নাগরিক কথা

ধর্ষকামী মানসিকতা বনাম ড্রেস কোড

ধর্ষণ, ধর্ষকামী মন-মানসিকতা ও ড্রেস কোড Neon Aloy

আজকের যে লেখার টপিক, সেটা খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবেই আমাদের সমাজে পরিচিত। ধর্ষণ, ধর্ষকামী মন-মানসিকতা ও ড্রেস কোড থেকে শুরু করে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত। লেখাটা কোন ‘বাদ’ মেনে লেখা না, লেখা সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমাদের সমাজের এই ব্যাপারটার প্রতি রেসপন্স ও এর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা থেকে। গত কিছুদিনে এই ব্যাপারটা নিয়ে শাবিপ্রবি ও ফেসবুক ভুক্তভোগী। কিন্তু আমার আঙ্গুল কোন অবস্থাতেই কোন মানুষকে কেন্দ্র করে লেখা না। প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে লেখা।

আমরা মানুষ। আমাদের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই প্রজাতিগত প্রজনন ও লিঙ্গব্যবস্থা বেশিরভাগ উন্নত স্তন্যপায়ীর মত, দুইটি লিঙ্গ- পুরুষ ও স্ত্রী। আমাদের নারী প্রজাতিদের অবস্থান সামাজিকভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবেই আমরা অবদমিত হিসেবে রেখেছি। আমাদের মা-বোন প্রজাতি (যে শব্দযুগল আমি আর ব্যবহার করতে চাচ্ছি না, নারীর সম্মান-আব্রু বুঝাতে কখনই মা বোন না, নারীকে প্রতিটা সম্পর্ক হিসেবে দেখেই তার প্রতি সম্মান ঠিক রাখা সম্ভব) তাদের জীবনের শুরু থেকেই নিজেদের মানুষের জায়গায় কারো আগ্রহের, কারও গবেষণার, কারও নির্যাতনের, কারও যৌনতার প্রোডাক্ট হিসেবে পেয়ে আসছে। ছোট থেকে আমাদের ছেলে-মেয়েরা যখন বড় হয়ে উঠতে শুরু করে, আমাদের সমাজ আমাদের জন্য লুকায়িত রাখে যে অধ্যায়, তার নাম যৌনতা। কারণ সমাজব্যবস্থা যাদের হাতে, তারা নিজেরাও একইভাবে একই সমাজ পেয়ে এসেছে। যে মুহূর্তে মায়ের স্তন ব্যাপারটা তার সামনে স্বাভাবিক একটা অঙ্গ হিসেবে তৈরি হবার কথা ছিল, সে বয়সেই তাকে আকারে ইঙ্গিতে বুঝানো শুরু হয়েছে এই ব্যাপারটা এড়িয়ে যাও। যে বয়সে একটা অন্তর্বাস বা স্যানিটারী ন্যাপকিনের এডভার্টাইজ আমাদের সামনে সাধারণ ১০ টা ব্যাপারের মতই হওয়া উচিত ছিল, তখন থেকে আমাদের সে এডভার্টাইজের সম্মুখীন হলেই চ্যানেল বদলাতে দেখা গেছে। নারী অঙ্গ হিসেবে , শিশুর প্রাথমিক খাবারের উৎপাদক অঙ্গ হিসেবে যেখানে সেটা তার কাছে পরিচিত হবার কথা ছিল, তখন সে ব্যাপারটাকে ট্যাবু হিসেবে দেখে আসছে। যখন ঘামের জন্য ডিওড্রেন্ট, চুলের জন্য শ্যাম্পুর মতই পিরিয়ডের মত প্রজননের মহাগুরুত্বপূর্ণ সাইকেলের ব্লাড ফ্লো এর প্রোটেকশানের জন্যই যে ন্যাপকিন তা আমাদের শেখানো হয় নি, মাথার জন্য ক্যাপ, হাতের জন্য গ্লাভসের মতই তোমার আমার প্রাইমারী বস্ত্র হিসেবে একটা অন্তর্বাস আমাদের সাধারণ ড্রেস হিসেবে পরিচিত করানো হয় নি, তখনই আমাদের সাইকোলজিতে জন্ম নেয়া শুরু করে অযাচিত প্রশ্ন আর অজানা আগ্রহ, আমরা আস্তে আস্তে না বলা ব্যাপারটাকে “লজ্জা” হিসেবে আমাদের মন মস্তিস্কে কনস্ট্রাক্ট করি, পরিকল্পিতভাবে নিষিদ্ধ হিসেবে রুপ দেয়া ব্যাপারের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ অনুভব করি, যা সঠিক সময়ে আমরা জানলে তৈরিই হত না।

