ইতিহাস

স্বর্গের দুয়ারে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু

স্বর্গের দুয়ারে গণতন্ত্রের অপমৃত্যু

কল্পনা করেছেন কখনও বাংলাদেশ যদি গণতান্ত্রিক না থাকত? এমন সময় কিন্তু আমাদের দেশে ছিল। টানা ৯ বছর সামরিক শাসন চলেছিল। তখনকার গল্প হারিয়ে গেছে এক রকম। সে সময়টা নিয়ে লেখালেখি, পড়ার আগ্রহ অনেক দিনের; হয়ে ওঠেনি। কেউ যেন সে সময়টার প্রভাব স্বীকারই করতে চায় না। সে সময়ে কেমন ছিল শাহবাগ মোড়, কেমন ছিল ছাত্ররাজনীতি আর কেমন ছিল সরকারি চাকুরীজিবীর ঘরের রোজগার। কিছুই জানা হয়ে ওঠেনি। আমাদের প্রজন্মের কাছে সে দিনগুলি একরকম অস্তিত্বহীন। কি সহজে ধামচাপা দেয়া আছে সেই সময়ের অনেক কেলেঙ্কারী। ইতিহাস জুড়ে এই ধামা চাপা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে যুগব্যাপী শাসন।

নিজের দেশেরটা জানা হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি, তবে অন্যেরটা দেখে শেখার চেষ্টা করা যায়। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনের এমনই বড়সড় ধামাচাপা দেয়ার ঘটনা ফাঁস হয়ে আসে একটি ছবি দিয়ে। গল্পটা ১৯৮৯ সালের। সে বছর মৃত্যু হয় চীনের সংস্কারধর্মী চিন্তাধারার রাজনৈতিক নেতা হু ইয়াওবাং’র আর জন্ম হয় ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অন্যতম বড় গণতন্ত্র আন্দোলনের।

চীনের আধুনিকায়নের ইতিহাসটাই বিপ্লবের জালে মোড়ানো। মাও শাসনের প্রতিষ্ঠার সময় যে আন্দোলন চীনের বর্তমান ক্ষমতা নিশ্চিত করতে অনেকখানি ভূমিকা পালন করে, সে শাসনের অবসান হয় চীনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমিতেও চীনের সমাজতান্ত্রিক একদলীয় সরকার টিকে ছিল। তবে টিকে থাকার জন্য যে গঠনমূলক পরিবর্তনের দরকার তার জন্যই কাজ করেছিলেন হু ইয়াওবাং। চীনের সর্বোচ্চ শাসকের ডানহস্ত বলেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তবে তার গঠনমূলক সংস্কার পরিকল্পনায় প্রবীন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অমতের বিষয়টি ছিল স্পষ্ট।

হু ইয়াওবাং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি তিব্বতে স্বতন্ত্র সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন। তার জনপ্রিয়তার মাশুল হিসেবে তাকে দলের সহসভাপতি পদ থেকে অবসর দেওয়া হয় ১৯৮৭ সালে।

১৯৮৯ সালে হু ইয়াওবাং এর মৃত্যুতে কোন প্রকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার ঘটনা চীনের ছাত্র সমাজকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফটক থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিল বের হয়ে জড়ো হয় ফরবিডেন কিংডমের সামনে, টিয়ানানমেন চত্ত্বরে। সেখানে তাদের দাবী হু ইয়াওবাং এর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৎকার দেয়ার। এই চত্ত্বরে দাঁড়িয়েই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিপ্লবীরা স্লোগান দিয়েছিলেন। মাও সরকারে পতনের দাবীতে। সেখানেই যেন আবার মাওবাদের স্বজনপ্রীতির সমাজতন্ত্রের শিকার মানুষ আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করে। সেখানে ছাত্রদের সাথে মিশতে থাকে বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ। তখনই আবার গণতন্ত্রের ডাক শুনতে পাওয়া যায় বুদ্ধিজীবিদের গলায়। কিন্তু এবার আন্দোলনের কথা কেউ ভাবে নি। স্বতন্ত্র ছাত্র ইউনিয়ন গঠন শুরু হয় চীনের সকল শহরে। এপ্রিলের ১৫ তারিখে টিয়ানানমেন দখল করে ছাত্ররা। গণতন্ত্র, বাক ও প্রকাশক স্বাধীনতা আর সুষ্ঠ বিচার ব্যবস্থা নিয়ে শাসক শ্রেণীর সাথে মত বিনিময়ের সুযোগ তৈরীর লক্ষ্যে। এমন অবস্থা সম্পুর্ণ অগ্রাহ্য করে চীন সরকার। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার কি পন্থায় এই গণজোয়ার নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে বিভাজিত হয়ে থাকে। ১লা মে প্রিমিয়ার লি পেং ও সাধারণ সম্পাদক ঝাও জিয়েং এর বৈঠক হয়। ঝাও জিয়েং ছিলেন হু ইয়াওবাং পন্থার রাজনৈতিক। তিনি চেয়েছিলেন ছাত্রদের দাবি শুনতে। প্রিমিয়ার ও সুপ্রিম লিডার ডেং শাওপিং বিষয়টিকে বিপ্লবী চিন্তাধারার আন্দোলন বই অন্য কিছু দেখতে নারাজ ছিলেন।

আন্দোলন এদিকে স্তিমিত হতে শুরু করে। ১৩ মে একদল অনশনের ঘোষণা দিয়ে বসে পড়ে টিয়ানানমেনে। অনশনের পরিকল্পনা কাজে আসে। ১৭-১৮ মে এর মধ্যে ১০ লক্ষ চীনা নাগরিক টিয়ানানমেন চত্ত্বরে জড়ো হয়। ২০ মে সামরিক শাসন জারি হয়। ৩ লক্ষ সেনা মোতায়েন করা হয়।

