেইনিং দিয়ে ভয়াবহ যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করা হত এবং তখন তাদেরকে বলা হত “ফিদাই কিংবা আত্মঘাতী যোদ্ধা”।

এই “ফিদাই”দের হাসান-ই-সাব্বাহ কিভাবে সংগ্রহ করতেন এই বিষয়ে নানা মতবিরোধ আছে, তবে মারকো পোলো’র ভ্রমণকাহিনীতে এর সম্পর্কে কিছু ইংগিত পাওয়া যায়। সেখানে মারকো পোলো হাসান-ই-সাব্বাহ কে “পাহাড়ের বৃদ্ধ মানুষ” রূপে উল্ল্যেখ করেন এবং “ফিদাই” সংগ্রহের এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেন।

মারকো পোলো’র বর্ণনায় জানা যায় যে হাসান-ই-সাব্বাহ প্রথমে গুপ্তচর দ্বারা এইসব যুবকদের খুঁজে বের করত, তারপর তাদেরকে নিজের আলামুটের গোপন দুর্গে নিয়ে আসা হত। সেখানে অমানুষিক পরিশ্রম দ্বারা তাদের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ করা হত। একটানা পরিশ্রম করতে করতে তাদের কাছে যখন সবকিছু অসহ্য লাগত তখন হাসান-ই-সাব্বাহ তাদের কাছে নিজের ব্যাক্তিগত লোক পাঠাত। সেই লোকগুলো যুবকদেরকে একরকম শরবত খেতে দিত, এই শরবতে মেশানো থাকত হাশিস, এলএসডি, ভাংসহ নানা রকম নেশাদ্রব্য। এই শরবত পান করে যুবকরা অচেতন হয়ে যেত এবং তখন তাদেরকে নিয়ে আসা হত হাসান-ই-সাব্বাহ’র ব্যাক্তিগত উদ্যানে।

সেই ব্যাক্তিগত উদ্যান ছিল এক লোভনীয় জায়গা, তাতে ছিল সুগন্ধি শরবত আর মদের ফোয়ারা, মধুর নহর, সুস্বাদু খাবার এবং শয়নকক্ষ। আরো ছিল অসামান্য রুপবতী সব সুন্দরী যুবতী যাদের দূরদূরান্ত থেকে সংগ্রহ করে আনা হত। অচেতন অবস্থা থেকে যুবকদের জাগানোর পর তারা নেশার ঘোরে বুঁদ হওয়া অবস্থায় যখন এসব দেখত তখন মনে করত তারা স্বর্গে চলে এসেছে। সেই বিভ্রান্ত অবস্থায় এসে হাজির হতেন হাসান-ই-সাব্বাহ, তিনি ঐ বিভ্রান্ত যুবকদের এই স্বর্গের লোভ দেখাতেন এবং বলতেন যে উনার কথা মানলে এই স্বর্গে তাদের আজীবন স্থান হবে।

ভাবুন না একবার, আপনার ঐ অবস্থায় কি মনে হবে? আপনি হয়তোবা বলবেন আরেহ দূর! এসব প্রলোভনে ফেঁসে গিয়ে হত্যাকান্ড করার মত কি আছে? হুম, ঠিকই বলেছেন, তবে মনের কোনো এক দুর্বল মুহুরতে চিন্তা করুন তো এই বিষয়টা নিয়ে, তখন আপনার মন কি উত্তর দেয় একটু দেখবেন।

এই নকল স্বর্গউদ্যান ছাড়াও আরেকটা বুদ্ধিমানের কাজ হাসান-ই-সাব্বাহ করতেন বলে ইতিহাসে জানা যায়। হাসান-ই-সাব্বাহ নতুন আসা কোনো “ফিদাই”কে ডেকে নিত তার মন্ত্রনা- কক্ষে, সেখানে তার পায়ের পাশে বালিতে একজন লোক গলা পর্যন্ত ঢুকে থাকত শুধু মাথাটা বের করে, সেই লোকটার মুখে মৃত মানুষের মত রঙ মাখিয়ে দেওয়া হত। পরে নতুন “ফিদাই” আসলে তাকে হাসান-ই-সাব্বাহ বলত যে এই লোকটি হচ্ছে তার আদেশ অমান্যকারী এবং অবিশ্বাসকারী একজন “ফিদাই”, এর জন্য তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পরও হাসান-ই-সাব্বাহ তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে ঐ “ফিদাই” এর মুন্ডুকে হাজির করেছে। তখন ঐ মুন্ডুটি নানা ভুজুং-ভাজুং করে নতুন আসা “ফিদাই”কে হাসান-ই-সাব্বাহ’র অলৌকিক ক্ষমতা এবং মহান শক্তির কথা বলত, এছাড়া মৃত্যুর পর হাসান-ই-সাব্বাহর অনুসারীরা স্বর্গে কি পরিমাণ সুখে আছে তাও সে বয়ান করত। এভাবে হাসান-ই-সাব্বাহ “ফিদাই”দের প্রভাবিত করতেন।