কেন, আমাদের ছেলেদের মুসলমানি তো কোন লজ্জা না, উৎসব করার মত প্রকাশ্য হয়ে উঠছে যুগের পর যুগ ধরে, সেখানে কেন নারীর অঙ্গ-কাপড়চোপড় আমাদের আলোচনায় আকর্ষণীয় ব্যাপার ? কারণটা পারফেক্টলি সাইকোলজিক্যাল। আমরা ছোটবেলা থেকে ব্যাপারগুলো এক প্রশ্নেই উত্তর হিসেবে পেয়ে আসি নি। আমাদের সেগুলো নিষিদ্ধ হিসেবেই দেখানো হয়েছে, এটা এক ধরণের ঐতিহাসিক পুরুষতান্ত্রিকতার জায়গা থেকে।

একটা মানুষের শরীর সরলরৈখিক না । বক্ররৈখিকতা আমাদের সাধারণ ব্যাপার। আমি যদি ছোটবেলা থেকেই ট্যাবু হিসেবে জেনে না আসতাম ব্যাপারগুলো, তাহলে আমার কখনো সুপ্ত আগ্রহ ও তা দেখার ইচ্ছা হতো না যে একটা কার্ভের নিচে কি আছে। আগ্রহের কারণ, আমাকে কেউ কখনো নিঃসংকোচে উত্তর দেয় নি। অপেক্ষা করার মত মেন্টালিটি ডেভেলপ করতো না যে কখন সামনের মেয়েটার ওড়না বাতাসে উড়ে যাচ্ছে বা জামা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে।

প্রতিটা ব্যাপার ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতেসি। জাস্টিস ফর ওম্যান গ্রুপটাতে পোস্ট দেখলাম, একটা মেয়ে সারাদিন কাজ করে ফেরে, তখন তার ঘামে ভেজা পিঠে আমরা অন্তর্বাসের ঘের বা স্ট্র্যাপ খোঁজার চেষ্টা করি। আপনি যখন বাসায় ফিরছেন সেই বাসে করে ঘর্মাক্ত শার্টের মাঝে সাদা দৃশ্যমান স্যান্ডো নিয়ে, সেটা নিয়ে তো কোন কমেন্ট হচ্ছে না। কারণ আবারও, একই।

আমাদের জন্য ট্যাবু হিসেবে এসব ব্যাপারকে রাখা আর আগ্রহ সৃষ্টি। ড্রেসের সাথে কোন সম্পর্কই নাই যৌনতার, ড্রেস জিনিসটা প্রতিষ্ঠিত যৌনতার একটা কনসেপ্ট, যা আপনার মাঝে ডেভেলপ করা হইসে। ড্রেস এখানে ফোকাস না, ফোকাস ওই অজানা আগ্রহই- ড্রেসের মাঝে কি আছে, কেন আছে। তার ড্রেস ব্যাপারটা আপনার লজ্জাস্থানের মতই তার লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য, এর বেশি কিছু না। এসবের পেছনে শুধু পরিবার না, দায়ী সমাজ ও অর্থনীতি ব্যবস্থায় মেয়েদেরকে ভোগপণ্য, লজ্জা ও ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করা। আমাদের মাঝে উপস্থাপন করা হচ্ছে তাকে খাবারের মত। সরি, আপনার চিন্তা ভুল। আমার আপনার মতই তার শরীর ঘামে, সে দেবী না। আমার আপনার মতই তার চুলে খুশকি হয়, তার শরীরে লোম আছে, আছে নারীত্বের কারণে স্ট্রেচ মার্ক, আমার আপনার মতই তার রেচনপ্রক্রিয়া, শি ডাজ নট শিট গোল্ড ডাস্ট। তার পায়ে কাদা লাগে, তার রক্তে আপনার রক্তের মতই গন্ধ থাকবে, তার লাশ আপনার লাশের মতই পচবে। সে খাবার না, মানুষ। সে কোন মজাদার প্রোডাক্ট না, সে একটা বায়োলজিক্যাল ক্রিয়েচার। ।

