শিল্প ও সংস্কৃতি

ডেথ নোটঃ সচেতন আর অবচেতন সত্ত্বার চিরায়ত দ্বৈরথ

নিয়ন আলোয়- ডেথ নোটঃ সচেতন আর অবচেতন সত্ত্বার চিরায়ত দ্বৈরথ- Neon Aloy

মানুষ রুপালী পর্দায় সেটাই দেখতে চায়, বাস্তবে যা ঘটে না। আর সেটা দেখেই আপ্লুত হয়, যা সে মনে প্রাণে কল্পনা করে। এই ভূমিকা মূলত দেওয়া জাপানি জগদ্বিখ্যাত এনিমে সিরিজ ডেথ নোট নিয়ে কিছু ভাবনা চিন্তা শেয়ার করার জন্য।

নিঃসীম দূরত্বের এক জগত থেকে শিনিগামি নামক দেবতারা বসে বসে অবলোকন করে মানবজাতিকে। মানুষের ভাগ্যকে তারা প্রতিনিয়ত প্রভাবিত না করলেও তাদের আছে এক অভাবনীয় ক্ষমতা। তারা মৃত্যু-খাতায় মানুষের নামটি লিপিবদ্ধ করলে সে মানুষটির প্রাণবায়ু ফুরিয়ে যাবে। আর সে ফুরনো তৎক্ষণাৎ হতে পারে, কিংবা হতে পারে নির্দিষ্ট কোনো সময় পর।সেই চিরঞ্জীব শিমিগামির এক সদস্য রিউক। ভয়ালদর্শন এই মৃত্যুদেবতার ডেথ নোটটি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়লো। আর সেই নোটবুকটি পেল আপাতদৃষ্টিতে “Epitome of Youth” বলে অভিহিত করা যায় এমন এক তরুণ। লাইট ইয়াগামি। একজন হাই-স্কুল টপার। লম্বা, ছিপছিপে, সুগঠিত, মেধাবী, পরিশীলিত, রমণী মোহন, সুপুত্র, সুভ্রাতা। যার মনের চিন্তাধারাও আমাদের মোরাল কোডেরই ধারাবাহক। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনের তাড়না বাজে তার চেতনায়। আপাতভাবে লোভ-লালসা, কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার, কোনো কিছুতেই তাকে পাওয়া যায় না।

ডেথ নোট আর লাইট- চমৎকারী এই যুগলবন্দী তাকে স্বপ্ন দেখায় নতুন পৃথিবী গড়তে। যে পৃথিবীতে থাকবে না কোনো পাপ, যে পৃথিবীতে থাকবে না কোনো অপরাধ। দারুণ শোনাচ্ছে, ঠিক না? কিন্তু একবার চিন্তা করুন, যে কোনো ছোট-বড় পাপের অবধারিত ফলই যদি মৃত্যু হয়, সেটা কি গ্রহণযোগ্য? হয়তো জীবনে একটিও বৃহৎ পাপের দায়ভার ঘাড়ে নেয় নি, এমন মানুষ খুঁজলে অনেক মিলবে। তবে মানুষের মাঝে জন্ম-মৃত্যুর কালক্ষণ যারা বেঁধে দেয়, যখন খুশি যেভাবে খুশি যে জীবন নিয়ে নেয়, তাকে আমরা কী বলি? খুনি, ঘাতক, স্বৈরাচার, জঙ্গি- এ শব্দই ভেবে নেবে সমাজ। সেই অসীম ক্ষমতার জন্য একটি ডাকনামও এসে যায়। “কিরা” একদিকে জাদুমন্ত্রে আচ্ছন্ন সমাজ কিরাকে উদ্ধারকর্তা ভেবে মোহিত হচ্ছে। কিন্তু একই সময় আরেকদিকে কিরাকে খুনি বলার সৎসাহস করে আরেক ব্যক্তি। তার নাম কেউ জানে না। আদ্যক্ষর এল তথা L ছদ্মনামেই তার পরিচয়।

