ইতিহাস

নাৎসী ও আমেরিকানদের এক টেবিলে বসানো গৃহিনী

নিয়ন আলোয়- নাৎসী ও আমেরিকানদের এক টেবিলে বসানো গৃহিনী- Neon Aloy

২৪ ডিসেম্বর ১৯৪৪, ক্রিসমাস ইভ।
বেলজিয়াম বর্ডার থেকে ৪ মাইল দূরে, হার্টগেন জঙ্গলের এক হান্টিং কেবিন। এলিজাবেথ ভিনকেন আর তার ১২ বছরের ছেলে ফ্রিটজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার বাবার জন্যে। মিঃ ভিনকেন আসলেই খাওয়া শুরু করবে তারা। ভিনকেনদের বাড়ি ছিল জার্মানীর জার্মান-বেলজিয়াম বর্ডার সংলগ্ন আখেন শহরে। মিত্রবাহিনীর বোমায় তাদের বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে জঙ্গলে নিজেদের পুরাতন হান্টিং কেবিনে আশ্রয় নেয় তারা। মিঃ ফ্রিটজ শহরে এক বেকারীতে কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে সময় পেলে চলে আসতেন পরিবারের কাছে। একটু পরে দরজায় ধাক্কা দেবার শব্দ। বাবা এসে গেছেন, ছোট্ট ফ্রিটজের মন আনন্দে নেচে উঠল। কিন্তু মিসেস ভিনকেন বুঝলেন দরজা ধাক্কানোর আওয়াজটা অস্বাভাবিক। তিনি ডাইনিং টেবিলের বাতি নিভিয়ে দিলেন। দুরু দুরু বুকে দরজা খুলে দেখলেন, শত্রুপক্ষের দুইজন সেনা দাঁড়িয়ে আছে, আহত আরেকজন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। অদ্ভুত এক ভাষায় তারা কি যেন বলে মাটিতে পড়ে থাকা সেনাটির উরুতে গুলির ক্ষতটা দেখাল। এলিজাবেথ ফ্রিটজ দুইজনেই জানতেন এরা মার্কিন সেনা। ফ্রিটজ ভয় পেয়ে গেল। সে ভাবছে এখন কী হবে?

যে আশ্চর্য গল্পটি পড়তে যাচ্ছেন সেটা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে। জার্মান সেনাবাহিনী প্রায় পরাজিত। কিন্তু মারণকামড় দিতে তারা শেষবারের মত বিশাল এক আক্রমণ পরিচালনা করে। জায়গাটা জার্মানি-বেলজিয়ামের বর্ডারের আশপাশের জঙ্গলে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে আর্ডেন জঙ্গলের ৮৫ মাইল লম্বা এক ট্রেঞ্চ। এখানেই সংঘঠিত হয়েছিল দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত ‘ব্যাটল অফ বোলজ’। প্রায় ১৬ হাজার মার্কিন সেনা নিহত সহ আরও ৬৫ হাজার সেনা কোনো না কোনোভাবে আহত অথবা বন্দী হয়েছিল। আজ অবধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর কোন যুদ্ধে একসাথে এত রক্তক্ষয় কখনো হয়নি। মিসেস এলিজাবেথ ভিনকেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না তার কী করা উচিত। ভয়ে ভয়ে শত্রুসেনাদের দিকে তাকালেন। তাদের রুক্ষ চেহারা দেখে বোঝা যায় মোটমুটি সবাই সদ্য বিশ বছর বয়সে পা দিয়েছে। তাদের কাছে অস্ত্র আছে, তারা চাইলেই কেবিনের দরজা ভেঙে ভেতরে আসতে পারত। কিন্তু, তারা সেটা করেনি। এলিজাবেথ এসব সাতপাঁচ চিন্তা করে তাদেরকে ভেতরে নিয়ে আসলেন। আহত সৈন্যটাকে ভেতরের দিকের এক উষ্ণ কেবিনে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলেন। মিসেস ভিনকেন যেমন ইংরেজি জানতেন না, তেমনি মার্কিন সেনারাও জার্মান ভাষা বুঝত না। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ফরাসী ভাষায় কথাবার্তা চলতে লাগল। মার্কিন সৈন্যরা বরফে ঢাকা আর্ডেন জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। মারাত্মক আহত কমরেডকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাঁটার উপরে ছিল তারা। উপত্যকার চারিদিকে থেকে অনবরত গোলাগুলির আওয়াজ আর প্রতিধ্বনিতে তারা আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, বুঝতে পারছিল না কোনদিকে যেতে হবে। কিছুক্ষণ আগে এই কেবিনের দেখা পেয়ে দরজায় নক দেয়। মার্কিন সেনাদের অবস্থা আর কাহিনী শুনে এলিজাবেথ এক্সট্রা খাবারের তোরজোড় শুরু করলেন। ফ্রিটজকে ছয়টা আলু আর ক্রিসমাসের জন্যে রাখা একমাত্র মুরগটাকে আনতে পাঠালেন। খাবার রান্না হচ্ছে ঠিক এমন সময় আবার দরজা ধাক্কানোর শব্দ। আরও পথ হারানো মার্কিন সৈন্য এসেছে মনে করে মিসেস ভিনকেন আর ফ্রিটজ দরজা খুলতে গেলেন।

