লাইফস্টাইল

বিদেশী ডাক্তার না দেখালে এই সোসাইটিতে কি আর মান-সম্মান থাকে!

বিদেশী ডাক্তার না দেখালে এই সোসাইটিতে কি আর মান-সম্মান থাকে!

১.
ঘুমিয়ে ছিলাম, মোবাইলের রিংটোন এ ঘুম ভাঙলো। স্কুল লাইফের এক বন্ধু ফোন দিয়েছে, আনন্দ নিয়ে ফোন রিসিভ করলাম। কুশলাদি পর্ব শেষ হবার পর ফোন করার আসল কারণ বের হলো। পত্রিকা মারফত সে জানতে পেরেছে ইন্ডিয়ান কিছু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এদেশে কিছুদিন পর আসছে চিকিৎসা সেবা দেবার জন্য। আমার কাছে ফোন দেবার কারণ আমি যাতে তার জন্য একটা সিরিয়ালের ব্যবস্থা করে দেই। যেহেতু আমি ডাক্তার, কাজেই ব্যাপারটা নাকি আমার জন্য সহজ হবার কথা!

কথায় কথায় জানলাম, এর আগেও সে সিরিয়ালের জন্য ট্রাই করেছে। কিন্তু, রোগী এত বেশী যে সে সিরিয়ালই পায়নি।

ফোন রাখার আগে বন্ধু আমার এদেশী ডাক্তারদের কসাই বলে ইন্ডিয়ান ডাক্তারের প্রশংসাও করলো। বিজ্ঞাপনে নাকি বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান ডাক্তাররা এদেশে রোগী দেখবে বিনা পয়সায়!

২.
ফোন রেখে ফ্রেশ হয়ে পেপার হাতে নিলাম। বিজ্ঞাপনটি খুঁজে বের করলাম।

তিনজন ডাক্তারের ছবি। ডাক্তার না বলে এদের ফেরেশতা বলাই ভালো। সুদূর দিল্লী থেকে এরা কষ্ট করে এদেশে আসবেন এদেশের মানুষকে বিনামূল্যে সেবা দেয়ার জন্য। ফেরেশতা তো বটেই, স্যুটেড-বুটেড ফেরেশতা!

আমিও যে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেই না, তা কিন্তু না। তবে সেটা বিভিন্ন জাতীয় দিবসে। ইনারা অবশ্য কোনো দিবসে না, এমনিতেই ফ্রী চিকিৎসা দিবেন। এদের কাছ থেকে উদারতা আমাকে শিখতে হবে বৈ কি!

৩.
মাসখানেক আগে এক অনলাইন পোর্টালে এক ভারতীয় চিকিৎসকের প্রতারণার খবর পড়েছিলাম।

চিকিৎসক সাহেব এদেশে প্রথমে ফাঁদ পাতলেন। ফাঁদে কিছু রামছাগল ধরা দিল। এদেরকে মিঠা মিঠা কথা বলে এদেশ থেকে কলকাতায় নিয়ে ঢুকালেন।

কলকাতায় ঢুকিয়ে প্রথমে পকেট কাটা শুরু হলো। রামছাগলেরা তখনও ঐ চিকিৎসককে দেবতাতুল্য জ্ঞান করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

দেবতা যখন পকেট কাটার পর পুরো প্যান্ট কেটে ন্যাংটো করলেন তখন তাদের হুঁশ ফিরলো। দেশে ফেরত এসে ন্যাংটো অবস্থায় মিডিয়ার কাছে নিজেদের ছাগলামি তুলে ধরলেন।

নটরডেমে পড়ার সময় ম্যাথমেটিকস্ এর অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় জহরলাল রায় স্যার বলতেন, ‘এদেশের মানুষ ফ্রি পেলে বিষও খায়’…. কথাটা শতভাগ সত্যি! বিষ খাবার পর যখন একটার পর একটা অর্গান ফেইল করতে থাকে তখন এদের সম্বিৎ ফেরে।

৪.
কয়দিন পর পর বিভিন্ন পত্রিকায় ভিনদেশী ডাক্তাররা এদেশে পদধূলি দিতে আসবেন, সে খবর পড়ি। পত্রিকায় রাশভারী চেহারার কিছু ছবি দেখি, সাথে থাকে অসংখ্য ডিগ্রির বহর, সেসব ডিগ্রি বহন করার জন্য তারা সাথে করে কোনো রাজস্থানী উট নিয়ে আসেন কিনা তা আমার জানা নেই।

তবে আমি যা বুঝি তা হলো এদের মূল ডিগ্রি মোটামুটি একটি; হয় MD বা MS, যে ডিগ্রি করতে MBBS এর পর তাদের সময় লাগে ৩ বছর!

একই ডিগ্রি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমাদের চিকিৎসকদের নিতে হয় ৫ বছরে। যে সব ডিগ্রি লিখে ইন্ডিয়ান ডাক্তারদের হাইলাইট করা হয়, এর থেকে অনেক বেশী ইন্টারন্যাশনালী রিকগনাইজড্ ডিগ্রি নিয়ে এদেশের ডাক্তার বসে রয়েছেন।

আমরা অবশ্য আমাদের এই দেশী চিকিৎসকদের মূল্যায়ন করি না। বিদেশী ডাক্তার না দেখালে এই ন্যাস্টি সোসাইটিতে কি আর মান-সম্মান থাকে!

