ইতিহাস

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া মানুষটি…

স্টানিসলাভ পেত্রভ

এই পৃথিবীতে অনেক সত্যিকারের নায়ক আছেন যাদের নাম আমরা অনেকেই শুনিনি। কিন্তু তাদের অবদান কোন অংশে সুপারম্যান অথবা ফ্ল্যাশের চেয়ে কম না। এমন একজন হিরো হলেন সোভিয়েত লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টানিসলাভ পেত্রভ। তিনি ছিলেন একজন সোভিয়েত অফিসার। ৮০’র দশকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার পারমাণবিক সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আমাদের এই স্বল্পখ্যাত ব্যক্তি। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনো হিরো হিসেবে চিন্তাই করেননি। আজকে তাকে নিয়েই আমাদের বিস্তারিত আলোচনা।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টানিসলাভ পেত্রভ-এর এই সাহসিকতার গল্প, যা আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে, তা পশ্চিমা দেশের মানুষের কানে পৌঁছে প্রায় দুই দশক পর। আর এই কাজটি করেন জার্মান রাজনৈতিক-কর্মী কার্ল স্মাখার।

১৯৮৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর দিনটি লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টানিসলাভ পেত্রভ-এর জন্য ছিল অন্যান্য দিনের মতই একটি সাধারণ দিন। কিন্তু এইদিনেই যে তাকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যা দুটি দেশের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের মত বড় একটি বিপর্যয় আটকে দিবে, সেটা তিনি আঁচও করতে পারেননি। তিনি সেদিন মস্কোর কাছাকাছি একটি আর্লি ওয়ার্নিং রাডারের বাংকারের দায়িত্বে ছিলেন। মধ্যরাত পার হওয়ার পর তিনি হঠাৎ খেয়াল করেন একটি মিসাইল আমেরিকা থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ধেয়ে আসছে। তিনি বলেন, “যখন এলার্ট মেসেজটা পাই, তখনই আমি চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠি। আমার সহকর্মীরা সকলেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। তখন আমি সকলকে শান্ত হতে বলি। কারণ আমি জানি আমার যেকোন সিদ্ধান্তের ফলাফল অনেক কিছুই হতে পারে”।

হঠাৎ দ্বিতীয় আরেকটি সাইরেন বেজে উঠল। আরো চারটি মিসাইল লঞ্চ করা হয়েছে আমেরিকা থেকে। মিসাইলগুলো ক্রেমলিনে আঘাত হানতে সময় নিবে মাত্র আধাঘন্টা। এবার স্ক্রিনে বড় বড় রক্ত-লাল অক্ষরে ফুটে উঠল “START”। পেত্রভ তখন বিরাট টেনশনে। লাল বোতামে চাপ দিবেন কি দিবেন না। ১৫ মিনিট সময় এখন তার হাতে। এর মধ্যে তাকে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জবাব দিতে হবে বিপদ সংকেতটা আসল নাকি নকল। তিনি তার ঘটনা নিজেই ব্যক্ত করেন এভাবে, “ মনে হচ্ছিলো আমার আর্মচেয়ারটা যেন গরম ফ্রায়িং প্যানের মত হয়ে গেছে। পা দুটিও যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে। আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। এমনই অবস্থা ছিল যখন, আমি আমার সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম”।

কিন্তু এইটা তো জানা কথা যে আমেরিকা যদি নিউক্লিয়ার এটাক করে তাহলে তারা খুব অফেন্সিভ এটাকে যাবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাবেন যে জিনিসটা যান্ত্রিক গোলযোগের ফলাফল। তিনি বলেন, “আমি স্বীকার করছি, আমি ভীত ছিলাম। কারণ আমি জানতাম আমার উপর কত বড় দায়িত্ব ছিল”।

