ক্ষমতা

অতি-উৎসাহীদের কারণে কি নষ্ট হয়ে যাবে একটি ছেলের ছাত্রজীবন?

জাহিদুল ইসলাম

শেখ হাসিনার নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিয়ে ভুয়া নিউজ প্রকাশ করে কয়েকটি হিট-কামানো নিউজপোর্টাল এবং ফেসবুকের কিছু আন-অথোরাইজড পেজ। প্রথমে বলা হয়, শেখ হাসিনা শান্তিতে নোবেলের জন্য প্রস্তাবিত একশ জনের তালিকায় আছেন, গত ক’দিনে সেটা ৩ জনে এসে ঠেকেছে! সমস্যা বাঁধে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, কয়েকজন মন্ত্রী, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা, আওয়ামীলীগের পক্ষে লেখালেখি করা অ্যাক্টিভিস্টরা এ খবরটি শেয়ার করার কারণে। অনেকেই এটা সঠিক বলে মনে করে এবং এই খবর বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

এই আবেগটা স্বাভাবিক। দেশের একজন যদি নোবেল পুরষ্কার পায়, আর সেটা যদি হন শেখ হাসিনা- তখন আমাদের আনন্দ তো হবেই। কিন্তু সমস্যাটা হল এই তথ্যটি সঠিক নয়। শেখ হাসিনা মনোনয়ন পেয়েছেন- এই তথ্যটি সঠিক না ভুল, সেটা আমরা বলতে পারবো না, কারণ সেটা আমাদের জানার কথা নয়। হতেই পারে তিনি মনোনীতদের তালিকায় আছেন, হয়তো পেয়েও যেতে পারেন, কিন্তু সেটা আমাদের জানার কোন সুযোগ নেই। শেখ হাসিনা নোবেল পুরষ্কারের জন্য চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হলেও, নোবেল কমিটি ঘোষণা করার আগে- আমাদের সেটা জানার কোন সুযোগ নেই। নোবেল পুরষ্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি নিজেই দেখে আসতে পারেন। পুরষ্কার ঘোষণার আগে তালিকা প্রকাশ করা দূরে থাক, পুরষ্কার ঘোষণা করার ৫০ বছরের মধ্যে মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়না।

এটা জানার পরও অনেক অতি-আবেগী নেতাকর্মী মেখে মেখে এই সংবাদ প্রচার করেই যাচ্ছে এবং একশ জনের তালিকাকে সংক্ষেপে ৩ জনের তালিকায় নিয়ে এসেছে! এদের এই প্রচারণা কি প্রকারান্তরে শেখ হাসিনাকে অপমানিত করছেনা? এদের এই প্রচারণা কি তাঁকে হাস্যরসের বিষয়ে পরিণত করছেনা? এখন ধরুন, আমি যদি বলি, “নোবেল কমিটি যে তিন জনের শর্টলিস্ট দিয়েছে সেখানে আমার নামও আছে”- কেউ কি ভুল প্রমাণ করতে পারবেন? পারবেন না। কারণ, যেহেতু ঐ লিস্ট কেউ দেখেইনি, তাই আমার নাম সেখানে আছে কি নেই, সেটা কারো পক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এখন বলুন তো, আমার এই বাক্যে কোথাও কি শেখ হাসিনাকে অপমান করা হয়েছে বলে আপনার মনে হয়? আপনি যদি নিতান্ত নির্বোধ না হয়ে থাকেন, তবে এমনটা কখনোই আপনার মনে হবেনা। কিন্তু BUTEX শাখা ছাত্রলীগের তাই-ই মনে হয়েছে!

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম। যেই অতিভক্তরা প্রধানমন্ত্রীর নোবেল মনোনয়নের ভুয়া খবরটি ছড়াচ্ছিলো তাদের উদ্দেশ্য করে একটি পোর্টালের লেখা শেয়ার করে জাহিদ। সাথে উপর দিয়ে লিখে দেয়-

“নোবেল পুরষ্কারের যে তিনজনের শর্টলিস্ট প্রকাশ করছে- তাতে আমার নামও আছে। কেউ পারলে প্রমাণ করুক আমার নাম নাই!”

এই নির্দোষ বাক্যজোড়া দেখে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হল এই স্ট্যাটাসে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে কটুক্তি করা হয়েছে! এই অভিযোগে তাকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। তার এই স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট দিয়ে অভিযোগ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। মজার বিষয় প্রশাসন অভিযোগ আমলেও নিয়েছে। তদন্ত চলাকালীন সময়ে জাহিদকে হল ছেড়ে দিতে নোটিশও দিয়েছে ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ এবং জানিয়েছে তদন্তসাপেক্ষে যথাযোগ্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে! হায় সেলুকাস, কি বিচিত্র এ ছাত্রলীগ! কি বিচিত্র এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন!

আমাদের কাজ এই অবিচারের তথ্যটুকু ছড়িয়ে দেয়া। সবাইকে জানানো যে, কত বড় অন্যায় হচ্ছে একজন ছাত্রের সাথে। কত বড় অনাচারের সাথে তার শিক্ষাজীবন নষ্ট করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। সেই সাথে এই অন্যায় যেকোন মূল্যে প্রতিরোধ করা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, ছাত্রলীগের সবাই নিশ্চয়ই পঁচে যায়নি। ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটির মধ্যে এখনও নিশ্চয়ই কেউ না কেউ আছে, যারা নির্বোধ-জ্ঞানশূণ্য নয়। তাদের বা দায়িত্বশীল কারো হস্তক্ষেপে এই অন্যায় বন্ধ হবে- এই আশা করি। সেই সাথে BUTEX-এর সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চয়ই সকলে মেরুদন্ডহীন নয়। যাদের মেরুদন্ড আছে, তারা এই সময়ে জাহিদের পাশে দাঁড়াবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

জাহিদ যদি বলে থাকে নোবেল পুরষ্কারের শর্ট লিস্টে তার নাম আছে তাহলে এখন আমিও দাবী করলাম, যেহেতু আমি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের সাথে জড়িত,তাই গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি- নোবেল কমিটির শর্ট লিস্টে আমারও নাম আছে। এবার আসুন। আমার নামেও কটুক্তির মামলা ঠুকে দিন!
একটা ছেলের এত বছরের শিক্ষা জীবন এত ঠুনকো কারণে কিছু নির্বোধের জন্য ধ্বংস হয়ে যাবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায়না। সকলে যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করুন। যারা সত্যি সত্যিই আওয়ামীলীগ এবং শেখ হাসিনাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন- আপনাদেরই সবার আগে প্রতিবাদ করা উচিত, সব থেকে বেশি সোচ্চার হওয়া উচিত।

আচ্ছা বলুন তো, লজ্জা লাগেনা আপনাদের?

জাহিদুল ইসলামের ঘটনাটি কি তারিক সালমনের ঘটনাটিরই পুনরাবৃত্তি নয়?

[এডিটরস নোটঃ নাগরিক কথা সেকশনে প্রকাশিত এই লেখাটিতে লেখক তার নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করেছেন। নিয়ন আলোয় শুধুমাত্র লেখকের মতপ্রকাশের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফরমের ভূমিকা পালন করেছে। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আপনার আশেপাশে ঘটে চলা কোন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে চান সবার কাছে? আমাদের ইমেইল করুন neonaloymag@gmail.com অ্যাড্রেসে।]

Most Popular

To Top