নিসর্গ

অসহ্য সুখের আরু ভ্যালী…!!

অসহ্য সুখের আরু ভ্যালী...!! (কাশ্মীরের গল্প)

কখনো কখনো, কিছু- কিছু ভীষণ সুখের মুহূর্ত আসে যা খুব অসহ্য লাগে। অসহ্য বলতে অনেকটা এমন, ঠিক মন ভরেনা যা দেখে বা পেয়ে, মনে হয়, সেই সুখের কিছু রেশ বা মুহূর্ত যদি নিজের সাথে নিয়ে নেওয়া যেত অনন্ত সময়ের জন্য। তবেই হয়তো কিছুটা সুকুন মিলতো (সুখের শেষ পরিসীমা)। অথবা যদি সেই সুখের কাছে বা সাথে কাটানো যেন অনন্ত অলস সময়, তবেই হয়তো হৃদয় কিছুটা তৃপ্ত হত; হয়তো কিছু একটা পাওয়া যেত যা মনে করে শত কষ্টেও মুখের কোন এক কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠতো অজান্তেই, হারিয়ে গিয়ে সুখ সৃতির সেই ক্ষণে বা মুহূর্তে।

কাশ্মীরের ৭ দিনে নানা যায়গায় ঘোরা হয়েছে কম- বেশী। আর এই ৭ দিনের এক একদিন আমার কাছে এক এক রকম রূপে ধরা দিয়েছে। তবে এর মধ্যেও যে জায়গাটা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, সুখে উত্তাল স্রোতে, যে যায়গাটা আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে, নরম কোমল সাদা মেঘের ভেলায়, যে ঝর্ণা ঝরিয়েছে গোপনে সুখের কান্না, যে পাহাড় আমাকে টেনেছিল চুম্বকের মত আর যে রাস্তার মায়া আমাকে মোহিত করেছিল তার সবটুকু মাদকতা দিয়ে সেই যায়গাটা হল আরু ভ্যালী।

এই আরু ভ্যালীতে যখন যাচ্ছিলাম, পেহেলগামের মুল শহর দূরে ফেলে উঁচু পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি ওঠা শুরু করতেই আমি হারিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের ভেতরে ভেতরে, উচ্ছ্বাসে মাঝে মাঝে চিৎকার করতে ইচ্ছা হচ্ছিল, অবাধ্য আবেগের। কিন্তু নিজেকে সামলে রেখেছিলাম সাথে আরও অনেকেই ছিল বলে। সেটা একটা অব্যাক্ত সুখের অনুভূতি ছিল আমার কাছে।

অসীম সুখের স্রোত!

ইস! কি ভীষণ উচু পাহাড়ি রাস্তা! যত উপরে উঠছি তার তত উপরে আরও উচু উচু পাহাড়ের কি অসম্ভব আকর্ষণ! পাহাড়ের গায়ে গায়ে জড়িয়ে থাকা ঘন জঙ্গল, পাইনের অরণ্য, নাম না জানা শত ফুলের সমারোহ, বাঁকে বাঁকে সুখের ঝর্ণা ধারা, নিচে উত্তাল, উম্মত্ত আর বিরামহীন ছুঁটে চলা লিডারের ঝংকার। আর দূরে আকাশের সাথে মাথা ছুঁই ছুই তুষার শুভ্র বরফের চূড়া, যতদূর চোখ যায়।

একটু পরেই আমাদের গাড়ি যখন উচু পাহাড়ের পিঠে বানানো রাস্তা ধরে নিচের পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল, লিডার নদী একটু একটু করে আমাদের রাস্তার সাথে লেগে যেতে লাগলো, তার আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের সবটুকু নিয়ে। চারদিকে বড় বড় পাথরের সাথে পানির সে কি উম্মত্ততা না দেখলে বোঝানো মুশকিল। আর সেই উচ্ছ্বসিত পানি আর পাথরের পাড়েই রয়েছে ছোট ছোট কটেজ, ক্যাম্প সাইট, তাবু খাটিয়ে থাকার ব্যবস্থা। যা দেখে কেন এখানে ব্যাগ- পত্র নিয়ে একবারে এলাম না সেই আক্ষেপে পুড়তে হল। এখানেই একদিন যদি থাকা যেত!