পরবর্তীতে জানা যায় সোভিয়েত স্যাটেলাইটগুলো মেঘ থেকে যে সূর্যরশ্মি বিকরিত হয়েছে তাকে মিসাইল হিসেবে ভুল করে। কিন্তু পেত্রভ তার এই উপস্থিত বুদ্ধির কোন প্রশংসাই পায়নি। তাকে কারণ দর্শানোর জন্য বলা হয় কেন তিনি সেই ঘটনা সার্ভিস জার্নালে লিখলেন না। তার সিনিয়রদের দোষারোপ করা হয় এইরকম যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য। ভালো কিছু কেউ করেছে, সেটার কোন স্বীকৃতি না দিয়ে তারা একে অপরের উপর দোষ চাপাতে শুরু করে দিলেন।

প্রায় দশ বছর পর্যন্ত এই ঘটনা অত্যন্ত গোপন ছিল। পেত্রভের স্ত্রী ‘রাইসা’ পর্যন্ত জানতেন না তার স্বামী পারমাণবিক যুদ্ধ আটকাতে কত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে পেত্রভের সিনিয়র কর্ণেল ইয়রি ভটিনসেভ জার্মান ট্যাবলয়েড ‘বিলড’-এ পেত্রভের এই উপস্থিত বুদ্ধির গল্প নিয়ে লিখেন।
এই লেখাটি পড়ার পর কার্ল স্মাখার দ্রুত রাশিয়া যান। তিনি বলেন, “লেখাটি পড়ার পর আমার উপর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেল। এমন একজন ব্যাক্তি, যিনি কিনা একটি পারমাণবিক যুদ্ধ আটকে ফেললেন তার সাথে দেখা না করে আমি নিশ্চিন্তে বসতে পারছিলাম না”।

স্মাখার রাশিয়া গিয়ে পেত্রভকে খুজে বের করেন। তিনি মস্কোর উত্তর-পূর্বের একটি শহর ফ্রাইয়াজিনোতে একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। স্মাখার পেত্রভকে জার্মানির ওবারহাওসেন-এ আমন্ত্রণ জানান যাতে সেখানকার মানুষরা জানতে পারে সোভিয়েত আর আমেরিকার মধ্যকার পারমাণবিক যুদ্ধ আটকাতে পেত্রভের অবদানের কথা।

জার্মানিতে থাকাকালীন পেত্রভ অনেক সংবাদপত্র এবং একটি টিভি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দেন। এভাবেই তিনি পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিতি পান। ২০০৬ সালে এসোসিয়েশন অফ ওয়ার্ল্ড সিটিজেনস জাতিসংঘে পেত্রভকে সম্মানিত করে। তার পদকে লিখা ছিল, ‘To the man who averted nuclear war’। ২০১২ সালে পেত্রভকে জার্মান মিডিয়া পদকে ভূষিত করা হয়। তার আগে নেলসন মেন্ডেলা, দালাই লামা, কফি আনানও এই পদক পেয়েছিলেন। পরের বছর তাকে ড্রেসডেন শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তাকে এই পদক দেয় ড্রেসডেনের একজন ২৫ বছর বয়সী যুবক যে কিনা এমন প্রজন্মের বাসিন্দা যারা স্টানিসলাভ পেত্রভ না থাকলে বাঁচত না।

২০১৪ সালে পেত্রভকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র ‘The man who saved the world’ নির্মাণ করা হয় যেখানে পেত্রভের চরিত্রে অভিনয় করেন কেভিন কস্টনার।

“মানুষ যখন এসে আমাকে বলে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে আমার নাম হিরো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তখন আমি খুব আশ্চর্য হই। কারণ আমি নিজেকে কখনো হিরো হিসেবে কল্পনাই করিনি। আমি তো আমার নিজের কাজই করছিলাম”, নিজের সম্পর্কে স্টানিসলাভ পেত্রভ এর মন্তব্য। পুরো দুনিয়াকে ৩য় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বাঁচিয়েও এইরকম বিনম্রতা শুধু আসল হিরোদের মধ্যেই দেখা যায়। এমন হিরোদের জন্যই হয়তো আমাদের প্রজন্ম আজকের পৃথিবী দেখতে পারছে যা হয়তো স্টানিসলাভ পেত্রভ না থাকলে একদম অন্যরকম হতে পারতো!

Most Popular

To Top