ক্ষমতা

ক্রা ক্যানাল: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নতুন কৌশল

ক্রা ক্যানাল: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নতুন কৌশল

সামুদ্রিক সংযোগ পথ

১.
সামুদ্রিক পরিবহনে পথের দূরত্ব ও সময়কে কমিয়ে আনার লক্ষে পৃথিবী’র মহাসমুদ্র/সমুদ্র পথে কিছু স্থানে দু’টি সমুদ্রকে সংযোগ করে – এমন সংক্ষিপ্ত পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সংক্ষিপ্ত পথ সবগুলোই এলাকার ভৌগলিক নামে পরিচিত, অনেক নামের পেছনে ইতিহাস জড়িত আছে। এসব ‘সংযোগ পথ’ কিছু প্রাকৃতিক ভাবেই রয়েছে, আবার কৃত্রিম ভাবে তৈরী করা পথও রয়েছে। সাধারনতঃ এসব পথ সংকীর্ণ। প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত এসব সংকীর্ণ পথকে সে এলাকার ভৌগলিক নাম দিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত, যেমনঃ Straits of Malacca । কৃত্রিম ভাবে তৈরী সংকীর্ণ পথগুলো দেয় নামেই পরিচিত (সুয়েজ খাল, পানামা খাল)। Global Maritime Routes এর শুধু মাত্র Strategic Maritime Passage হিসেবে বহুল পরিচিত ১০টিঃ সুয়েজ খাল, পানামা খাল, ষ্ট্রেইট অব মালাক্কা, ষ্ট্রেইট অব হরমুজ, ষ্ট্রেইট অব বাব এল-মানদেব, ওরেসান্ড ষ্ট্রেইট, ষ্ট্রেইট অব জিব্রালটার, ষ্ট্রেইট অব বস্ফরাস, ষ্ট্রেইট অব ম্যাগিলান, কেপ অব গুড হোপ ।

STRAITS OF MALACCA

মালাক্কা প্রণালী/ ষ্ট্রেইট অব মালাক্কা

২.
আমাদের কাছের মালাক্কা প্রণালী/Strait of Malacca সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালী ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর কে সংযুক্ত করেছে। ফলে এই রিজিয়নের সাথে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ও এশিয়া-প্যাসিফিক এর দেশগুলোর মধ্যে সহজ ও সংখিপ্ত পথে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে। মালাক্কা প্রনালীর নিকটস্থ দেশঃ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর। মালাক্কা প্রনালীর অধিকাংশ অংশই ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণে, সামান্য অংশ সিঙ্গাপুরের অধীনে, তবে এই প্রনালী দিয়ে ব্যবসায়ের আর্থিক লাভ সবচেয়ে বেশী পেয়ে আসছে সিঙ্গাপুর – তাদের বিশাল এবং আধুনিক পোর্ট সুবিধার জন্য। এ প্রনালী দৈর্ঘে ৫৫০ মাইল, উত্তর-পশ্চিম দিকের চওড়া ১৫৫ মাইল, গভীড়তাঃ ৬৫০ ফুট। কিন্তু দক্ষিন-পূর্ব দিকে অর্থাৎ সিংগাপুরের দিকের অংশে এর চওড়া মাত্র ৪০ মাইল, কিন্তু একাংশে চওড়া মাত্র দেড় মাইল আর গভীড়তা মাত্র ৯০ থেকে ১২০ ফুট।

৩.
এ প্রনালীটি পৃথিবীত সবচেয়ে congested shipping choke point হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর সমুদ্র পথে পরিবহনের ৪০% এই প্রনালী দিয়ে যাতায়াত করে, জাপানের আমদানীর ৯০%, চীনের ক্রুড ওয়েল আমদানীর ৮০%, এবং বছরে ৬৫,০০০ বানিজ্যিক জাহাজ এ পথে চলাচল করে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের উপমহাদেশের সাথে সাথে চীন ও জাপান এর কাছেও মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে ভারত মহাসাগর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে আমেরিকার নৌবাহিনীর কাছে এর গুরুত্ব অনেক। যদি মালাক্কা প্রনালী কোন কারণে বন্ধ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহ ভারত মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলো চীন,জাপান, কোরিয়া শিপিং করতে হলে সেই অষ্ট্রেলিয়া হয়ে ঘুরে যেতে হবে। আর আমেরিকার দিকে যেতে হলে সুয়েজ ঘুরে যেতে হবে। এতে দূরত্ব, সময়, এবং শিপিং খরচও অনেক বেশি পরে যাবে।

৪.
মালাক্কা প্রণালী ইতিমধ্যেই জাহাজ চলাচলের বাড়তি চাপ নিতে পারছে না এর সংকীর্ণতার জন্য। মেরিটাইম নিয়ন্ত্রণ বিপদজনক হয়ে উঠছে। আর ভবিষ্যতে যে কোন কারণে এ প্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে এর সুবিধাভোগী দেশগুলোর জন্য তা হয়ে উঠবে বিশাল এক মাথা-ব্যাথার কারণ। এর মধ্যে চীনের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। চীন ১৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে মালাক্কা প্রণালীতে সিংগাপুর পোর্ট এর চেয়েও বড় এক পোর্ট তৈরী করছে। ফলে এই প্রনালীর উপরে চীনের প্রভাব আরো বেড়ে যাবে। একটি চীনা কোম্পানী (Guangxi Beibu International Port Group) ইতিমধ্যে দক্ষিন চীন সাগরের কোলে অবস্থিত মালয়েশিয়ার KUANTAN PORT এর ৪০% কিনে নিয়েছে।