বড় গাছের শেকড় গিয়ে ঝুলে পড়েছে লিডারের বুকে, পাথরে পাথরে পা ফেলে লিডারের এপার থেকে ওপার করা যেত অনায়াসেই। থাকা যেত একদম ডিলারের গা ছুঁয়ে- ছুঁয়ে আর গান শুনে- শুনে, ইচ্ছে মত ভিজে- ভিজে, অনন্ত অলস সময় কাটিয়ে দেয়া যেত কোন এক দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায় আর নীরব কালো রাতের উচ্ছ্বসিত লিডারের মাদকতায়। তবুও সেই আক্ষেপ কিছুটা মেটাতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম, রাস্তার- পাহাড়- পাথর- লোহার ব্রিজ আর লিডার একই সমতলে এসে গেছে এমন একটা যায়গায়। কয়েকটি পাহাড়ের দোর গোঁড়ায়। সবাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে ছবি তুলছিল ব্রিজের কাছে বা আসেপাশে দাড়িয়ে। কিন্তু আমাকে আর দূরে রাখিয়ে রাখে সাধ্য কার?

কাউকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নেমে পড়লাম উচ্ছ্বসিত হিম শীতল জলের ছোঁয়া পেতে। পাথর- পাহাড় আর কিছু ঝুঁকি পেরিয়ে। বড় একটা পাথরের উপরে চুপচাপ বসে ছিলাম অনেক অনেক ক্ষণ। যতক্ষণ কেউ জোর করে ডেকে উপরে নিয়ে না যায়। ইস! কি যে অদ্ভুত আনন্দের ছিল সেই সময়টুকু বলে কিভাবে বোঝাই?

ডানে প্রায় পাহাড়ের সমতলের পাহাড়ের মত ভ্যালী থেকে নেমে আসছে লিডার অজস্র ঝর্ণা ধারায় মিলিত নদী হয়ে, পাহাড়, পাথর আর ব্রিজ পেরিয়ে। বামে উচু পাহাড় থেকে নিচের পাহাড়ের খাঁদে ছুঁটে যাচ্ছে আমার চেয়েও অবাধ্য হয়ে। মিশে যাচ্ছে লিডারের ভয়াবহ উম্মত্ততার সাথে। সে এক মায়াময় যায়গা, সেখান থেকে উঠে আসতে মন চাইছিলনা কিছুতেই। পুরোটা দুপুর- বিকেল আর সন্ধ্যা যদি সেখানে কাটানো যেত তবেই না কিছুটা তৃপ্তি আর অল্প হলেও একটু প্রাপ্তি হত।

কিন্তু সেই উপায় নেই। উঠে আসতেই হল অন্য সবার ডাক আর কারো কারো চোখ রাঙানি উপেক্ষা করতে না পেরে। গাড়িতে উঠেছিলাম ঠিকই, তবে মনটা পড়েছিল ওখানেই, আরু ভ্যালীর পাহাড়ের গায়ে- পায়ে, সবুজে, পাইনের বনে, গাছের বেড়িয়ে থাকা আর নদীর পানি ছুঁয়ে শুয়ে থাকা শিকড়ে, ছোট- বড় আর মাঝারি লিডারের শীতল জলে অনবরত আর ইচ্ছেমত ভিজতে থাকা পাথরে- পাথরে, ছোট- বড় জলের ঢেউের তোড়ে, গাছের নিচে দাড়িয়ে থাকা রঙিন কটেজে নানা রঙে, জলের ছোঁয়া নিয়ে, পাথরে বসে থেকে পাহাড় আর পাইনের আড়াল থেকে দূরে হাসি নিয়ে দাড়িয়ে থাকা বরফ পাহাড়ের চূড়ায়- চূড়ায়, নীল আকাশের সাথে মিশে যাওয়া পাহাড়ের শিখরে, রাস্তায় দিয়ে যাবার সময় রঙ- বেরঙের ভেড়ার পালে, আর পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে, নাম না জানা, অজস্র ঝর্ণার ধারার কাছে।

সবকিছু মিলে সে এক অসহ্য সুখ ছিল আরু ভ্যালীর সবটুকু, সবকিছু জুড়ে। যা না যায় ইচ্ছেমত ধারন করা, আশ মিটিয়ে উপভোগ করা, না যায় ছেঁড়ে আসা, না যায় ওদেরকে, এই সুখের পসরা সাজিয়ে রাখা সবকিছুকে ফেলে দূরে চলে যাওয়া। যেতে যে ইচ্ছেই করেনি এতটুকু।

আমাকে সুযোগ দেয়া হলে, আমি বার বার আরু ভ্যালীর ওই অসহ্য সুখের মাঝে বিলিন হয়ে যেতে চাই। অন্য কোথাও না, এক ছুঁট দিয়ে, চোখের পলকে পৌঁছে যেতে চাই, পুরো কাশ্মীরের মধ্যে আমার দেখা- পাওয়া সবচেয়ে আনন্দের, অনেক সুখের, অনাবিল সৌন্দর্যের, আসলে সে এক অসহ্য সুখের আরু ভ্যালীতে।

Most Popular

To Top