কিন্তু, দরজা খুলেই যেন ভূত দেখলেন এলিজাবেথ। চারজন অস্ত্র সজ্জিত জার্মান সৈন্য দাঁড়িয়ে। মনে হয় আশ্রয় নেওয়া মার্কিন সৈন্যদেরে খোঁজে এসেছে। শত্রু সেনাদের আশ্রয় দেবার পরিণাম যে মৃত্যু এটা ভালমত জানতেন তিনি। চারজনের মধ্যে তিনজন আল্পবয়সী সৈনিক, আরেকজন কর্পোরাল। কর্পোরাল এগিয়ে এলেন, ‘মেরি ক্রিসমাস ম্যাম, আমরা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। আপনার এখানে কি আজ রাতের জন্যে আশ্রয় হবে?’ এলিজাবেথ কি যেন ভাবলেন তারপর দরজায় ফ্রিটজকে ভেতরে রেখে বাইরে আসলেন। “আপনারা আমন্ত্রিত, ভেতরে গরম খাবারের ব্যবস্থাও করেছি, যতক্ষণ খুশি থাকবেন, যত মন চায় খাবেন। কিন্তু ভেতরে আমার আরও গেস্ট আছে, এমন গেস্ট যাদের আপনারা পছন্দ করবেন না।” কর্পোরাল তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার গেস্ট কি কোন আমেরিকান?” “জ্বী, তারা তিনজন আপনাদের মতই রাস্তা হারিয়ে এখানে আশ্রই নিয়েছে,” এলিজাবেথ দৃঢ় গলায় বললেন। কর্পোরাল এত সাবলীলভাবে এই রকম উত্তর আশা করেননি। তিনি হতভম্ব হয়ে কড়া চোখে এলিজাবেথকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। “এটা পবিত্র রাত, এখানে কোনোরকম গোলাগুলি চলবে না। আপনাদের অনুরোধ করছি আপনাদের অস্ত্র বাইরে রেখে ভেতরে আসুন। আজ আমার বাসায় কোনো অস্ত্র ঢুকবে না”, এলিজাবেথ বললেন আরও সাহস সঞ্চার করে। এলিজাবেথের সাহস দেখে হতচকিয়ে গেল জার্মান সেনারা। তারা নিজেদের দিকে চাওয়াচায়ি করে রাজি হয়ে গেল এলিজাবেথের শর্তে। জার্মানরা রাজি হয়ে যাবে, এলিজাবেথ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তিনি ভেতরে গিয়ে আমেরিকান সেনাদেরকেও একই কথা বললেন। তিনি তদের অস্ত্র নিয়ে বাইরে জার্মানদের অস্ত্রের সাথে স্তুপ করে রাখলেন। স্বাভাবিকভাবেই বনের ওই ছোট্ট কেবিনটায় ভয় আর টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

আমেরিকান আর জার্মান সেনারা খুব সতর্কভাবে একে অন্যকে চোখাচোখি করছে। কিন্তু কেবিনের উষ্ণতা আর চুলায় বসানো খাবারের সুগন্ধে ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হতে লাগল। জার্মান সেনারা তাদের ব্যাগ থেকে র‍্যাশনের রুটি আর এক বোতল ওয়াইন বের করল। এক মার্কিন সেনারাও তাদের র‍্যাশন থেকে কফি বের করে ডিনারে কন্ট্রিবিউশান করল। জার্মান সেনাদের মধ্যে একজন ছিল এক্স মেডিকেল ছাত্র। সে আহত আমেরিকান সেনার ক্ষত পরীক্ষা করে বলল, “অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে কিন্তু ঠান্ডার জন্যে ইনফেকশান ছড়াতে পারেনি। এখন তার বিশ্রাম আর খাবার দরকার।” খাবার তৈরী হতে হতে কেবিনের পরিবেশ অনেকটা হালকা হয়ে গেল। এলিজাবেথ বাইবেল পড়তে লাগলেন। তারপর অনেক কথা হল দুই পক্ষের মধ্যে। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল দুইজন জার্মান সেনার বয়স কেবল ১৬। কর্পোরাল ২৩ -এ পা দিয়েছেন।