‘গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না’ কথাটা আসলে আমাদের দেশের জন্য এক্কেবারে পারফেক্ট। আমরা নির্দ্বিধায় ‘বিদেশী কুকুর ধরি স্বদেশী ঠাকুর ফেলিয়া’।

৫.
এদেশের পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডক্টররা যথেষ্ট Efficient। আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যারদের সক্ষমতা সম্পর্কে আমার নিজের ধ্যান-ধারণা অনেক উচ্চ

কিন্তু আফসোস হয়, আমাদের এই স্যারদের চোখের সামনেই এই প্রতারণাগুলো চলে আসছে। ‘নীরবতা সম্মতির লক্ষণ’- দিনের পর দিন এই ঘটনাগুলোতে আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যাররা নীরব থাকছেন। তাঁদের এই নীরবতা কিন্তু তাঁদের সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

৬.
বিজ্ঞাপনে ব্যাক করি।বিজ্ঞাপনে একেবারে উপরের দিকে এবার এক নতুন জিনিস দেখলাম। ইন্ডিয়ান ডাক্তাররা এদেশে এসে যে ফেরেশতাগিরি করবেন-সেটা নাকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এর অনুমোদনপ্রাপ্ত। ভালোই…

আচ্ছা, আমাদের দেশের ডাক্তাররা যদি দাদাদের দেশে গিয়ে রোগী দেখতে চান, তবে ঐদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি সেটার অনুমোদন দিবে? কি মনে হয়?

“হীরক রাজার দেশে” মুভিটির একটি লিরিক মনে পড়ছে, “কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে ও ভাই, কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়….”

৭.
যেসব পত্রিকায় এসব বিজ্ঞাপন ছাপা হয় তাদের ব্যাপারে বলি।

ঐসব পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত এদেশের চিকিৎসকদের ভিলেন হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এদেশের চিকিৎসকদের চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে- সে কথা এসব পত্রিকা প্রচার করে না। অন্যদিকে ঐসব পত্রিকায় নিয়মিত ভিনদেশী ডক্টরদের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, তাদেরকে দেবতা হিসেবে প্রকাশ করা হয়। মোটিভটা কি সেটা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হবার প্রয়োজন দেখি না।

অথচ এদেশের আলো হাওয়ায় যারা বেঁচে থাকেন সেই সম্পাদকরা কিন্তু ভিন্ন কাজ করতে পারতেন। এদেশের চিকিৎসকদের পজিটিভ নিউজগুলো তুলে ধরতে পারতেন, আমাদের ভুলগুলোকে পজিটিভ ওয়েতে সমালোচনা করতে পারতেন। আমরা আনন্দিত হতাম, উৎসাহিত হতাম, এদেশের জনগণ উপকৃত হতো।

আফসোস, এত উদারতার পরিচয় তারা দিতে পারেন নাই….

৮.
এদেশের জনগণদেরও কিছু কথা জানা থাকা প্রয়োজন। The Huffington post (বর্তমানে HuffPost) এর একটি দুইটা লাইন হুবহু উল্লেখ করিঃ

“No country in the world has more open defecation than India, where one in two people defecate outside. Every year, 200,000 children in India die from diseases caused by fecal contamination….”

যে দেশের এই অবস্থা, যে দেশ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় WHO ranking এ আমাদের পেছনে, সে দেশ থেকে চিকিৎসক কেনো আমাদের দেশে এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়- সেটি আপনাদের বুঝতে হবে। বোকামীর মাধ্যমে অনেক দেশী কারেন্সী তো ট্রান্সফার করলেন, আর কতো?

একই ভাবে, যে দেশে দুইজনে একজন Open Air Defecation এর শিকার সে দেশের হাসপাতালে গিয়ে তাদের বেড দখল করে বড়াই করে সেটা ফলাও করাটাও কোনো কাজের কথা না।

পরিশেষঃ ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা ‘- এই দেশের প্রতি ভিনদেশীরা যুগ যুগ ধরে আকৃষ্ট হয়েছে। এদেশে তারা এসেছে নানা ভঙ্গিমায়, নানা মুখোশে। এদেশের সহজ সরল লোকদেরকে শোষণ করা হয়েছে, এদের লুণ্ঠন করে এই ভিনদেশী ডাকাতরা নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি করেছে। সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে , লুণ্ঠন কিন্তু বন্ধ হয় নাই।

তবে একথাও সত্যি যে, অতিথিপরায়ণ এই জাতি একটা সময় এই ভিনদেশীদের এদেশে আগমনের মূল কারণটি ধরতে পেরেছে। ইতিহাস বলে, প্রতিটা ক্ষেত্রে এদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে।

ভিনদেশী যে লম্পটেরা এখনও এদেশে পায়চারী করছে- আমি নিশ্চিত শুভ বুদ্ধির উদয়ে একটা সময় এদেরও বিতাড়িত করা হবে। শত শত বছরের এদেশের ইতিহাস কিন্তু সেকথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top