এল- ২০০৬ এ আঁকা এই চরিত্র যেন বর্তমান তারুণ্যের এক সুপ্ত প্রতিনিধি। এলও মেধাবী, প্রখর বুদ্ধিমান। কিন্তু তার জীবনধারা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার মত নয়। পরিবারহীন, একা এক তরুণ এল। “সোশিওপ্যাথ”– শব্দটাই যার সাথে বেশি যায়। চেহারা, গড়ন, পোশাক-পরিচ্ছদ এ নিয়ে তার কোনো এ নিয়ে তার কোনোই ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের জগতেই সে যেন আচ্ছন্ন। তবে তারও আছে মানবীয় আশা-আকাঙ্খা। তবে তারও আছে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। সেও অবদান রাখে পৃথিবীর বুকে। তবে তার অবদান ফর্মুলাটিক সমাজ কাঠামোর একজন সাধারণ সদস্যের কাছে দৃষ্টিগোচর নয়। সে যেন এভারেজ হয়েও “Larger Than Life” সমগ্র বিশ্বব্যাপী আইন শৃঙ্খলা বাহিনীরা যখনই কোন অত্যন্ত জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়য়, তাদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে “এল” এর আবির্ভাব ঘটে।

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানার আদর্শ উদাহরণ ডেথ নোট। আর এটা আমাদের তরুণদের সাথেও রিলেটেবল। বয়সের একটা পর্যায়ে বন্ধু কমে, প্রতিযোগী বাড়ে। পাশাপাশি থাকা, একসাথে পথ চলা মানুষের ভেতরেও চলে স্নায়ুর লড়াই। প্রতিটি পদে পদে জয়ের চিন্তা। এটি  মানুষের “প্রাথমিক তাড়না” ও হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আমরা যখন এমন স্নায়ু যুদ্ধের দর্শক, তখন তা আমাদের দান করে প্রশান্তি। আর আমরা যখন সে লড়াইয়ের সৈনিক, তখন এই এনিমে আমাদের “আত্মার মাঝে গিয়ে লাগে” । আর এ ধরনের রিলেটেবলিটির জন্যেই এনিমে ঘরানার মাঝে ডেথ নোট হয়েছে “কাল্ট ক্লাসিক” । একজন নন এনিমে দর্শকের জন্যও একটা “মাস্ট সি” সংযোজন হয়ে রয় ডেথ-নোট।

এনিমেতে এই দুই চরিত্রের স্নায়ুযুদ্ধের একটি সাব-প্লট প্রেম-ভালবাসা। এই সাবপ্লটকে এনিমে সিরিজে বিকশিত করা না হলেও একজন তরুণের মনে তা দাগ কাটার জন্য যথেষ্ট। চিরায়ত বিবর্তনবাদের সূত্র মেনে, সুদর্শন লাইট ইয়াগামিই হয় নায়িকা মিসার প্রিয়তম। কিন্তু যদি তাদের জুটিতে এক তৃতীয় ব্যক্তি আসে, যোগ্যতার দিক থেকে যে কিনা লাইট ইয়াগামিরই সমকক্ষ, তবে কার ভালবাসার জয় দর্শক আশা করবে? বোধবান এল এর সুপ্ত প্রেম, প্রতিটি সমাজের ভগ্ন-হৃদয় তরুণদের নিশানই যেন বহন করে।

সমাজের অস্থিরতা, ভারসাম্যহীনতা, নৈতিকতার অভাব প্রতিটি তরুণকে আলোড়িত করে, দেয় এক সার্বক্ষণিক পীড়া। এ সমাজের চারপাশে মানুষ খুঁজে পায় অপরাধ। দেখতে পায় দুর্জনের আস্ফালন। কেউই সেই দুর্জন হতে চায় না, বরং তাকে থামাতে চায়, এ থেকে সে মুক্তি চায়। সে চায় এক স্বপ্নের সমাজ। তাই লাইটের মত “যুগান্তকারী ক্ষমতা”র স্বপ্ন দেখে তরুণ। সে জানে তা অসম্ভব, তবুও সে রোমান্টিসিজম, কিংবা মুগ্ধতাই স্বপ্নবাজ তরুণকে আচ্ছন্ন করে।

কিন্তু সময়ের সাথে মোহমুক্তিও ঘটে মানুষের। তাই একসময় সেও বাস্তববাদী হয়, তার মাঝে বিদ্যমান যাবতীয় দোষ-গুণের ভেতর দিয়েই সে প্রোডাকটিভ হওয়ার চেষ্টা করে।

তাই বলা চলে, যত বেশি আমরা মনে মনে “লাইট” হওয়ার স্বপ্ন দেখি; ততই আমাদের সত্তা আপন করে নেয় “এল”কে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top