ছোট্ট ফ্রিটজ লক্ষ্য করল খেতে খেতে সেনাদের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। না জানি কত বছর ধরে এরা এরা যুদ্ধ করছে। শান্তি কি জিনিস, হয়ত ভুলেই গেছিল। এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব ছিল সারা রাত আর পরদিন সকাল। আমেরিকানদের একটা ম্যাপ দিয়ে জার্মান কর্পোরাল তাদের দেখিয়ে দিলেন কীভাবে খুব সহজে তারা আমেরিকান ক্যম্পে ফিরে যেতে পারবে, একটা কম্পাসও দিয়ে দিলেন। এলিজাবেথ তাদের অস্ত্রগুলা ফিরিয়ে দিলেন। দুই পক্ষ একে অন্যের সাথে হ্যান্ডশেইক করে দুই দিকে হাঁটা দিল।

ফ্রিটজ আর তার বাবা-মা যুদ্ধে বেঁচে গেছিলেন। ৬০ বছর বয়সে মারা যান তারা। ততোদিনে ছোট্ট ফ্রিটজ বড় হয়ে গেছে। বিয়ে করে হাউয়াইতে চলে যায় সে।সেখানে সে ‘ফ্রিটজ ইউরোপিয়ান’ নামে এক বেকারী দেয়। অনেকদিন ধরে ফ্রিটজ সেই আমেরিকান আর জার্মান সেনাদের খুঁজেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ফ্রিটজের এই গল্প শুনে ১৯৮৫ সালে জার্মানিতে এক ভাষণে শান্তি আর পুনর্মিলনীর উদাহরণ হিসেবে টানেন। অবশেষে ১৯৯৬ -এ ফ্রিটজ খোঁজ পায় র‍্যালফ ব্ল্যাঙ্ক নামের এক আমেরিকান সেনার। পরে সে আরেকজন আমেরিকান সেনারও খোঁজ পেয়েছিল কিন্তু জার্মান সেনাদের একজনেরও কোন খোঁজ সে কখ্ন পায়নি। ফ্রীটজ এক ইন্টারভিউতে সেই রাতের স্মৃতি রোমান্থন করতে যেয়ে বলেন, “অনেক বছর হয়ে গেছে রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধের পর। অনেক ভয়ানক অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। কিন্তু আর্ডেন জঙ্গলের ১৯৪৪ এর ওই ক্রিসমাস রাতের কথা কখনো ভুলব না। একা একজন মহিলার কৌশল, জ্ঞান আর আত্মবিশ্বাস সেদিন অবশ্যম্ভাবী এক রক্তপাত থামিয়েছিল। যুদ্ধ আমার শিশুমনে মানুষের উপর বিতৃষ্ণা ধরিয়ে দিয়েছল কিন্তু সেদিন আমি শিখেছিলাম মানূষকে ভালবাসতে। আজও মনে পড়ে মাকে আর ওই সাতজন সেনাদের, ভয়ংকর ‘ব্যাটল অব বোলজ’ চলাকালীন যারা আমাদের বাসায় এসেছিল শত্রুর বেশে কিন্তু বিদায় নিয়েছিল বন্ধু হয়ে।”

সেই ক্রিসমাসের ঘটনার প্রায় ৫৮ বছর পর ২০০২ সালের ৮ই ডিসেম্বর মারা যান ফ্রিটজ ভিনকেন। এই ঘটনা আজ থেকে ৭৩ বছর আগের এক ভয়ংকর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। চলছে সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা। ভেদাভেদ ভুলে আমরা কি পারি না আমাদের শত্রু বা অপছন্দের কাউকে আপন করে নিতে? একটু সাহসই তো লাগবেই। প্রথম পদক্ষেপ না হয় আপনিই নিলেন। বিশ্বাস করুন, বিব্রত হয়ে ফিরে আসবেন না। বরং এমন একটা বন্ধন তৈরী হতে পারে যেটা আজীবন থেকে যাবে। আর বদলে দিতে পারে আপনার জীবন!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top