৫.
মালাক্কা প্রণালী’র এ অবস্থার কথা বিবেচনায় এনে চীন একটা প্রস্তাব করেছিলো নুতন এক কৃত্রিম চ্যানেল তৈরীর, যা KRA CANAL PROJECT নামে পরিচিত। এর আগে ১৬৭৭ সাল, ১৭৯৩ সাল, ১৮৬৩ সাল, ও ১৮৮২ সালে এ সম্ভাবনা নিয়ে কাজ কিছুদূর এগোলেও পড়ে তা বন্ধ হয়ে যায় নানা কারনে। ১৯৪৬ সালে থাইল্যান্ড-ব্রিটিশ এক চুক্তি স্বাক্ষর করে KRA CANAL PROJECT কে কবর দিয়ে দেয় শুধু মাত্র সিঙ্গাপুর বন্দরকে রিজিওনাল আধিপত্যের একমাত্র বন্দর হিসেবে রক্ষার্থে।

BRITISH-THAI TREATY 1946

এখন এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য চীন থাইল্যান্ড এর সাথে MOU স্বাক্ষর করে ফেলেছে। এখনো থাইল্যান্ড এর সংসদে পাশ করা বাকী আছে। প্রজেক্ট শেষ হলে ফলাফল লাভ করবে মালাক্কা প্রণালী ব্যবহারকারী সব দেশ, অর্থাৎ চীন, জাপান, আসিয়ান-ভুক্ত সব দেশ, ও এশিয়ার অন্যান্য দেশসমূহ। এর ফলে দূরত্ব, পরিবহনের সময় এবং খরচ – সব কিছুই কমে যাবে। সময় লাগবে ১০ বছর, চীন এতে খরচ করবে ২৮ বিলিয়ন ডলার।এর পরেও KRA CANAL PROJECT নিয়ে চীনের এগিয়ে যাওয়া অবশ্যই চিন্তার বিষয়, অনেকের কাছেই।

KRA CANAL PROJECT

৬.
আগেই বলেছি কাজটি জটীল, সময় সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল, এবং এর ফলে এই রিজিয়নে ভূ-রাজনীতির দৃশ্যে অনেক অনেক পরিবর্তন চলে আসবে। চীন ইতিমধ্যে প্রাথমিক জরীপ করেছে। পরিকল্পনাটি ম্যাপে দেখাচ্ছি [ম্যাপ দেখুন] ।

কৃত্রিম সংযোগ খাল কেটে গালফ অব থাইল্যান্ড কে যুক্ত করা হবে আন্দামান সী এর সাথে। থাইল্যান্ড এর KRA ISTHMUS এ অবস্থিত এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে প্রণালী’র দৈর্ঘ হবে ১০২ কিঃমিঃ, প্রস্থঃ ৪০০ মিটার, এবং গভীরতাঃ ২৫ মিটার।এর ফলে মালাক্কা প্রণালী হয়ে যাতায়াতের পথের দূরত্ব ১,২০০ কিঃমিঃ কমে যাবে, ফলে শিপিং সময় ও খরচ কমে আসবে।

৭.
চীন থাইল্যান্ড কে দেখিয়েছে স্বপ্ন, শুরু হয়েছে রাজনীতি। মালাক্কা প্রণালী দিয়ে বছরে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল এর বেশি তেলের চালান যায় নিকটস্থ দেশগুলোতে। কিন্তু কোন দেশই এখনো অফিসিয়ালী বিষয়টি নিয়ে কোন ঘোষণা দেয়নি। এ প্রজেক্ট সিংগাপুর কে আর্থিক ভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিষয়টি নিয়ে সিংগাপুর আমেরিকার দ্বারস্থ হলে চীন সিঙ্গাপুরের এ প্রচেষ্টা নেগেটিভলী দেখেছে।

এর প্রেক্ষিতে চীন সিংগাপুর কে পরোক্ষভাবে সতর্ক করে দেয়। সেই সাথে সিংগাপুর আমেরিকান পি-৮ পর্যবেক্ষন বিমান মোতায়েন করার বিরুদ্ধেও সতর্ক করে দিয়ে চীন জানিয়েছে, এশিয়ান রিজিয়নে সিংগাপুর আমেরিকার ক্রীড়নক হয়ে ক্রমাগত চীনের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে সিঙ্গাপুর কে এর জবাব দেয়া হবে।

৮.
ভবিষ্যতের KRA CANAL PROJECT এলাকার দুই পারের অর্থনৈতিক জোন এর বিশাল এক অংশ ইতিমধ্যেই চীনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন এবং থাইল্যান্ড বন্টন করে নিয়েছে। প্রজেক্ট এর ফলে হঠাত করেই থাইল্যান্ড এর বার্ষিক আয় কি পরিমাণ বেড়ে যাবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা হিসেব করছেন। সিংগাপুর হিসেব করছে তাদের বৃহত্তম পোর্ট এর ক্ষতির পরিমাণ। আর এসব হিসেবের বাইরে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ও অষ্ট্রেলিয়া ভিন্ন হিসেব কষছে, আর তা অনেক কিছু মিলিয়ে। যেমন, অর্থনৈতিক দিক থেকে এই রিজিয়নের পালটে যাওয়া, জ্বালানী তেল পরিবহনের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তায় চীন স্বাবলম্বী হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকায় রিজিয়নের ভূ-রাজনীতি থেকে কৌশলগত বিষয়ের এতো দিনের হিসেব-নিকেষ পালটে যাওয়া, মার্কিন নৌ-বহরের নিশ্চিত চলাচল সহ অনেক বিষয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া চীনের এভাবে উঠে যাওয়া আমেরিকার গা-সওয়া হতে কত সময় নিবে, তা-ও হিসেবের বিষয়।

লেখক
ব্রিগেঃ জেনারেল (অব:) মোঃ রকিবুর রহমান, বীর প্রতিক।

 

Most Popular

To Top