যৌন সম্পর্ক। খুব স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া। আপনার খাওয়া যেমন আপনার ইচ্ছা, আপনার প্রস্রাব করাটা আপনার ইচ্ছা, আপনার যৌনতা আপনার ইচ্ছা। এখানে যার সাথে আপনি সে সম্পর্ক করবেন, সে ইচ্ছাটা সিমিলারলি তার থাকতে হবে, তার “মত” না, “সিদ্ধান্ত” টাতে তার সমান ভাগ থাকতে হবে। কারণ আমরা একই প্রজাতি “মানুষ” এর দুই লিঙ্গ, নারী কোন অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমত্তা ও বিকাশ সম্পন্ন প্রজাতির না যে আপনি কুকুর-বিড়ালের মত তাকে চালাবেন, পালবেন, ট্রিট করবেন। বন্ধুর অন্ডকোষে লাথি দিলেই সে চিৎকার করে কেঁদে দেয় ব্যথায়, তার সেনসিটিভ জায়গা, আপনার মত মানুষের কপালের পাশের রগ চেপে ধরলে আপনি অজ্ঞান হবেন, হাতে শক্ত আচড় দিলে রক্ত বেরুবে। একইভাবে আপনি ধর্ষণের জন্য তাকে চেপে ধরলে তার শরীরেও ক্ষত হবে, যোনী ক্ষতবিক্ষত হবে ঠিক আপনার আচড় খাওয়া হাতের মতই। আর বড় ক্ষতিটা হবে তার মানসিক ক্ষত, সেটা ঠিক আপনি তাকে সমপ্রজাতি না ভেবে কুকুর-বিড়ালের মতই হাত পা দিয়ে চেপে ডোমিনেন্ট ট্রিট করার জন্য, তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাকে আঘাত করার জন্য। সে অধিকার আপনাকে কেউ দেয় নি।

আমাদের মনে এসব ব্যাপার ক্লিয়ার না বলেই আমরা নারীর এক অবাস্তব সেক্সুয়াল প্রতিকৃতি আমাদের মধ্যে ডেভেলপ করি, অজানাকে সেক্সুয়াল ফ্রাস্ট্রেশান হিসেবে তৈরি করি। আর সেই ট্যাবু আর মজাদার খাবারসুলভ সাইকোলজিটাই বয়স হবার সাথে সাথে আমার মধ্যে গেড়ে বসে পড়ে। আমরা একটা ওরিয়েন্টেশান অনুষ্ঠানে টিজ করি একটা মেয়েকে, আমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটা মেয়েকে নিয়ে কমেন্ট করি (অনস্বীকার্য, আমি নিজেও করেছি, আমার সমাজ আমাকে এভাবে বড় করেছে) আর
তাকে ধর্ষণ করলে সে উপভোগ করে, এমন ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বসে থাকি।

শুরুটা অনেক পুরনো। আমি হিস্টোরিক্যাল ডিটেইলে যাবো না। যে সমাজ আপনার আমার মাঝে এমন মেন্টালিটি ডেভেলপ করে, সেই সমাজে নারীর এসব স্বাভাবিক ও ন্যাচারাল ফেনোমেনা আপনি মেনে নিলেই আর সাইকোলজিক্যালি ডেভেলপ করলেই সহপাঠী মেয়েটা হাত ধরলেও সেটা মানুষ এর হাত লাগবে, ধর্মের বোনের অন্তর্বাসের ফিতা দেখে আপনি কামনা বাসনার বদলে নিজের ভেতর খারাপ লাগতে দেখবেন তার সারাদিন চাকরী করে বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে।

এত কথাবার্তা লেখার জন্য আমি মনে করিনা আমার সরি ফিল করার কিছু আছে।

ক্যাম্পাসে যা হয়েছে, তা কোন প্রতিষ্ঠিত মেন্টালিটির জায়গা থেকে হয়েছে, কারো একার অপিনিয়ন না। আমার আপনার মেন্টালিটিও সিমিলারলি ডেভেলপ করছে। একটা ছেলে বলছে বলে অন্যরা যে সে ধারণা ধারণ করে না তা না। কিন্তু এই চিন্তাভাবনা গুলো যে তার মাঝে ডেভেলপ হচ্ছে, তার দায় কি সমাজের না ? শাস্তি বা মাফ কোনটাই এখানে সলিউশান না। সলিউশান হচ্ছে যৌনতার ও নারী-পুরুষের সঠিক কনসেপ্ট তাকে বুঝানো, সময় নিয়ে তাকে তা চর্চা করার ও নিজের সাইকোলজিতে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দেয়া। আমার ক্যাম্পাস না, সমাজের শুরু থেকে কম বয়স থেকে পরিবার থেকে শিক্ষা দেয়া, পাঠ্যবইয়ে স্যার-ম্যাডামদের এসব ব্যাপার এড়িয়ে যেয়ে পালটা আগ্রহ ও ভুল ধারণা সৃষ্টি না করা, ব্যাপারটাকে ন্যাচারালিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, ট্যাবু হিসেবে নয়।

ধন্যবাদ কষ্ট করে লেখাটা পড়ার জন্য।

Most Popular

To Top