ফিদাই নাকি আসাসিন বা হাসানসিন

ফিদাইদের অনেকেই আসাসিন বা হাসানসিন নামে অভিহিত করে থাকেন, হাশিস শব্দটি থেকেই হাসানসিন নামের উৎপত্তি। হাসানসিন শব্দের অর্থ হল “হাশিস ব্যাবহারকারী লোক”। আধুনিক যুগে ফিদাইরা হাসানসিন নামেই বেশি পরিচিত।

যুদ্ধ প্রশিক্ষণ

আসাসিনস ক্রিড বা প্রিন্স অফ পার্সিয়া সিনেমা দেখেছেন নিশ্চয়, সেখানে আসাসিনদের যুদ্ধ কৌশল আর প্রস্তুতি দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। মনের মধ্যে অনেকসময় সন্দেহ জাগতো যে বাস্তবেই এমন প্রশিক্ষণ নেওয়া হতো কিনা।

“ফিদাই বা আসাসিন”রা আসলেই এমন প্রশিক্ষণে অভ্যস্ত ছিল। সাধারণ যুবক হলেই এই কাল্টে যোগ দেওয়া সম্ভব হতনা, “ফিদাই”কে একাধারে হতে হত নিপুণ কৌশলী- যোদ্ধা- সর্বরকম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কারণ তাকে শত শত যোদ্ধাকে একলা প্রতিহত করে নিজের শিকারকে মেরে আসতে হবে।

“ফিদাই”কে প্রথমে শিখতে হয় যুদ্ধের সবরকম কলা- কৌশল, তারপর দ্বন্দ্ব- যুদ্ধ এবং ছদ্মবেশের শিক্ষা নিতে হবে। তারপর আস্তে আস্তে শিখতে হত যুদ্ধের রাজনীতি এবং বিভিন্ন দেশের ভাষা। সবার শেষে তারা শিখে “ফুরুসিয়া” বা ইসলামিইয়া যোদ্ধাদের নিজস্ব ভাষা, এই ভাষায় “ফিদাই” বা আসাসিনরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলত। এছাড়াও তাদেরকে সুফিজম বা আধ্যাত্মিক বিদ্যায় দীক্ষা দেওয়া হত, যেন তাদের মন বিক্ষিপ্ত না হয়ে যায়। এই সবকিছু শেখানোর স্থান ছিল ঐ “মৃত্যু উপত্যকা”।

আসাসিনদের লক্ষ্যবস্তু বা শিকার

আসাসিনরা ইসলামিয়া মতবাদের বিরোধীদেরকে প্রধানত খুন করত, এছাড়া তারা অর্থের বিনিময়েও মানুষকে খুন করত। তাদের হাতে অসংখ্য রাজা, উজির, সেনাপতি এমনকি ইসলামধর্মেরই অন্য মতবাদের অনুসারীরা প্রাণ দিয়েছেন। এসব “ফিদাই”রা সাধারন মানুষদের সমর্থন বজায় রাখার জন্য তাদেরকে মারত না। তখন এই কাল্টদের নাম শুনলেই সবাই কেঁপে উঠত।

হাসান-ই-সাব্বাহ’র কাল্টের পতন

অনেক রাজা কিংবা রাজনৈতিক দল চেষ্টা করেছিল এই কাল্ট দলের পতন ঘটাতে, কিন্তু তারা সফল হতে পারেননি। পরে এই কাল্ট দল মোঙ্গল নেতা “মংকে খান”কে মারার চেষ্টা করে এবং তার ফলশ্রুতিতে আসাসিনদের নামে সমন জারী করা হয়। শেষমেশ মোঙ্গল নেতা “হালাকু খানের” হাতেই এই কাল্ট দলের সর্বশেষ গ্র্যান্ড মাস্টার মারা যায় এবং তার অনুসারী ফিদাইদেরও মেরে ফেলা হয়।

এভাবেই শেষ হয় ভয়ংকর এক কাল্ট দলের বিভীষিকা।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top