১লা জুন রাষ্ট্রীয় দৈনিক পত্রিকায় এই আন্দোলনকে স্বাধীনতা বিরোধী পরাশক্তির প্ররোচনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করা হয়। এতে সাধারণ জনগণ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ২রা জুন মানুষের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। সেদিন ডেং শাওপেং সরাসরি সামরিক প্রধানের সাথে বৈঠকে টিয়ানানমেন চত্ত্বর থেকে বিপ্লবীদের উৎখাতের আদেশ দেন।

রাত ৯টার সময় কর্মসূচী শুরু করে সেনাবাহিনী। চত্ত্বরের চতুর্দিক থেকে সেনাবাহিনী অগ্রসর হতে থাকে। কোন প্রকার বিলম্ব সহ্য করা হবে না ছিল কর্মসূচীর প্রথম শর্ত এবং সেটা যে কোন মূল্যে নিশ্চিত করার আদেশ দেয়া হয়। প্রাণহানির সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় টেলিভিশনে সতর্কতা বাণী সম্প্রচার করা হয়।

১০টার সময় প্রথম মৃত্যু হয় সেনাবাহিনীর গুলিতে সাং শাওমিং নামের শ্রমিকের। ১০টা ৩০ মিনিটে ছাত্ররা বাসে আগুন দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে একদিকের। সেনাবাহিনীর অগ্রসরের সাথে সাথে রাস্তায় লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১২টা ১৫ মিনিটে একটি ফ্লেয়ারের আলোয় পুরো চত্ত্বর আলোকিত হয়ে ওঠে। আর্মরড পার্সোনেল ক্যারিয়ার প্রবেশ করে চত্ত্বরের পশ্চিম প্রবেশপথ দিয়ে। ১টা ৩০ মিনিটে চত্ত্বরে সেনাবাহিনী তাদের অবস্থান সুরক্ষিত করে।

রাত সাড়ে ৩টায় সামরিক অধিনায়কের সাথে বৈঠকে ছাত্ররা চত্ত্বর থেকে প্রস্থান করতে রাজি হন। ঘন্টাখানেক পর চত্ত্বর একবার অন্ধকার করে আবার আলোকিত করা হয়। এরপর ছাত্রনেতা হু ডেহন চত্ত্বর ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। ভোর বেলা ৫টার সময় ধীরে ধীরে মানুষ কমতে শুরু করে। ৬টার মধ্যে চত্ত্বরে সেনাবাহিনী কেবল অবস্থান করে। ৪ জুন সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিষ্কার কর্মসূচি চলে চত্ত্বরে। দুপুর গড়াতে আবার বিপ্লবীদের একদল চত্ত্বরে প্রবেশের চেষ্টা করে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার অবসান ঘটে গুলি বর্ষণের মাধ্যমে। চীনের রেডক্রসের হিসাব মতে জুনের ৩-৪ তারিখে আনুমানিক ৩ হাজার চীনা নাগরিক হত্যা করা হয়।

পরবর্তী ২ সপ্তাহ টিয়ানামেনের গেটস অব হেভেনলী পীস বন্ধ করে রাখা হয়। চত্ত্বরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সংবাদ মাধ্যমগুলোর উপর কড়া নজরদারী রেখে সামরিক হত্যাযজ্ঞ নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টির চেষ্টা করে সরকার। চীন ফিরে যায় মাও শাসনের লেনিন পন্থী সমাজতন্ত্রের মোড়কে। সামরিক খাতে খরচ বৃদ্ধি করা হয় ১৫%।

আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র নিন্দার শিকার হয় চীন ট্যাঙ্কম্যান ছবিটি প্রকশিত হবার পর। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক চীনকে দেওয়া ঋণ স্থগিত করে। জুনের ৫ তারিখে এক অজ্ঞাতনামা পুরুষ বেইজিঙের রাজপথে দাঁড়িয়ে এক স্কোয়াড ট্যাঙ্কের পথে বাধা দেন। তার ছবি সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আইকন হয়ে আছে ৩৬ বছর পরে।

টিয়ানানমেনের হত্যাযজ্ঞকে কেবল “জুন ৪ ইন্সিডেন্ট” বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে চীন সরকার। এই বর্বর আচরণের কথা আজকের সভ্য চীনা নাগরিকের জানার সুযোগ রাখা হয় নি। প্রতি বছর জুনে ৪ তারিখ কড়া নজরদারিতে রাখা হয় চীনের ইন্টারনেট। বর্ষপূর্তির ১ সপ্তাহের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী ও তাদের আত্মীয়দের।

১৯৮৯ সালে চীনের মোট সংবাদপত্রের ১২% এবং ১৫০টি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা হয়। ৮% প্রকাশনী বন্ধ করার আদেশ আসে। বিপ্লবে মৃতদের আত্মীয় স্বজনদের কোন প্রকার শোক পালনে বাধা দেওয়া হয়। যে কোন মূল্যে ৬/৪ তারিখের মাহাত্ম্য লুকিয়ে রাখার ব্রত নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে চীন সরকার। অত্যাচারের এই পর্যায়ে বিপ্লবে সন্তান হারানো মায়েরা টিয়ানানমেন মাতৃসংসদ গঠন করেন। প্রকাশ্যে সন্তান হারানোর শোক পালনের দাবি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের।

তথ্যসূত্রঃ

  • Wikipedia
  • New York Times Archives
  • The VOA

Most Popular

To Top